নেতাবাবুদের অফিসঘরে
বন্দী নারীর ইজ্জত
মনের ভিতর গুমরে কাঁদে মর্মযন্ত্রণা
তাইতো খুঁজছি সবাই নয়া সমাজের
‘ আলোর ঠিকানা ’
রচনা :- অর্ঘ্য ঘোষ
দ্বিতীয় দৃশ্য
স্থান-নাইট স্কুল।সেখানে বোর্ডে অ-আ , ক-খ লেখা রয়েছে । মেঝেয় বসে কিছু ছেলে মেয়ে।একদিকে ছেলেদের শ্লেটে লেখা দেখছে বিপুল।অন্য দিকে মেয়েদের সুর করে অ – আ পড়াচ্ছে সুচরিতা।
সুচরিতা-বল সবাই , অ এ অজগর আসছে তেড়ে।
ছাত্রছাত্রীরা - অ এ অজগর আসছে তেড়ে।
সুচরিতা-আ এ আমটি খাব পেড়ে ।
ছাত্রছাত্রীরা –আ এ রামটি খাব পেড়ে।
সুচরিতা- রামটি নয় বলো আমটি ।
ছাত্রছাত্রীরা - আমটি ।
সুচরিতা-এবার বল এক এ চন্দ্র , দুই এ পক্ষ।
ছাত্রছাত্রীরা -এক এ চন্দ্র ,দুই এ পক্ষ।
সুচরিতা- তিন এ নেত্র।
ছাত্রছাত্রীরা - তিন এ নেত্র ।নেত্র মানে কি দিদিমনি ?
সুচরিতা- নেত্র মানে চোখ।
ছাত্রছাত্রীরা - তিনটি চোখ ?
সুচরিতা - দেবী দুর্গার মুর্তি দেখেছ তো তোমরা।ক'টা চোখ আছে ?
ছাত্রছাত্রীরা - তিনটে তিনটে , একটা কপালে।
সুচরিতা- ঠিক বলেছ। মানুষেরও তিনটে চোখ হতে পারে । সেই চোখ মানুষকে অর্জন করতে হয় । সেই চোখ হল জ্ঞানের চোখ।
ছাত্রছাত্রীরা -- কি মজা - কি মজা , আমরাও সেই চোখ অর্জন করব ।
সুচরিতা-- খুব ভাল কথা ।
তাহলে তো তোমাদের আগে পড়াশোনা করে করতে হবে ।
ছাত্রছাত্রীরা -- করব দিদিমণি । আমরা আপনার কাছে পড়েই জ্ঞান অর্জন করব ।
( ঠিক সময়েই এসে পড়েছি বলতে বলতে কৃষ্ণধনের প্রবেশ )
বিপুল- আরে কৃষ্ণধনবাবু যে,আসুন কি সৌভাগ্য আমাদের আলোর ঠিকানায় আপনার মত লোকের পদধুলি পড়ল।বসুন বসুন। ( চেয়ার দেখিয়ে )
কৃষ্ণধন-দেখতে এলাম আপনাদের নাইট স্কুল । ( চেয়ারে বসে )
বিপুল- শুনে ভাল লাগল। আসলে এইসব ছেলেমেয়েরা দিনের বেলায় হয় ঝিগিরি কিম্বা বাগালি করে।দিনের বেলায় তো ওদের পড়ার সুযোগ নেই , সেই কথা ভেবেই এই নাইট স্কুলটা খুলেছি। ( তারপর ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে ) আজ প্রথম দিন।যাও সব ছুটি। আমি জানি তোমরা কেউ চা-মিষ্টির দোকানে কাজ কর।কেউ বা পড়ের বাড়িতে ঝি চাকরের কাজ কর।
কারও দিন কাটে মোটর গ্যারেজে।সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমে সকলে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়।কিন্তু সমস্ত ক্লান্তি ভুলে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তোঁমাদের এখানে আসতেই হবে।ন্যুনতম শিক্ষাটুকু সবার চায়।বুঝলে সবাই ?
ছাত্রছাত্রীরা - হ্যাঁ --ছুটি ছুটি। ( বলে কলরব করতে করতে প্রস্থান )
কৃষ্ণধন- তোমাদের এই উদ্যোম কত দিন টিকবে ?
বিপুল- প্রথম দিনেই এ প্রশ্ন কেন ?
কৃষ্ণধন- ঘরে খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর পাগলামি তো বাঙালির বেশি দিন থাকে না ।
বিপুল-একে আপনি পাগলামি বলছেন ?
কৃষ্ণধন- নয় তো কি ? যেখানে শিশুদের শিক্ষার জন্য সরকার অঢেল টাকা খরচ করছে সেখানে তোমাদের এই উদ্যোগের কোন মানে আছে বলে আমি মনে করি না।
বিপুল- আপনি কি মনে করেন , আর না করেন তার উপর তো সব কিছু নির্ভরও করে না। আমাদের এই ছোট ছোট উদ্দ্যোগে সরকারের বিশাল কর্মযজ্ঞের ভার অনেকটাই লাঘব হবে বলেই আমরা মনে করি।সিন্ধুতে বিন্দু হলেও একদিন বিন্দু বিন্দু করে সিন্ধু ভরিয়ে দেব।তাছাড়া সার্বিক শিক্ষার যে সব প্রতিষ্ঠানগুলি রয়েছে সেখানে কাজের কাজ কতটুকু হয় তার সংশয় রয়েছে রীতি মতো।কিন্তু সার্বিক শিক্ষার নামে যে সরকারি টাকার ভালো রকম শ্রাদ্ধ হয় তা আমি জানি , আপনিও জানেন।
কৃষ্ণধন- যত সব নাটুকে ডায়ালগ ।
বিপুল- নাটুকে ডায়ালগ নয় কৃষ্ণধনবাবু ,নাটুকে ডায়ালগ নয় ।আমরা দেখিয়ে দিতে চাই প্রতিনিয়ত অভাবের যাঁতাকালে পিষ্ট কচি কাঁচারাই প্রকৃত শিক্ষায় তৈরি হয়েছে আগামী দিনের সৈনিক।
কৃষ্ণধন- এ তোমাদের আকাশ কুসুম কল্পনা।
বিপুল- আপনাদের কাছে তো কল্পনাই মনে হবে।আপনার চান না হতদরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলো পাক।কারণ শিক্ষিত হলেই ওরা বুঝে যাবে ইন্দিরা আবাসের বাড়ি ,বার্ধক্য ভাতার টাকা কিম্বা ১০০ দিনের কাজ আপনারা দয়া করে দেন না , এ ওদের নায্য প্রাপ্য।সেদিন আর কেউ আপনাদের দাসত্ব করবে না।ভেঙে পড়বে আপনাদের রাজ্যপাট।
কৃষ্ণধন- তোমারা সেই আনন্দেই থাক। (প্রস্থান )
( আনন্দ নেই , কোথাও আনন্দ নেই ।বলতে বলতে মদের বোতল হাতে টলতে টলতে স্পন্দনের প্রবেশ )
সুচরিতা - একি স্পন্দনদা আবার তুমি --- ?
স্পন্দন - (জড়ানো গলায়) আনন্দ নেই ,সত্যি বলছি কোনোখানে এতটুকু আনন্দ নেই। সে তো কবেই হারিয়ে গেছে।
সুচরিতা - স্পন্দনদা তুমি আবার মদ খাচ্ছ ?
স্পন্দন- খাচ্ছি , বেশ করছি তুই বলার কে ?
সুচরিতা - তুমি না আমায় বোন বলে ডেকেছো ?
স্পন্দন - না , আমার কোন বোন নেই , আমি কারও দাদা নই ।
সুচরিতা - স্পন্দনদা ?
স্পন্দন - বাল্যকালেই বাবা মাকে হারিয়েছি । এক রাজনৈতিক নেতার ছেলের হাতে ধর্ষিতা হয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে একমাত্র বোন।
পুলিশ প্রশাসনের দরজায় মাথা খুঁড়েও কোন বিচার পাইনি। তাহলে আমি কিসের দাদা ? এ পৃথিবীতে আমি সম্পূর্ণ একা। একাকী জীবনে সব আনন্দ হারিয়ে গিয়েছে।কিন্তু যখনই পালায় দড়ি দিয়ে বোনের মৃত্যু দৃশ্যটা মনে পড়ে তখনই আমি মদ খাই , মাতাল হই।
বিপুল- কিন্তু মদ খেলেই কি শান্তি পাও ?
স্পন্দন- না , শান্তি পাই না।বরং জ্বালা আরও বেড়ে যায়।চোখের সামনে বোনের ধর্ষণকারীকে ঘুরে বেড়াতে দেখে মনে হয় টুঁটি টিপে শেষ করে দিই লম্পটটাকে।
সুচরিতা- স্পন্দনদা।
স্পন্দন-তোর এই দাদা ডাকটাই বড় দুর্বল করে দেয় আমাকে।হতভাগীটাকে মনে পড়ে যায়।ছোট থেকে কারও স্নেহ ভালোবাসা পায় নি।পয়সার অভাবে লেখাপড়াও হয়নি।যে যখন যা বলেছে , ফাইফরমাইস খেটে দিয়েছি।কিন্তু কেউ একথালা ভাতও এগিয়ে দেয় নি।তাই খিদে ভুলতে মদ খাই।কারণ এক বার পেটে ভাত পড়লেই খাবার চাহিদা বেড়ে যায়। মদ কিন্তু দীর্ঘক্ষণ খিদে ভুলিয়ে রাখে।
সুচরিতা - সাধ হয় নিজে হাতে পরিপাটি করে রান্না করে তোমায় বসিয়ে পেটপুরে খাওয়ায়।কিন্তু মামার বাড়িতে আমার তো সেই স্বাধীনতা নেই।যদি কোন দিন সেই সুযোগ আসে দেখো পাশাপাশি বসে দুই ভাইবোনে খাব।
স্পন্দন - এই যে তুই বললি , এতেই আমার পেট ভরে গেল রে।এত ভালোবেসে তো কেউ বলেও না ।
বিপুল - তোমাকে তো আমার বলাই আছ , যে দিন ইচ্ছা ঘরের ছেলের মত আমাদের বাড়ি গিয়ে পাত পেড়ে বসে যেও।
স্পন্দন- নারে , না । সমাজ গড়ার ব্রত নিয়েছিস তোরা।আমার মত এক সমাজবিরোধী তোদের মাথা ব্যাথার কারণ হতে চাই না রে , মাথা ব্যাথার কারণ হতে চাই না। ( প্রস্থান )
সুচরিতা - আশ্চর্য।জানো স্পন্দনদার সঙ্গে আমার অদ্ভুত মিল।
বিপুল- কি রকম ?
সুচরিতা - তখন আমি খুব ছোট। বাড়ির সামনে একটা জমি ছিল আমাদের
।আমাদের জ্ঞাতি গুষ্ঠির লোকেরা সেটা কিনতে চেয়েছিল , বাবা দিতে রাজী হন নি। সেই রাগে ওরা রাতের অন্ধকারে বাবাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে।ওদের নামে মামলা হলেও কোন লাভ হয় নি। টাকার জোরে ওরা পুলিশ -আইন সব কিনে নেয়। প্রমাণ অভাবে বেকসুর খালাস পেয়ে যায় সবাই।মাঝখান থেকে মামলা লড়তে গিয়ে সেই জমি তো বটেই , আমরা সর্বশান্ত হয়ে যায়। লাঞ্ছনা সইতে না পেরে মা আত্মহত্যা করেন।
বিপুল-তারপর ?
সুচরিতা- তার পর থেকেই লাথি ঝাঁটা খেয়ে মামার বাড়িতে পড়ে রয়েছি।আশায় আছি কবে কোন রাজপুত্র এসে রাক্ষসপুরী থেকে আমায় উদ্ধার করে নিয়ে যাবে।
বিপুল- পেয়েছো সে রাজ পুত্রের সন্ধান ?
সুচরিতা-পেয়েছি বই কি ?
বিপুল- কে সেই রাজপুত্র ?
সুচরিতা- দেখতে চাও তাকে ?( বলে বিপুলের দুই হাত ধরে ) এই তো সেই আমার রাজপুত্র , আমার স্বপ্নের সওদাগর একদিন ময়ূরপঙ্খী নাও ভাসিয়ে এসে জীবনকাঠি ছুঁইয়ে প্রাণ ফিরিয়ে সে নিয়ে যাবে আমায়।কিগো মশাই ,যাবে তো আমায় নিয়ে ?
বিপুল-যেতে তো ইচ্ছা করে।কিন্তু আমায় পিছু টানে কাজ।
সুচরিতা -কাজ ?
বিপুল - হ্যা , অনেক কাজ আমাদের করা বাকি রয়েছে সুচি। নাইট স্কুল নিয়েই থেমে থাকলেই হবে না।করতে হবে অনেক কাজ। রক্তদান , চক্ষুদান , দেহদানের অঙ্গীকার শিবির করে মানুষকে বোঝাতে হবে প্রতিদিন আমাদের শরীর থেকে যে পরিমান রক্ত অযথা নষ্ট হয় তার সামান্য অংশ দিয়েই বহু মানুষের মুল্যবান প্রান বাঁচানো যায়।
সুচরিতা- বিপুলদা তোমার কথা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
বিপুল- মানুষকে বোঝাতে হবে মৃত্যুর পর যে চোখ , যে নশ্বর দেহ আগুনে ছাই হয়ে যায় কিম্বা মাটিতে মিশে যায় সেই চোখ দিয়েই বহু দৃষ্টিহীনকে অপরূপ পৃথিবীর রূপ দেখানো যেতে পারে , নশ্বর দেহই ফিরিয়ে দিতে আরও একটি দেহের সক্ষমতা , খুলে দিতে পারে বিজ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত।
সুচরিতা - এত সব করে তুমি চাও বিপুলদা ?
বিপুল- আমি শুধু মানুষের ভালোবাসা চাই সুচি , শুধু মানুষের ভালোবাসা চাই।
সুচরিতা- মানুষের ভালোবাসা ?
বিপুল- রোগে- শোকে - দুঃখ বেদনায় মানুষের পাশে থেকে তাদেরই একজন হতে চাই।সুখের দিনে কেউ আমাকে মনে না রাখলেও কোন অভিমান নেই।তবু আমি মানুষকে পাশে পেতে চাই।
সুচরিতা-আমাকে চাও না ?
বিপুল- তুমিও তো মানুষের বাইরে নও সুচি। তাছাড়া অজান্তে কবেই তো তুমি আমার হৃদয়ে দেবীর আসন করে নিয়েছো ।
সুচরিতা-সত্যি ?
বিপুল- সত্যি -- সত্যি -- সত্যি । ( বলে সুচরিতার হাত ধরে ডায়াসে ওঠে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজনে এক সঙ্গে আবৃত্তি করে ---
( আবৃত্তি )
" আমরা দু'জনা স্বর্গ খেলনা গড়িব না ধরণীতে
মুগ্ধ ললিত অশ্রু গলিত গীতে
পঞ্চশরের বেদনা মাধুরী দিয়ে
বাসর রাত্রি রচিব না মোরা প্রিয়ে ।
ভাগ্যের পায়ে দূর্বল প্রানে ভিক্ষা না যেন যাচি
কিছু নাই ভয় , জানি নিশ্চয় তুমি আছ আমি আছি।"
( পর্দা নেমে আসে )



No comments:
Post a Comment