নেতাবাবুদের অফিসঘরে
বন্দী নারীর ইজ্জত
মনের ভিতর গুমরে কাঁদে মর্মযন্ত্রণা
তাইতো খুঁজছি সবাই নয়া সমাজের
‘ আলোর ঠিকানা ’
রচনা :- অর্ঘ্য ঘোষ
তৃতীয় দৃশ্য
( স্থান- কৃষ্ণধনের অফিস সেখানে মুখোমুখি চেয়ারে বসে কৃষ্ণধন এবং হরিসাধন ।
টেবিলে ফোন এবং ফোন খাতাপত্র )
কৃষ্ণধন- ভবতারনের ভাগ্নী ছুঁড়িটা অঙ্গনওয়াড়ীর কাজের টোপ দিয়ে কবজা করার কাজটা কতদূর এগোল হরিদা ?
হরিসাধন - যার সরষে...ফ্যাল ফ্যাল। মামাটাকে যে টোপ গিলিয়ে এসেছি তাতে চারে মাছ উঠল বলে।
কৃষ্ণধন - তাই নাকি ?
( নেপথ্যে কৃষ্ণধনবাবু আছেন নাকি ? বলতে বলতে সুচরিতা সহ ভবতারনের প্রবেশ , সুচরিতার হাতে ফাইল )
হরিসাধন-আছেন মানে ? বিলক্ষণ আছেন । বলি যারা সরষে...ফ্যাল ফ্যাল ।
ভবতারন - নমস্কার কৃষ্ণধনবাবু । ( তারপর ভাগ্নীর দিকে চেয়ে ) সুচি ওনাকে প্রনাম কর ।
( সুচরিতা প্রনাম করতে যায় , কৃষ্ণধন শশব্যাস্তে দুহাত তুলে অনাবশ্যক তার পিঠে - ঘাড়ে হাত বোলাতে থাকে ।
দেখাদেখি হরিসাধনও হাত বোলাতে যায়। বার বার সুচরিতার পিঠ এবং কাঁধের কাছে নিয়ে যায় সে।আবার তুলে আনে )
কৃষ্ণধন - না না , প্রনাম করতে হবে না ।
হরিসাধন - আমাদের আর প্রনাম করার কি আছে ?
ভবতারন-হাজার হলেও আপানার ওর গুরুজন ।
হারিসাধান - যার সরষে...ফ্যাল ফ্যাল ।কি আর এমন গুরুজন , আমাদের কি'ই বা আর এমন বয়স ? নাকি বল হে কৃষ্ণভায়া ?
কৃষ্ণধন- তা যা বলেছেন। জনগণের কাজের চাপ সামলাতে গিয়ে চুল দাঁড়ি কিছু পেকেছে ঠিকই , কিন্তু আমাদের কি আর গুরুজনের মতো বয়স ?
ভবতারণ - সে যাই হোক , এই আমার বাপ মা মরা ভাগ্নী ।
নিজের ভাগ্নী বলে বলছি না ভারী কাজের মেয়ে সুচি । জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত জানে।
সুচরিতা-আঃ মামা আবার শুরু করলে ?
ভাবতারন- মিথ্যাটা কি বলেছি শুনি ? সংসারের সব কাজ একা হাতে সামাল দিয়ে নিজের চেষ্টায় ওই রকম রেজাল্ট নিয়ে মাধ্যমিক পাশ করাটা কি চাট্টি খানি ব্যাপার ?
কৃষ্ণধন- তাই নাকি ?
ভবতারন - তবেঁ আর বলছি কি ? এখন আপনাদের দয়ায় একটা কাজ জুটলে ওর গতি হয়।
কৃষ্ণধন- হরিদার মুখে আমি সব শুনেছি । আমরা থাকতে এমন একটা মেয়ের গতি হবে না তাই কখনও হয় ?
হারিসাধান - যার সরষে...ফ্যাল ফ্যাল , তাই কখনও হয় ?
কৃষ্ণধন- ( সুচরিতার উদ্দেশ্যে ) তা তোমার সব কাগজ পত্র এনেছ তো ?
সুচরিতা - ( হাতের ফাইল দেখিয়ে ) অ্যাডমিট , মার্কসিট , পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেট সব এতেই আছে ।
কৃষ্ণধন - ( ফাইল খুলে কাগজ পত্র দেখে ) হ্যা , কাগজপত্র সব ঠিকই আছে । আবেদনপত্রটা লিখিয়ে নিতে কিছুক্ষণ দেরি হবে। ভবতারনবাবু আপনি বরং বাড়ি চলে যান। কাজ সেরে সুচরিতা চলে যাবে।
ভবতারন-সেই ভাল , অতক্ষণ দুজনে এখানে আটকে থাকলে সুচির মামী আবার কুরুক্ষেত্র বাঁধাবে। আমি তাহলে আসি ।
( প্রস্থান )
কৃষ্ণধন- এদিকে এসে বসো । ( বলে পাশের চেয়ার দেখায় সুচরিতা সেখানে বসে )
সুচরিতা- কাজটা আমার হবে তো মামাবাবু ?
হরিসাধন- এই দেখ , যার সরষে --- ফ্যাল ফ্যাল। না হওয়ার কি আছে , ঠিক জায়গাতেই এসেছো। কাজ তোমার হবেই হবে।
সুচরিতা-হবে ?
কৃষ্ণধন- হবে তো বটেই , কিন্তু কি জান আজকাল আর শুধু ভাল রেজাল্ট থাকলেই চাকরি হয় না । তার জন্য দুটো জিনিসের একটা চায়।
সুচরিতা-দুটো জিনিস ?
কৃষ্ণধন- একটা হচ্ছে টাকা , যা দেওয়ার ক্ষমতা তোমার নেই। তবে অন্যটা অবশ্য ভালো রকম আছে সুচি।
হরিসাধন - বলি যার সরষে...ফ্যাল ফ্যাল ? হেঁ হেঁ ভালো রকমই আছে। হি হি সুচি । নামটা শুনেই মনটা করে যেন খুচখুচি ।
সুচরিতা-অন্য কি আছে ? বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারলাম না ।
কৃষ্ণধন - বুঝতে পারছ না ? ( বলে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সুচরিতার মুখের দিকে। আর গায়ে পিঠে হাত বোলাতে থাকে )
সুচরিতা- সত্যি বলছি বুঝতে পারছি না ।
হরিসাধন-হেঁ হেঁ না বোঝার মত কচি খুঁকি তো তুমি নও । ( বলে উঠে গিয়ে হরিসাধনও সুচরিতার শরীরে হাত বোলাতে থাকে। সুচরিতা উভয়ের হাত সরিয়ে দেয় )
সুচরিতা- কি বলতে চাইছেন খুলে বলুন তো ?
কৃষ্ণধন- ( পুনরায় সুচরিতার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলে ) কথায় আছে ফেল কড়ি মাখো তেল। কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়।
তাই চাকরির আগে তোমাকে যে আমাদের সঙ্গে বার কয়েক লজ হোটেলে রাএি বাস করতে হবে সুন্দরী। তোমার এই সুন্দর শরীরটা দিয়েই প্রশাসনের কর্তাদেরও খুশি করতে হবে তোমায় ।
হরিসাধন- যার সরষে...ফ্যাল ফ্যাল। হরি হে মাধব আর ক'দিন শোব। আমাদের সঙ্গে শুতে হবে তবেই মিলবে তোমার চাকরি।
সুচরিতা - (চেয়ার ছেড়ে উঠে সরে দাঁড়িয়ে বলে ) চাই না আমার চাকরি লোকের বাড়িতে ঝিগিরি করে খাব। তবু ইজ্জতের বিনিময়ে আমি কোন কিছুই চাই না ।
( বলে চলে যেতে উদ্যত হয় কিন্তু হরিসাধন এবং কৃষ্ণধন দুদিকের পথ আটকে দাঁড়ায় )
হরিসাধন - চাই না বললে তো হবে না সুন্দরী। পড়েছো মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে ।
কৃষ্ণধন- তোমাকে যে আমাদের চাই ।
( বলে দুজনে সুচরিতাকে জড়িয়ে ধরে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মুখ ঘষতে থাকে )
সুচরিতা- ছেড়ে দিন বলছি । আপনাদের বাড়িতে মা বোন নেই ? আপনাদের মেয়ের বয়সী আমি। চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে এনে এভাবে অসভ্যতা করতে লজ্জা করে না আপনাদের ?
( বলে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে সুচরিতা )
কৃষ্ণধন- লজ্জা তোমার করবে সুন্দরী । যখন তোমার বস্ত্রহরণের পালা শুরু হবে তখন তুমি লজ্জা রাখবে কোথাই ? তবে সেই লজ্জাও কেটে যাবে একদিন। কত মেয়ে বউকেই তো দেখলাম।
প্রথম প্রথম বেড়ালের মত আঁচড়ে কামড়ে দিতে আসত ।কিন্তু ভাজা মাছের মত চাকরির বিনিয়োগপত্র চোখের সামন নাড়াতেই আমদের আর তদের বস্ত্রহরণ করতে হয় নি , নিজেরাই বস্ত্র উন্মোচন করেছে দিয়েছে।
হরিসাধন-যার সরষে...ফ্যাল ফ্যাল এখন ও করছে তাছাড়া শাস্ত্রেয় আছে লজ্জা ঘৃনা ভয় তিন থাকতে নয়।লাজে রাঙা হল কনে বউ গো ( বলে বিকৃত সুরে গান করতে করতে পাকে পাকে ঘোরে আর সুচরিতার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করে সুচরিতা মুখ সরিয়ে নেয় )
সুচরিতা- সবাইকে এক ভাববেন না । ছাড়ুন বলছি নইলে চিৎকার করে লোক ডেকে আপনাদের মুখোশ খুলে দেব ।
কৃষ্ণধন- কটা মুখোশ খুলবে তুমি আমাদের ? মুখে যে একের পর এক অনেক মুখোশ।
( বলে দুজনে সুচরিতার কাপড় টানাটানি করে )
সুচরিতা-বাঁচাও কে আছ বাঁচাও ।
( বলে হাত ছাড়িয়ে যা পালানোর চেষ্টা করে কিন্তু কৃষ্ণধন ও হরিসাধন দুই দিকে পথ আগলে দাঁড়ায় )
( নেপথ্যে শোনা যায় স্পন্দনের কন্ঠস্বর )
স্পন্দন - একি ? এ কার আর্তনাদ ? বাঁচাও বাঁচাও বলে কি আমার মরা বোন চিৎকার করছে ? যাই বোন ভয় নেই আমি আসছি ।
( বলে ছুটতে ছুটতে স্পন্দনের প্রবেশ )
সুচরিতা –আমাকে বাঁচাও স্পন্দনদা । এই জানোয়ার দুটি আমার ইজ্জত লুট করতে চাইছে ।
( বলে ছুটে স্পন্দনের দিকে ছুটে আসতে চায় )
স্পন্দন – খবরদার বলছি বাঁচতে চাস তো আমার বোনের গা থেকে হাত সরা বলছি শয়তানের দল ।
কৃষ্ণধন- যদি না সরাই ?
স্পন্দন –তাহলে তোদেরই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে ।
( বলে দুজনকে মারার জন্য এগিয়ে যায় )
হরিসাধন- যার সরষে...ফ্যাল ফ্যাল । দেওয়াচ্ছি আমাদের বাড়া ভাতে ছাই ।
( বলে হাতের ছড়ি দিয়ে স্পন্দনের মাথায় আঘাত করতে যায় সেই সময় আচমকা বিপুলের প্রবেশ করে
সেই লাঠি ধরে ফেলে। দু'পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি বেঁধে যায় এক সময় লাঠি কুড়িয়ে কৃষ্ণধন এবং হরিসাধনকে পেটাতে থাকে স্পন্দন। মায়ের চোটে তদের ধুতির কোচা খুলে যায়।
এক হাতে তার একদিকে ধরে থাকে স্পন্দন। আর ওরা দুজনে দুই দরজায় টানাটানি করতে থাকে। এক সময় ধুতির কোমরের গিঁঠ খুলে যায় । আণ্ডারওয়ার পড়া অবস্থায় ছুটে পালায় দুজনে। সেই সময় বিপুল বলতে থাকে )
বিপুল- একজনের বাপ মা শখ করে নাম রেখেছিল হরিসাধন । কিন্তু হরি সাধনা পরিবর্তে তিনি মেতে রয়েছেন শুধু নারী সাধনায়। অন্যজনের নাম অবশ্য সার্থক। বাড়িতে বাড়িতে লীলা করে কৃষ্ণধন নাম সার্থক করেছেন তিনি।
( এদিকে ছাড়া পেয়ে স্পন্দনের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে সুচরিতা । মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয় স্পন্দন )
স্পন্দন- কাঁদিস না বোন । ভদ্রলোকের মুখোশধারী এই সব এক মহিষাসুরদের বধ করতে তোদের সব এক একটা দশভূজা হতে হবে। নানা অস্ত্রে সাজিয়ে দিয়ে আমরা তোদের আবাহন করব।
( নেপথ্যে শোনা যাবে যা দেবী সর্বভূতেষু বন্দনা । বন্দনা চলাকালীন হাঁটু মুড়ে হাত জোড় করে সুচরিতার সামনে বসে থাকে স্পন্দন। বন্দনা শেষে প্রস্থান করে স্পন্দন। )
সুচরিতা – চলো না দীপ্তদাকে সব বলে খবরের কাগজে জানোয়ার দুটোর অপকীর্তির কথা ফাঁস করে দিই ।
বিপুল- ওদের তো গণ্ডারের চামড়া কিছুই হবে না । দেখছ না গরীব দরদের কথা কথা বলে ওরা কেমন নিল্লর্জ্জের মত তাদের মেয়ে বৌদের ইজ্জত লুটছে। স্ত্রী'কে ছেড়ে মেয়ের বয়সী পরিচারিকাকে রক্ষিতা করছে। বিদেশী কুকুরকে ২০০ টাকা কেজি মাংস খাওয়াচ্ছে দামী। গাড়িতে ৮০ টাকা লিটার পেট্রোল পুড়িয়ে প্রমোদ ভ্রমণ করছে। কিন্তু নিরন্ন
ভিক্ষারীকে ১ টা পয়সাও ভিক্ষা দেয় না।
সুচরিতা- কিন্তু বহু মানুষ তো এখনও ওদেরই দাসত্ব করছে ।
বিপুল- দেখো একদিন ঠিক মানুষের ভুল ভাঙবে । যেসব মা বোনেরা ওদের লালসার শিকার হয়েছে তারাই একদিন দেবী দূর্গা হয়ে নিধন করবে ওদের । সেদিন নতুন করে লেখা হবে অন্য এক মহিষাসুরমর্দ্দিনীর আলেখ্য ।
সুচরিতা- তাই যেন হয় ঠাকুর তাই যেন হয় ।



No comments:
Post a Comment