Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

আলোর ঠিকানা -- ৪




                                                             


                             

ধারাবাহিক  নাটক



 নেতাবাবুদের অফিসঘরে 

 বন্দী নারীর ইজ্জত

মনের ভিতর গুমরে কাঁদে  মর্মযন্ত্রণা 

তাইতো খুঁজছি সবাই নয়া সমাজের


     ‘ আলোর ঠিকানা ’




           রচনা :- অর্ঘ্য 
ঘোষ


                চতুর্থ দৃশ্য




স্থান- থানার  ওসি'র চেম্বার . সেখানে টেবিলের একদিকে চেয়ারে বসে রয়েছেন ওসি রাজেশ চক্রবর্তী  . অন্যদিকে গুটি কয়েক ফাঁকা চেয়ার। টেবিলে টেলিফোন ফাইল এবং অন্যান্য কাগজপত্র । 

রাজেশ- পুলিশের চাকরিটাই হয়েছে এক ঝকমারি ব্যাপার ।  খবর পেয়েছি গতকাল নষ্টামি করতে গিয়েই উত্তম মধ্যম খেয়েছেন হৃদয়পুরের এক নেতা আর তার সঙ্গী  । অথচ সেই নেতার এক নেতা দাদা নির্দেশ পাঠিয়েছেন মারধোরের অভিযোগ যে দুজনকে ধরে আনা হয়েছে তাদের জামিন অযোগ্য ধারায় কোর্টে চালান করতে হবে। উপায় তো কিছু নেই চাকরি যে বড় দায়। এই কে আছিস --- ।

                                             ( রামদীনের প্রবেশ )

রামদীন-বলুন স্যার ।

রাজেশ-বাইরে যে দুজন ভদ্রলোক বসে আছেন তাদের পাঠিয়ে দাও ।

রামদীন -আচ্ছা স্যার । ( প্রস্থান )

                                       ( কৃষ্ণধন আর হরিসাধনের প্রবেশ । তাদের মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা ) 

কৃষ্ণধন-আসতে পারি ?  

রাজেশ- আসুন ,  বসুন ।     ( রাজেশ চেয়ার দেখায় , সেখানে কৃষ্ণধন আর হরিসাধন বসে )

কৃষ্ণধন এবং হরিসাধন – নমস্কার বড়বাবু । 

রাজেশ- নমস্কার তা ঘটনা কি হয়েছিল খুলে বলুন দেখি ? 

হরিসাধন-যার সরষে...ফ্যাল ফ্যাল । আসলে কাল আমরা একটি মেয়ের ইণ্টারভিউ নিচ্ছিলাম ।

রাজেশ- পাটি অফিসে সরকারি চাকরির ইন্টারভিউ ?

কৃষ্ণধন- বোঝেনই তো সব , পঞ্চায়েত প্রধানরা তো সব আকাট অর্ধশিক্ষিতের দল তাই আমাদেরই পার্টি অফিসে বসে সব ঝক্কি সামাল দিতে হয় ।

রাজেশ-তা না হয় হলো , কিন্তু আপনাদের মাথাগুলো ফাটলো কেমন করে ?

হরিসাধন- ওই যে বলে না  , যার সরষে --- ফ্যাল ফ্যাল।

রাজেশ- ধুর মশাই আপনি তখন থেকে শুধু যার সরষে সরষে করছেন কেন বলুন তো ?

কৃষ্ণধন- কিছু মনে করবেন না  , এটা ওনার কথার লবজো মানে মুদ্রাদোষ আর কি । 

রাজেশ- সব দোষই আছে দেখছি  ,  হ্যা তারপর বলুন -- ।

কৃষ্ণধন- সেই সময় পিরিতের  নাগর এবং মাতাল দাদা এসে তাদের প্রার্থীকে চাকরি দিতে হবে বলে জুলুমবাজী শুরু করে।
রাজশে- তারপর ? 

হরিসাধন – তারপর আর কি ?  যার  সরষে ---  ফ্যাল ফ্যাল  ( জিভ কেটে )  ওই যা ভুল হয়ে গিয়েছে ।

রাজেশ- আপনাকে বলতে হবে না  , কৃষ্ণধনবাবু বলুন ।

কৃষ্ণধন – তারপর আমরা সব কাগজপত্র না দেখে কিছু বলতে পারব না  বলা মাত্রই লাঠির বাড়িতে  আমদের মাথা ফাটিয়ে দিল ।  টেবিল চেয়ার ভেঙে সে এক লঙ্কা কাণ্ড । 

রাজেশ- বাঃ গল্পটা তো বেশ সাজিয়েছেন । 

হরিসাধন- গল্প সাজিয়েছি মানে ? বলুন গল্পের গরুকে গাছে তুলে দিয়েছি । যার সরষে -- ফ্যাল ফ্যাল । ( জিভ কেটে ) ওই যা আবার ভুল । 

কৃষ্ণধন – গল্প সাজিয়েছি ? মানে কি বলছেন আপনি ? 

রাজেশ- গল্প কিনা তা তো আপনারা  ভালোই জানেন । বলি , ইণ্টারভিউটা কিসের হচ্ছিল মেয়েটির শিক্ষাগত যোগ্যতার , না শারিরিক গঠনের ? মেয়েটি কিন্তু সব খুলে বলেছে ।

কৃষ্ণধন- বোঝেনই তো সব , জনসেবার কাজে আমাদের দিন রাত মাথা ঘামাতে হয় । কিছুটা ফুর্তিফার্তা না হলে আমদের কাজের  এনার্জি আসবে কি করে ?

হরিসাধন-  ঠিক কথা  , এনার্জি আসবে  কি করে বলুন ?  না আর ভুল হয় নি । 

রাজেশ- কিন্তু এ ভাবে আর কত দিন চলাবেন ?

কৃষ্ণধন- যতদিন আমরা প্রশাসনে আছি আর আপনাদের মত অফিসারেরা  আমাদের পাশে আছেন  ততদিন ঠিক
চালিয়ে নেব । কি বলেন হরিদা ?

হরিসাধন- বিলক্ষণ  বিলক্ষণ ।  আর ভুল হবে না ।  আপনি আমাদের দেখবেন আর আমরা দেখব আপনাকে । সেই যে একটা কথা আছে না ' দিবে আর নিবে ' ।  ব্যাটা দুটোকে একটু ভালো করে টাইট দিয়ে দিন তো । তার বদলে এটা রাখুন ।
  
        (  বলে টেবিলের তলা দিয়ে সিগারেটের প্যাকেটে টাকা দেয় । ওসি টাকা নিয়ে গুনতে শুরু করে । দরজায় দাড়িয়ে ক্যামেরায় সেই ছবি তোলে দীপ্ত । তারপর বড়বাবু আছেন নাকি ?  বলে চেম্বারে ঢোকে দীপ্ত )

রাজেশ- ( তাড়াতাড়ি টাকাগুলো পকেটে চালান করে )  আরে দীপ্তবাবু যে ?  আসুন আসুন ,  বসুন ।

                              (  দীপ্ত চেয়ারে বসে )

হরিসাধন এবং কৃষ্ণধন- আমরা তাহলে এখন আসি আসি বড়বাবু । 

                             (  বলে  দুজনে প্রস্থান করে )

রাজেশ- তারপর বলুন দীপ্তবাবু কি খবর ?

দীপ্ত- খবর তো মশাই আপনার কাছে । 

রাজেশ- না না ,  আমার কাছে তো ক তেমন কোন খবর নেই ।

দীপ্ত - সে কি ? হৃদয়পুরের পার্টিঅফিস থেকে এক তরুণী সহ দুই যুবককে তুলে আনলেন , তাদের বাড়ি লণ্ডভণ্ড করে তল্লাসি চালালেন ,  অথচ বলছেন  কোন খবর নেই ?

রজেশ - ও সামান্য ব্যাপার বলার মতো কিছু নয় । খবর করার মতোও কিছু নয় ।

দীপ্ত- আপনার কাছে ব্যাপারটা সামান্য সামান্য হলেও আমার কাছে কিন্তু রাজেশবাবু এটার গুরুত্ব অনেক । খবর করার মতোও বিষয় ।

রাজেশ -  মানে এটা নিয়ে আপনি আবার খবর করছেন নাকি  ? খবর করার মত কিছু আছে ?

দীপ্ত- কিছু নেই বলছেন ?

রাজেশ - একে বারে জালি কেস । খবরের কিচ্ছু নেই । এটা নিয়ে খবর করলে আপনার কাগজের পাঠকেরাই হাসবেন । 

দীপ্ত -- কিন্তু খবর না করলে যে রাগে ফুঁসবেন । 

রাজেশ -- মানে ?

দীপ্ত --  বড়বাবু পুলিশের আচরণ বিধি সম্পর্কে সামান্য হলেও অমার কিছু ধারণা আছে । কোনও রকম সার্চ ওয়ারেণ্ট ছাড়াই দুটো বাড়িতে রাতের বেলা তল্লাসি চালিয়েছেন , মহিলা পুলিশ ছাড়াই একজন তরুনীকে থানায় তুলে এনেছেন , তথ্য প্রমাণ ছাড়াই শুধুমাত্র মিথ্যা অভিযগের ভিত্তিতে দু'জন যুবককে কোমরে দড়ি পড়িয়ে যে মানবাধিকার আপনি লঙ্ঘন করেছেন তা তো বেশ বড় মাপের খবরের বিষয়। এই খবর যদি আমি না করি তাহলে পাঠকেরা ক্ষোভে ফুঁসবেন না বলুন ? 

রাজেশ-আসল ব্যাপারটা কি বলুন তো । 

দীপ্ত- আসল ব্যাপারটা কি তা আপনিও জানেন অমিও জানি ।  আমি শুধু জানি না সব কিছু জেনে শুনে আপনারা এই না জানার ভানটুকু কত দিন চালিয়ে যাবেন ?

রাজেশ- মানে ? 

দীপ্ত- মানে যাদের ধরে এনেছেন তারা নিরপরাধ । 

রাজেশ- তাহলে হরিসাধন - কৃষ্ণধনবাবুদের মাথাগুলো ফাটল কি করে ?

দীপ্ত - সেটা আপনি তদন্ত করে বের করুন । সেটাই পুলিশের কাজ ।

রাজেশ- তাছাড়া যে দুজনকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে  তাদের কথাবার্তায় মাওবাদী প্রভাব র‍য়েছে । আমি নিজে ওদের সঙ্গে কথা বলে সেই আভাস পেয়েছি । 

দীপ্ত- এই তো বাঁধা ছক পেয়ে গিয়েছেন ।

রাজেশ-বাঁধা ছক ? 

দীপ্ত-পুলিশ প্রশাসন কিম্বা ক্ষমতাসীল রাজনৈতিক দলের অন্যায় আচরনের বিরুদ্ধে কেউ সরব হলেই তো আপনারা তাদের গায়ে মাওবাদী তকমা এঁটে দিয়ে হেনস্থার পথ  প্রশস্থ  করেন । 

রাজেশ- তা আপনি এখন কি বলতে চাইছেন ? 

দীপ্ত -- আমি আবার আপনাকে কি বলব ? একজন পুলিশ অফিসার হিসাবে আপনার যা করনীয় , আপনি সেটাই করবেন ।

রাজেশ --- আমি তো সেটাই করছি। 

দীপ্ত -- না , আপনি সেটা করছেন না । আপনি অভিযোগটা ধামাচাপা চাপা দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ উল্টো কাজ করছেন।  আপনি ভালো করেই জানেন একটি  অসহায় মেয়ের ইজ্জত বাঁচানোর জন্য কৃষ্ণধনদের পেটাতে বাধ্য হয়েছিলেন বিপুল এবং স্পন্দন। ওদের ধরে এনে আপনি ঠিক করেননি । আমার অনুরোধ , আপনি ওদের ছেড়ে দিন ।

রাজেশ- ধরে যখন এনেছি তখন কোন কেস না দিয়ে তো ছেড়ে দিতে পারি না । 

দীপ্ত - অপরাধ নেই জেনেও কেস দেবেন ?

রাজেশ- কি করতে বলেন আমাকে ?

দীপ্ত-কোমরে দড়ি পড়িয়ে যেমন তুলে এনেছেন তেমনি  সসম্মানে  তাদের বাড়িতে পৌঁচ্ছে দিয়ে আসুন। তল্লাসির নামে যে সব বাড়িতে তাণ্ডব চালিয়েছেন সেই সব বাড়িতে গিয়ে হাত জোর করে চেয়ে আসুন ক্ষমা। আর তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা  করুন।

রাজেশ -- মামার বাড়ির আবদার আর কি ?  যেন আমার গুরুঠাকুর চলে এলেন । যা বলবেন তাই আমাকে মানতে হবে । 

দীপ্ত -- মামারবাড়ির আবদার নয় তা আমি জানি । আর আপনার গুরু ঠাকুর হওয়ার ইচ্ছাও আমার নেই । আমি শুধু জানতে চাইছি আমি যা বললাম তা আপনি করবেন কি না ? 
  
রাজেশ- যদি না করি ? 

দীপ্ত- তাহলে আপনি যেমন ওদের ফাঁসাবেন আমিও তেমনই আপনাকে ফাঁসাবার  ব্যবস্থা করব । 

রাজেশ-কি ভাবে ফাঁসাবেন আপনি আমাকে ? 

দীপ্ত-আপনার বস এস.ডি.পি ও  , এস , পি , আই.জি ,  পুলিশমন্ত্রী এমন কি প্রয়োজনে মানবাধিকার কমিশনে যাব । তাতেও কাজ না হলে একটু আগে টেবিলের তলা দিয়ে সিগারেটের প্যাকেটে যে ভাবে ঘুষ নিলেন তার ছবি এই ক্যামেরায় ( ক্যামেরা দেখিয়ে ) ধরে রেখেছি , সেই ছবি সহ বিস্তারিত সংবাদ সমস্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করে  দেব। হৃদয়পুর ছড়িয়ে আপনার অপকীর্তির কথা ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। তখন কেমন হবে ?

রাজেশ- দীপ্তবাবু ---। 

দীপ্ত- বাড়িতে যে সব প্রতিবেশিদের কাছে আপনার স্ত্রী তার পুলিশ অফিসার স্বামীর গল্প করেন ,  যেসব বন্ধুদের কাছে পুলিশ অফিসার বাবার গল্প করে আপনার স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে , সংবাদমাধ্যমে ওই সংবাদ দেখার পর তাদের অবস্থাটা কেমন হবে ভাবতে পারছেন ? 

রাজেশ-( খপ করে দীপ্তর হাত থেকে ক্যামেরাটা কেড়ে নিয়ে ) এবার কি করবেন   ?

দীপ্ত - অফিসার আপনারা মানুষ চড়ান ,  পেশাগত কারণেই আপনাদের মতো পুলিশ প্রশাসনের কিছু অফিসারকে চড়াতে হয় আমাদের। আমি আগেই জানতাম ছবি তোলার কথা শুনে আপনি ক্যামেরা ছিনিয়ে নেবেন তাই আপনার চেম্বার ঢোকার আগেই মোবাইল থেকে কয়েকটা ছবি পাঠিয়ে দিয়েছি আমার নিজস্ব ইন্টারনেটে। এখন ক্যামেরাটা আপনি রাখতে চাইলে রাখতেই পারেন। 

রাজেশ- ( ক্যামেরা ফিরিয়ে দিয়ে ) আপনি তো বিপদজনক লোক মশাই। আপনি সব পারেন । বেশ আসুন , একটা রফা করে নিই দু'জনে। যা পেয়েছি দু'জনে  আধাআধি ভাগ করে নিই।

দীপ্ত -- এই তো একটা ভুল করলেন , আমি আর যাই পারি না কেন ঘুষ খেতে পারি না । ভালোবেসে এই পেশায় এসেছিলাম , আপনার মতো দু'হাতে টাকা কামানোর জন্য নয়। আপনাদের  মত শক্তের ভক্ত নরমের যমও নই। আমি শঠেশাঠ্যং নীতিতে বিশ্বাস করি।

রাজেশ- দোহাই আপনার  , এবারের মত মার্জনা করে দিন । আমি এখনই ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে আসছি ।কথা দিলাম সুযোগ পেলেই ভবিষতে এই কাজের প্রায়চিত্ত করে পুলিশী উর্দির মর্যাদা রাখব।আপনি শুধু দয়া করে ইণ্টারনেট এবং ক্যামেরা থেকে ছবিগুলি মুছে দিন।

দীপ্ত- যেদিন প্রায়চিত্ত করবেন সেইদিন মুছব।

রাজেশ-তাই হবে । কিন্তু দেখবেন ছবিগুলো যেন কোথাও ফাঁস না হয়ে যায় ।

দীপ্ত-সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আমার বাড়িতেও স্ত্রী ছেলেমেয়ে আছে । আমার দুর্নাম তাদের মনে কি প্রভাব ফেলেতে পারে তা আমি অনুমান করতে পারি।তাই আপনার পরিবারের লোককেও আমি অযথা বিড়ম্বনায় ফেলব না ।     
               
                                   

      (  পর্দা নেমে আসে  ) 






                  (  চলবে )


         নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



    





                      --------০--------

No comments:

Post a Comment