Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

আলোর ঠিকানা -- ৫





                                                             


                             

ধারাবাহিক  নাটক



 নেতাবাবুদের অফিসঘরে 

 বন্দী নারীর ইজ্জত

মনের ভিতর গুমরে কাঁদে  মর্মযন্ত্রণা 

তাইতো খুঁজছি সবাই নয়া সমাজের


     ‘ আলোর ঠিকানা ’




           রচনা :- অর্ঘ্য 
ঘোষ


                       পঞ্চম দৃশ্য




( স্থান –বি.ডি.ও অফিস  । বড় টেবিলে কাগজ , ফাইলপত্র । টেবিলের একদিকে চেয়ারে বসে কাগজপত্র দেখছেন বিডিও অর্পণ রায় । অন্যদিকে কয়েকটি খালি চেয়ার )

অর্পণ- অভিযোগ অভিযোগ আর অভিযোগ । প্রতিদিন শুধু অভিযোগের পাহাড় জমে যাচ্ছে । কোথাও ভুয়ো টিপছাপ দিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে সহায় সম্বলহীন বিধবার ভাতার টাকা। কোথাও ঘুঁষ না দেওয়ায় আটকে দেওয়া হয়েছে  আবাস  যোজনার টাকা। আবার কোথাও কালভার্ট তৈরিতে সিমেন্টের সঙ্গে মেশানো হয়েছে পাথরের গুঁড়ো।পঞ্চায়েতগুলো হয়ে উঠেছে এক একটা দলবাজি আর দুনীতির আখড়া। 

          ( নেপথ্যে বিডিও সাহেব আছেন নাকি -- বলতে বলতে মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা অবস্থায় কৃষ্ণধন, হরিসাধন এবং প্রলয়ের প্রবেশ )

সকলে- আসতে পারি স্যার ? 

অর্পণ - এসেই তো পড়েছেন ।  বসুন সব , ( চেয়ার দেখিয়ে )  তা হঠাৎ সদলবলে যে , কি মনে করে ?

প্রলয়- এলাম আপনর সঙ্গে দেখা  করতে ।

অর্পণ - আপনাদের মাথায় কি হলো ? ( ব্যাণ্ডেজে দেখিয়ে )

কৃষ্ণধন- আর বলবেন না পার্টি করতে এসে আমাদের হয়েছে এক জ্বালা । 

হরিসাধন- যার জ্বালা সেই জ্বলে , আর সব মারে মজা ফাঁকতালে। জ্বালা বলে জ্বালা , যোগ্যতা যাচাই না করে একটি মেয়েকে অঙ্গনওয়াড়ী কাজ দিতে রাজী হইনি বলে দিলে দুজনের মাথা ফাটিয়ে।

অর্পণ  – তাই নাকি  ?

কৃষ্ণধন- তবে আর বলছি কি  স্যার , নিঃস্বার্থভাবে জনগণের কাজ করে প্রতিদান কি পাচ্ছি আপনিই দেখুন ।

প্রলয়- আসলে বিরোধীরা  ভুল বুঝিয়ে মানুষকে খেপিয়ে তুলেছে ।

অর্পণ- আপনারা সেই ভুল ভাঙাতে পারছেন না ?

হরিসাধন - যার সরষে.... ফ্যাল ফ্যাল । চেষ্টা কি আমরা কম করছি স্যার ? 

কৃষ্ণধন- হ্যাঁ যে কাজের জন্য আসা -- 

অর্পণ -  কাজ ?

কৃষ্ণধন- শুনলাম গোয়ালসাহী কাঁদরে ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে নাকি সেচ বাঁধ হবে । কাজটা যাতে প্রলয় পায় সেটা আপনাকে দেখতে হবে স্যার ।

হরিসাধন- যার সরষে.... ফ্যাল ফ্যাল ।  আপনাকেও দেখা হবে ,  কি প্রলয়ভায়া তাই তো ?

প্রলয়- আমি তো বলে দিয়েছি পার্টি ফাণ্ডে ১০ শতাংশ , বি.ডি.ও সাহেবকে ১০ শতাংশ দেব।

অর্পণ - আচ্ছা প্রলয়বাবু , একটা সত্যি কথা বলুন তো - আমাদের ২০ শতাংশ দেওয়ার পর আপনার কত শতাংশ থাকবে ? 
প্রলয় -- স্যার আপনাদের পরেও ইঞ্জিনিয়ার , ওভারসিয়ার , পার্টির লোকাল ছেলেদের পিছনে আরও ১০ শতাংশ যায়। মিথ্যা বলব না স্যার, সব বাদ দিয়েও আমার ২০ শতাংশ থাকে।

অর্পণ -- ৫০ শতাংশ যদি এভাবেই চলে যায় তাহলে কাজটা করেন কি করে ?
    
প্রলয় -- ও স্যার হয়ে যায়। সিমেন্টের ভাগ কমিয়ে দিই , শিকের ক্ষেত্রেও তাই করি ।

অর্পণ -- আর যদি কাউকে কিছু না দিয়ে সরকারি সিডিউল মাফিক কাজ করেন তাহলে আপনার লভ্যাংশ কত শতাংশ থাকবে ? 
প্রলয় -- স্যার আপনি এত সব জানতে চাইছেন , বকলমে আপনিও ঠিকাদারিতে নামবেন নাকি স্যার ? তা স্যার ভালোই হবে । অনেক অফিসারই তো বকলমে ঠিকাদারি করেন। আপনি করলে একচেটিয়া কাজগুলো আমরাই পাব।তাহলে স্যার দুহাতে টাকা লুটে নেওয়া হবে।
    
অর্পণ -- সেই জন্যই তো আগে হিসাবটা জেনে নিচ্ছি।

প্রলয় -- তা স্যার কাউকে কিছু না দিয়ে ঠিকঠাক কাজ করলে ১০ শতাংশ লাভ তো থাকবেই । 

অর্পণ -- তাহলে আপনি মাত্র বাড়তি ১০ শতাংশ লাভের জন্য বিভিন্ন জনকে টাকা খাইয়ে বারদ্দের অর্ধেক টাকায় কাজ সম্পূর্ণ করেন। আর তারই জন্য মানুষের মাথার উপরে ভেঙে পড়ে ছাদ , সেতু। নদী বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। ঘর গৃহস্থালি হারিয়ে হাহাকার করে নিরন্ন মানুষ। আর আপনারা কমিশনের হিসাব কষেন।লজ্জা করে না আপনাদের ? 

প্রলয় -- স্যার আমরা চাইলেও সিডিউল মেনে কাজ করতে পারব না । কারণ ধারাবাহিক ভাবে কমিশন খেতে খেতে সবাই অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। এখন কমিশন না দিলে তারাই বিভিন্ন রকম অজুহাত খাড়া করে মাঝপথে আমার কাজ আটকে দেবে। তাই স্যার ওইসব কথা না ভেবে কাজটা যাতে পাই তার ব্যবস্থা করে দিন।

হরিসাধন -- হাটের লোক কোথাই শোবে তা ভেবে আমার -- আপনার লাভ  কি স্যার ? 

অর্পণ -- আপনার লাভালাভের ব্যাপার নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই । কিন্তু মানুষের স্বার্থ দেখাটাই আমার কর্তব্য ।

কৃষ্ণধন -  সেই জন্যই তো বলছি স্যার , প্রলয়ও তো একজন মানুষ । ওর স্বার্থ দেখাটাও আপনার কর্তব্য। আপনি সেটা একটু দেখলেই হবে।

অর্পণ - আপনাদের একটা কথা স্পষ্ট করে বলে দিই আমার কাছে  দেখাদেখির কিছু নেই। টেণ্ডারের মাধ্যমে যে গ্রহনযোগ্য হবে তাকেই কাজটা দেওয়া হবে। তাছাড়া প্রলয়বাবুর কাজের রেকর্ড ভালো নয়। এর আগে ওনার তৈরি একটি কালভার্ট তিনমাসের মাথায় ভেঙে পড়েছিল।সরকারি টাকাটাই জলে গিয়েছিল।
  
কৃষ্ণধন- আপনার দ্বারা দেখা সম্ভব হলে দেখবেন,   না হলে পার্টির উপরতলার নেতাদের বলতে হবে। দল চালাতে ১০ শতাংশ টাকার কথাটা তারা ভাববেন নিশ্চয়। মাঝখান থেকে আপনিই আঙুল চুষবেন। চলো হে প্রলয়।

                                    (  বলে তিনজনের প্রস্থান )

অর্পন - কথা শুনলে মাথা গরম হয়ে যায় ।  মনে হয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রাইভেট টিউশনি করি ।স্বাধীনভাবে কোন কাজ করার উপায় নেই। যতসব অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত নেতা , পঞ্চায়েত প্রধান , পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিরা দলীয় সমর্থকদের এনে অনায্য দাবিতে টেবিল চাড়বাবে , অশ্রাব্য গালিগালাজ করবে আর আমাদের তা মেনে নিতে হবে। উপেক্ষা করলে উপরতলার মাধ্যমে কড়া নির্দেশ পাঠাবে। গালভরা পদটাই আছে - সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক। আসলে ছেঁড়া গামছার সামিল। যার যখন ইচ্ছা পা মুছে দিয়ে চলে যাবে।

      ( আসতে পারি ?  বলে স্পন্দন ও দীপ্তর প্রবেশ )

দীপ্ত-নমস্কার অর্পণবাবু ।

অর্পণ - নমস্কার ( চেয়ার দেখিয়ে )  বসুন ,  বলুন কি খাবেন চা না কফি ? 

দীপ্ত- কোনটাই নয়  , কারণ এইমাত্র চা খেয়ে এলাম । কৃষ্ণধনবাবুদের বেরিয়ে যেতে দেখলাম ।

অর্পণ - আর বলবেন না  , ১০ লক্ষ টাকার একটা সেচবাঁধ হবে । কাজটা যাতে প্রলয়বাবুকে দেওয়া হয় তারই উমেদারি করতে এসেছিলেন। আমি অবশ্য সাফ বলে দিয়েছি টেন্ডার ডেকে যোগ্যজনকেই কাজ দেওয়া হবে।

দীপ্ত- ঠিকই করেছেন ,  তবে ওরা বোধহয় আপনাকে বেশিদিন এখানে টিকতে দেবে না।

অর্পণ -  চলে যেতে হয় যাব ,  কিন্তু কোন দুর্নীতির সঙ্গে আপোষ করতে পারব না । হ্যাঁ  , ভাল কথা শুনলাম অঙ্গনওয়াড়ী চাকরি নিয়ে কারা নাকি কৃষ্ণধন এবং হরিসাধনবাবুর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছেন ।

দীপ্ত- আর বলবেন না চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অফিসে ডেকে একটি মেয়ের সর্বনাশের চেষ্টা করছিলেন ওই দুই কীর্তিমান। সময় মত গ্রামের দুই যুবক পৌঁছে যাওয়ায় কোন রকমে রক্ষা পায় মেয়েটি। যুবকেদের লাঠিতে মাথা ফাটে ওদের।

অর্পণ - এই ব্যাপার ?  ওরা তো নিজেদের সাধু হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার গল্প বলছিলেন এতক্ষণ । তা যুবক দুটিকে তো ধন্যবাদ জানাতে হয়।

দীপ্ত- তাদের একজন হল এই স্পন্দন ( বলে স্পন্দনকে দেখায় ) ।

অর্পণ - ধন্যবাদ ভাই  , আপনাকে এর আগে তো বি.ডি.ও অফিসে দেখিনি ।

স্পন্দন- সমাজছুট  ছেলে আমি , কখন কোথাই থাকি তার ঠিক থাকে না ।

অর্পণ - সমাজ ছুট ? 

দীপ্ত - এরই কথা আপনাকে আমি বলেছিলাম । সমাজের মূলস্রোতে ফেরানোর জন্য একটা কাজের ওর বড়ো প্রয়োজন ।

অর্পণ - আপনি তো সবই জানেন দীপ্তবাবু  ,  ব্লক প্রশাসনের অধীনে যে সমস্ত সরকারি কাজের সুযোগ রয়েছে  সেখানে খবরদারি  করেন শাসকদলের নেতা ,  পঞ্চায়েত এবং পঞ্চায়েত সমিতির কর্তারা। নিয়োগে দলবাজী হয়েছে জেনেও কিছুই করতে পারি না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে পছন্দের প্রার্থীর নিয়োগপত্র অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়।

দীপ্ত -  তাহলে কি কিছুই করা যাবে না ? 

অর্পণ - একটা কাজ রয়েছে , কাজটি যদিও অস্থায়ী এবং বেতন সামান্যই। মাসিক হাজার দুই টাকা।

দীপ্ত - কি সেই কাজ ?

অর্পণ - গাছ রক্ষণাবেক্ষণের একটি কাজ আপাতত আমার হাতে খলি রয়েছে। সেটা দেওয়া যেতে পারে ।

স্পন্দন- ওই কাজটি পেলেই আমার চলে যাবে । এর বেশি আশা আমার নেই স্যার ।  

দীপ্ত  -  এই কাগজপত্রগুলো আপনাকে দিয়ে গেলাম । ( বলে  দুটি ফাইল দেয় ) 

অর্পণ - কিসের কাগজ ? 

দীপ্ত - চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে হৃদয়পুরের যে মেয়েটির সর্বনাশের চেষ্টা করেছিলেন কৃষ্ণধনবাবুরা তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সাটিফিকেট রয়েছে একটিতে অন্যটিতে রয়েছে মেয়েটির উদ্ধারকারী অন্য যুবকের।

অর্পণ -  আমাকে দিচ্ছেন কেন  ? 

দীপ্ত -  না ,  পক্ষপাতিত্ব করে কোন কাজ পাইয়ে দেওয়ার অনুরোধ করছি না । শুধু দেখবেন যোগ্যতার বিচারে প্রথম হলে ওরা যেন দলবাজির শিকার না হয় । 

অর্পণ - সেটা অবশ্যই দেখব দীপ্তবাবু ,  তাতে যদি শাসকদলের চক্ষুশূল হয়ে আমাকে চলে যেতে হয় তাই যাব ।  চলে যেতে হয় তাই যাব।


             (  আলো নিভে আসে ) 






                  (  চলবে )


         নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



    





                      --------০--------


No comments:

Post a Comment