নেতাবাবুদের অফিসঘরে
বন্দী নারীর ইজ্জত
মনের ভিতর গুমরে কাঁদে মর্মযন্ত্রণা
তাইতো খুঁজছি সবাই নয়া সমাজের
‘ আলোর ঠিকানা ’
রচনা :- অর্ঘ্য ঘোষ
ষষ্ঠ দৃশ্য
স্থান-একটি সুসজ্জিত পার্ক সেখানে একটি ডায়াসে বসে বিপুলের প্রতীক্ষায় গুন গুন সুরে গান গায় সুচরিতা ।
( রবীন্দ্রসঙ্গীত - সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে। গান শেষ হলে ঘড়ি দেখে )
সুচরিতা - কি যে হলো , পাঁচটার সময় আসব বলেছিল সাড়ে পাঁচটা বাজতে চলল । তবু বাবুর দেখা নেই , এমন তো কখনও হয় না।
প্রলয়- এই তো আমি ঠিক সময়েই এসে গেছি সুচি ( বলে পিছন দিক থেকে হাত দিয়ে সুচরিতার দুই চোখ চেপে ধরে )
সুচরিতা - কে আপনি ? পিছন থেকে এসে আমার চোখে হাত দিচ্ছেন কেন , ছাড়ুন বলছি । ( তারপর চোখ থেকে প্রলয়ের হাত সরিয়ে দিয়ে তাকে দেখে বলে ) ও , শয়তান তুই ? এখানেও আমার পিছু নিয়েছিস ? সেদিন থাপ্পড় খেয়েও শিক্ষা হয় নি ?
প্রলয় - শিক্ষা যে হয় নি তা তো দেখতেই পাচ্ছ সুন্দরী । বরং থাপ্পড় খেয়ে তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছাটা আরও বেড়ে গিয়েছে ।
সেদিন তো থেকেই তক্কে তক্কে ছিলাম । নির্জন পার্কে তোমাকে একাকী ঢুকতে দেখেই তো পিছু নিয়েছি।এবার তো তোমাকে আমার কাছে ধরা দিতেই হবে সুন্দরী ।
সুচরিতা - তুই এখান থেকে যাবি না আমি চিৎকার করে লোক ডাকব ?
প্রলয়- কোন লাভ হবে না , তুমি কাউকে ডাকার সুযোগই পাবে না । ততক্ষণে আমি মধু খেয়ে চলে যাব।
( বলেই আচমকা সুচরিতার গালে চুমু খায় । তারপর গলায় ঝোলানো দোপাট্টা দিয়ে সুচরিতার মুখ বেঁধে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করে। সুচরিতা তাকে ঠেলে সরিয়ে ফেলে দেয়। মুখের বাঁধন খুলে সপাটে চড় মারে প্রলয়ের গালে।তারপর মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বলে ওঠে --)
সুচরিতা - অসভ্য , ইতর । একাকী একটি মেয়ের চোখে হাত চাপা দিয়ে নষ্টামি করতে লজ্জা করে না তোর ?
প্রলয়- লজ্জা ঘৃনা ভয় আমার জন্য নয় ।
সুচরিতা- আসুক বিপুলদা , দাঁড়া দেখচ্ছি মজা ।
প্রলয়- কি করবে তোমার বিপুলদা ?
সুচরিতা- সেটা সময়ে টের পাবি ।
প্রলয়- অতক্ষণ সময় তো আমি নষ্ট করতে পারব না ডারলিং ( বলে সুচরিতার হাত ধরে , হাত ছাড়িয়ে সুচরিতা পালাতে উদ্যত হয় , পথ আগলে দাঁড়ায় প্রলয় )
সুচরিতা – আমাকে যেতে দে বলছি শয়তান ।
প্রলয়- যেতে তো আর তোমায় দিতে পারছি না সুন্দরী ।আমার দিকে তাকাও ( বলে সুচরিতার থুঁতনি তুলে ধরে নিজের দিকে ) কি আছে তোমার বিপুলদার ? রূপ-যৌবন , টাকা-পয়সা কিসে আমার সমকক্ষ সে ? তার চেয়ে তুমি আমার কাছে ধরা দিলে তোমার সব শখ আহ্লাদ আমি কানায় কানায় ভরিয়ে দেব।
সুচরিতা - বিপুলদার সঙ্গে নিজের তুলনা করতে লজ্জা করে না তোর ? টাকা-পয়সা , ধন-দৌলত বিপুলদার নেই সত্যি , কিন্তু ওর যা আছে তা হাজার চেষ্টা করেও তুই তা অর্জন করতে পারবি না। সেটা কী জানিস ? সেটা হলো প্রকৃত শিক্ষা , যা না থাকলে মানুষ তোর মত জানোয়ার হয়।
সিমেন্টে ভেজাল মিশিয়ে বড়লোক হওয়া যায় , বড়ো মানুষ হওয়া যায় না বুঝলি জানোয়ার ?
প্রলয়- তবে রে শালী যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা ( বলে সুচরিতার হাত ধরে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরতে যায় , সুচরিতা ছটফট করতে থাকে )
সুচরিতা- ছাড় ছাড় বলছি শয়তান ( নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে )
প্রলয়- বল , যত খুশী শয়তান জানোয়ার বল । শয়তান জানোয়ারের মত তোর সর্বস্ব লুট করে নেব (বলে সুচরিতাকে বুকে চেপে পিষ্ট করতে থাকে , মুখে মুখ ঘষে , সুচরিতা ছট ফট করতে থাকে )
সুচরিতা- বাঁচাও কে কোথায় আছ বাঁচাও ।
প্রলয়- হুঃ হাঃ হাঃ ( হাসি ) চিল্লা শালী যত পারিস চিল্লা । এই নির্জন সন্ধ্যায় পার্কে কেউ তোকে বাঁচাতে আসবে না । আজ তোর রূপ সুধা সব নিঙড়ে নেব ( সুচরিতা বুকে চেপে পিষ্ট করতে থাকে )
( নেপথ্যে -- সুচি কিছু মনে করো না , এই দেখ না বি.ডি.ও অফিসে দেরী হয়ে গেল বলতে বলতে বিপুলের প্রবেশ।তারপর সুচরিতাকে ওই অবস্থায় দেখে )
বিপুল- একি কি হচ্ছে এসব ?
সুচরিতা- ( প্রলয়ের বাহু বন্ধন ছাড়িয়ে ছুটে বিপুলের বুকে আশ্রয় নেয় ) বিপুলদা এই শয়তানটা একা পেয়ে আমার সঙ্গে নোংরামি করছে।
বিপুল - ( সুচরিতাকে বুকে ধরে ) করাচ্ছি নোংরামি । বড় বাড় বেড়েছে তাই না রে লম্পট ? মেয়েদের একা পেলেই নষ্টামি করার ইচ্ছা আজ তোর ঘুচিয়ে দিচ্ছি ( বলে সুচরিতাকে সরিয়ে প্রলয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বিপুল। দু'পক্ষের মারপিট চলতে থাকে। এক সময় কোনঠাঁসা হয়ে পিছু হাটতে থাকে প্রলয়। তখন পথ আটকে দাঁড়িয়ে প্রলয়ের দিকে এগোতে থাকে বিপুল।)
প্রলয়- খবরদার , আর এগোবি না বলছি না হলে শেষ করে দেব । ( বলে পায়ের মোজার ভিতরে গুঁজে রাখা চাকু বের করে বিপুলের বুক নিশানা করে এগোতে থাকে। বুকে বিদ্ধ করার পূর্ব মুহূর্তে অন্য দরজা দিয়ে লাফিয়ে ঢোকে ওসমান আলি। হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করে প্রলয়ের চাকু ধরা হাতে।যন্ত্রনায় আর্তনাদ করে ওঠে প্রলয়। তার হাত থেকে চাকু পড়ে যায়। সেটি কুড়িয়ে নেয় ওসমান। তারপর সেটি প্রলয়ের মুখের সামনে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে )
ওসমান - বার বার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান এইবার ঘুঘু তোমার বধিব পরাণ ।
বিপুল- ওসমান তুই ? তুই আমার সঙ্গে এমন করলি ?
ওসমান - হ্যা প্রলয়বাবু , আমি ওসমান রিক্সাওয়ালা। আর পাপ সইছিল না , তাই আমাকে তোমার পাপের হাতটা থামাতে হল।
সুচরিতা-ওসমান রিক্সাওয়ালা ?
প্রলয়-শালা বেইমান , না খেয়ে মরছিলি রিক্সা কিনে দিলাম বলে দুটো খেয়ে পড়ে বাঁচলি । আর আমারই থাবা থেকে শিকার ফসকে দিলি ?
ওসমান - বেইমান আমি নই প্রলয়বাবু । রিক্সা কিনে দিয়েছেন তার বিনিময়ে প্রতিদিন ভাড়া বাবদ ১০ টাকা করে কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিয়েছেন।
তার পরেও রিক্সায় চাপিয়ে বহু অসহায় মেয়েকে তুলে আনিয়েছেন । তাদের সর্বনাশ করে ছেড়ে দিয়েছেন। পেটের দায়ে সব মুখ বুজে সহ্য করেছি , প্রতিবাদ করতে পারিনি। কিন্তু ওইসব অসহায় মেয়েদের ইজ্জত হারানোর বোবা কান্না আমাকে ঘুমোতে দেয় না।
সুচরিতা - ওসমান ভাই ?
ওসমান- জানেন , সব সময় একটা পাপবোধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আজ প্রায়চিত্ত করার সুযোগ পেয়ে কিছুটা শান্তি পেলাম।
প্রলয়-আজই তোর রিক্সা কেড়ে নিচ্ছি । দেখি শালা তোর কি করে ভাত জোটে ।
( প্রস্থান )
ওসমান-শুনে যাও প্রলয়বাবু , কাড়তে হবে না ওই পাপের রিক্সা আজই তোমার গ্যারেজে জমা করে দিয়ে এসেছি।
বিপুল- এরপর তোমার কি করে চলবে ওসমান ভাই ?
ওসমান - কি করে আবার ? হয় দিনমজুরি না হয় ভিক্ষাবৃত্তি ?
সুচরিতা -আমার জন্যই আজ তোমার এই দশা হলো ওসমান ভাই ।
ওসমান-না বোন না , তোমার মতো অনেক বোনের ইজ্জত লুঠের নীরব দর্শক হতে হয়েছিল ওই রিক্সার মোহে। সেইসব বোনদের বোবা কান্না আমার বুকে পাষান ভার হয়ে বসেছিল। রিক্সাটা ফিরিয়ে দিতে পেরে সেই ভার কিছুটা হালকা হল। আর তো আমাকে কাঠের পুতুলের মত কোন মা বোনের বাঁচাও বাঁচাও আর্তনাদ শুনতে হবে না।
( প্রস্থান )
সুচরিতা-আশ্চর্য মানুষ ।
বিপুল- সত্যি আশ্চর্য । কার বিবেক যে কখন জেগে ওঠে বলা যা্য় না ।
ওসমান তোমার এই জাগ্রত বিবেক বোধের কথা কখনও আমরা ভুলব না। তোমাকে শতকোটি প্রনাম ওসমান ভাই।
সুচরিতা-ভুলবো না ( মুখ ভ্যাঙায় ) এদিকে আমি যে বাবুর প্রতীক্ষায় একা পার্কে বসে রয়েছি তা তো দিবি ভুলে গেলে।
বিপুল- রাগ কোর না লক্ষ্মীটি , আসলে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ করতে বি. ডি. ও অফিসে এমন ভাবে আটকে গেলাম না --- ।
সুচরিতা- না , আমি তোমার কোন কথা শুনব না ( বলে দুটো হাত দিয়ে বিপুলের বুকে সোহাগের কিল মারতে থাকে।বিপুল বুকে তাকে টেনে নেয়। কপালে মাথায় চুমু খায় )
বিপুল- কেন শুনবে না শুনি ?
সুচরিতা - তোমাকে বেশিক্ষণ দেখতে না পেলে আমি যে চোখে অন্ধ কার দেখি।
কারণ তুমি আমার জীবন প্রদীপে জ্বেলে দিয়েছো অন্য রকম আলো ।
বিপুল- অন্য রকম আলো ?
সুচরিতা - ( গান ) বধু কোন আলো লাগলো চোখে । ( তারসঙ্গে হাত ধরাধরি গলা মেলায় বিপুলও । কখনও মঞ্চে ঘোরে। কখনও ডায়াসে উঠে মুখোমুখি দাঁড়ায় )
বিপুল- অপূর্ব ।
সুচরিতা- সত্যি তোমার ভালো লেগেছে ?
বিপুল- ভীষণ ভীষণ ভালো লেগেছে । এমনি করে সারা জীবন আমায় গান শোনাবে তো সুচি ?
সুচি- শোনাব গো শোনাব , আমার যত সুর যত গান সব তো তোমাকে ঘিরেই । তুমি সব সময় আমাকে পাশে পাশে রাখবে তো বিপুলদা ?
( দুজনে হাত ধরে মুখোমুখি ডায়াসে দাঁড়িয় আবৃত্তি করে )
বিপুল- " উড়াব উর্ধ্বে প্রেমের নিশান দুর্গম পথমাঝে ,
দুর্দম বেগে , দুঃসহতম কাজে ।
সুচরিতা- রুক্ষ দিনের দুঃখ পাই তো পাব
চাই না শান্তি , সান্ত্বনা নাহি চাব।
বিপুল-সুচরিতা ( এক সঙ্গে )
পাড়ি দিতে নদী হাল ভাঙে যদি
ছিন্ন পালের কাছি ,
মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে জানিব
তুমি আছ , আমি আছি ।



No comments:
Post a Comment