সপ্তম দৃশ্য
স্থান- নাইট স্কুল । ডায়াসের উপর কয়েকজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর ছবি । উত্তোলনের জন্য লাঠিতে জাতীয় পতাকা তৈরি । নেপথ্যে হাল্কা সুরে বাজে বন্দেমাতরম গানের সুর । কয়েকটি চেয়ার টেবিল। উপস্থিত মৃত্যুজ্ঞয় , ভবতারণ , এবং দীপ্ত ।
বিপুল- বি.ডি.ও সাহেব পৌঁছালেই অনুষ্ঠান শুরু হবে । ততক্ষণ আমরা মরণোত্তর চক্ষু এবং দেহদানের অঙ্গীকার পত্রগুলিতে সই করে ফেলি । অনুষ্ঠান শেষে রক্তদান শিবিরে গিয়ে রক্ত দেব । আসুন সবাই একে একে অঙ্গীকার পত্রে সাক্ষর করুন।
( টেবিলে রাখা অঙ্গীকার পত্রে সকলে একে একে সাক্ষর করে ।
দীপ্ত এবং বিপুল দেখিয়ে দেয় কোথায় সাক্ষর করতে হবে । নেপথ্যে বিপুলবাবু -- আছেন নাকি ? বলতে বলতে অর্পণের প্রবেশ )
সকলে- আসুন বি.ডি.ও সাহেব আসুন , নমস্কার । (উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে ) ।
অর্পণ – ( হাত জোড় করে ) নমস্কার , নমস্কার ।
দীপ্ত- আজকের এই অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসাবে মাননীয় বি. ডি .ও সাহেব অর্পণ রায়ের নাম প্রস্তাব করছি ।
বিপুল- আমি সমর্থন জানাচ্ছি ।
( সকলে হাততালি দেয় সভাপতির চেয়ারে বসেন বি. ডি .ও )
সুচরিতা – এবারে প্রধান অতিথি হিসাবে মাননীয় মাস্টার মশাই পরমেশ দাসের নাম প্রস্তাব করছি ।
দীপ্ত- আমি সমর্থন করছি ।
( সকলে হাততালি দেয় , চেয়ারে বসেন পরমেশ )
বিপুল- এবারে পতাকা উত্তোলন করবেন মাননীয় সভাপতি মহাশয় ।
( অর্পণ উঠে গিয়ে দড়ি টেনে পতাকা উত্তোলন করে। বন্দেমাতরম বলে স্যালুট করে )
দীপ্ত – এবারে আমরা সকলে একে একে জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন জানাই আসুন ।
( একে একে সবাই বন্দেমাতরম বলে পতাকাকে স্যালুট জানায় । নেপথ্যে বাজে বন্দেমাতরম গানের সুর )
বিপুল- এবারে আলোর ঠিকানার পক্ষ থেকে সভাপতির হাতে মরণোত্তর চক্ষু এবং দেহদানের অঙ্গীকার পত্রগুলি তুলে দিচ্ছেন ভবতারণবাবু ।
( ভবতারণ কতগুলি কাগজ অর্পণের হাতে তুলে দেয় । উঠে দাঁড়িয়ে অর্পণ সেগুলি গ্রহণ করে )
অর্পণ - আমি অভিভূত । হৃদয়পুরের মতো একটি প্রত্যন্ত গ্রামের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আলোর ঠিকানা মানব কল্যাণে যে ভূমিকা নিয়েছে তা আরও অনেককে অনুপ্রাণিতও করবে। ব্লক প্রশাসনের তরফ থেকে উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ।
দীপ্ত- এবার ওসমান আলির হাতে তিন হাজার টাকার চেক তুলে দেবেন প্রধান অতিথি ।
( সুচরিতা পরমেশের হাতে চেক এগিয়ে দেয় ।
পরমেশ উঠে দাঁড়িয়ে সেটি তুলে দেয় ওসমানের হাতে )
অর্পণ - এই চেক কিসের জন্য ?
বিপুল- আমরা মনে করি স্বাধীনতা দিবস মানে স্বাধীনতার দিন । কিন্তু অর্থনৈতিক ভাবে আমরা অনেকেই আজও পরনির্ভর। এই যে ওসমান আলি এক বিত্তশালী মানুষের কিনে দেওয়া রিক্সা দৈনিক ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে চালাতেন।বছরের পর বছর ওইভাবে ১০ টাকা জমা দিয়ে গেলেও রিক্সা তার নিজের হয় নি। ভোরবেলা বের করে সন্ধ্যাবেলায় মালিকের বাড়িতে রিস্কা জমা দিয়ে আসতে হত।ভাড়া দেওয়া স্বত্ত্বেও তাকে মালিকের মর্জিমাফিক চলতে হত। তাই অর্থনৈতিক ভাবে সে আজও পরাধীনতার নাগপাশে বন্দী ছিল। সেই নাগপাশ থেকে তাকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আড়ম্বর কাঁটছাট করে সেই টাকা আমরা রিক্সা কেনার জন্য ওসমান ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
অর্পণ -- অভুতপূর্ব ভাবনা ।
বিপুল -- আমাদেরও ওসমান ভাইকে দৈনিক ১০ হারে জমা দিতে হবে । কিন্তু এ ক্ষেত্রে ৩০০০ টাকা জমা দেওয়ার পর রিক্সা তার নিজের হয়ে যাবে । তখন আর ভাড়ার টাকা জমা দিতে হবে না । আর তার জমা টাকা দিয়ে পরের বছর স্বাধীনতা দিবসের দিনে তারই হাত দিয়ে আর একজন মানুষকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্বাদ দেওয়া হবে।
এইভাবেই আলোর ঠিকানার তরফ থেকে আমরা ঠিক করেছি প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে অর্থনৈতিক ভাবে একজন পরাধীন মানুষকে স্বাধীন করব।
অর্পণ - অর্থনৈতিক ভাবে পরাধীন ?
দীপ্ত- তাইই তো। আর্থিক পরাধীনতাও বড়ো গ্লানিময়। আমরা চাই সেই গ্লানি দূর হোক। সাধ আমাদের অনেক , সাধ্য সীমিত । তারই মধ্যে প্রতিবছর অনুষ্ঠানের খরচ বাঁচিয়ে স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীন ভাবে জীবিকা শুরু করার জন্য সেই টাকা তুলে দেওয়া হবে একজন হতদরিদ্র মানুষের হাতে।
অর্পণ - চমৎকার ।
সুচরিতা- ওসমান ভাইয়ের মতো বহু মানুষ রয়েছে যারা সামান্য কিছু পুঁজির অভাবে আজও পুঁজিপতিদের কাছে দাসত্ব খাটছেন। বছরে পর বছর শোষিত হচ্ছেন । কিন্তু কিছু করার নেই বলে মুখ বুজে সেই শোষণ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিপুল -- আমরা সেই শোষণ মুক্তির চেষ্টা করব।
অর্পণ - সাবাস , ভাবাই যায় না এমন পরিকল্পনা ।
পরমেশ - আলোর ঠিকানার কর্ণধার আমার ছাত্র । স্বাধীনতার যে নতুন অর্থ ও আমাদের সামনে তুলে ধরল তাতে আমাদের জ্ঞান চক্ষু খুলে গেল।
মৃত্যুজ্ঞয়- আমরাও ভাবিনি এমনটা হতে পারে ।
অর্পণ - বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তাদের অনুরোধ আমি বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি সবগুলির কথা মনে নেই । কিন্তু আজকের এই অনুষ্ঠানের কথা চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে ।
পরমেশ- বি ডি ও সাহেব ?
অর্পণ - অনুষ্ঠানের খরচ বাঁচিয়েও যে মানুষকে বাঁচার পথ দেখানো যায় তা আমার ভাবনাতেও ছিল না । আলোর দিশা দেখাল আলোর ঠিকানা । তাই হে আলোর ঠিকানার দিশারী , আজ শুধু এই মিনতি করে যায় এমনি করেই নব নব দিশায় ভরিয়ে তুলুন সমাজে দশ দিক। ভরিয়ে তুলুন সমাজের দশ দিক।
( প্রস্থান )
সুচরিতা- কি গো দীপ্তদা আজকের এই অনুষ্ঠানের খবর তোমার কালকের কাগজে দেখতে পাচ্ছি তো?
দীপ্ত- অবশ্যই , কাল আমার খবরের শিরোনাম হবে ' স্বাধীনতার নতুন দিশা দেখাল আলোর ঠিকানা ' ।
ওসমান- আমি ভাবতে পারছি না আমার মত একজন মুসলমান রিক্সাচালকের জন্যও হিন্দু ভাইদের বুকেও এত দরদ ছিল ।
পরমেশ - না ওসমান , হিন্দু মুসলিম নয় । আমরা সবাই মানুষ । শোন নি কবি বলেছেন ( আবৃত্তি) ' মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান ' ।
ওসমান- মাস্টার সাহেব ?
মৃত্যুজ্ঞয় - মুসলিম তার নয়নমনি হিন্দু তাহার প্রান ।
সকলে - এক সে মায়ের কোলে যেন রবি শশী দোলে,
একই রক্ত বুকের তলে এক সে নাড়ীর টান ।
মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান
মুসলিম তার নয়নমনি হিন্দু তাহার প্রান ।



No comments:
Post a Comment