Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

আলোর ঠিকানা -- ৮









                                                             


                             

ধারাবাহিক  নাটক



 নেতাবাবুদের অফিসঘরে 

 বন্দী নারীর ইজ্জত

মনের ভিতর গুমরে কাঁদে  মর্মযন্ত্রণা 

তাইতো খুঁজছি সবাই নয়া সমাজের


     ‘ আলোর ঠিকানা ’




           রচনা :- অর্ঘ্য 
ঘোষ


                  অষ্টম দৃশ্য



              (  স্থান- কৃষ্ণধনের অফিস  .সেখানে চেয়ারে বসে কৃষ্ণধন হরিসাধন এবং প্রলয়   )


কৃষ্ণধন- একের পর এক জনসেবার কাজ করে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠছে বিপুল। এরপর তো নেতা বলে কেউ আমাদের কাছে আসবেই না। ক্ষমতা ধরে রাখাটাই সমস্যা হবে।  গোদের উপর বিষ ফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই এক বিচ্ছু সাংবাদিক। একের পর এক আমাদের বিরুদ্ধে খবর ছেপে জনগণের মন বিষিয়ে তুলেছে। উপরতলার নেতাদের কাছেও জবাবদিহি করতে হচ্ছে। 

প্রলয়- যা বলেছেন ,  ব্লক অফিসের কর্মীদের টাকা খাইয়ে  ১০ লক্ষ টাকার সেচ বাঁধের কাজটা বিনা টেন্ডারে প্রায় বাগিয়েই ফেলেছিলাম। হারামিটা কাগজে সেই খবর ফাঁস করে দিতেই সব বানচাল হয়ে গেল।

হরিসাধন- চুঃচুঃ , একবারে যাকে বলে বাড়া ভাতে ছাই পড়ে গেল ।

কৃষ্ণধন- ওই দুই শালাকে আচ্ছা করে জব্দ করতে হবে।

                                       ( দীপ্তর প্রবেশ )

দীপ্ত- ত্রিমূর্তি  মিলে কাকে আবার জব্দ করার প্ল্যান আঁটছেন ?

কৃষ্ণধন- কাকে আর জব্দ করব  ? জনসেবা করতে গিয়ে নিজেরাই জব্দ হয়ে যাচ্ছি । তার উপরে তুমি লেগে রয়েছো পিছনে ,  তা আবার নতুন করে কি বাঁশ দেওয়ার মতলবে এসেছো শুনি ? 

দীপ্ত- আমরা শুধু শুধু কাউকে বাঁশ দিই না কৃষ্ণদা , যারা ঝাড়ের বাঁশ ডেকে নেয় তাদের বাঁশ দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না ।

হরিসাধন -  লাখ কথার এক কথা, ডেকে নিলে তো বাঁশ খেতে হবেই । সেই যে কথায় আছে না বাঁশ কেন ঝাঁড়ে , এসো মোর ঘাড়ে। যার সরষে --- ফ্যাল ফ্যাল।  

কৃষ্ণধন- আঃ আপনি থামুন তো । সাংবাদিক ভায়ার  কাগজে তো দেখলাম বিপুলের নাইট স্কুলের স্বাধীনতা দিবসের খবর ফলাও ছাপা হয়েছে। ওই কাগজের কাঁটিং দেখিয়ে তো সরকারের কাছ থেকে ভাল রকম দাঁও মেরে দেবে বিপুল।

দীপ্ত-  অমানুষদের চিনতে একটু দেরি হলেও  আমি মানুষ চিনি কৃষ্ণদা। কোনরকম দাঁও মারার উদ্দেশ্যে বিপুল কাজ করে না। সে যা করে মানুষের মঙ্গলের জন্যই করে।

কৃষ্ণধন- আর আমরা বুঝি সব অমঙ্গল করে বেড়াই?

দীপ্ত- সত্যি করে বলুন তো কতগুলো ভালো কাজ আপনাদের দ্বারা সাধিত হয়েছে ? 

কৃষ্ণধন –মানে  ? 

দীপ্ত- মানে জনহিতকর কাজের জন্য বরাদ্দ সরকারি টাকার শ্রাদ্ধ হয়েছে । আর সেই শ্রাদ্ধের মহোৎসব খেয়েছেন আপনারা।

কৃষ্ণধন- শ্রাদ্ধ হয়েছে ? 

দীপ্ত- নয়তো কি ? আপনারা কথায় কথায় বলেন তালের আঁঠি চুষে দিন কাটানোর অবস্থা ঘুচেছে গরীব মানুষের। সত্যিই কি তাই ?  তাহলে কেন আজ আমলাশোল , বেলপাহাড়ির অনাহার ক্লিষ্ট মানুষের মুখ দেখি টি.ভি , সংবাদপত্রের পাতায় ? কেন অভাবের জ্বালায় শিশু সহ সহ আত্মযাতী হন অসহায় বাবা মা ? কেন ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে কীটনাশক নিজের গলায় ঢেলে দেন দেনার দায়ে সর্বশ্রান্ত চাষি ? কেন পতিতালয়ে বিকিয়ে যায় ফুলের কুঁড়ির মতো সদ্য কিশোরী ? কেন -কেন ? দিন , জবাব দিন। জানি , জবাব আপনারা দিতে পারবেন না।কারণ জবাব দেওয়ার মতো কিছু নেই আপনাদের।
    
কৃষ্ণধন- এসব তোমার রাজনৈতিক হতাশার কথা।

দীপ্ত- সে আপনি বলতেই পারেন ।  আচ্ছা বলুন তো সাধারণ মানুষ কতটুকু পেয়েছেন ?  তার তুলনায় দৃষ্টিকটু ভাবে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন আপনাদের মত নেতারা।  আর সাধারণ মানুষ যা পেয়েছেন তার তুলনায় তাদের মুল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি। 

কৃষ্ণধন-  বেশি মুল্য দিতে হয়েছে মানে ?

দীপ্ত- একসময় আধপেটা ভাতের জন্য গ্রামের গরীব মানুষকে সপরিবারে উদয়াস্ত ক্রীতদাসের মত পরিশ্রম করতে হত বাবুদের বাড়িতে। আর রাতেরবেলা ক্লান্ত - শ্রান্ত শরীর নিয়ে বাবুদের ফুর্তির খোরাক যোগাতে হয়েছে মহিলাদের। সামন্ততান্ত্রিক সেই ব্যবস্থার আদৌ কি পরিবর্তন হয়েছে ? গরিবের পেটের খিদে হয়তো কিছুটা মিটেছে ,  কিন্তু জুড়োয় নি তাদের অন্তরের জ্বালা। আজও তারা ধিকি ধিকি জ্বলেই যায়।
  
কৃষ্ণধন - কিছুই কি পরিবর্তন হয় নি ?

দীপ্ত- রূপ বদল হয়েছে মাত্র । বাবুদের জায়গা নিয়েছেন এখন নেতারা । যে কোন ধরণের কাজের জন্য নেতাদের কাছে বাঁধা দিতে হচ্ছে নারীদের ইজ্জত।ওইসব নারীদের যাবতীয় প্রতিরোধ-প্রতিবাদ হুমকি দিয়ে  দাবিয়ে দিচ্ছেন আপনারা। ত্রিস্তর পঞ্চায়েত পরিচালনায় সংরক্ষিত পদে যে সব মহিলাদের আপনারা এনেছিলেন ,  তাদের নানা কৌশলে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। এরপরেও বলবেন নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করেন আপনারা ?

কৃষ্ণধন –কিছুই কি হয়নি ? 

দীপ্ত-  হয়েছে । উন্নয়নের নামে রাশি রাশি টাকা খরচ হয়েছে ।  কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন কতটকু হয়েছে সবাই জানেন। হবে কি করে ?  বরাদ্দ টাকার একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে পার্টির তহবিলে । কিছু যাচ্ছে দুর্নিতিগ্রস্থ কর্মীর পকেটে। এরফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে।  ঠিকাদার সিমেন্টে পাথরের গুঁড়ো মেশাচ্ছে।বালির বদলে ধুলো দিচ্ছে। শিকের পরিবর্তে বাঁশের বাতা দিচ্ছে। আর বছর না ঘুরতেই ভেঙে পড়ছে রাস্তা , বাড়ি , সেতু। মারা পড়ছে পথচারি মানুষ। আপনারা কান্না কান্না মুখ করে তাদের পরিবারের লোকেদের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।সংবাদ মাধ্যমে সেইসব ছবি বের হচ্ছে। আপনাদের মুখে ফুটে উঠছে আত্মপ্রসাদের চওড়া হাসি। আর শিশু সন্তানদের বুকে চেপে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন কত হতভাগিনী স্ত্রী। 
        
কৃষ্ণধন- দেব একদিন আড়ং ধোলাই  ,  সেদিন বড় বড় বুলি কপচানো বেড়িয়ে যাবে ।

দীপ্ত- নেতাগিরি করছেন নেতাগিরি করুন ।  আমাকে ভয় দেখাতে আসবেন না । সাদাকে সাদা আর কালাকে কালো বলাই আমাদের ধর্ম। ধমক ঝমক দিয়ে পুলিশ-প্রশাসনকে আপনারা কবজা করতে পারেন , কিন্তু সাংবাদিকদের নয়। প্রাণ যায় যাক ,  সাংবাদিকরা কারও  রক্তচক্ষুকে  ভয় পায় না , কারও  রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না।

                                                   ( প্রস্থান )

কৃষ্ণধন- বটে ,  এ ব্যাটার তেল বড্ড বেড়েছে দেখছি । 

প্রলয়- সময় থাকতেই ভালো করে টাইট দিয়ে  দেওয়া প্রয়োজন ।

হরিসাধন- যার সরষে --- ফ্যাল ফ্যাল । টাইট দিতে হলে সময়ে দেওয়াই ভাল , নাহলে তেল আরও বেড়ে যাবে ।

কৃষ্ণধন- হরিদা এইসব ব্যাপারে আপনার বুদ্ধি তো একটু ভালোই খেলে । ব্যাটাকে কি ভাবে ভাল রকম কড়কে দেওয়া যায় তার একটা উপায় বাতলান দেখি ? যাতে সরাসরি আমাদের জড়িত থাকা চলবে না । কারণ সাংবাদিককে মারধোরের খবর সংবাদ মাধ্যমে বেরোলে ঢি ঢি পড়ে যাবে। উপরতলার নেতাদেরও ধমক খেতে হবে বুঝলেন তো বিষয়টা ? 

হরিসাধন- বিলক্ষণ বুঝেছি । যার সরষে -- ফ্যাল ফ্যাল ।  ওই যে কথায় বলে না সাপ মরবে কিন্তু লাঠি ভাঙবে না । কি তাই তো ? 

প্রলয়-হ্যঁ হ্যাঁ , ওই ধরনের কোন উপায় খুঁজুন ।

হরিসাধন-যার সরষে -- ফ্যাল ফ্যাল ।  এত খোঁজাখুঁজির কি আছে ?  উপায় তো আমার মাথায় মজুতই রয়েছে । যাকে বলে গুদামজাত রয়েছে ।
  
কৃষ্ণধন- কি সেই উপায় ? 

হরিসাধন- সাংবাদিক ব্যাটা প্রায়ই নাইট স্কুলে ঢুঁ মারতে যায় ।  বেশ কিছুটা ঝোঁপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় । অন্ধকারে সেখানেই তাঁকে ঘায়েল করার উপযুক্ত সুযোগ।

কৃষ্ণধন- চমৎকার প্ল্যান । জঙ্গলেই কিছু লোককে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে হবে । তারপর ঝোঁপ বুঝে কোপ । কিন্তু কাকে লাগানো যায় ওই কাজে ?

প্রলয়- এ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না । আমার ঠিকাদারী কাজের মজুরদের আকন্ঠ মদ গিলিয়ে ঠিক করে রাখব। তারপর যা কারার ওরাই করবে ।

কৃষ্ণধন- চমৎকার আমাদের মনবাসনা পূর্ন হবে। কিন্তু আমরা ধরাছোঁওয়ার মধ্যে থাকব না ।

হরিসাধন- যার সরষে  ---  ফ্যাল ফ্যাল ।  আর হাভেতেগুলো ধরা পড়ে যদি আমাদের নামও করে তাহলে মাতালের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেব । 

কৃষ্ণধন- ফাঁসলে ওরাই ফাঁসবে ।

হরিসাধন- বাইরে থেকে নাড়ব আমরা কলকাঠি , তাতেই হবে সাংবাদিক ব্যাটার দাঁত কপাটি ।

কৃষ্ণধন- আপনার কাব্যরসও আছে দেখছি । 

হরিসাধন- রস তো আরও অনেক আছে ,  কিন্তু কাজে লাগল না ভায়া । 

কৃষ্ণধন-তাহলে ওই কথায় রইল  । ঠিক মত ব্যবস্থা কোর । দেখো , কোন বেচাল না হয়ে যায় যেন । সাংবাদিক বলে কথা । 

প্রলয় - আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন  । সব ব্যবস্থা পাকা করে রাখব আমি। 


        ( আলো নিভে আসে )



                 (  চলবে )


         নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



    





                      --------০--------

No comments:

Post a Comment