নবম দৃশ্য
( স্থান- নাইট স্কুল । সেখানে ডায়াসে পাশাপাশি বসে রয়েছে বিপুল এবং সুচরিতা )
বিপুল- আজ তো স্কুল ছুটি । ছেলেমেয়েরা আসবে না । তুমি আজ আবার কষ্ট করে এলে কেন ?
সুচরিতা- কষ্ট না করলে কেষ্টঠাকুরকে তো একা পেতাম না ।
বিপুল- তাই বুঝি ?
সুচরিতা- হ্যাঁ গো মশাই হ্যাঁ , তোমার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য আমি সব কষ্ট স্বীকার করতে আমি রাজি আছি।
দিনান্তে একবার তোমার মুখটা দেখার জন্য আমি ছুটে আসি ।
বিপুল-কেন গো ?
সুচরিতা- কেন বোঝ না ? ( বলে গান শুরু করে ) " তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়" ( দুজনে কখনও
ডায়াসে বসে , কখনও দাঁড়ায়। কখনও সুচরিতার কোলে মাথা রেখে শোয় বিপুল )
বিপুল- সত্যি তুমি গানটা বড় ভাল গাও সুচি ।
আমাদের বিয়ের পর সারাদিন কাজের শেষে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসব তখন তোমার কোলে মাথা রেখে এমনি ভাবেই গান শুনব। শোনাবে তো সুচি ?
সুচরিতা- শোনাব গো শোনাব । আমার জীবনের সব গান যে তোমাকে ঘিরেই । তুমিই যে আমার স্বপ্নের সওদাগর ।
কবে তোমার ময়ুরপঙ্খী নাও আমার ঘাটে এসে ভিড়বে আমি যে কুলে বসে তারই প্রতীক্ষা করছি।
বিপুল- আর তুমি আমার বনলতা সেন ।
সুচরিতা- বনলতা সেন ?
বিপুল- ( সুচরিতার কোলে শুয়ে আবৃত্তি )
'" চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা ,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য , অতিদুর সমুদ্রের ' পর
হাল ভেঙে যে- নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি- দ্বীপের ভিতর ,
তেমনি দেখছি তারে অন্ধকারে ; বলছে সে , ' এতদিন কোথায় ছিলেন ? '
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
সুচরিতা- অপূর্ব , কার লেখা ?
বিপুল- নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাসের । বইটা এনে দেব , পড়ে দেখবে আরও ভালো লাগবে ।
( নেপথ্যে চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যায় । সুচরিতার কোল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় বিপুল )
সুচরিতা-কি ব্যাপার বলতো ?
বিপুল- কিছু বুঝতে পারছি না , দীপ্তর আসার কথা ছিল ওরই কোন বিপদ হল না তো ?
( সেই সময় কপালে হাত চেপে ছুটতে ছুটতে দীপ্তর প্রবেশ ।
তার কপাল থেকে রক্ত ঝরে পড়ে )
বিপুল- এ কি কাণ্ড ? কারা করল এমন ?
দীপ্ত- মানুষকে ভাল বাসার উপহার ।
বিপুল -- মানে ?
দীপ্ত -- সব কথার কি মানে হয় ? হয় না , তাই মানে জানতে চেও না ।
সুচরিতা- ইসঃ কপাল তো অনেকটাই কেটে গেছে , দেখি দেখি ( বলে কাপড়ের আঁচল ছিড়ে বেঁধে দেয় )
( ছুটতে ছুটতে পরমেশ,মৃত্যুজ্ঞয়,স্পন্দন , ওসমান আলির প্রবেশ )
মৃত্যুজ্ঞয়- ছেলেটার কে এমন দশা করল বলুন তো মাস্টারমশাই ?
পরমেশ- সংবাদ মাধ্যম গণতন্ত্রের একটি স্তম্ভ স্বরূপ । যারা সেই গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করতে চায় একাজ তাদেরই ।
ওসমান- একবার তুমি তাদের নাম বলো ভাই ।এই হাত দিয়ে ( দুই হাত মুঠো করে তুলে ধরে) তাদের টুঁটি ছিঁড়ে আনি ।
দীপ্ত - শান্ত হও ওসমান ভাই , তুমি শান্ত হও ।
স্পন্দন- তোমার কপাল ফেটে রক্ত ঝড়ছে আর তুমি বলছ শান্ত হতে ?
বিপুল - কারও নাম বলতে না চাও তো জোর করব না কিন্তু পুলিশের কাছে তো একটা অভিযোগ জানাতে হবে ।
দীপ্ত- কি লাভ হবে তাতে ? কিছু সাধারণ মানুষ ফেঁসে যাবে। উকিল আর পুলিশের পাল্লায় পড়ে ঘটিবাটি বিকিয়ে রাস্তায় দাঁড়াবে তারা। আর আসল অপরাধীরা হাসবে ।
স্পন্দন- বুঝেছি , এ শালা ওই কাঠিকেষ্ট কৃষ্ণধনদের কাজ । ওরাই মদ খাইয়ে কাউকে দিয়ে এই কাজ করছে ।
ওসমান- ওই শালাদের আমরা ছাড়ব না ?
দীপ্ত - কি করবে ?
স্পন্দন- তোমার যতটুকু রক্ত ওরা ঝরিয়েছে তার পাঁচগুণ রক্ত ঝড়িয়ে ছাড়ব ওদের ।
দীপ্ত- ওইসব করতে যেও না । তাতে একের পর এক মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ওরা তোমাকে জেলে পচিয়ে মারবে ।
সুস্থ জীবনে আর ফিরতে দেবে না।
মৃত্যুজ্ঞয়- বাবা তোমার আর রিপোর্টারি করে কাজ নেই ।
ওরা তোমাকে খুন করে ফেলবে ।
দীপ্ত- না কাকাবাবু তা হয় না , যেদিন এই পেশায় ঢুকেছি সেইদিনই জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য ব্রত নিয়েছি ।
মৃত্যুজ্ঞয়- তোমার কিছু হয়ে গেলে আমাদের পাশে কে দাঁড়াবে বাবা ?
দীপ্ত- চিন্তা করবেন না কাকাবাবু , সত্য উদঘাটনের জন্য যদি আমার মৃত্যু হয় সে মৃত্যু হবে গর্বের।
তাছাড়া আরও অনেক দীপ্তকে আপনারা পাশে পাবেন কাকাবাবু।
সুচরিতা- তাহলে কি কিছুই করার নেই দীপ্তদা ?
পরমেশ- এমন একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কি কিছুই করার নেই ?
দীপ্ত- আছে , মাস্টারমশাই আছে । মানুষের দরবারে ওদের এইসব অপকর্মের কথা তুলে ধরতে হবে ।
গড়ে তুলতে হবে সচেতনতা বোধ। সচেতনতাবোধই গণ প্রতিবাদ আর গণ প্রতিরোধের জন্ম দেবে। সেই গণ প্রতিবাদ আর গণ
প্রতিরোধের ধাক্কায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে কুচক্রীদের রাজ্যপাট।
স্পন্দন- তবে তাই হোক ।
বিপুল- আজ থেকে একটি সুন্দর গঠনই হোক আমাদের ব্রত
( একসঙ্গে সবাই হাতে হাত রাখে ) ।
পরমেশ-যে সমাজে রুটি রুজির জন্য নারীকে বিকিয়ে দিতে হবে না তাদের ইজ্জত ।
সুচরিতা- যে সমাজে প্রতিটি শিশু পাবে পুষ্টি , স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার অধিকার ।
মৃত্যুজ্ঞয়- যে সমাজে মনুষ্যত্বই হবে মানুষের একমাত্র পরিচয় ।
সকলে একসঙ্গে - তেমনই সমাজ গড়ার জন্য আমরা দায়বদ্ধ হলাম ।
( সমবেত গান )
" হাতে হাত রেখে মিলি এক সাথে
আমরা আনিব নতুন ভোর ।
উষার দুয়ারে হানি আঘাত ,
আমরা আনিব রাঙা প্রভাত
আমরা টুটাব তিমির রাত
বাধার বিন্ধ্যাচল
চলরে চল চলরে চল " ।



No comments:
Post a Comment