Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

আলোর ঠিকানা -- ১০



                                                             


                             

ধারাবাহিক  নাটক



 নেতাবাবুদের অফিসঘরে 

 বন্দী নারীর ইজ্জত

মনের ভিতর গুমরে কাঁদে  মর্মযন্ত্রণা 

তাইতো খুঁজছি সবাই নয়া সমাজের


     ‘ আলোর ঠিকানা ’




           রচনা :- অর্ঘ্য 
ঘোষ


                 দশম দৃশ্য



  (  স্থান- কৃষ্ণধনের অফিস ।  সেখানে টেবিলের  একদিকের চেয়ারে বসে কৃষ্ণধন এবং অন্যদিকে প্রলয়  )


কৃষ্ণধন- ভবতারণের ডাঁটালো ভাগ্নীটাকে তো ভোগেই চড়ানো গেল না  হে । শুধু শুধু মাথা মাথাটাই ফাটালাম । 

প্রলয়- আমিও চেষ্টা করে বাগে আনতে পারিনি । শালী বিপুল হারামজাদাটার প্রেমে পড়ে গায়ে আদর্শের নামাবলী জড়িয়ে রেখেছে । সেই নামাবলী খোলে কার সাধ্যি ? 

কৃষ্ণধন - যাই বলো মালখানা কিন্তু খাসা । অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে চাকরি , স্বনির্ভর গোষ্ঠীর লোনের টোপ গিলিয়ে তো যাকে ইচ্ছে ভোগে চড়িয়েছি , শুধু এই ছুঁড়িটাকেই পারলাম না ।

প্রলয়- তবে আফশোসের কিছু নেই । আমি একটি নতুন প্ল্যান ভেঁজেছি তাতে শালীকে ভেগে চড়ানোও যাবে উপরি হিসাবে জুটবে নগদ কিছু টাকা।

কৃষ্ণধন -তাই নাকি , তা কি সেই প্ল্যান ? 

প্রলয়- এখনই জানতে পারবেন , একটু অপেক্ষা করুন ।    

        (  সেই সময় ক্ষান্তমনি , কালীরামকে নিয়ে হরিসাধনের প্রবেশ।কালীরামের হাতে টিনের ছোট্ট বাক্স  )

হরিসাধন-যার সরষে  --- ফ্যাল ফ্যাল । ব্যাবস্থা সব পাকা করেই এনেছি ।

কৃষ্ণধন- তা ব্যবস্থা কি শুনি ?

প্রলয়- শুনুন তাহলে খুলেই বলি ।

কৃষ্ণধন- হ্যাঁ হ্যাঁ তাড়াতাড়ি বল  । আমার আর তর সইছে না । জলে মাছ ঘাই  দিয়ে বেড়াবে অথচ টোপ গিলবে না , কাঁহাতক আর সহ্য হয় ?

হরিসাধন- সত্যিই সহ্য হয় না ।

প্রলয়- শুনুন কৃষ্ণদা , এই বিহারী ব্যাটা গুচ্ছের টাকা নিয়ে কয়েক দিন থেকে বস্তিতে বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। ওকে দেখে তখনই আমার মাথায় প্ল্যানটা আসে । 

কৃষ্ণধন- আরে প্ল্যানটা কি বলবে  তো ?

প্রলয়- আগামীকাল এই বিহারীটার সঙ্গে সুচরিতার বিয়ে দেব ঠিক করেছি । 

কৃষ্ণধন-ওই বুড়ো হাবড়াটার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে  আমদের কি লাভ হবে শুনি ? বিহারী তো মেয়েটাকে নিয়ে বিহার মুলুকে চলে যাবে। আমরা পরে ভোগে চড়ানোর যে চেষ্টাচরিত্র করব তারও সুযোগ থাকবে না ।

প্রলয় - আহা আগে সবটা শুনুন ।

কৃষ্ণধন -- হ্যা হ্যা বলো।

প্রলয় -- আমাদের হলো চা খেয়ে  ভাঁড় ফেলে দেওয়ার ব্যাপার , তাই তো ? তারপর সেই ভাঁড় নিয়ে কে চা খেল না খেল তাতে কি এসে যায় আমদের ?

হরিসাধন- যার সরষে --- ফ্যাল ফ্যাল ।  কিছুই এসে যায় না ।

কৃষ্ণধন-আঃ আপনি একটু চুপ করুন দেখি , ব্যাপারটা ভাল ভাবে বুঝতে দিন । ভাই প্রলয় তুমি ঠিকঠাক খোলসা করে বলো দেখি ।

প্রলয়- এই বিহারী ব্যাটা সুচরিতাকে বিয়ের জন্য আমাদের হাতে ৫০ হাজার টাকা দেবে । আর ওর মামীকে ২০ হাজার। বিয়ের পর ফুলশয্যা এবং মধুচন্দ্রিমার নাম করে উঠবে চন্দ্রপুরের একটি লজে। সেখানে যতদিন খুশী ভোগ চড়িয়ে আমরা বিহারীটার হাতে তুলে দেব মাগীটাকে।তারপর বুড়োটা আমাদের এঁটো ভাঁড় নিয়ে যা খুশী তাই করবে।

কৃষ্ণধন- খাসা মতলব , একেই বলে ঠিকাদারি বুদ্ধি । তোমার মগজটাকে তো সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখতে হয় হে । 

প্রলয়- তাহলে মামীমা , কালীরামজী সব ঠিক আছে তো ? 

ক্ষান্তমনি- তোমারা যেখানে আছ সেখানে বেঠিক হওয়ার তো কিছুই নেই । 

কালীরাম- জরুর সব কুছ ঠিক হ্যায় ।  দিন কয়েক ফুর্তিফার্তা করে লিয়ে হামার হাতে লড়কিকে তুলে দিলেই হোবে ।

প্রলয়- হ্যাঁ হ্যাঁ তাই পাবে  , এখন ঝটপট টাকাগুলো দাও তো দেখি ।

কলীরাম- হ্যাঁ হ্যাঁ এই নিন ( বলে বাক্স থেকে গুণে গুণে প্রলয়ের হাতে টাকার বাঁণ্ডিল তুলে দেয় ) ।

প্রলয়-  ( ক্ষান্তমনির হাতে ২০ হাজার টাকা তুলে দিয়ে ) তাহলে মামীমা ওই কথাই রইল । কাল সন্ধ্যায় বর ,পুরুত আর  নাপিত নিয়ে আমরা যথাসময়ে হাজির হয়ে যাব ।  শুভকাজ সেরে বর - বৌ নিয়ে চলে আসব । দেখবেন কথাটা আবার পাঁচকান না হয়ে যায় , তাহলে তীরে এসে তরী ডুবে যাবে । আপনি কেবল মামাটাকে একটু ম্যানেজ করবেন , বাকী কাজ আমরা সামলে দেব ।

ক্ষান্তমনি - ( টাকা আঁচলে বাঁধতে বাঁধতে ) সে ব্যাপারে তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো । কাক-পক্ষীতেও টের পাবে না । মামা ভাগ্নীকে ঘেঁটি ধরে বিয়ের আসরে বসাতে না পারলে আমার নাম ক্ষান্তমনিই নয় হুঁ । 

হরিসাধ ন- যার সরষে ---  ফ্যাল ফ্যাল ।  সে তুমি ইচ্ছা করলেই পার , বয়সকালে তোমার ঘায়েও তো কম মুর্চ্ছা যায় নি আমরা ?

ক্ষান্তমনি- মরণ ( হরিসাধনের প্রতি কটাক্ষ হেনে ) ।

                       ( নেপথ্যে ক্ষান্ত --  ক্ষান্ত বলে চিৎকার করতে করতে ভবতারণের প্রবেশ )

ভবতারণ-এইযে ক্ষা ন্ত,তুমি এখানে আর আমি তোমাকে সারা পাড়া তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছি ।

ক্ষান্তমনি - কেন  কি রাজকার্যটা আটকে আছে শুনি , যে হামলাতে হামলাতে উদয় হলে ?

ভবতারন-তা রাজকার্য বই কি ,  সুচির বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ঘটক ঠাকুর এসে বসে রয়েছেন বাড়িতে ।

কৃষ্ণধন- ভাগ্নীর বিয়ের জন্য আর আপনাকে ভাবতে হবে না ভবতারণবাবু ।

ভবতারন- ভাবতে হবে না মানে ? আমার ভাগ্নীর বিয়ে , আমি ভাবব না তো কে ভাববে ? 

প্রলয়- একেবারে নিখর্চায় আগামীকালই আমরা  আপনারা ভাগ্নীর বিয়ের ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছি । 

হরিসাধন-  এ যাকে বলে সেই উঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে , বর আসছে  টোপর মাথায় দিয়ে একদম নিখর্চায় এই যুগেও ভাবা যায় ?

ভবতারণ - আগামীকাল বিয়ে ?  কোথাই কার সঙ্গে  ? পাত্রটি কে জানতে পারি ?

কৃষ্ণধন- পাত্রের বয়সটা অবশ্য একটু বেশী  । তবে আর্থিক অবস্থা ভালই , জমি- জমা , একপাল গরু-মোষ আছে। ভাগ্নী আপনার সুখেই থাকবে।

হরিসাধন --- সুখ বলে সুখ । সেই যে বলে না সোনার থালায় খাবে আর দুধে আঁচাবে। 
     
ভবতারণ - পাত্র কে নিজে না দেখে বিয়েতে তো আমি কিছুতেই মত দেব না । 

হরিসাধন - যার সরষে ---  ফ্যাল ফ্যাল । দেখবেন বৈকি  , দেখবেন বৈকি ,  হাজার হলেও পাঁচটা নয় , দশটা নয় ,  
একটাই মাত্র ভাগ্নীন জামাই বলে কথা। দেখে শুনে তো নিতে হবেই ।   

প্রলয়- পাত্র তো আপনার পাশেই রয়েছে । ( বলে কালীরামকে ভবতারনের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় ) এই হল আপনার একমাত্র ভাগ্নী জামাতা বাবাজীবন । 

ভবতারণ - ( কালীরামকে দেখে দু -পা সরে যায় ) এর সঙ্গে হবে আমার সুচির বিয়ে ? এ বিয়ে আমি কিছুতেই হতে দেব না ।  ক্ষান্ত তোমারও কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? 

ক্ষান্তমণি - মাথা খারাপ আমার হয়নি  , হয়েছে তোমার  । ভাগ্নী তোমার যতই রূপসী হোক না  কেন বিনা পণে যেচে এসে কেউ উদ্ধার করবে না ।

ভবতারণ - না করুক ,  সারাজীবন কুমারী হয়ে থাকবে তবু এই বুড়ো হাবরাটার সঙ্গে কিছুতেই বিয়ে দেব না । 

ক্ষান্তমণি - হ্যাঁ সারা জীবন কুমারী হয়ে থাকবে আর আমার ঘারে বসে অন্ন ধংসাবে। 

ভবতারণ  -   আচ্ছা ক্ষান্ত ,  তোমার নিজেরও তো  সূচির বয়সী মেয়ে রয়েছে ,  পারবে তার সঙ্গে এই ঘাটের মড়াটার বিয়ে দিতে ? 

ক্ষন্তমণি - কি ? আমার পেটের মেয়ের সঙ্গে তুলনা ?  বুড়োর সঙ্গে ভাগ্নীর বিয়ে দেবে না মুরোদ কত জানা আছে ? নিজের মেয়ের বিয়ে কি করে হবে তার ঠিক নেই ,  বিনা পয়সায় আপদ বিদায় হচ্ছে আর উনি এলেন বাগড়া দিতে। আদিখ্যেতা দেখে আর বাঁচিনা।

ভবতারণ -আদিখ্যেতা নয় , ক্ষান্ত আদিখ্যেতা নয় । সুচিও আকাশ থেকে পড়ে নি । বানের জলে ভেসেও আসে নি । সেও আমারই মায়ের বোনের মেয়ে। মৃত্যুর আগে ওর মা বাপ মরা মেয়েটাকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল ' দাদা মেয়েটাকে আমি তোমার হাতে তুলে দিয়ে গেলাম।  তুমি ওকে নিজের মেয়ের মত মানুষ কোর।

ক্ষান্তমণি - আর উনি সেই উটকো দায় ঘাড়ে করে বয়ে বাড়ি আনলেন । যা বলছি ভাল করে মন দিয়ে শোন । চুপিচুপি বুড়োটার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলে কুড়ি হাজার টাকা পাব।সেই টাকাটা নিজের মেয়ের বিয়ের সময় কাজে লাগাতে পারব।

ভবতারণ - এই তাহলে মতলব  ?

ক্ষান্তমণি -  তবে আর বলছি কি , ওই টাকা আর মাগীর গয়নাগুলো দিয়ে দিব্যি আমাদের মেয়েটার বিয়ে হয়ে যাবে। তাই বলছি নিজের পায়ে কুড়োল মের না ।

ভবতারণ -- ক্ষান্ত তোমার মনে কি একটুও পাপ বোধ নেই । তোমার কি একবারও মনে হয় না অন্যের মেয়ে বিক্রির টাকায় নিজের মেয়ের বিয়ে দিলে সে বিয়ে কোনদিন সুখের হতে পারে না । 

ক্ষান্তমণি -- আমি তো তোমার মতো অত পাগল নয় তাই নিজের মেয়ের অমঙ্গল চিন্তা করব । 
     
হরিসাধন-  সাত কথার এক কথা । সেই যে বলে না  ছাগলেও ,  না-- না পাগলেও নিজের ভালোটা বোঝে । যেখানে যা পায় কুড়িয়ে নেয় । 

কৃষ্ণধন - আর তো  যাকে বলে একেবারে পড়ে পাওয়া  চৌদ্দআনা ।

হরিসাধন -- না-না যাকে বলে  একেবারে ষোলআনা । 
   
প্রলয়- বিনা পয়সায় ভাগ্নীর দায়ও উদ্ধার হল ,  আবার নিজের মেয়ের বিয়ের টাকাও জুটে গেল । 

ভবতারণ - ( ক্ষান্তমণির প্রতি ) যা ভাল বোঝ কর ।  তবে আমি এই বিয়েতে নেই তা সাফ জানিয়ে দিয়ে গেলাম ।                    
                             ( প্রস্থান )
                                          
হরিসাধন- যার সরষে  ---  ফ্যাল ফ্যাল ।  একেই বলে বেআক্কেলে মানুষ । 

ক্ষান্তমণি  - এনিয়ে আপনাদের কিছু ভাবতে হবে না ।  কাল সন্ধ্যায় ঠিক সময়ে পৌচ্ছে যাবেন তারপর দেখি কার বাপের সাধ্যি বিয়ে আটকায় ।  আমার নামও ক্ষান্ত মনি হুঁ ।

                                                                          ( প্রস্থান )

                                 (  তিনজনে একসঙ্গে হাতে হাত রেখে বলে ওঠে ,  হিপ- হিপ- হুররে )

প্রলয়-কৃষ্ণদা তাহলে টাকাটার এখন কি সদগতি করা যায় ?

কৃষ্ণধন -কি আবার ? তোমার কুড়ি ,  আমার কুড়ি । বাকি দশ হাজার হরিদার । 

প্রলয় - বেশ তাহলে তাই হোক।  (বলে টাকা ভাগ করে দেয় )

হরিসাধন- একেই বলে আমে দুধে মিশে গেল , আঁটি শালা গড়াগড়ি খেয়ে মলো ।

প্রলয় ও কৃষ্ণধন - মানে ?

হরিসাধন  -   বলছিলাম  আমার প্রতি একটু অবিচার হল নাকি ? 

কৃষ্ণধন - আপনি না খুব --- । আপনার চোরের কপনি লাভের ব্যাপার । যা পাচ্ছেন সেটাই তো উপরি ।

হরিসাধন -- সে তো ভায়া তোমারও । দাঁওটা তো প্রলয় ভায়াই মেরেছে ।

কৃষ্ণধন -- ঠিক আছে ঠিক আছে , আর দাঁও মারামারি দেখতে হবে না । এই নিন আরও  দশ  টাকা করে টাকা দিচ্ছি ।
প্রলয় তুমিও  দশ টাকা দাও ।  ( বলে  পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে দেয় । অসন্তুষ্ট হয়ে সেটা নিয়ে পকেটে ঢোকায় হরিসাধন।
  
প্রলয় -  এই নিন ( বলে হরিসাধন কে দশ টাকা দেয় । একই ভাবে সেটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখে সে )

হরিসাধন- দেখো ভায়া আসল জিনিসের এমন ভাগ কোর না যেন । বহু কাঠখড় কিন্তু আমাকেও পোড়াতে হয়েছে ।

কৃষ্ণধন- সে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না । 

হরিসাধন-( দর্শকদের উদ্দেশ্য টাকা দেখিয়ে ) যার সরষে -- তার তেল । একেই বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারার খেল।  হেঁ হেঁ হেঁ (  হাসি )


      (  আলো নিভে আসে  )

           (  চলবে )


         নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



    





                      --------০--------

No comments:

Post a Comment