( কিস্তি --- ৭৫ )
ওই ভাবেই একসময় তারা পৌঁচ্ছে যায় হোমের গেটের সামনে। দুটো দিন কেটে যায় চরম ব্যস্ততায়। হোম জুড়ে যেন সাজো সাজো রব পড়ে যায়। ডি,এম সাহেবের নির্দেশে প্রশাসনের কর্মীরা বিয়ের ব্যবস্থাপত্র করতে ঘন ঘন ছুটে আসেন হোমে।হোমের মেয়েরাও বিয়ের কাজে কোমর বেঁধে নেমে পড়েন।সুধাদি প্রস্তাব দেন আলাপনবাবু আর তাকে একসঙ্গে হোমে আইবুড়ো ভাত খাওয়ানোর। সাবিত্রীদি চলে যাওয়ার পর সুধাদিই তাদের মধ্যে সব থেকে বেশি বয়স্কা। সবাই তাকে অবিভাবিকার মতোই মান্য করে। তাই সঞ্চিতা, মালতি সহ অন্যান্য মেয়েরাও একবাক্যে তার প্রস্তাব সমর্থন করে। ঠিক হয় সেদিন আর রাঁধুনি নয়, সুধাদিই হোমের মেয়েদের নিয়ে রান্না করবেন। সোমবারেই আইবুড়ো ভাত খাওয়ার অনুষ্ঠানটা হবে। ওই দিন শ্রাবণী আর দিদিরাও সব চলে আসবে। দিদি আর শ্রাবণীকে নিয়ে সেদিন আলাপনবাবুর সঙ্গে বিয়ের কেনাকাটা করতে যাওয়ার কথা হয়েছে তার। শ্রাবণী তো সরাসরি হোমেই উঠবে। দিদিরা উঠবে হোটেলে। কিন্ত আইবুড়ো ভাতের দিনে সন্দীপ আর দিদিদের হোমেই খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তাদের বিয়ে ঘিরে হোমের মেয়েদের এত আবেগ উচ্ছাস তার খুব ভালো লাগে। তাই সে'ও ঠিক করেছে বাজার করতে হোমের সমস্ত মেয়েকে নিয়ে যাবে।
তাদেরও পচ্ছন্দ সই একটা করে পোশাক কিনে দেওয়া হবে। তার হাতে অবশ্য অত টাকা নেই। গ্রুপের লভ্যাংশের কিছু টাকা জমা আছে, কিন্তু সেটা সে নিতে চায় না। গ্রুপের সাংস্কৃতিক চক্রের উন্নয়নের জন্য ওই টাকাটা সে দিয়ে দেবে ঠিক করেছে। ডি,এম সাহেবকে বললে বেতন বাবদ অগ্রিম কিছু টাকাও হয়ত পেতে পারে সে। কিন্তু কাজ না করে অগ্রিম টাকা নেওয়ার পক্ষপাতীও সে নয়। সে ঠিক করছে আলাপনবাবুকে তার জন্য কেনা কাটা কাটছাঁট করে সেই টাকায় হোমের মেয়েদেরও জন্য একটা করে পোশাক কেনার অনুরোধ করবে। আলাপনবাবুকে সে যতদুর চিনেছে তাতে তিনি এই প্রস্তাবে খুশী হবে বলেই মনে হয় তার।
তবু তার সঙ্গে কথা না বলে এখনই ওই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলতে চায় না। হঠাৎ করে সবাইকে চমকে দিতে চায় অঞ্জলি। তাকে ঘিরে সবার এত আবেগ উচ্ছাস, তাদের সে কোনদিন ভুলতে পারবে না। তাই সবাইকে সে তার আনন্দে সামিল করতে চায়। তার সেই দুঃখের দিনে যারা পাশে ছিলেন তাদের সকলকে পাশে চায় অঞ্জলি। মাঝে একদিন আলাপনবাবুর সঙ্গে প্রেস ক্লাবে গিয়ে সাংবাদিকদের নিমন্ত্রণ করে এসেছে। সবাই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। অরুণস্যর আর সুব্রতবাবুকে নিজে গিয়ে বলা উচিত ছিল। কিন্তু সেই সময় আর করে উঠতে পারে নি সে। তাই ফোনেই নিমন্ত্রণ সারতে হয়েছে। তবে তা নিয়ে অবশ্য স্যারেদের কোন অনুযোগ নেই।
বরং তাদের গলাতেও রীতিমতো উচ্ছাস ঝড়ে পড়তে শুনেছে সে। নিজের বিয়ের কথাটা অবশ্য সরাসরি সে বলতে পারে নি। সে কেবল নিজের পাশের খবরটা দিয়েছিল। তারপর ফোনেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল আলাপনবাবুর সঙ্গে। যা বলার উনিই বলেছিলেন। শোনার পর স্যার বলেন, খুব খুশী হয়েছি রে। বিয়ের দিন হয়তো যেতে পারব না। কিন্তু বৌভাতে আমরা দুজনে ঠিক হাজির হয়ে যাব দেখিস। অঞ্জলি সাবিত্রীদির বাড়ির ঠিকানা দিয়ে বলেছিল, স্যার আপনারা না এলে কিন্তু আমার বিয়েটা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
স্যার বলেছিলেন, যাব রে মা নিশ্চয় যাব। স্যরের কথা শুনে তখন কিছুটা স্বস্তি পায় অঞ্জলি।সোমবার সকালের দিকে কিছুক্ষণ আগে পড়ে এসে পড়ে দিদি এবং শ্রাবণীরা। শ্রাবণীকে মোটর বাইকে নামিয়ে দিয়ে সন্দীপ বিয়ের কাজে নেমে পড়ে। দিদিদের কাছেই একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছেন আলাপনবাবু। সেখানে জিনিসপত্র রেখেই অবশ্য দিদিরা সবাই হোমে চলে আসে। অঞ্জলি এগিয়ে গিয়ে অফিস ঘরে এনে বসায় তাদের। ভাইকে এরই মধ্যে বেশ বড়োসড়ো দেখাচ্ছে। দিদিদের সঙ্গে গল্প করতে করতেই খাওয়া -দাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। তাদের দুজনকে ঘিরে গোল হয়ে বাকিরাও খেতে বসে। খেতে খেতেই কালকের অনুষ্ঠান নিয়ে কথা হয়। ঠিক হয় বিয়ের পরই দিনই সবাই পৌঁছে যাবে সাবিত্রীদিদের বাড়িতে। সেই জন্য সেদিনের সেই মিনিবাসটা বলে রাখা হয়েছে। খাওয়ার পর আলাপনবাবুকে একটু একা পেয়ে কথাটা তোলে অঞ্জলি। শুনে আলাপনবাবু বলেন, আমি তো সেটাই ঠিক করে রেখেছি। মা, দিদি, ভাইরাও সবাই যাবেন আমাদের সঙ্গে।
কথাটা শোনার পর আলাপনবাবুকে তার আরও ভালো লেগে যায়। এত বিবেচনা বোধ সম্পন্ন লোক সে কমই দেখেছে।হোমের সবাইকে বাজার করতে যাওয়ার কথাটা বলে সে। শুনে সবাই বলে, না- না আমরা আবার কেন?
---- কেন নয় ? ছেলে মেয়ের বিয়ে লাগলে গোটা পরিবারের জন্য কেনা কাটা করা হয়। এখানেও তো আমরা একই পরিবারের লোক। আর যেহেতু বাজারটা কাছেই সেই হেতু সবাই মিলে পচ্ছন্দ করে কেনাকাটা করতে অসুবিধা কোথাই ?
এরপর আর কেউ কোন আপত্তি তোলে না। বরং সবাইকে বেশ খুশী, খুশীই দেখায়। আসলে কেনা কাটা করার প্রবনতা মেয়েদের সহজাত। সঞ্চিতা, মালতিদের কথাতে তা আরো একবার প্রমানিত হয়।
তারা বলে, দিদি তুমি খুব ভালো গো। আমাদের কথাও ভেবেছো। কি ভালো যে লাগছে, আমরাও নিজের পচ্ছন্দ মতো জিনিস কিনতে পারব।
---- কেন তোরা আমার বোন না ? তাহলে তোদের বাদ দিয়ে আমি কি করে নতুন পোশাক পড়ি বলতো ?
--- থ্যাংক ইউ দিদি, থ্যাংক ইউ।
---- হয়েছে হয়েছে, চল আর বেশি পাকামি করতে হবে না।
বলে সবাইকে তাড়া দিয়ে গাড়িতে তোলে অঞ্জলি।
দিদিরা প্রথম দিকে যেতে একটু আপত্তি তুলেছিল। তখন আলাপনবাবু বলেন , তার মানে আপনারা আমাকে নিজের ভাবতে পারছেন না তাই তো ?
তারপর আর দিদিও আর কথা বাড়ায় নি।সবাইকে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসে। অনেক রাত পর্যন্ত চলে কেনা কাটা। শুধু পোশাকই নয়, সবার জন্য সাজার জিনিসও কেনা হয়। বাদ যায় না তার বাড়ির লোকেরাও। সবার চোখ মুখে খুশী খুশী ভাব। সঞ্চিতা, শ্রাবণীরা তো রীতিমতো উচ্ছস্বিত।তার মাঝেই আলাপনবাবু বলেন, আজ আর হোমে খেতে হবে না। সবাই বরং কোন রেস্তরাঁয় খাওয়াদাওয়া করেই ফিরব।
আর যাই কোথায় ? সঞ্চিতা, শ্রাবণী, মালতিরা বলে ওঠে, আপনার জবাব নেই। এই ভাবে মার্কেটিং করার পর রেস্তোরাতে না খেয়ে ফেরাটা বড়ো বেমানান লাগত। দিনটা সত্যিই বড়ো ভালো কাটল। এই দিনটার কথা কোনদিন ভুলতে পারব না। অঞ্জলিরও খুব ভালো লাগে ওদের খুশী মুখ দেখে। মনে মনে এজন্য সে আলাপনবাবুকে ধন্যবাদ দেয়। একপলক প্রশংসা সূচক দৃষ্টিতে চেয়েও থাকে আলাপনবাবুর মুখের দিকে। আলাপনবাবু সেই দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকেই যার যা পচ্ছন্দ সেই অনুযায়ী খাবারের অর্ডার দেন। খাওয়া দাওয়া চুকতেই বেশ রাত হয়ে যায়।
কিছুক্ষনের মধ্যেই তাদের হোমে নামিয়ে দিয়ে দিদিদের নিয়ে গাড়ি হোটেল অভিমুখে চলে যায়। শ্রাবণী অবশ্য তার কাছেই থেকে যায়। পাশাপাশি শুয়ে দুজনে নানা গল্প গুজবে মেতে উঠে।শ্রাবণী তার বিবাহিত জীবনের গল্প বলে।
নানা টিপস দেয়। আর অঞ্জলির বুক ঢিপ ঢিপ করে। আলাপনবাবুর সংগে তার তো বেশ কয়েকবছর ধরে মেলামেশা তবুও যেন কেন ভয় ভয় করে। শ্রাবণী বলে , ওই রকম প্রথম প্রথম সবারই হয়। তারপর সব ঠিক হয়ে যায়। অঞ্জলি বলে, তবুও কেমন যেন ভয় হচ্ছে রে ? মনে হচ্ছে আমি পারব তো ওকে সুখী করতে।
--- খুব পারবে। আর সেটা তুমি ভালোই জানো। আমার কাছে আর বাহানা করতে হবে না। ফুলশয্যায় আড়ি পাতব। তখন দেখব তুমি কতখানি কচি খুকি ? বলে অঞ্জলির গাল টিপে দেয় শ্রাবণী।
অঞ্জলি বলে -- তুই না --
---- কি আমি না বলো বলো, সেই যে একটা কথা আছে না, নেকু রে নেকু, খাও ঢুকু ঢুকু। তোমার অবস্থা এখন সেই রকম।
অঞ্জলি শ্রাবণীর পিঠে আলতো চাপড় মেরে বলে -- তুই বিয়ের পর খুব অসভ্য হয়েছিস মুখে কিছুই আটকায় না।
--- তুমিও হবে।
দুজন নারীর নিভৃত আলাপচারিতায় রাত শেষ হয়ে ভোরের পাখিরা ডেকে ওঠে। তবু যেন শেষ হয় না কথা। আসলে এই ই হয়। সদ্য বিয়ে হতে চলেছে এরম কাউকে পেলে আর কথা ফুরোয় না বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েদের। শেষে অঞ্জলি বলে, হ্যারে এবার উঠতে হবে তো নাকি।এরপরই তো ক্যাটারারের লোক থেকে শুরু করে ছাদনাতলা সাজানোর লোক এসে পড়বে।
---- তোমার মনে হচ্ছে আর তর সইছে না। একেবারে সখা ধরো ধরো অবস্থা। বলেই ইঙ্গিতপূর্ণ কটাক্ষ করে শ্রাবণী। অঞ্জলি হাত উঁচিয়ে তাকে থাপ্পড় মাড়তে উদ্যত হয়। শ্রাবণী তা এড়িয়ে এক ছুটে কলতলায় গিয়ে হাজির হয়। আর চকিতে একটা মুখ ভেসে ওঠে অঞ্জলির মানসপটে।



No comments:
Post a Comment