Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় --৭৬





              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ

          (  কিস্তি --- ৭৬ )




আর চকিতে একটা মুখ ভেসে ওঠে অঞ্জলির মানসপটে। সেই মুখ তার প্রেমাস্পদ আলাপনবাবুর মুখ। সেই মুখই তো তার এখন শয়নে স্বপনে জপমালা হয়ে উঠেছে। শ্রাবণী ভুল কিছু বলে নি , সত্যিই তার তর সইছে না। মনের মানুষটাকে একান্তে পেতে খুব ইচ্ছা করছে তার। ফুলশয্যার কথা মনে পড়তেই কেমন লজ্জা লজ্জা লাগে অঞ্জলির।কিছুতেই সেটা চাপা দিতে পারে না সে। তাই ধরা পড়ে যায় শ্রাবণীর কাছে। ততক্ষণে পরিস্কার পরিচ্ছিন্ন হয়ে কলতলা থেকে ফিরে আসে শ্রাবণী। আর তাকে স্ট্যাচুর মতো লজ্জা রাঙা মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে -- আচ্ছা মেয়ে তো তুমি। এখনো এখানেই দাঁড়িয়ে আছো ?  একেই বলে যার বিয়ে তার ঠিক নেই, আর পাড়া পড়শির ঘুম নেই। আমি কোথাই ওনার তাড়া খেয়ে উঠে পড়লাম আর উনি এখনো লাজে রাঙা বৌটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
শ্রাবণীর কথা শেষ হয় না , আচমকা বেজে ওঠে সানাইয়ের সুর। না আর দাঁড়িয়ে থাকা চলে না।কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই এসে পড়বে। তাই অঞ্জলিও একেবারে  তৈরি হয়ে নেয়। আজকে পড়ার জন্য কাল আলাপনবাবু নিজে পচ্ছন্দ করে একটা শাড়ি বেছে দিয়েছেন। সেটা পড়ে বেরোতেই তাকে ছেঁকে ধরে সঞ্চিতারা। সবাই বলে -- এই শাড়িটা কি সুন্দর মানিয়েছে গো দিদি তোমায়। ঠিক যেন সিনেমার নায়িকাদের মতো দেখাচ্ছে তোমাকে।
শ্রাবণী টিপ্পনী কাটে, হবে না কেন ? খোদ নায়কই যে পচ্ছন্দ করে কিনে দিয়েছে ! যাই বলো পচ্ছন্দ আছে বলতে হবে আলাপনবাবুর।
নায়িকার কথা উঠতেই আনমনা হয়ে পড়ে অঞ্জলি। মনে পড়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। আর একজনও তো তাকে হিন্দি সিনেমার এক নায়িকার সঙ্গে তুলনা করত। তখন মনে মনে খুব গর্ব হতো তার। কিন্তু না , আজ এই শুভদিনে তার কথা সে মনে ঠাঁই দিতে চায় না। তার বদলে আজ সে যাকে জীবনসঙ্গী হিসাবে পেতে চলেছে তা অনেক মেয়ের কাছেই সৌভাগ্যের ব্যাপার। আলাপনবাবুর কাছে কোন তুলনাতেই আসে না সে। তবু মন থেকে যতই তার স্মৃতি ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে কাজটা তত সহজ হয় না। কথায় আছে , প্রথম ভালোবাসার কথা মেয়েরা নাকি সারা জীবন ভুলতে পারে না। ভালোবাসার মানুষ হারিয়ে গেলেও তার দাগ থেকে যায় সারাজীবন।


                                         তার মনে এক ধরনের অপরাধ বোধের জন্ম হয়। মনে হয় এমনিতেই আলাপনবাবুর মতো একটা ছেলের যোগ্য সে নয়, তার উপরে তার অতীত কলঙ্কিত। সেই অতীত তার পরবর্তী জীবনে ছায়া ফেলবে না তো ? সে অবশ্য আলাপনকে সব খুলেই বলেছে। তাকে আনমনা দেখে ফের টিপ্পনী কাটে শ্রাবণী -- কি গো কোথাই হারিয়ে গেলে ?  নায়কের ধ্যানে জগত-সংসার সব ভুলে গেলে নাকি ? কিন্তু এখনই তো তুমি নায়ককে পাচ্ছো না গো। তাকে পেতে তো তোমাকে আরও একটা দিন প্রতীক্ষায় থাকতে হবে। কাল বৌভাতের পর ফুলশয্যা। তুমি তো তবু একদিন পরে নায়ককে পাচ্ছ। আমার তো বিয়ের পরদিন কালরাত্রি পালন করতে হয়েছে। শাশুড়ি  নতুন বরের কাছে ঘেঁসতে দেওয়া তো দুরের কথা মুখ পর্যন্ত দেখতে দেন নি।
--- ইস খুব আফশোস হচ্ছে বুঝি ?
--- তা একটু হচ্ছে বৈকি।
---- তাই বুঝি আমার পিছনে লাগা হচ্ছে ?
---- মোটেই না , যেটা সত্যি সেটাই বলছি। আমাদের সমাজে বিয়ের পরদিন কাল রাত্রি পালন করতে হয়। সেদিন স্বামী-স্ত্রীর মুখ দেখা পর্যন্ত বারণ। কিন্তু তোমার তো বৌভাতের দিনেই ফুলশয্যা।
নিয়মটার কথা জানে অঞ্জলি। বৌভাতের পর দিনই একজন মন্ত্রীর আসার কথা রয়েছে জেলায়। তার হাত দিয়েই তাদের গ্রামের সমন্বয় মঞ্চের শিলান্যাস করাতে চান ডি,এম সাহেব। ওই সমন্বয় মঞ্চের ইনচার্য হিসাবে সেখানে অঞ্জলির থাকাটা নাকি জরুরী। তাই বৌভাত আর ফুলশয্যা একটা দিনেই করা হয়েছে। শ্রাবণীও বিষয়টা জানে , তবু তার পিছনে লাগতে ছাড়ছে না। অঞ্জলির অবশ্য বেশ ভালোই লাগে। তাদের ওইসব খুনসুটির মধ্যেই হঠাৎ হোমে এসে পৌঁছোন অমলবাবু। তাকে দেখে অবাক হয়ে যায় অঞ্জলি। অমলবাবুর তো এই সময় হোমে আসার কথা ছিল না। তার তো ওখানে বৌভাতের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। হঠাৎ এমন কি হলো যে হোমে ছুটে আসতে হলো তাকে ?
অঞ্জলির মুখ দেখে বোধ তার দুশ্চিতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেন অমলবাবু। তাই এগিয়ে এসে বলেন -- আমাকে দেখে খুব অবাক হয়ে গিয়েছো মনে হচ্ছে ?  আরে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
দিদি বললেন, সবই যখন হচ্ছে তখন আর ছেলে - মেয়ে দুটোর গায়ে হলুদটাই বা বাকি থাকে কেন ? তাই দিদি গায়ে হলুদের তত্ত্ব ঠিক করেই রেখেছিলেন। আমি নিয়ে এলাম ।কথাটা শোনার পরই শ্রাবণী সঞ্চিতারা তো মহাখুশি।
শ্রাবণী তো বলেই বসে -- ওহো সাবিত্রীদি তুমি সত্যিই গ্রেট, জিও দিদি জিও।
সঞ্চিতা বলে , সত্যি এই বিষয়টা আমাদের মাথায় ছিল না। কি মজা যে হবে না , দুজনকে একসঙ্গে হলুদ মাখিয়ে সবাই মিলে মাথায় ঘড়া ঘড়া জল ঢেলে এমন স্নান করাব না যেন ঠান্ডা লেগে দুজনে ফুলশয্যায় একে অন্য অন্যকে জড়িয়ে ধরে মুখোমুখি বসে শুধু কেশেই যাবে। বার বার ফুলশয্যার কথা শুনে লজ্জা পায় অঞ্জলি। লজ্জা ঢাকতে সে বলে , এই আমি তোদের দিদি না ?  আর উনি তোদের স্যর হন না ? তাহলে বার বার আমাদের নিয়ে উল্টো পাল্টা কথা বলছিস যে  বড়ো ?
--- উহু উহু , ওসব বলে আমাদের ভোলানো যাবে না। দেখই না দেখাচ্ছি মজা। 


                                                    
                                                     বলেই শ্রাবণী অফিস ঘরের দিকে চলে যায়। সেখানে তখন লাইট,  ক্যাটারার, ছাতনাতলা সাজানোর লোকেদের সঙ্গে কথা বলছিলেন আলাপনবাবু। শ্রাবণী তার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে অঞ্জলির কাছে। তারপর বলে -- এই যে মশাই শুনুন , সে যেদিন আপনি আমাদের স্যর ছিলেন ছিলেন। কিন্তু আজ আপনি আমাদের দিদিকে বিয়ে করতে চলেছেন। সেই হিসাবে আমরা এখন থেকে শালী--জামাইবাবু। আর জানেনই তো এই সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের চেয়েও মধুর। তাই এখন থেকে আর স্যর স্যর করতে পারব না, জামাইবাবু বলব। আর হাসি মশকরাও  করব। রাগ করলে হবে না কিন্তু।
তারপর আলাপনবাবুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হলুদবাঁটা এনে ঘসে দেয় তার গালে। ততক্ষণে অন্যরাও হাজির হয়েছেন সেখানে। শ্রাবণীর দেখাদেখি তারাও দুজনকে হলুদ মাখিয়ে দেয়। হলুদ মাখানো শেষ হতেই সবাই ঘড়া ঘড়া জল ঢালতে থাকে তাদের মাথায়। একসময় সত্যিই ঠাণ্ডায় তাদের কাঁপুনি ধরে যায়। তবে রেহাই মেলে তাদের। ভেজা পাজামা পাঞ্জাবিতে আলাপনবাবুকে দেখতে খুব সুন্দর দেখায়। শরীরের প্রতিটি রেখা আর্কষনীয় হয়ে ওঠে।চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না অঞ্জলির। সেটা লক্ষ্য করে শ্রাবণী এসে তার কানে কানে বলে , সব দেখা কি এখনই শেষ করে নেবে নাকি ?  তাহলে শুভ দৃষ্টিতে কি দেখবে ?
তখন লজ্জা পেয়ে দ্রুত বাথরুমের দিকে চলে যায় সে। যেতে যেতেই দেখতে পায় তার প্রিয় মানুষটা অফিস ঘরের বাথরুমের দিকে চলেছেন। সেখানেই তার তোয়ালে সহ একপ্রস্থ পোশাক রাখা থাকে। ওইভাবেই দিনভর নানান হাসি ঠাট্টায় কেটে যায়। সন্ধ্যা নামতেই জ্বলে ওঠে রঙ বেরঙের আলো। সেই আলো আর সানাইয়ের সুরে মোহময় হয়ে ওঠে গোটা হোম। একে একে আসতে শুরু করে সবাই। দিদিদের সঙ্গেই পৌঁছোয় সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরা। তারা এসেই প্রথমে তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তাকে ততক্ষণে শ্রাবণী -- সঞ্চিতারা সাজাতে বসেছে। ওই অবস্থাতেই তারা বিভিন্ন পোজে তার ছবি তোলে। সে'ও মিষ্টি হেসে সবাইকে ধন্যবাদ জানায়। তাকে সাজানো শেষ হতে না হতেই বাইরে থেকে সাংবাদিকরাই বর এসেছে বর এসেছে বলে চিৎকার করে ওঠে। আর তাই শুনে সাজানো ফেলে সেদিকে ছুটে যায় সঞ্চিতারা। তারপর ফিরে এসে বলে, দিদি কি বলব জামাইবাবুকে যা লাগছে না একেবারে ফাটাফাটি। খুব লোভ হচ্ছে গো।
---- খুব না ? লোভ করতে হবে না। তোমাদের জন্যও ব্যবস্থা ভেবে রেখেছি।
---- সে কি গো ?  হোমে তো আর পুরুষ নেই। যে দুজন ছিল তুমি আর শ্রাবণীদি তুলে নিলে।
---- কেন হোমের বাইরে বুঝি আর পুরুষ নেই ?



                                      তাদের কথা শেষ হয় না , এসে পৌঁছোন দোকানের সেই জ্যেঠু। তার হাতে একটা উপহারের প্যাকেট তুলে দিয়ে বলেন -- দেখি দেখি, একে বারে সাক্ষাৎ মা লক্ষীর মতো লাগছে গো মাকে আমার। অঞ্জলি সবার সঙ্গে জ্যেঠুর পরিচয় করিয়ে দেয়। এমন কি ডি,এম সাহেব  এবং   এস,পি সাহেব যখন তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তখনও তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে অঞ্জলি বলে, স্যার এই সেই জ্যেঠু যার কথা আপনাদের আগেই বলেছি। ওনার জন্য আজকের এই দিনটা আমার জীবনে এসেছে।
নমস্কার -- প্রতিনমস্কারের পর ডি,এম সাহেব বলেন , আপনি এসেছেন খুব ভালো হয়েছে। অঞ্জলিকে আজ আপিনই সম্প্রদান করবেন। 
জেঠু বলেন, না - না আপনারা থাকতে আমি কেন ?
ডি,এম, সাহেব বলেন, আপনি অঞ্জলিকে এই জীবনে পৌঁছোতে সাহার্য করেছেন। সেই হিসাবে অঞ্জলিকে কারও যদি সম্প্রদান করার অধিকার থাকে সে একমাত্র আপনার।
ওই কথা শোনার পর আবেগে গলা বুজে যায় জ্যেঠুর। কম্পিত গলায় বলেন , এমন সৌভাগ্যের কথা আমি স্বপ্নেও ভাবি নি। আমার নিজের ছেলেমেয়ে নেই। তাই খুব আক্ষেপ ছিল। সেটা আজ ঘুচে গেল। বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন জ্যেঠু। ডি,এম সাহেব তার হাত ধরে বিয়ের আসরে নিয়ে যেতে যেতে বলেন, আসুন আজ আর কান্না নয়। আজ আমাদের খুব আনন্দের দিন। নির্ধারিত লগ্নেই বিয়ে হয়ে যায়। পাত্রপক্ষের ভূমিকা পালন করেন ডি,এম সাহেব। শুভদৃষ্টির সময় কাপড়ের আড়ালে অঞ্জলি যেন আর চোখ ফেরাতে পারে না। আলাপনবাবুও এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন সদ্য পরিণীতা স্ত্রীর দিকে। তারই মাঝে শ্রাবণী  আচমকা মাথা ঢুকিয়ে বলে, এই যে মশাই আর কতক্ষণ লাগবে। বাইরে থেকে দেখা না গেলেও ভিতরে কি হচ্ছে সবাই কিন্তু আন্দাজ করতে পারছি।
শ্রাবণীর কথায় থতমত খেয়ে একে অন্যের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।বিয়ের অনুষ্ঠান চুকে যাওয়ার পর একসঙ্গে সবাই খেতে বসে। হোমের মেয়েদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে অঞ্জলি আলাপনও। তখনও ফটোগ্রাফারদের আলোর ঝলকানির বিরাম নেই। তাদের আবদারে দুজনকে একে অপরকে খাওয়ানোর  পোজও দিতে হয়। খাওয়া শেষে সবাই জড়ো হন অফিসঘরে। সেখানে ডি,এম সাহেব সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের আরও একটা সুখবর দিই , আগামী বৃহস্পতিবার অঞ্জলিদের শ্রীপল্লীতে সমন্বয় মঞ্চের শিলান্যাস করতে আসছেন পুনঃবার্সন মন্ত্রী মাননীয় সুরেশ মুখার্জী। আপনারা প্লিজ ওইদিন হাজির থাকবেন।
সম্মতি জানিয়ে একে একে সবাই বিদায় নেন। থেকে যান কেবল আলাপনবাবু। তাকে নিয়েই অফিসঘরে বসে বাসর। আলাপনবাবু একাই একের পর এক আবৃত্তি করে জমিয়ে দেন বাসর রাত।

               

 ( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----

   
     

No comments:

Post a Comment