লুপ্তপ্রায় খেলা -- ৬
( ছবি -- সোমনাথ মুস্তাফি )
' লিডার ধরা '
একদল ছেলেমেয়ের মধ্যে থেকে ' লিডার ' অর্থাৎ দলপতিকে খুঁজে বের করতে হয় বলেই এই খেলার নাম ' লিডার ধরা'। তবে বিভিন্ন জায়গায় খেলাটি ভিন্ন নামেও পরিচিত। এই খেলায় খেলোয়াড়দের পর্যবেক্ষণ শক্তির পরিচয় মেলে। কারণ এক দল ছেলেমেয়ের মধ্যে থেকে দলপতিকে খুঁজে বের করাটা পুলিশের চোর ধরারই সামিল। ৯/১০ জন ছেলেমেয়ে একত্রে কিম্বা আলাদা আলাদা ভাবেও ওই খেলা চলে। প্রথমে খেলোয়াড়দের মধ্যে থেকে একজনের ' মোর ' নির্ধারণ করা হয়। ' মোর ' নির্ধারণের পদ্ধতিটি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম। এই খেলায় সাধারণত ' উবু-দশ-কুড়ি ' গণনা পদ্ধতিতে ' মোর ' নির্ধারিত হয়। এই গণনা পদ্ধতিতে প্রথমে একজন গণনাকারী মনোনীত করা হয়। তারপর গণনাকারী সহ খেলোয়াড়রা সবাই বৃত্তাকারে দাঁড়ায়। আর গণনাকারী ডান হাতটা প্রথমে নিজের মাথার উপরে তুলে উল্টো দিকে কিছু ছুড়ে দেওয়ার কায়দায় উবু বলে ডাক শুরু করে। উবু বলার পর সে নিজের বুকে হাত ছুঁয়ে দশ থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে তার ডানদিকের খেলোয়াড়দের বুকে হাত ছুঁইয়ে ' কুড়ি - তিরিশ- চল্লিশ-পঞ্চাশ - ষাট - সত্তর - আশি - নব্বই- শ ' শব্দ উচ্চারণ সহ গণনা প্রক্রিয়া চালু করে। যার কাছে ' শ ' অর্থাৎ একশ গণনা শেষ হয় সে গণনা বা 'মোর ' আওতার বাইরে চলে যায়।ওইভাবে গণনার শেষে যে খেলোয়াড় পড়ে থাকে তারই 'মোর' নির্ধারিত হয়।
' মোর ' নির্ধারণ হয়ে যাওয়ার পর ' মোরধারী ' ছাড়া বাকি খেলোয়াড়রা মাঠের মধ্যে বৃত্তাকারে বসে। ' মোরধারীকে ' চলে যেতে হয় সেখান থেকে ১০ / ১৫ ফুট দুরে। তার অবস্থানের জায়গাটি কোথাও কোথাও ' বুড়ির ঘর ' হিসাবেও পরিচিত। বুড়ির ঘরে 'মোরধারীকে ' অন্যান্য খেলোয়াড়দের ' ডাক ' না আসা পর্যন্ত চোখ বন্ধ করে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কোথাও কোথাও চোখে গামছা কিম্বা রুমাল বেঁধে দেওয়ারও প্রচলন রয়েছে।
ওই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর বৃত্তাকারে বসে থাকা খেলোয়াড়রা ইশারায় নিজেদের মধ্যে থেকে একজনকে লিডার বা দলপতি নির্বাচন করে নেয়। তারপর চিৎকার করে ' এসো দেখি বাছাধন , ধরো দেখি লিডার কোনজন ' জাতীয় ছড়া কেটে মোরধারীকে ডাকে। খেলার ভাষায় একেই 'ডাক ' দেওয়া বলে। ওই 'ডাক' পাওয়ার পরই মোরধারী চোখের আবরণ খুলে বৃত্তের মধ্যে এসে প্রবেশ করে।
নিয়ম হলো , মোরধারীর নজর এড়িয়ে লিডার ধারাবাহিক ভাবে কখনও নাক কিম্বা কান চুলকানো , কখনও বা মাটিতে কাল্পনিক থালায় ভাত খাওয়া সহ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী বিভিন্ন রকম ভঙ্গিমার পরিবর্তন করে।
বাকি খেলোয়াড়দেরও দ্রুততার সঙ্গে ওই ভঙ্গিমা অনুসরণ করতে হয়। যদি এক বা এক বা একাধিক খেলোয়াড়কে মোরধারী পূর্বের ভঙ্গিমায় চিহ্নিত করতে পারে তাহলে সেই এক বা একাধিক খেলোয়াড় ' মরা ' হিসাবে বিবেচিত হয়। তখন বৃত্ত থেকে তাদের বেরিয়ে যেতে হয়।ফের জীবিত না হয়ে ওঠা পর্যন্ত তার স্থান হয় বৃত্তের বাইরে।মোরধারীর ভুল পর্যবেক্ষণ না হওয়া পর্যন্ত ওইসব ' মরা ' প্রাণ ফিরে পায় না।
কারণ মোরধারীকে খুব সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কে লিডার অর্থাৎ কাকে অনুসরণ করে খেলোয়াড়দের ভঙ্গিমার পরিবর্তন হচ্ছে তা চিহ্নিত করতে হয়। তার চিহ্নিতকরণ ভুল হলে প্রতিবারের জন্য বৃত্তের বাইরে চলে যাওয়া একজন করে মরা খেলোয়াড় প্রাণ ফিরে পায়।অর্থাৎ ফের সে বৃত্তে ঢুকে খেলায় সামিল হওয়ার সুযোগ লাভ করে। কিন্তু পর্যবেক্ষণ অর্থাৎ লিডার চিহ্নিতকরণ সঠিক হলে লিডারকে 'মোর ' বরণ করতে হয়।সেক্ষেত্রে ' মরা ' সমস্ত খেলোয়াড় প্রাণ ফিরে পায় অর্থাৎ বৃত্তে প্রবেশ করে খেলার সুযোগ লাভ করে। ফের ' লিডার ' মনোনয়ন করে নতুন ভাবে খেলা শুরু হয়। লিডারকে ওইভাবে ' মোর ' মানতে হয় বলে অনেক খেলোয়াড়ের মধ্যে ওই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়।
আবার অন্যান্য খেলোয়াড়দের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ থাকে বলে লিডার হওয়ার আগ্রহও পরিলক্ষিত হয়। সমস্যা এড়ানোর জন্য তখন দুটি ক্ষেত্রেই ক্রমান্বয়িক ভাবে লিডার নির্বাচন করা হয়।তবে সেক্ষেত্রে একে একে খেলোয়াড়দের লিডার হওয়ার ' দান ' হয়ে গেলে শেষের দিকে সহজেই লিডার ধরা পড়ার আশংকা থাকে। তাই আলোচনার মাধ্যমেই লিডার নির্বাচন বেশি গুরুত্ব পায়। এই খেলাটিও হারিয়ে যাওয়ার দলে নাম লেখাতে বসেছে।




No comments:
Post a Comment