লুপ্তপ্রায় খেলা -- ২
( ছবি -- সোমনাথ মুস্তাফি )
' রস - খস '
রাম - সীতা কিম্বা হাকিম-পুলিশের মতোই প্রাইমারি স্কুল স্তরে আরও একটি খেলা ছিল ছেলেমেয়েদের খুব প্রিয়। সেই খেলাটির নাম রস-খস। রাম সীতার মতোই ওই খেলাটিও সাধারণত ক্লাস শুরুর আগে কিম্বা টিফিনে খেলত ছেলেমেয়েরা। ওই খেলা খেলতে গিয়ে কতজনের যে সহ খেলোয়াড়দের হাতের থাপ্পড়ে থাপ্পড়ে হাত লাল হয়ে উঠত তার ঠিক নেই। অনেকে রাতে ব্যাথায় ঘুমোতে পর্যন্ত পারত না।কিন্তু ব্যাথার কারণ কিছুতেই বাবা-মা'কে প্রকাশ করত না। বরং পরদিন ব্যাথা ভুলে হাসি মুখে ফের খেলতে বসে যেত।
খেলাটি মূলত পাঁচজন খেলোয়াড় নিয়ে খেলা হয় । ছেলেমেয়ে একত্রে কিম্বা আলাদা-আলাদা ভাবেও খেলা চলে।সাধারণত কচিকাঁচা অর্থাৎ প্রাইমারী স্কুলের ছেলে মেয়েদের মধ্যেই নিজ নিজ স্কুলে ওই খেলার চল ছিল।তবে স্কুল ছুটির পর কিম্বা ছুটির দিনগুলিতে গ্রামেও ওই খেলায় মেতে উঠত দেখা যেত স্কুলের ছেলেমেয়েদের।সেক্ষেত্রে স্কুলে যায় না এমন ছেলেমেয়েরাও ওই খেলায় সামিল হত।
প্রথমে খেলোয়াড়রা পচ্ছন্দ অনুযায়ী নিজেদের রস , খস , সিঙ্গারা , বুলবুল এবং মস্ত নাম ধারণ করে। এরপরে গণনার মাধ্যমে একজনের ' মোর ' নির্ধারণ করতে হয়। ওই খেলার নিয়মানুযায়ী গণনাকারী হিসাবে একজনকে ' মোর ' আওতার বাইরে রাখা হয়। বিভিন্ন জায়গায় গণনাকারী নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন রকম নিয়ম চালু ছিল।সাধারণত পাঁচটি অথবা ততোধিক কাগজের টুকরোয় কোন একটিতে গণক লিখে ভাঁজ করে একত্রে উপরের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়। কাগজগুলির মধ্যে থেকে প্রত্যেককেই একটি করে কাগজকুচি কুড়িয়ে নিতে হয় । পাঁচের অধিক কাগজকুচি থাকলে দেখা যেত অনেকক্ষেত্রেই কারও ভাগ্যেই গণক লেখা কাগজ ওঠে নি। সেক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি বার বার আবর্তিত হত। পাঁচের অধিক কাগজকুচি ব্যবহারেরও উদ্দেশ্য ছিল। হাতে অতিরিক্ত সময় থাকলে খেলা দীর্ঘায়ত করার জন্য বেশি কাগজকুচি যোগ করা হত। কারণ ওইভাবে গণক নির্বাচনের জন্য বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়ে যায়।অন্যথায় পাঁচটি কাগজই বেছে নেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে একবারেই গণক নির্বাচিত হয়ে যায়। যার কুড়িয়ে নেওয়া কাগজে গণক লেখা থাকে সেই ভাগ্যবান বিবেচিত হয়।কারণ থাপ্পড় খাওয়ার হাত থেকে তার ছাড় মেলে।
খেলার নামের মতোই চমক রয়েছে গণনাতেও। গণনাকারী বাদে বাকি চারজন নিজেদের দু'হাত একত্রিত করে প্রথমে মাথার উপর উঁচু করে তুলে একসঙ্গে নামিয়ে মেঝেতে আঙ্গুল বিছিয়ে ধরে। গণনাকারী সেই আঙ্গুলগুলি একে একে রস - খস- সিঙ্গারা - বুলবুল এবং মস্ত বলতে বলতে গণনা করে। যার নামে গনণা শেষ হয় সে চলে যায় ' মোর ' আওতার বাইরে।অর্থাৎ আঙুল গুনতে গুনতে যদি সিঙ্গারাতে গোনা শেষ হয় তা হলে সিঙ্গারা প্রথমে 'মোর' আওতার বাইরে যাওয়ার সুযোগ পায়।পর্যায়ক্রমিক ভাবে গণনার মাধ্যমেই আরও দু'জন ' মোর' আওতার বাইরে চলে যায়। তবে গণনাকারীর নামে গণনা শেষ হলে তা ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয় না। তখন সেই গণনা বাতিল করে পুনরায় নতুন ভাবে গণনা করা হয়। ওইভাবে গণনা শেষে যে খেলোয়াড় বাকি পড়ে থাকে অর্থাৎ যার ' মোর ' হয় , তার কার্যত ' শিরে সংক্রান্তির ' দশা হয়।
কারণ তাকে নিজের ' মোর ' ছাড়াতে হয় । ' মোর' ছাড়ানোটা যথেষ্ট যন্ত্রণাদায়ক ব্যপার। কারণ ' মোরধারী' খেলোয়াড়কে নিজের ডান হাত মাটি বা মেঝের উপর নিচের দিকে আঙুল রেখে সোঁজা করে ধরে থাকতে হয়। আর বাকি খেলোয়াড়রা পর্যায়ক্রমে সেই হাতের দুই দিকে নিজেদের হাত রেখে একবার ডান হাত , একবার বাঁহাত দিয়ে থাপ্পড় মারতেই থাকে। যদি ' মোরধারী ' থাপ্পড় মারার ফাঁকে সুকৌশলে নিজের হাত সরিয়ে নিতে পারে , আর সেই কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যে থাপ্পড় মারছিল সে যদি নিজের হাতেই থাপ্পড় মেরে বসে তাহলে তার থাপ্পড় মারার অধিকার চলে যায়। অর্থাৎ সে মৃত খেলোয়াড় হিসাবে পরিগণিত হয় ।কিন্তু যদি সে ' মোরধারীর' কৌশল ব্যর্থ করে নিজের হাতে থাপ্পড় মারা থেকে বিরত হতে পারে তাহলে তার থাপ্পড় মারার অধিকার বহাল তো থাকেই , তার আগে যদি কেউ থাপ্পড় মারার অধিকার হারিয়ে থাকে তাহলে 'মোরধারীর' প্রতি একবারের কৌশল ব্যর্থ হওয়ার জরিমানা হিসাবে একজন করে ফের থাপ্পড় মারার অধিকার ফিরে পায় অর্থাৎ খেলার পরিভাষায় জীবিত হয়ে ওঠে।ওইভাবে একে একে বাকিরাও থাপ্পড় মারার অধিকার হারানোর পর নিস্কৃতি মেলে ' মোরধারীর'। তারপর শুরু হয় নতুন করে নাম নেওয়া এবং 'মোর' নির্ধারণের প্রক্রিয়া।



Text colore টা যদি Black রাখতেন তবে রিডিং এ একটু সুবিধা হতো । নীল লেখায় চোখ জমাতে একটু অসুবিধা হচ্ছিল ।।
ReplyDeleteArgha chatterjee
Vill- Aral
Po-katigram
Dist- Birbhum
Pin-731216
arghachatterjee24@gmail.com