লুপ্তপ্রায় খেলা -- ৩
মাটির দিকে ঝুঁকে থাকা স্বল্প উচ্চতার ঝাঁকড়া গাছের ডালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রামভক্তের মতো ঝুলে কিম্বা পা ঝুলিয়ে বসে রয়েছে একদল কচিকাঁচা। আচমকা তাদেরই মধ্যে একজন ঝুপ করে মাটিতে লাফিয়ে পড়ে ' ঝালোও' বলে চিৎকার করে উঠল।বাকিরাও সঙ্গে সঙ্গে ' ঝাল্লুর-ঝাল্লুর ' বলে চেঁচিয়ে ওঠে। ওই খেলাটিরই প্রচলিত নাম ' ঝুপ- ঝাল্লুর' বাঁ ' ঝাল-ঝাল '। কোথাও কোথাও খেলাটি ' ঝরোল ঝাঁপ ' নামেও পরিচিত।
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের ' বনবাস ' কবিতাতেও ওই খেলার উল্লেখ আছে । কবি লিখেছেন , ' কোথা গাছে ঝুপ-ঝাল্লুর , কোথা বটগাছে ঝুলব ' । নানা কারণে কবি বর্ণিত ওই খেলাটিও আজ অবলুপ্তির পথে।' ঝুপ-ঝাল্লুর ' ছেলেমেয়ে একত্রে কিম্বা আলাদা - আলাদা ভাবেও খেলা চলে।
সাধারণত একটু বেশি বয়স অর্থাৎ গাছে উঠায় পারদর্শী ছেলেমেয়েরাই ওই খেলায় অংশ নিয়ে থাকে।কারণ ওই খেলার অন্যতম শর্তই হলো গাছে ওঠা। ওই খেলার জন্য প্রয়োজন ফাঁকা পরিসরে মাটির দিকে ঝুঁকে থাকা স্বল্প উচ্চতার ঝাঁকালো গাছ।যে গাছের ডাল শক্ত সেই গাছই বাঞ্ছনীয়। সাধারণত আম , জাম , পেয়ারা , নিম গাছই বেশি ব্যবহৃত হয়।তবে ঝুরি বহুল বটগাছও বেছে নেওয়া হয়।তবে তেমন গাছ অভাবে কাছাকাছি ছোট আকারের একাধিক গাছ নিয়েও খেলাটি চলে।
ওই গাছের অদুরেই থাকা চাই আরও একটি ছোট্ট গাছ । সে গাছের প্রজাতির অবশ্য তেমন কোন বাছ-বিচার নেই। জবা , গন্ধরাজ , টগর সহ যে কোন ধরণের গাছ হলেই চলে। খেলার পরিভাষায় ছোট গাছটিকে ' বুড়ি ' বলা হয়। খেলায় অংশগ্রহণকারীর নিদিষ্ট কোন সংখ্যা নেই। তবে গাছের আকার অনুযায়ী নুন্যতম ১০/১২ খেলোয়াড় হলেই খেলা জমে উঠে। অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের মধ্যে থেকে একজনের ' মোর ' নির্ধারণ করা হয়। বিভিন্ন জায়গায় 'মোর' নির্ধারণে বিভিন্ন রকম পদ্ধতি চালু আছে। সব থেকে চালু পদ্ধতিটি হলো পাতা ফুটিয়ে ' মোর' নির্ধারণ করা। এই পদ্ধতিটি অনেকটাই লটারীর মতো। ওই পদ্ধতিতে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়রা সংখ্যা গরিষ্ঠ মতে একজনকে লিডার নির্বাচন করে ' মোর' নির্ধারণের দায়িত্ব দেয়।
সেই লিডার প্রথমে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়ের সংখ্যা অনুযায়ী বা ততোধিক কোন গাছের পাতা সংগ্রহ করে।তারপর আড়ালে গিয়ে সংগৃহিত পাতাগুলির মধ্যে কোন একটিতে ফুটো করে পরপর সাজিয়ে নিয়ে এসে খেলোয়াড়দের সামনে ধরে। খেলোয়াড়রা তা থেকে একটি করে পাতা টেনে নেয়। যার ভাগ্যে ফুটো যুক্ত পাতা পড়ে তারই 'মোর ' ধরা হয়।কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় সমস্ত খেলোয়াড়ের টানা পাতাই নিখুঁত। সেক্ষেত্রে লিডারের জন্যই পড়ে থাকে ছিদ্র -যুক্ত পাতা।তখন তাকেই 'মোর' খাটতে হয়।
' মোর ' খাটা বিষয়টি বেশ শ্রম সাপেক্ষ ব্যাপার । খেলা শুরু হওয়ার আগে 'মোরধারী ' ছাড়া সমস্ত খেলোয়াড় ঝাঁকড়া গাছটিতে চেপে বসে। নিয়ম হলো ' মোরধারীকে ' ছোটগাছটি অর্থাৎ 'বুড়ি' ছুঁয়ে ছুটে আসতে হয় বড় গাছটির নীচে। নীচে থেকে কিম্বা গাছে উঠে কোন একজন খেলোয়াড়কে ছুঁতে পারলে তার ' মোর ' ঘোচে।সে তখন গাছে ওঠার অধিকার লাভ করে এবং যাকে ছোঁওয়া হয় তাকে 'মোর' খাটতে হয়।কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজসাধ্য নয়। কারণ যখন 'মোরধারী ' নিজের 'মোর' ঘোচানোর জন্য কাউকে কোনভাবে ছোঁওয়ার উপক্রম করে তখন কোন একজন খেলোয়াড় গাছের ডাল ধরে ঝুলে মাটিয়ে লাফিয়ে পড়ে ' ঝালোও -- ঝালোও' বলে চেঁচিয়ে ওঠে। বাকি খেলোয়াড়রাও গাছের উপর থেকে তার সুরে সুর মিলিয়ে ' ঝাল্লুর-ঝাল্লুর ' বলে চিৎকার করে ওঠে।
তখন আবার 'মোরধারী'কে ' বুড়ি ' ছুঁয়ে আসার জন্য ছুটে যেতে হয়। সেই ফাঁকে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়া খেলোয়াড়কে দ্রুত গাছে উঠে পড়তে হয়।অন্যথায় সে ওঠার আগেই যদি ' মোরধারী ' 'বুড়ি' ছুঁয়ে গাছের নীচে চলে আসে তাহলে তাকে গাছ কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। নাহলে ' মোরধারী ' ছুঁয়ে দিতে পারলেই তার ' মোর ' অবধারিত। ফের কেউ ' ঝাল ' দেওয়ার পর 'মোরধারী' 'বুড়ি' ছুঁয়ে আসার ফাঁকে সে গাছে উঠার সুযোগ পায়।
এইভাবে নিজের 'মোর ' ছাড়ানোর জন্য ছোটাছুটি করে চোখমুখ লাল হয়ে যায় 'মোরধারীর ' । সে ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে উঠে। তার উপরে ' মোরধারীকে ' আরও নাজেহাল করে গাছের উপরে থাকা খেলোয়াড়দের ' ভাবকি '। ' মোড়ধারী ' যখন বুড়ি ছুঁয়ে কাউকে ছোঁওয়ার ছুটে আসে তখন এক বা একধিক খেলোয়াড় তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে লাফিয়ে ছোঁওয়ার মতো উচ্চতায় পা ঝুলিয়ে প্রলুব্ধ করে।কিন্তু যেই সে লাফিয়ে ছোঁওয়ার উপক্রম করে তখন সেই খোলোয়াড় দ্রুত পা তুলে নেয়।আর ওইভাবে লাফাতে লাফাতে আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে 'মোরধারী'। খেলার পরিভাষায় প্রলুব্ধ করার এই প্রক্রিয়াটিকে ' ভাবকি ' দেখানো বলা হয়। অনেক সময় 'মোর' ছাড়াতে না পেরে ক্লান্ত বিধ্বস্ত 'মোরধারী' আত্মসমর্পণ করে নতুন ভাবে 'মোর ' নির্ধারণের আর্জি জানায়।বাকি খেলোয়াড়দের 'দয়া' হলে সেই আর্জি মঞ্জুর করে। অন্যথায় ' রেগে মেগে ' 'মোর ' নিয়েই ছুটে বাড়ি পালায় 'মোরধারী'। তখন শাস্তি হিসাবে দিনকয়েক আর তাকে খেলা নেয় না বাকি খেলোয়াড়রা।
চর্চার অভাবে ওই খেলাটিও হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়ের মধ্যে গাছে চড়ার সেই সক্ষমতা নেই। হাত - পা ভাঙার আশঙ্কায় বর্তমান কালের বাবা-মায়েরাও ছেলেমেয়েদের গাছে ওঠার কথা শুনলেই আঁতকে উঠেন। গাছের ধারে পাশেও মাড়াতে দেন। সর্বোপরি সেইসব গাছও আর নেই। তাই তো হাল আমলের কবির কলমেও ঝড়ে পড়ে আক্ষেপ --- ''কোথাই হারিয়ে গেল ঝুপ-ঝাল্লুর - কোথাই হারাল বটের ঝুড়ি / কংক্রীটে বন্দী শৈশব -- মানুষ নিয়েছে আজ গাছ লোপাটের ঠিকাদারি ।''



Khub bhalo.ami khelechi.amader samoi name chili khol jhappan
ReplyDelete