আছে শুধু খেলার নষ্টালজিক সুখ
অর্ঘ্য ঘোষ
ওইসব ক্লাব বা প্রতিষ্ঠানে কোথাও কোথাও আজও ফুটবল খেলার চর্চা অব্যাহত রয়েছে।পাশাপাশি রামপুরহাট কোচিং সেন্টার , রামপুরহাট শুভেচ্ছা স্পোর্টিং ক্লাব , মারগ্রাম সোনালি স্পোর্টিং ক্লাব , লোকপাড়া প্রতিবাদ ক্লাব , সিউড়ি ত্রাণ সমিতি , সাঁইথিয়া স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন , আমোদপুর প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন , আমোদপুর স্পোর্টস কমপ্লেক্স , দুবরাজপুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম , দেবেন্দ্রগঞ্জ বয়েজ অ্যান্ড ইয়ুথ ক্লাব , পারুলিয়া তরুণ সংঘ , পুরন্দরপুর কেশরী সংঘের মতো জেলার বেশ কিছু সংস্থা প্রশিক্ষণ কিম্বা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ফুটবল চর্চাকে অব্যাহত রেখেছে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থা , জেলা পুলিশও ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে চলেছে। ফুটবল চর্চাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রাক্তন খেলোয়াড়ও কাজ করে চলেছেন।তারা বিনা পারিশ্রমিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দল তৈরি করছেন। এ জেলার ফুটবল প্রতিযোগিতার ইতিহাসও বেশ গৌরবময়।একসময় সাঁইথিয়ার নন্দিকেশ্বরী শিল্ডে খেলে গিয়েছে কলকাতা , হাওড়া , হুগলি , জামালপুরের মতো বিখ্যাত সব দল। হেতমপুরের রাজাদের পরিচালনায় ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে ইশলিংটন কোরিন্থিয়ানসের মত বিদেশী দলও। দুবরাজপুরের শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম পরিচালিত সত্যানন্দ শীল্ডেও খেলেছে বহু নামীদামী দল।ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া প্রতিবাদ ক্লাব কুণ্ডলা এবং কোটাসুরেও বেশ কিছু ভালো ক্লাবের খেলা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে সিউড়িতে জেলা ক্রীড়া সংস্থার মাঠে অনুষ্ঠিত হয় অনূর্ধ ২১ পঞ্চম জাতীয় জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা।তাতে পশ্চিমবঙ্গ সহ ওড়িশা , পঞ্জাব , মহারাষ্ট্র , তামিলনাড়ু , গোয়া , অন্ধপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্য অংশগ্রহণ করে।জেলার নানা প্রান্তে ফুটবল প্রতিযোগিতা আজও হচ্ছে। কিন্তু সম্ভাবনাময় ফুটবলার তৈরি হচ্ছে না। তার অন্যতম কারণ হলো অনুশীলন এবং প্রশিক্ষণের অভাব। হাতে গোনা কয়েকটি ক্লাব নিজস্ব উদ্যোগে প্রশিক্ষণ এবং অনুশীলনের ব্যবস্থা করলেও অর্থাভাবে ওইসব ক্লাবগুলিতেও নাভিশ্বাস দেখা দিচ্ছে। সরকারি সহায়তার অভাবে বন্ধ হতে বসেছে ফুটবল চর্চা।কয়েক বছর ধরে ক্লাবে প্রথম বছর ২ লক্ষ এবং পরবর্তী ৪ বছর ১ লক্ষ টাকা করে অনুদান বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার।কিন্তু সেই অনুদান ফুটবল প্রশিক্ষণের পিছনে ব্যয় হয় না বললেই চলে।
একদিকে যখন সরকারি সহায়তার অভাবে ফুটবল চর্চায় ভাটা পড়েছে অন্যদিকে তখন বিপুল অর্থ ব্যয় করে ক্রীড়া সংস্থা ফুটবল সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে চলেছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও জনসংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। কিন্তু ওইসব প্রতিযোগিতা যতটা আয়োজক সংস্থার অস্তিত্ব জাহির করে , ক্রীড়াক্ষেত্রকে ততখানি সমৃদ্ধ করতে পারে না।কারণ ব্লক , মহকুমা কিম্বা জেলা স্তরে আয়োজিত ওইসব প্রতিযোগিতায় ইচ্ছা স্বত্ত্বেও অংশ নিতে পারে না প্রত্যন্ত এলাকার বেশিরভাগ ক্লাব কিম্বা ক্রীড়া সংস্থা। কারণ লিগ পর্যায়ের ওইসব খেলাগুলিতে অংশগ্রহণের জন্য দিনের পর দিন ৫০/৬০ কিমি দুরের মাঠে যাওয়া আসা করতে হয়।কিন্তু যাতায়াত
বাবদ কোন খরচ মেলে না।এমন কি ক্রীড়া সংস্থা পরিচালিত খেলাগুলিতে টিফিনের জন্য বরাদ্দ যৎসামান্য টাকাও দেওয়া হয় ফাইন্যাল খেলার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে।সেক্ষেত্রে মাঝপথে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যাওয়া ক্লাব বা ক্রীড়া সংস্থাগুলির পক্ষে ওই টাকা আনতে যাওয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। কারণ টিফিন বাবদ যা টাকা দেওয়া হয় তাতে ভাড়া খরচ করে আনতে যাওয়া কার্যত ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির সামিল হয়।
ওইসব প্রতিযোগিতাগুলির আড়ম্বরে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয় , তার একটা অংশ দিয়ে যদি প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং অনুশীলনের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে আরও সমৃদ্ধ হতে পারে ক্রীড়াক্ষেত্র। প্রতিযোগিতার প্রয়োজন অবশ্যই আছে , কিন্তু তার থেকে বেশি প্রয়োজন প্রশিক্ষণ এবং অনুশীলনের। কারণ প্রতিযোগিতাগুলিতে ' হায়ার ' অর্থাৎ বহিরাগত খেলোয়াড় নিয়ে এসে অস্তিত্ব জাহিরের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।সেক্ষেত্রে স্থানীয় খেলোয়াড়দের বিকাশের বড়ো একটা সুযোগ ঘটে না।অনুশীলন এবং প্রশিক্ষণ থেকেই সম্ভবনাময় খেলোয়াড়ের জন্ম হয়।বর্তমানে যা প্রায় দুলর্ভ হয়ে পড়েছে। সমস্যা রয়েছে মাঠেরও।অধিকাংশ প্রত্যন্ত এলাকায় ফুটবল খেলার মতো উপযুক্ত মাঠই নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতারও অভাব রয়েছে। রাজ্য কিম্বা জাতীয় স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করা বিগত দিনের বহু সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় সুযোগের অভাবে মাঝপথে মাঠ ছেড়ে ক্ষুন্নিবৃত্তির তাগিদে হকারি কিম্বা সাইকেল মিস্ত্রির কাজ করছেন।
পূর্বসূরিদের এহেন দুরবস্থা দেখে খেলাধুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে উত্তরপুরুষ।পাশাপাশি অত্যধিক 'কেরিয়ার' মনস্কতা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলেছে বর্তমান প্রজন্মকে।এখন তাদের দিনের বেশিরভাগ সময়ই বইয়ের ব্যাগ কাঁধে ছোটাছুটি করতে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে। অবসর সময়টুকু তারা কাটিয়ে দিচ্ছে মোবাইল কিম্বা কম্পিউটার গেমে।
( ক্রমশ )
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment