ঠাকরুন মা
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
অর্ঘ্য ঘোষ
তবে মেয়ের বিয়ের আগে পাত্র নিয়ে যে খুঁতখুঁতানি ভাবটা ছিল সেটা কেটে যায়।অয়ন একটু হাবাগোবা ধরণের ঠিকই কিন্তু বাবার মতোই খুব ভদ্র। বাসন্তীর জন্য এর চেয়ে ভালো আর কি'ই বা তারা করতে পারত ? মনে মনে সেই কথা ভেবে স্বান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করে সে। কপালে থাকলে ওই ছেলেতেই সুখী হবে বাসন্তী। তাই ওই নিয়ে আর কোন আক্ষেপ করতে চায় না অন্নপূর্ণা। তাকে গ্রাস করে নেয় অন্য চিন্তা। বিক্রি করতে করতে জমি -- জায়গা প্রায় সব শেষ। থাকার মধ্যে রয়েছে একটি পুকুরের চার আনা অংশ। বাকিটা রয়েছে তিনআনি জমিদারদের। তাই পুকুরটার প্রতি তাদের নজর রয়েছে।তাদের অংশটা কেনার জন্য কতবার গোমস্তাকাকাকে বলেছে , অন্নপূর্ণা কানে তোলে নি। কিন্তু আর তো কানে না তুললে চলবেও না। বারো আনা অংশ তিনআনিদের থাকায় অন্য কেউ সেই পুকুর নিতেও চাইছে না। তাছাড়া পুকুরটা তিনআনিদের দিলে তারা সায়ন্তনকে তাদের মুদিখানায় ডালিদারির কাজটাও দেবে বলেছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ওদেরই পুকুরটা দেওয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় অন্নপূর্ণার।
পুকুর বিক্রি করে যা টাকা পাবে তাতে টেনেটুনে মাস খানেক চলে যাবে। তারপর মাস পূর্ণ হলেই তো সায়ন্তন বেতন পেয়ে যাবে। ওইভাবেই কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে নিতে হবে। সৌরভ চাকরি বাকরি কিছু একটা পেয়ে গেলে আর চিন্তা নেই। সায়ন্তন এবং গোমস্তাকাকাও তার মতেই সায় দেন।কিন্তু তিনআনির বাবুরা পুকুরের দামটা খুবই কম বলছেন , কার্যত সুযোগ বুঝে হাতিয়ে নিতে চাইছেন। তা নিয়ে কিছুটা দোটানায় পড়ে অন্নপূর্ণা। গোমস্তাকাকা তাকে বোঝান , ওদের দেওয়া ছাড়া তো আর কোন গতি নেই মা। ওদের দাপটের মাঝে কে কিনতে আসবে ওই পুকুর ? এমনিতেই ওরা বলে বেড়াচ্ছে কে কিনছে , কিনুক তো দেখি। ওই কেনাই হবে। মাছ খেতে কোনদিনই পাবে না। সব ছেঁকে ধরে নেব। তাই কারও কারও কেনার ইচ্ছা থাকলে ওই হুমকির ভয়ে পুকুর কিনতে কেউ আর এগিয়ে আসছে না।
---- তাহলে উপায় কি কাকা ?
---- তিনআনিরা যা ফাঁদ পেতেছে তাতে পুকুর ওদেরকেই দেওয়া ছাড়া উপায় নেই মা। দাম হয়তো অনেক কম দিচ্ছে , কিন্তু দোকানের কাজটাও তো পাওয়া যাচ্ছে। এই বাজারে একটা স্থায়ী আয়ের সংস্থান তো কম নয়।
গোমস্তাকাকার কথাতে সায় দেয় সায়ন্তনও। তিনআনিরা ওদের দোকানে কাজ করার জন্য দিনে দুবার খাওয়া সহ মাসে একশো টাকা করে বেতন দেবে বলেছে। অন্নপূর্ণা হিসাব করে দেখেছে টিপে টিপে খরচ করলে ওই টাকাতে কোন রকমে সংসারটা চলে যাবে। হিসাব করে চলার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে সে মেয়েদের স্কুল ছাড়িয়ে দেয়। তার মধ্য ছোট মেয়েটার পড়াতে একটু মাথা ছিল। স্কুল ছাড়িয়ে দেওয়ায় সে খুব কান্নাকাটি করে। অন্নপূর্ণা বলে , খুব হয়েছে, আর লেখাপড়া করে কাজ নেই। ছাগল-ভেঁড়া ক'টা চড়ালে কাজ দেবে। মুখে ওই কথা বলেছিল বটে , কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার খুব কষ্ট হয়। মেয়ে পড়তে চাইছে অথচ সে তাকে স্কুল ছাড়িয়ে ছাগল- ভেড়া চড়াতে বলছে। মা হয়ে অক্ষমতার জ্বালাটা তাই হজম করা খুব কষ্টকর হয়। তারপর থেকেই মেয়েরা ছাগল -- ভেড়া চড়িয়ে বেড়ায়। কখনও ঘাস কেটে কখনও বা জ্বালানী কুড়িয়ে আনে। বাগানে বাগানে ফল-মাকড়ও কুড়িয়ে বেড়ায়।
তা দিয়েই এক আধটা দিন চলে যায় তাদের। মেয়েদের দেখে নিজের মেয়েবেলার কথা মনে পড়ে যায় তার। তাদেরও তো অভাবের সংসার ছিল।তারাও ওইভাবে আম-জাম- তাল কুড়িয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু তাদের নিয়ে কোন কথা হত না। কারণ তাদের ছিল একটাই পরিচয়। সেটা হলো গরীব। গরীবের ছেলেমেয়েরা তাল, আম, জাম কুড়িয়ে বেড়াবে না তো কারা বেড়াবে ? কষ্ট করে কুড়ানো ওইসব ফল সব সময় গরীবের ছেলেরা খেতেও পায় না। একবাটি মুড়ি কিম্বা একথালা ভাতের বিনিময়ে বড়োলোকেরা তা হাতিয়ে নেয়। সাপ খোপের ভয় , ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে , রাতের অন্ধকারে নিজেদের কুড়ানো ফল খাওয়ার লোভ জয় করে তুলে দিত অন্যের হাতে। ছেলেমেয়েদের মধ্যেই নিজের সেই মেয়েবেলাটার সাদৃশ্য খুঁজে পায় অন্নপূর্ণা। কিন্তু তার ছেলেমেয়েদের পরিচয় শুধু গরীরই তো নয় , তারা যে জমিদারবাড়ির সন্তান। পাঁচজনে পাঁচকথা বলার সুযোগ ছাড়ে না।
সবই কানে আসে তার। কেউ কেউ তো তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই বলে , ভোররাতে সোমত্ত মেয়েদের তাল কুড়াতে পাঠানো না অন্য কিছু , কে জানে বাবা! লজ্জাও করে না।ইঙ্গিতটা বুঝতে পারে অন্নপূর্ণাও , তাই মেয়েদের পায়ে সে একরকম বেড়িই পড়িয়ে দেয়। কেবল ছেলে দুটো বারণ শোনে না। কিন্তু একটা ঘটনার পর থেকে ছেলেদেরও আর যেতে দেয় না। দিনটার কথা আজও ভোলে নি সে। সেদিন ভোরে তাল কুড়াতে গিয়ে একটা নারকেলও কুড়িয়ে পেয়েছিল গৌরব। অমুল্য ধন পাওয়ার আনন্দে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু তিনআনির ছোটকর্তা দূর্গাপদ নারকেলটা কেড়ে নিয়ে ঠেঁসে কান মুলে দেয় তার।
শুধু তাই নয় , বলেছিল হারামজাদা ছেলে নারকেল চুরি করেছিস ? ফের যদি বাগানে দেখি মেরে ঠাং ভেঙে দেব।গৌরব অবশ্য এক ফোঁটাও কাঁদে নি সেদিন। বাড়ি এসে বলেছিল , জানো মা আজ না তালের সঙ্গে একটা নারকেলও কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নারকেল দিয়ে তালবড়া করে সবাই মজা করে খাব। কিন্তু ছোটবাবুটা হাত মুচড়ে কেড়ে নিল। আবার বলল এবার ওদের বাগানে গেলে ঠাং ভেঙে দেবে। ওদের তো কত নারকেল। ওই নারকেলটা কেড়ে না নিলে আমরা কেমন খেতে পারতাম বলো ? লাঞ্ছিত হয়ে ছেলে কাঁদে নি , কেঁদে ফেলেছিল অন্নপূর্ণা নিজে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল , দেখিস একদিন আমরা নারকেল কোঁড়া দিয়েই
তালবড়া করব। কিন্তু আমার মাথার দিব্যি রইল তোরা আর ওদের বাগানে যাবি না।অন্নপূর্ণা সেদিন ভয় পেয়েছিল সত্যিই যদি তেমন কিছু হয়। যা মারহাট্টা ওদের বাড়ির ছোটছেলেটা। সেই তিনআনিদের দোকানে তাই সায়ন্তনের কাজ করা নিয়ে কিছুটা দোটানা ছিল অন্নপূর্ণার। যদি সায়ন্তনকে তেমন কিছু করে বসে ওরা ? কিন্তু সব শুনে গোমস্তাকাকা বলেন , কবে কি বলেছে তা নিয়ে এত ভাবছো কেন মা ? বেকায়দায় পড়লে মানুষকে বেঁচেবর্তে থাকার জন্য কত কিছু করতে হয়। তাছাড়া এত ক'টা মুখে অন্ন যোগাবে কি করে ? আমাকে ওই কাজে নিলে কি আর দাদাঠাকুরকে আমি ডালিদারি করতে যেতে দিতাম মা ? আমিই ওই কাজ করতাম।
সায়ন্তনও বলে , তাছাড়া আমি তো চুরি করছি না। কাজ করব , মাইনে নেব। আর খুব বেশিদিন ওই কাজও আমাকে করতে হবেনা। বড়খোঁকা একটা চাকরি বাকরি পেলেই কাজ ছেড়ে দেব।
অগত্যা ঘাড় পাততে হয় অন্নপূর্ণাকে। সে স্বামীকে বলে , তবে তুমি কথা দাও, অপমানিত হলে তুমি আর ওই কাজ করবে না। আমি বরং লোকের বাড়ি মুড়ি ভেজে, ধান সিদ্ধ করে সংসার চালাব। ওই কাজ আমার জানা আছ। ---- আর তাতে বুঝি আমার খুব সম্মান বাড়বে। লোকে বলবে এতদিন বাবার ঘাড়ে বসে খেয়েছে। এবার বৌয়ের ঘাড়ে চেপেছে। সায়ন্তনের কথাতে সায় দেন গোমস্তাকাকাও। অন্নপূর্ণার আর কোন ওজর আপত্তি ধোপে টেকে না। ছেলেমেয়েগুলো অন্তত খেয়ে পড়ে বাঁচবে ভেবে অন্নপূর্ণা আর কিছু বলে না। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। দুমাসের মাথায় তার প্রমাণ পায় অন্নপূর্ণা।শেষ পর্যন্ত তিনশো টাকায় পুকুরের অংশটা তিনআনিদেরই বিক্রি করে দেয় অন্নপূর্ণা। বিনিময় ওরা সায়ন্তনকে মুদিখানায় চাকরিটাও দেয়। প্রথম মাসটা পুকুর বিক্রি আর সায়ন্তনের বেতনের টাকায় কোন রকমে চলে যায়। আরও কিছুদিন চলত। কিন্তু তিনআনিদের জন্যই সেটা সম্ভব হয়নি। সায়ন্তনের বেতনের টাকাটা ওরা নগদে দেয় নি। দোকানের চাল - ডাল দিয়ে শোধ করেছে। তার উপরে বাজার চলতি দামের চেয়ে অনেক বেশী দাম ধরে নেওয়া হয়েছে ওইসব জিনিসপত্রের। অন্নপূর্ণা হিসাব করে দেখেছে ৭৫ টাকার জিনিসপত্র দিয়েই একমাসের বেতন শোধ করেছে ওরা।
তবু মুখ বুজে সব সহ্য করে নেয় সে। তাছাড়া উপায়ও তো কিছু নেই। তাদের যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। তাই সব জেনে বুঝেও মেনে নিতে হয় তিনআনিদের শোষণ। কিন্তু দু'মাসের মাথায় আসল স্বরূপ প্রকাশ পায় ওদের। তার আশঙ্কাই সত্যি হয়। ততদিনে পুকুরটা রেজিস্টারি করে নিয়েছে ওরা। তারপর মাস পূর্ণ হওয়া স্বত্ত্বেও বার বার তাগাদা দিয়েও নগদ টাকা কিম্বা চাল ডাল কিছুই মেলে না। বেশি তাগাদা দিলে মারমুখী হয়ে ওঠে তারা। ঘরে তীব্র অভাব। কাজ করেও বেতন না পেয়ে মেজাজ গরম হয়ে যায় সায়ন্তনের। কড়া করে দু'কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ে না সে। আর যাই কোথায় ? সেখানে তখন হাজির ছিল ওদের মারকুটে ছোটছেলেটা। সে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে সায়ন্তনের উপর। বাকিরাও তখন থেমে থাকে না। সবাই মিলে বেধড়ক মারধোর করে চোর অপবাদ দিয়ে দোকান থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেয় সায়ন্তনকে। ছোটছেলেটা শাসায় , শালা হারামজাদা , চুরি করে আবার বেতন চাইছে। মেরে মুখ ভেঙে দেব। চুপচাপ বাড়ি চলে যা। নাহলে পুলিশের হাতে তুলে দেব , তখন সারাজীবন ঘানি টানবি।
রাগে অপমানে লজ্জায় মাথা নীচু করে বাড়ি ফিরে আসে সায়ন্তন। আর তাকে দেখে সিউড়ে ওঠে অন্নপূর্ণা । সারা গায়ে কালশিটে , বিভিন্ন জায়গায় রক্ত ঝড়ছে। পশু নাহলে , মানুষ হয়ে কি কেউ মানুষকে এমনভাবে মারতে পারে ? বেতন দেওয়ার ইচ্ছে না থাকলে বলে দিলেই তো হত , চোর অপবাদ দিয়ে এভাবে মারার কি দরকার ছিল ? এই আশঙ্কাটাই তো সে এতদিন করেছিল। তা যে এত তাড়াতাড়ি সত্যি হয়ে যাবে তা ভাবতে পারে নি। ঘরে এক ফোঁটা ওষুধও নেই। গাঁদার পাতা থেঁতলে স্বামীর ক্ষতস্থানগুলোতে লাগাতে লাগাতে কখন যে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে তা বুঝতে পারে নি অন্নপূর্ণা। খেয়াল হয় স্বামীকেও ফুঁপিয়ে উঠতে শুনে। কান্না বড়ো সংক্রামক। কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ছেলেমেয়েরা। বাবার ওই অবস্থা দেখে তাদের চোখও ঠল ঠল করে ওঠে। তাই কান্না থামিয়ে স্বামীকে স্বান্ত্বনা দেয় সে। খবর পেয়ে ছুটে আসেন গোমস্তাকাকা। তিনিও সায়ন্তনকে দেখে কেঁদে ফেলেন। তার গলায় ঝড়ে পড়ে আক্ষেপ ---চরম বোকা বনে গেলাম মা। এতদিন জমিদারি সেরেস্তায় কাজ করেও ওদের চালাকিটা ধরতে পারলাম না। পুকুরের অংশটা আধা দামে হাতানোর জন্যই ওরা যে এভাবে চাকরি দেওয়ার নাটক করবে আমি ভাবতেও পারি নি মা। দেখো ভগবান ওদের ভালো করবে না।
---- ভগবানের প্রতি আর আমার ভরসা নেই কাকা।
---- কিন্তু মা , দুর্বল আর গরীব মানুষের তো ভগবান ছাড়া গতিও নেই।
ওই ঘটনার পর খুবই মুসড়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। বাড়িতে কানাকড়িও আর সম্বল নেই। ঘটিবাটিটুকু পর্যন্ত বিকিয়ে গিয়েছে। কি করে যে ছেলেমেয়েগুলোর মুখে দুবেলা দুটো খাবার তুলে দেবে তাই ভেবে দিশাহারা হয়ে পড়ে সে। থাকার মধ্যে আছে কয়েকটা ছাগল - ভেঁড়া। তাই বিক্রি করে কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে চলছে সংসার। কিন্তু সে আর ক'দিন, তারপর কি হবে তা ভেবে কোন কুল কিনারা পায় না অন্নপূর্ণা। সায়ন্তন সমানে বিভিন্ন জায়গায় ছোটখাটো যেকোন ধরনের কাজের চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু কোথাও কোন সুবিধা করতে পারছে না। তিনআনিরা যে হাতে -- ভাতে দুদিক থেকেই মেরে ফেলেছে। তারা চোর অপবাদ দিয়ে দাগিয়ে দেওয়ায় সায়ন্তন যেখানেই যায় সেখানেই তাকে
শুনতে হয় , আরে তুমিই তো চুরি করে ধরা পড়েছিলে না ? আবার চুরির মতলবে কাজ খুঁজতে এসেছো। যাও এখান থেকে। সায়ন্তন যত তাদের আসল ঘটনাটা খুলে বলতে যায় তত তারা মারমুখী হয়ে ওঠে। কেউ তার কথা কানে তুলতেই চায় না। জগতের এই হলো নিয়ম। একবার কাউকে অপরাধী হিসাবে দাগিয়ে দিলেই হলো। কেউ আর সত্যি মিথ্যা খতিয়েও দেখে না। এমন কি গণপ্রহারে অংশ নেওয়া মানুষজন অনেক সময় খোঁজও নেন না যাকে মারা হচ্ছে তার অপরাধটা আসলে কি। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কোন পথচারী হয়তো হঠাৎ দেখলেন হাত পা বেঁধে কাউকে মারা হচ্ছে , অমনি তার হাত নিশপিশ করে ওঠে। বাঁধা মানুষকে মারার এমন সুযোগ অনেকেই হাতছাড়া করতে চান না।
ঘা কতক লাগিয়ে দিয়ে নিরাসক্তের মতো বাজার করতে চলে যান। আসলে বাঁধা অবস্থায় মানুষকে মেরে মানুষ বোধহয় পৌরুষ জাহিরের পৌশাচিক উল্লাস খুঁজে পায়। কিছুদিনের মধ্যেই সায়ন্তনের জীবনেও সেটাই অমোঘ সত্য হয়ে দেখা দেয়। তিনআনিরা চোর হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার পর কোথাও কোন কাজ তো জোটেই নি , উল্টে বিপত্তি দেখা দেয় তার জীবনে। কোথাও বাগানের কলার কাঁদি , মাঠের আদা, দরমার মুরগি কিম্বা কলতলায় পড়ে থাকা এঁটো বাসন চুরি হলেই সবাই বলতে শুরু করে , এ নিশ্চয় ব্যাটা সায়ন্তনের কাজ। শালা সারাদিন কিছু কাজ করবে না, বসে বসে খাবে আর কোথাই কি আছে দেখে বেড়াবে।
ধরে নিয়ে আয় ব্যাটাকে। তারপর থেকে যেখানেই যা চুরি হয় প্রথম সন্দেহটা গিয়ে পড়ে সায়ন্তনের উপরে। দল বেধে এসে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় তাকে। কতবার ওদের হাতে পায়ে ধরে আটকানোর চেষ্টা করেছে অন্নপূর্ণা। কোন লাভ হয়নি। তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়েছে সায়ন্তনকে। বাবা-- মায়ের ওই অবস্থা দেখে ছেলেমেয়েরা চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে। ভাসুর - জা, পাড়া -প্রতিবেশীরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখেছে। কিন্তু কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় নি। বরং দূর থেকে মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছে , যেমন কর্ম তেমনি ফল। বসে বসে খেলে মাঝে মধ্যে ওই রকম মারও তো খেতেই হবে বাবা। অন্নপূর্ণা ভাবে, ওরা কি একবার খোঁজ নিয়ে দেখেছে কেন সায়ন্তনকে বসে থাকতে হয়, আর বসে বসে তারা কি খায় ? এই বিপদের দিনে একে একে সবাই তাদের পাশে থেকে সরে যায়। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য চোরের দায়ে ধরা পড়ার আশঙ্কায় অনেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। আত্মীয় স্বজনরাও মুখ ঘুরিয়ে নেয়। লজ্জায় অন্নপূর্ণাও কাউকে মুখ দেখাতে পারে না। সমাজে তারা একঘরে হয়ে পড়ে। বাদ যায় না ছোট ছেলেমেয়েগুলোও। তাদের দেখেই সমবয়সী ছেলেমেয়েরা মুখে মুখে ছড়া কাটে। লজ্জায় অপমানে মুখ চোখ লাল হয়ে যায় ছেলেমেয়েদের। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তাই তারা বাড়ি থেকে বেরোনোই বন্ধ করে দেয়। ছেলেমেয়েদের নিয়ে গৃহবন্দীর মতো দিন কাটে অসহায় অন্নপূর্ণার।
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment