ঠাকরুন মা
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
এই দুর্দিনে থাকার মধ্যে পাশে রয়েছেন একমাত্র গোমস্তাকাকা। সায়ন্তনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পেলেই ছুটে আসেন তিনি। তারপর ছুটে যান যারা ধরে নিয়ে গিয়েছেন তাদের কাছেও। হাতে পায়ে ধরে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করেন সায়ন্তনকে। ততক্ষণে মেরে হাতের সুখ করে নেওয়ার পর অনেকে বোঝেন সায়ন্তনকে ধরে আনাটা ভুল হয়ে গিয়েছে , তারা তখন গোমস্তাকাকার কথা শুনে সায়ন্তনকে ছেড়ে দেয়। আবার মারধোর করার পরেও যাদের আশ মেটে না তারা তুলে দেয় পুলিশের হাতে। আবার থানায় পুলিশ একপ্রস্ত পেটায়। তারপর চুরি ছিনতাইয়ের কেস দিয়ে কোর্টে চালান দেয়। কোর্ট থেকে গোমস্তাকাকা যখন জামিন করিয়ে নিয়ে ফেরে তখন আর মানুষটার দিকে তাকানো যায় না। মারের চোটে শরীরের বিভিন্ন জায়গা ফুলে ঢোল হয়ে থাকে। ভাল করে হাঁটতেও পারে না। স্বামীর কষ্ট আর দেখতে পারে না অন্নপূর্ণা। ছেলেকে পাঠিয়ে ওষুধ আনায়। ওষুধ লাগিয়ে দিতে দিতে চোখ জল চলে আসে তার। সে ভেবে পায় না , কেন মানুষটাকে এভাবে বিনা দোষে শাস্তি পেতে হচ্ছে। শুধু এক-দুবার নয় , দিনের পর দিন একই ভাবে মার খেলে লোকটা তো মরে যাবে। সবদিন পেট ভরে খাওয়াও জোটে না , তার উপরে ওই মার হজম করা সহজ কথা নয়। খাবার জুটবেই বা কি করে ? পোষা হাঁস -- মুরগি , ছাগল --ভেড়া বিক্রি করে কোন রকমে যদিও বা শাকভাত জুটছিল, সেটাও বন্ধ হওয়ার মুখে।
চোর সন্দেহে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধোরের পর অনেকেই তুলে দিচ্ছে পুলিশের হাতে। আর ছাগল-- ভেড়া বিক্রি করেই তাকে ছাড়িয়ে আনতে হচ্ছে। শুধু নতুন কেসই নয় , পুরনো কেসগুলিতেও নির্ধারিত দিনে কোর্টে হাজিরা দিতে হয়। তারও খরচ আছে। যারা সায়ন্তনকে মিথ্যা অভিযোগে জেলে পাঠাচ্ছে তারা কেমন করে বুঝবে একবার মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো মানে তার ছোটছোট ছেলেমেয়েদের কয়েকদিনের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া।
এইভাবে বার বার সন্দেহের বশে মার খেতে খেতে আর মিথ্যা অভিযোগে জেল খাটতে খাটতে সায়ন্তন কেমন যেন বদলে যেতে থাকে। নরম মনের লোকটার চোখে মুখে কেমন যেন মরীয়া ভাবফুটে ওঠে। সব সময় কি যেন একটা চিন্তায় থাকে সে। ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পড়লে একদিন রাতে সে সায়ন্তনকে চেপে ধরে ---- তোমার কি হয়েছে বলো তো ? কয়েকদিন ধরেই দেখছি তুমি কেমন যেন হয়ে গিয়েছ। তোমার ভাবগতিক আমার ভালো লাগছে না।
----- আমি একটা কথা কয়েকদিন ধরেই ভাবছি। তোমাকে বলব বলবও ভাবছিলাম।
----- কি কথা ?
----- ভাবছি চুরি করাই ধরবো।
----- মানে , কি বলছো তুমি ?
----- দেখ আমাদের তো দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। এবার তো সবাইকে অনাহারে মরতে হবে।
----- তা বলে তুমি চুরি করবে ?
---- সৎভাবে কাজ করার চেষ্টা করে তো অনেক দেখলাম। কিন্তু চোর অপবাদ আমাকে সেই সুযোগ দিল না।
----- ভিক্ষা করে খাবো তাও ভালো। কিন্তু ওই চিন্তা তুমি ছাড়ো।
----- তাতেও কিছু লাভ হবে না। একবার যখন চোর হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন যেখানেই কিছু চুরি হবে লোকে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। মারধোর করে পুলিশের হাতে তুলে দেবে। আর আমাকে ছাড়াতে গিয়ে তুমি ফতুর হয়ে যাবে।
----- তবুও তুমি আর একবার ভাবো। তুমি চোর হবে মানতে পারছি না।
------ ভাবাভাবির কিছু নেই। মানতে না পারারও কিছু নেই। চুরি না করেই যখন মার খেতে হচ্ছে , জেলে যেতে হচ্ছে আর অনাহারে থাকতে হচ্ছে তখন চুরি করেই মার খাওয়া , জেলে যাওয়া ভালো। তাহলে অন্তত ছেলেমেয়েগুলোকে অনাহারে থাকতে হবে না।
---- তাহলেও এই যুক্তি তোমার আমি মানতে পারছি না। এতদিন তোমাকে চোর অপবাদে মার খেয়ে জেল খাটতে হলেও নিজের মনের কাছে তো স্বচ্ছ ছিলাম। মনে মনে একটা সান্ত্বনা খুঁজে পেতাম, যাই হোক তুমি তো চুরি করো নি। কিন্তু সত্যি সত্যি চুরি করলে যে সেই সান্ত্বনাটা আর থাকবে না।
----- তোমার এই সততার দাম কি আছে বলো তো ? কেউ কানাকড়ি মুল্য দেয় ? কেউ কি ভেবে দেখে এই লোকটা চুরি করতে পারে কিনা ? তুমি কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবে যে আমি সত্যি চোর নই ? বরং লোকে উল্টোটাই ভাববে। তারা তো বলাবলিই করে , চুরি নিশ্চয় করেছে না হলে এত লোক থাকতে সবাই ওকেই বা বারবার ধরে নিয়ে যাবে কেন ?
---- কে কি বলল তাতে কি এসে যায় , নিজের মন যেটা বলে সেটাই তো আসল।
---- এই কথাটা তোমার আমি মানতে পারলাম ঠাকরুন। আমিও কয়েকদিন ধরে মনের সঙ্গে অহরহ যুদ্ধ করে চলেছি। কিন্তু কোন স্থিরতা পাচ্ছি না।
-- ঠাকরুন ! এতদিন অন্যরা ঠাকুরুনমা বলে সম্বোধন করলেও সায়ন্তন এই প্রথম তাকে ঠাকরুন বলল। যখন জমিদারবাড়ির রমরমা ছিল তখন ওই সম্বোধনটাই সমীহ আদায় করে নিত। আজ নিতান্তই হাস্যকর মনে হয় তার। আপত্তি করেও লাভ হয়নি। কিছু মানুষ তাকে ওই সম্বোধনই করে। আজ সায়ন্তনও করল। যুক্তি -- পাল্টা যুক্তিতে কখন রাত ভোর হয়ে যায় টের পায় না কেউ। অন্নপূর্ণা টের পায় সায়ন্তনের চোখে মুখে টানাপোড়নের স্পষ্ট ছাপ। টানাপোড়ন কম হয় না অন্নপূর্ণারও। সায়ন্তনের যুক্তিগুলো পুরোপুরি সে উড়িয়ে দিতেও পারে না। সত্যিই তো একটা মানুষ আর কত সহ্য করবে। কিন্তু নিজের স্বামীকে একটা সত্যিকারের চোর ভাবতেও তার কষ্ট হয়। একসময় ঘুমিয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা।
সকালে উঠে সায়ন্তনকে চা দিতে গিয়ে দেখে তার চোখে মুখে আর টানাপোড়নের চিহ্ন মাত্র নেই। তাহলে সায়ন্তন তার যুক্তিই মেনে নিল শেষ পর্যন্ত। কথাটা ভাবতে খুব ভালো লাগে তার। কিন্তু কয়েকদিন পর তার ভুল ভেঙে যায়। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই তুমুল বৃষ্টি আর নিকশ কালো অন্ধকার। এক হাত দুরের মানুষকেও দেখা যায় না । বাড়িতে সেদিন এক ছটাকও চাল-ডাল নেই। কিছু কেনার মতো পয়সাও নেই। থাকার মধ্যে রয়েছে সামান্য কিছুটা আটা আর ভেলিগুড়। গুড় আর আটা গোলা খেয়েই সকাল সকাল শুয়ে পড়ে সবাই। কাল সকালে ছেলেমেয়েগুলোর মুখে কি তুলে দেবে ভেবে ঘুম আসছিল না অন্নপূর্ণার। সায়ন্তনও তা আঁচ করে ঘুমোয় নি দীর্ঘক্ষণ। বাইরে তখন প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা। একই ঝড় বইছে দুজনের মনেও। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় এক
সময় গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে অন্নপূর্ণা। মাঝরাতে ঘুমে ভেঙে দেখে স্বামী পাশে নেই। সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে আসে সে। দেখে কেউ কোথাও নেই। ঘরের সদর দরজা বাইরে থেকে আটকানো। গেল কোথাই মানুষটা ? মনে একটা কু ডাকে। তবে কি --- ! দুশ্চিন্তায় আর দুচোখের পাতা এক করতে পারে না সে। দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঠায় বসে থাকে।
অনেকক্ষণ পর একটা বস্তা কাঁধে সায়ন্তন ফেরে। অন্নপূর্ণা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ঠোটে আঙুল ছুঁইয়ে তাকে চুপ করিয়ে দেয় সায়ন্তন। অন্নপূর্ণা তখনই বুঝে যায় সে যা আশংকা করেছিল তাই ঘটেছে। বস্তা খুলে সায়ন্তন এক কাঁদি কলা বের করে। তা দেখে অন্নপূর্ণা খুব চুপি স্বরে বলে, তুমি শেষপর্যন্ত সেই চুরিই করলে ?
তার চেয়েও নিচু স্বরে সায়ন্তন বলে, চুরি না করলে ছেলেমেয়েগুলোর মুখে কি তুলে দেবে সকালে ?
---- তাবলে চুরির টাকায় ওদের খাওয়াতে হবে ? সে যে বড়ো ঘেন্নার ব্যাপার হবে।
---- দেখ, চুরি না করেও আমরা সবার ঘৃনার পাত্র। আমাদের মতো মানুষের ঘেন্না বলে কিছু থাকতে আছে বলো ?
----- কিন্তু কাজটা তুমি একদম ভালো করো নি। যাদের কলা তারা যদি সব জেনে যায় ? তার চেয়ে বরং কলাবাগানেই কাঁদিটা ফেলে দিয়ে এসো।
---- তিনআনিদের বাগান থেকেই কেটে এনেছি কাঁদিটা। শালারা চুরি না করেও আমাকে চোর সাজিয়েছিল। আজ চুরি করে শোধ নিলাম।
স্বামীর কথাটা শুনেই আঁতকে ওঠে অন্নপূর্ণা। বলে, এ তুমি কি করেছো ? ওদের চেন না , কি নিষ্ঠুর লোক ওরা ? জানতে পারলে রক্ষা থাকবে ? তার চেয়ে বরং ওদের কলাবাগানেই ফেলে দিয়ে এসো কাঁদিটা।
---- মাথা খারাপ ? ভোর হয়ে আসছে। যখন কলা কেটে এনেছি তখন কেউ দেখেনি , এখন ফেলে আসতে গিয়ে যদি কারো চোখে পড়ে যায় , কি হবে ভেবেছো একবার ? তাছাড়া ফেলে এলেও তো সকালে সেই চোরের দায়ে আমাকেই ধরবে।
কথাটা উড়িয়ে দিতে পারে না অন্নপূর্ণাও। উভয় সংকটে তার মাথা না ভালো কাজ করে না। তাই সায়ন্তকেই জিজ্ঞাসা করে , তাহলে উপায় ? ওরা যদি বাড়িতে খুঁজতে চলে আসে ?
---- তুমি কিছু চিন্তা কোর না তো , ভোর ভোর ষাটপলশা হাটে কলার কাঁদিটা বিক্রি করে ছেলেমেয়েদের জন্য খাবার কিনে আনব।
ছেলেমেয়েদের খাবার আনার জন্য নয় , চুরির আপদ বিদায় করতে অন্ধকার থাকতেই স্বামীকে হাটের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেয় অন্নপূর্ণা। আর স্বামী বেড়িয়ে যেতেই সে দূর্গানাম জপ শুরু করে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমুল হই ইট্টগোল কানে আসে তার। দরজা খুলে বেরোতেই তিনআনিদের হাঁক -ডাক কানে আসে। ছোট ছেলেটার গলাই বেশি শোনা যায় , জানতামই এ সানা শালারই কাজ। তাই তক্কে তক্কে ছিলাম।শালার পাপ আজ পরিপূর্ণ হয়েছে বলেই বমাল সহ ধরা পড়েছে। দড়ি দিয়ে নারকেল গাছে বাঁধ হারামজাদাকে। আজ ভালো করে কলা খাইয়ে দিচ্ছি ওকে।আর শুনতে পারে না সে। মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে তার। বুঝতে বাকি থাকে না সর্বনাশ যা
হওয়ার তা হয়েই গিয়েছে।
---- ঠাকুর এ তুমি কি করলে। আর যে কোথাও মুখ দেখানোর জো রইল না। তার উপরে এই খবর যদি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছোয় তাহলে হয়তো আর কোন সম্পর্কই রাখবে না ওরা। লোকটাকেও ওরা সহজে ছাড়বে না। কাল থেকে পেটে কিছু নেই। মার খেতে খেতে মরে যাবে না তো লোকটা ? কেউ তো আর বিশ্বাসই করবে না , এতদিন ওকে সন্দেহের বশে ধরে নিয়ে যাওয়া হত , এই ওর প্রথম চুরি। বরং সবাই উল্টোটাই ভাববে। ভেবে কিছু কুল কিনারা পায় না অন্নপূর্ণা। সেদিন সবার অভুক্ত অবস্থায় কাটে। ছেলেমেয়েদের বাড়ি থেকে বেরোতে দেয় না সে। খবর পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। তিনআনিদের হাতে পায়ে ধরে সায়ন্তনকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ওরা সাফ জানিয়ে দেয় , সায়ন্তনকে পুলিশের হাতেই তুলে দেবে। সেই মতো দিনভর নির্মম ভাবে মারধোরের পর সায়ন্তনকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় ওরা। মাস খানেক পর জামিনে ছাড়া পেয়ে ফিরে আসে সায়ন্তন। কিন্তু সে এক সম্পুর্ণ অন্য মানুষ। বড্ড জেদী আর একরোখা হয়ে ওঠে সে জেলের ভিতরে। অল্পদিনেই চুরি করাটা তার নেশা হয়ে দাঁড়ায়। যেদিন যেখানে যা পায় তাই চুরি করে আনে। অন্নপূর্ণার শাসন- বারণ কিছুই মানে না। স্বামীর চুরির রোজগারের খাবার গলা দিয়ে নামতে চাই না তার। কিন্তু ছেলেমেয়েদের মুখ চেয়ে খেতেও হয়। না হলে ওদের মনে হাজারটা প্রশ্ন দেখা দেবে।
চোখের সামনেই মানুষটাকে পুরোপুরি চোর হয়ে উঠতে দেখে খুব খারাপ লাগে তার। কিন্তু মনে মনে ভাবে, এজন্য তো সমাজই দায়ি। একটা ভালো মানুষকে ভালোভাবে সমাজই তো বাঁচতে দিল না। সায়ন্তন তো চেষ্টার কোন ত্রুটি করে নি। এখন রাত্রি হলেই চুরি করতে বেড়িয়ে যায় সে। যেখানে যা পায় নিয়ে ফেরে। কোথাও কোথাও ধরা পড়ে মার খেয়ে জেলেও যায়। ফিরে এসে আবার শুরু করে। লজ্জায় আর কোথাও মুখ দেখাতে পারে না অন্নপূর্ণা। সব থেকে খারাপ লাগে বাপের বাড়ি আর মেয়ের বাড়ির কথা ভেবে। এরই মধ্যে দুদিন দু'জায়গায় চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে সায়ন্তন। সেই থেকে মেয়ে আর অন্নপূর্ণার বাপের বাড়ির লোকেরা সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছে। এখন লোকে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের বাড়িটাকে দেখিয়ে দেখিয়ে চোরের বাড়ি বলে।ছেলেমেয়েরদের সামনে সেই কথা শুনে মরমে মরে যায় অন্নপূর্ণা।
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment