ঠাকরুন মা
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
অর্ঘ্য ঘোষ
সেদিন মামলার রায় বেরোনোর কথা। সকাল থেকেই সারা বাড়িতে চাপা উত্তেজনা।শাশুড়িমা ঠাকুরঘরে পুজোয় ব্যস্ত। শ্বশুরমশাই ইজিচেয়ারে আধশোয়া। তার চোখেমুখেদুঃচিন্তার ছাপ। গোমস্তাকাকা কলকাতায় আছেন। রায়ের খবর নিয়ে ফিরবেন। বাড়িতেসেদিন কার্যত নাওয়া খাওয়া বন্ধ। সবাই গোমস্তাকাকার ফেরার জন্য প্রতীক্ষায়
রয়েছেন। অন্নপূর্ণা তারই মাঝে ছেলেমেয়েগুলোকে কোন রকমে স্নান করিয়ে খাইয়ে ঘুমপাড়িয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে শুধুই ঠাকুরকে ডেকে চলেছে সে। দুপুরের দিকেগোমস্তাকাকা ফেরেন। তার মুখ দেখেই আর কারও বুঝতে বাকি থাকে না রায় কি হয়েছে ?সবাই কেমন অদ্ভুত রকম চুপচাপ হয়ে যায়। কেবল শ্বশুরমশাই গোমস্তাকাকাকে জিজ্ঞাসা করেন --- কি হলো মদন , শেষরক্ষা হলো না তাহলে ?
---- হ্যা কর্তা , মামলায় আমাদের হার হয়েছে। আমি তো প্রথমেই বলেছিলাম সরকারেরসঙ্গে লড়াই করে পেরে ওঠা যাবে না। আপনি শুনলেন না তখন। তাহলে তো এভাবেধনেপ্রাণে শেষ হয়ে যেতে হত না।
----- যাও যাও , তুমি আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে এসো না দেখি। বিদেয় হও এখনআমার সামনে থেকে।
গোমস্তাকাকা চলে যাওয়ার পর কাগজপত্র নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যান শ্বশুরমশাই।তারপর থেকেই খুব একটা ঘর থেকে বেরোতেন না। যখন বেরোতেন কথা বলতে বলতেই বিনা কারণেই মেজাজ হারিয়ে চেঁচামেচি শুরু করতেন। এত উত্তেজিত হয়ে পড়তেন মনে হোতবুঝি এখনই হার্টফেল করবেন। তখন আবার তাকে ধরে ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসতে হত।শ্বাশুড়িও এখন সকাল হলেই ঠাকুরঘরে ঠুকে যান। সারাদিন বিড় বিড় করেন --- ঠাকুর একি করলে তুমি? এর থেকে আমাদের তুমি টেনে নিলে না কেন ?
তার ওই আর্তি প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন জমিদার বাড়ির খিলান , ঘুলঘুলি , কার্ণিসে গুমরে গুমরে মাথা কুটে মরে। গোমস্তাকাকা দুবেলা আসেন , খোঁজখবর নিয়ে যান। কিন্তু তিনি কোন আশার আলো দেখাতে পারেন না। অন্নপূর্ণাকে যাওয়ার সময় চুপিচুপি বলে যান , মা ঘোরদুর্যোগের ছায়া দেখছি। জানি না কি করে কি হবে। জমি ভেষ্ট হওয়ার খবর কেমন করে সবাই জেনে গিয়েছে। কেউই আর তাই খাজনা দিতেও চাইছে না।
মুখের উপর বলে দিচ্ছে , আবার খাজনা কিসের ? জমি তো এখন সরকারের হয়ে গিয়েছে। খাজনা দিতে হয় তো সরকারকেই দেব। নিজস্ব জমি বলতেও তো আর বিশেষ কিছু নেই। বেশিরভাগই চলে গিয়েছে মামলার পিছনে। যেটুকু আছে , সেটুকুরও খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে প্রজারা। তারাও পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে , আগে পরিস্কার হোক, এই জমি সরকারের না জমিদারের , তবেই খাজনা দেব।
---- তাহলে কি হবে কাকা ?
----- কি হবে তা তো আমিও ভেবে পাচ্ছি না মা। ঠাকুরকে ডাকো। তাছাড়া তো আর পথ নেই মা।
------ কিন্তু ঠাকুর তো আমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না কাকা।
------ মা , ঠাকুর তো মানুষের কাছে পরীক্ষা নেন। পরীক্ষায় পাশ করলে তবেই তিনি ভক্তের ডাকে সাড়া দেন। ধরো তোমার এখন সেই পরীক্ষা চলছে।
গোমস্তাকাকা যতক্ষণ থাকেন তার সঙ্গে কথা বলে ততক্ষণ মনে তবু কিছুটা সান্ত্বনা , কিছুটা বল ভরসা পায় অন্নপূর্ণা। কারণ এই বিপর্যয়েও সায়ন্তনের কোন হোলদোলই নেই। সে আসন্ন বিপদের কোন আঁচই গায়ে মাখে না। দিব্যি আছে তার মাছ ধরা , তাসখেলা নিয়ে। তাই গোমস্তাকাকা চলে গেলেই গোটা জমিদার বাড়িটিকে নিঝুম পুরীর মতো মনে হয় অন্নপূর্ণার। তারই মধ্যে পালাক্রমে দুই জায়ের দরজা বন্ধ ঘরে কিসের যেন বৈঠক বসে ভাসুরদের। নিজেকে বড়ো একা লাগে অন্নপূর্ণার। শ্বশুরমশাই নিজেরঘরে শয্যাশায়ী , শাশুড়িমা ঠাকুরঘরে , ভাসুর -- জা'রা নিজের ঘরে গোপন মিটিং-এ ব্যস্ত। কেমন যেন একটা দমবন্ধ পরিবেশ। এই পরিস্থিতিতে সব থেকে যে মানুষটির শক্ত থাকা প্রয়োজন ছিল সেই শ্বশুরমশাই আজ ভেঙে পড়েছেন। তাকে সব থেকে কাহিল করে ফেলেছে বন্ধক রাখা বাড়ির চিন্তা। কয়েকদিন আগেই যারা বাড়ি বন্ধক নিয়েছেন তারা এসেছিলেন। বলে গিয়েছেন টাকা না পেলে তিনদিনের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে বাড়ি। তারপর থেকে আরও উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন শ্বশুরমশাই। কারণ বাড়ি বন্ধকের জন্য নেওয়া টাকা সুদেমুলে কয়েকগুণ হয়ে গিয়েছে। সেই টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য এখন জমিদার বাড়ির নেই। তাই কয়েকদিন ধরেই রাতে ঘুম নেই শ্বশুরমশাইয়ের। সেদিন তো সন্ধ্যে থেকেই কেন যেন পাগল পাগল ভাব। রাত পো্হালেই ছেড়ে যেতে হবে বাড়ি। কিন্তু কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
তাছাড়া জমিদারদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াটা গ্রামের মানুষ বিশেষ করে তিন আনিদের হাসির খোরাক হবে। সেটাই তার কাছে সব থেকে বেশি যন্ত্রণাদায়ক। এই সময় ছেলেরাও তার পাশে নেই। বরং জা-ভাসুররা এই পরিস্থিতির জন্য শ্বশুরমশাইকেই দুষছে। আর তিনি আরও উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। চুপচাপ চোরের মতো ঘরে ঢুকে বিছানা নিচ্ছেন। লোকটাকে দেখে খুব কষ্ট হয় অন্নপূর্ণার। কিন্তু তার তো কিছুই করার ক্ষমতা নেই। কেবল একবার শাশুড়িমা ঠাকুরঘর থেকে বেড়িয়ে এসে ভাসুরদের উদ্দেশ্যে বলেন , তোরা তো ভালো ছেলে। এই পরিস্থিতিতে তোরা কোথাই বাবার সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজবি , তা নয় লোকটাকে দগ্ধে দগ্ধে মারার চেষ্টা করছিস । বাবা তো তোদের ভালোর জন্যই মামলা লড়তে গিয়েছিল। নাহলে আমরা আর ক'দিন ? সরকার নিয়েও যা থাকত তা দিয়েই তো দিব্যি চলে যেত আমাদের।
জবাবে বড় ভাসুর বলেন , মা তুমি আর বাবার হয়ে সাফাই গেয়ো না। আমাদের ভালোর জন্য নয় , জমিদারি জেদ বজায় রাখতেই বাবা মামলা করেছিলেন।
তার কথা শেষ না হতেই ছোট ভাসুর বলেন , তাই বাবার সঙ্গে আর আলোচনা নয়। যা করার আমারই করব। সেই কথা শুনে শাশুড়িমা টের না পেলেও অন্নপূর্ণা পায় এক দুর্যোগের পুর্বাভাস।
সেদিন সন্ধ্যা থেকেই আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা। মেঘ চিঁড়ে ঝলকে উঠেছে বিদ্যুৎ। কখনও বা দমকা ঝড়। অর্থাভাবে জমিদার বাড়ির পোটোম্যাক্সের আলোগুলো আর জ্বালানো হয় না। জ্বলে কয়েকটা টিমটিমে লন্ঠন। হাওয়ায় তির তির করে কাঁপে তার শিখা। একসময় দপ করে নিভে যায় দমকা হাওয়ায়। আর কাকতালীয় ভাবেই সেইসময় ফর ফর উড়ে যায় জমিদারবাড়ির ঘুলঘুলিতে বাসা বেধে থাকা একপাল বাদুর। দুরে কাছারিবাড়ির নিম গাছে আচমকা ডেকে ওঠে একটি পেঁচা । অমঙ্গলের আশংকায় অন্নপূর্ণার বুক কেঁপে ওঠে। অভ্যাস বসে কপালে -- বুকে হাত ছুঁইয়ে বার কয়েক রামনাম লেখে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। হঠাৎই শ্বশুরমশাইয়ের ঘর থেকে ভেসে আসে শাশুড়িমায়ের কান্নার আওয়াজ। তখন ছেলেমেয়েরদের ঘুম পাড়াচ্ছিল অন্নপূর্ণা । সব ফেলে ছুটে যায় সেদিকে। গিয়ে দেখে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে শ্বশুরমশায়ের। যন্ত্রণায় চোখ কপালে উঠেছে। যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে। কেবল বলছেন, না - না, আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিও না। লোকে হাসবে।কয়েক দিন সময় দাও।
আমি তোমার সবটাকা মিটিয়ে দেব। বুঝতে বাকি থাকে না প্রলাপ বকছেন তিনি। সায়ন্তন নেই বাড়িতে । শাশুড়িমায়ের কান্না শুনেও ভাসুর-- জা'রা
কেউ নিজেদের ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে না। অগত্যা বাসন্তীকে দিয়ে গোমস্তাকাকাকে ডাকতে পাঠায় অন্নপূর্ণা। তারপর রসুন তেল গরম করে শ্বশুরমশাইয়ের বুকে মালিশ করতে বসে । কিন্তু যন্ত্রণার কোন উপশম হয় না , বরং বেড়েই চলে। আর সমানে চলে প্রলাপ বকা। কখনও বলেন , হু হু বাবা দিয়েছি কেস ঠুকে। নে এবার কি করবি কর ?
কখনও বা তাকে দেখে কবিতা আবৃত্তি করে ওঠেন , কে তুমি মা শিয়রে বসি ----।
শাশুড়িমা সমানে কেঁদে চলেন। নীরবে সেও কাদে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। শুরু হয় ডাক্তারখানা নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড়। কিন্তু সব চেষ্টাব্যর্থ হয়ে যায়। খিঁচুনি ওঠে শ্বশুরমশাইয়ের। আর তাতেই মৃত্যু হয় তার।শাশুড়িমায়ের সঙ্গে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে অন্নপূর্ণাও। তাদের কান্না শুনে ভাসুর -- জা'রাও এসে পৌঁছোয় । সুর করে লোক দেখানো কান্নায় দৃষ্টি আর্কষণ করে তারা। গোমস্তাকাকা লোকজন ডেকে সৎকারের তোড়জোড় শুরু করে দেন । কিন্তু খরচপাতিরব্যাপারে ভাসুররা কেউ কোন উচ্চবাচ্যই করেন না। অন্যান্য ব্যবস্থাপত্র করে গোমস্তাকাকা সৎকারের টাকার জন্য শাশুড়িমায়ের সামনে এসে দাঁড়ান। কিছুটা অস্বস্তির সঙ্গে বলেন , মা ঠাকুরুণ জমিদারি তহবিলে তো কোন টাকাপয়সা নেই। কর্তাবাবুর পারলৌকিক কাজের খরচাপাতি কি ভাবে হবে ? শাশুড়িমা ভাসুরদের মুখের দিকে তাকান। ভাসুররা তখন মুখ ঘুরিয়ে নেন। একে একে নিজেদের ঘরে গিয়ে ঢোকেন তারা। বিষয়টি বুঝতে বাকি থাকে না অন্নপূর্ণার। সে ঘরে গিয়ে নিজের গলার হার আর ছেলেমেয়েদের মুখেভাতে পাওয়া সোনারূপার গয়নাগুলো এনে তুলে দেয় শাশুড়িমমায়ের হাতে। সেগুলো হাতে নিয়ে শাশুড়িমা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে যান। তারপর কান্না সামলে বলেন, মামলার পিছনে আমার -- তোমার যা গয়নাগাটি ছিল সব চলে গিয়েছে। তোমার তো ওইটুকুই সম্বল।
এতগুলো ছেলেমেয়ে রয়েছে, বিপদ আপদ আছে। গয়নাগুলো সব চলে গেলে তোমার কি হবে মা ?
------ কি আর হবে মা ? আমার সাত -- সাতটা ছেলেমেয়ে। বিপদ আপদ হলে ভগবান না দেখলে ওই গয়না ক'টাতেও কিছু হবে না।
----- মা , ছোটঘরের মেয়ে বলে এতদিন তোমাকে কত গঞ্জনা দিয়েছি। বুঝিনি ছোটঘরের মেয়েদেরও বড়ো মন থাকে। আজ বুঝলাম বড়ো ঘরে জন্ম হলেই মনটা সবার বড়ো হয়না।
----- থাক না মা , আজ আর ওইসব কথা না'ই বা তুললেন। ভুলে যান সবকিছু।
----- ভুলতে আর পারছি কই মা। একদিন এই হারই তোমার বোনের গলা থেকে আমি খুলিয়ে এনে কত না কথা শুনিয়েছি তোমাকে। আমার এমনই পোড়া কপাল সেই হারই শুধু নয়, ছোট ছোট নাতি-- নাতনীদের গয়নাও হাত পেতে নিতে হচ্ছে। বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
আর তাকে স্বান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেকেও সামলাতে পারে না অন্নপূর্ণা। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে কেঁদেই চলে। কেউ টের পায় না জমিদারবাবুকে নিয়ে হরিধ্বনি দিতে দিতে শশ্মানবন্ধুরা কখন জমিদারবাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে। দুই ভাসুরের কেউই পারলৌকিক কাজের দায়িত্ব নেয় না। অগত্যা অন্নপূর্ণা আর সায়ন্তনকেই সেই দায়িত্ব নিতে হয়। শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যুর পর পরিবারে বিভাজন রেখাটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শ্রাদ্ধশান্তির কাজ চুকে যাওয়ার পর বাড়ি নিয়ে নুতন করে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে জমিদার পরিবারে। অন্নপূর্ণা ভেবেছিল হয়তো পাওনাদারের এবার তাদের
বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার তাগদা দিতে আসবে। কিন্তু তাগাদাটা আসে অন্যদিক থেকে।
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment