ঠাকরুন মা
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
অর্ঘ্য ঘোষ
অন্নপূর্ণা অবশ্য এই রকম কিছু যে একটা হতে চলেছে তার আভাস আগেই গোমস্তা কাকার কাছে পেয়েছিল। তাই সে কথাটা শুনে ততটা অবাক হয় না। কিন্তু কথাটা শোনার পরই হতবাক হয়ে যান শাশুড়িমা। শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ সবে চুকেছে। শোকের আবহ জমিদারবাড়িকে তখনও ঘিরে রয়েছে । একে একে আত্মীয় স্বজনরা সব বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে অন্নপূর্ণার। শ্বশুরমশাইয়ের অভাবটা খুব বেশি খুব জানান দিচ্ছে। একটা মানুষই যে সবদিকে এতটা ভরে রেখেছিল তা আজ মর্মে মর্মে অনুভব করছে। ঘুরছে ফিরছে আর নানা কথা মনে পড়ছে। ইজিচেয়ারের কাপড়ে কাঁধের কাছে লেগে রয়েছে শ্বশুরমশাইয়ের মাথার চুলের তেলচিটে দাগ। অন্নপূর্ণার মনে পড়ে যায় ওই চেয়ারে আধশোওয়া হয়ে চা খেতে খেতে জমিদারির কাগজপত্র দেখতেন তিনি। বেতের শৌখিন লাঠিটা এখনও ঝোলানো রয়েছে দেওয়ালের পেরেকে। ওই লাঠি নিয়েই সকাল বিকাল হাঁটতে বের হতেন। স্নান করার আগে চকচকে করে নিয়মিত তেল মাখাতেন লাঠিটাতে।
এমনই নানা কথা মনে পড়ে যায় অন্নপূর্ণার। উপযুক্ত মর্যাদা হয়তো সে পায়নি। কিন্তু তাকে তো এবাড়ির বৌ করে তিনিই এনেছিলেন। সেই দিনটার কথা আজও ভোলেনি সে। তার তৈরি ঘোলের সরবত খেয়ে কত প্রশংসা করেছিলেন। বিনা পণে নিজের ছেলের বৌ করে ঘরে এনেছিলেন। নাহলে হয়তো তিন--তিনটে মেয়ের বিয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে তার গরীব বাবার জিভ বেরিয়ে যেত। শ্বাশুড়িমা যখন তার সামনেই নানা কারণে গঞ্জনা দিতেন তখন প্রতিবাদ করতেন না ঠিকই কিন্তু নিজে কোনদিন অপমানজনক কথাও বলেন নি। তিনি মাথার উপর ছিলেন বলেই সবাই তাকে পরগাছা মনে করলেও উপড়ে ফেলার সাহস দেখায় নি। কথাগুলোমনে পড়তেই কেমন যেন একটা মন খারাপ করা ভাব ঘিরে ধরে তাকে। ওইসব কথা ভাবতে ভাবতে কোথাই যেন হারিয়ে যায় অন্নপূর্ণা। কিন্তু জা- ভাসুরদের গলা পেয়ে বাস্তবে ফেরে। সে তখন শাশুড়িমায়ের পাশে চুপচাপ বসেছিল। ওরাও এসে একে একে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেন। ওদের গতিবিধিতেই কেমন একটা অভিসন্ধি টের পাচ্ছিল অন্নপূর্ণা। কেমন যেন একটা লুকোছাপা ভাব। কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায় তার ধারণাই সত্যি। কিছুটা ইতস্তত করে বড় ভাসুর বলেন , মা একটা কথা বলার ছিল --।
----- কি কথা বল ?
----- আসলে বাবার কাজের চাপে এতদিন তোমাকে বলা হয়নি কথাটা। কিন্তু আর না বললেও নয়।
বড়ো ভাসুরের চোখে মুখে কেমন যেন একটা অপরাধী অপরধী ভাব ফুটে ওঠে। কথা বলতে বলতেই খেই হারিয়ে ফেলেন। তার ওই পরিস্থিতি দেখে আসরে নামেন ছোট ভাসুর। তিনি বেশ গুছিয়ে শুরু করেন --- জানোই তো মা বাবা যে রাতে মারা যান তারপর দিনই পাওনাদারদের বাড়ি দখল নেওয়ার কথা ছিল।
---- জানি তো , সেই কথাই তো ভাবছিলাম। কেন ওরা এখনও এলো না।
---- ওরা বাবার কাজের পরদিনই এসেছিল বাড়ির দখল নেওয়ার জন্য। তখনও বাড়িতে আত্মীয়স্বজনরা সবাই ছিলেন। লজ্জায় মাথা কাটা যেত সবার সামনে। কিন্তু সব শোনার পর আমাদের শ্বশুরমশাইরাই লজ্জার হাতে থেকে বাঁচিয়ে দেন।
----- মানে ?
এবারে কিছুটা সামলে নিয়ে মুখ খোলেন বড়ো ভাসুর। তিনি বলেন -- তখন পাওনাদারের কাছে থেকে ওরাই বাড়িটা কিনে নেন। বলো মা কি উপকারটাই না করেছেন ওরা ?
----- তা বটে বই কি। আর তো আমাদের গাছতলায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে না। এটা যদি বাবা বেঁচে থাকতে করতে পারতিস তাহলে তাকে চলে যেতে হত না। পরে হয়তো তোদের শ্বশুরমশাইদের টাকাটাও মিটিয়ে দিতে পারতেন উনি। তবু যা হয়েছে তাও ভালোই হয়েছে।
---- কিন্তু মা ওদের না একটা শর্ত আছে।
------ শর্ত ?
----- ওদের দুই মেয়ে ছাড়া এই বাড়িতে আর কেউ থাকুক তা ওনারা চান না।
এতক্ষণে বিষয়টা জলের মতো পরিস্কার হয়ে যায় অন্নপূর্ণার কাছে। আর সবটা শোনার পর হতভম্ভ হয়ে যান শাশুড়িমা। তারপর মুখ খোলেন তিনি -- হ্যা রে , বাড়িতে ক শুধু ওদের মেয়েরাই থাকতে পাবে ? জামাই -- নাতনিরা পাবে না ?
দুই ভাসুরই একসঙ্গে বলে ওঠেন ----- বা , রে আমরা থাকতে পাবো না কেন ?
------ জানি তো রে , আমাদের জায়গা হবে না এই তো ? সোঁজা কথাটা তোদের এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলতে হল কেন সেটাই বুঝতে পারছি না। ভয় নেই রে , তোদের শ্বশুরের কেনা বাড়িতে আমি থাকতেও পারতাম না। একটা কথা আছে জানিস তো , ঘরের চেয়ে পর ভাল, আর পরের চেয়ে গাছতলা ভালো। আমি দেখি কাশী ,বারানসী কোথাও একটা চলে যাব। সেখানে বাবা বিশ্বনাথের কাছে যদি ঠাঁই জোটে ভাল , নাহলে গাছতলায় পড়ে থাকব। তোরা সুখে
শান্তিতে থাকিস। বলতে বলতেই গলার স্বর বুজে আসে শাশুড়িমায়ের। নির্বাক হয়ে যায় অন্নপূর্ণা। সে ভেবে পায় না মানুষ কি করে এত ফন্দিবাজ হতে পারে। যে মা তাদের পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন , সমস্ত ঝড় ঝাপটা থেকে পাখির পাখার মতো আড়ল করে রক্ষা করেছেন, যে ভাই কুড়িয়ে পাওয়া আম , জাম দাদাদের না দিয়ে খায়নি , সেই মা--ভাইকে কি করে এত সহজেই দূরে সরিয়ে দিতে পারে ? বিষয়টি জানার পরই ছুটে আসেন গোমস্তাকাকা।
শ্বাশুড়িমাকে বলেন , মা ঠাকরুন আপনাদের আমাদের বাড়ি যেতে বলতে পারতাম , কিন্তু আমি তো আপনাদের কর্মীমাত্র। তাই জমিদার বাড়ির কর্ত্রী, বৌ ছেলেকে আমার বাড়িতে দেখলে নিন্দুকরা হাসার সুযোগ পাবে। তাই আমার বাড়িতে আপনাদের যেতে বলতে পারব না। কিন্তু কর্তাবাবু বৈঠকখানা বাড়িটা ছোটবৌমার নামে লিখে দিয়ে গিয়েছেন। আপনারা দিব্যি সেখানেই গিয়ে উঠতে পারবেন। আমি সমস্ত ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
------ এটা তো আমার জানা ছিল না মদন। আমার জন্য ভাবি না। হভভাগী এই মেয়েটার কথা ভেবেই আমার দুঃচিন্তা হচ্ছিল এতক্ষণ। যাক ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন। তুমিবরং কাল সকালে এসে সব ব্যবস্থাপাতি করে দিও। আজকের রাতটা থাকার ছাড় আছে। শেষ রাতটুকু স্বামী--শ্বশুরের ভিটেয় কাটিয়ে নিই।
সে রাতে আর কেউ খাবার মুখে তুলতে পারে নি। শাশুড়িমা উঠে গিয়ে নিজের ঘরে দোর দেন। আর ছেলেমেয়েদের খাইয়ে নিজে জল খেয়ে বিছানা নেয় অন্নপূর্ণাও। কিন্তু ভাসুরদের ঘরে অবশ্য অন্য চিত্র। দিব্যি শোনা যায় তাদের হাসি, হৈ-হুল্লোড়। কিছুতেই ঘুম আসে না অন্নপূর্ণার চোখে। কাল সকালেই এই বাড়ি ছেড়ে খড়ের চালের মাটির বৈঠকখানা বাড়িতে উঠে যেতে হবে।
মাটির বাড়ি নিয়ে অবশ্য তার কোন আক্ষেপ নেই। তার দুঃচিন্তা মাটির বাড়ি প্রতিবছর রক্ষণাবেক্ষণ করা নিয়ে। ঘুমোন নি শাশুড়িমাও। অনেক রাত্রি অবধি তার ঘরের ভেণ্টিলেটারের ফাঁক থেকে আলোর রেখা দেখতে দেখতে কখন ভোর হয়ে যায় টের পায় না সে। সকাল সকাল উঠে পড়ে। কাল বিকেল থেকে শাশুড়িমা মুখে কুটোটি পর্যন্ত কাটেননি। তাই এক গ্লাস দুধ গরম করে নিয়ে গিয়ে কড়া নাড়ে শ্বাশুড়ি মায়ের দরজায়। কিন্তু বার বার কড়া নাড়া স্বত্ত্বেও কোন সাড়া মেলে না। এমনকি দরজা ধাকাধাক্কি করেও কোন লাভ হয়না।
এরকম তো কখনও হয়না। খুব পাতলা ঘুম শাশুড়িমায়ের। কতবার এক ডাকেই দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছেন। কেমন কু ডাকে অন্নপূর্ণার মন। জা-ভাসুররা কেউ তখন বিছানা ছেড়ে ওঠেন নি। তাই সঙ্গে সঙ্গে বড় মেয়েকে দিয়ে গোমস্তাকাকাকে ডাকতে পাঠায়। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে ছুটে আসেন গোমস্তাকাকা। ততক্ষণে জা--ভাসুররাও উঠে পড়েছেন। সাত সকালে অন্নপূর্ণার সক্রিয়তায় তারা কিছুটা বিরক্তই হয়। কিন্তু অন্নপূর্ণা কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। সে বলে , গোমস্তাকাকা আর দেরী করা ঠিক হবে না। যেমন করেই হোক দরজা ভাঙার ব্যবস্থা করুন।
তার কথা শেষ না হতেই দুই ভাসুরই হই হই করে ওঠেন -- দরজা ভাঙার মানেটা কি ? বাড়িটা আর জমিদারবাড়ি নয়। তাই ভাঙো বললেই ভাঙা যায় না।
আগুন ঝড়া দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে থাকে অন্নপূর্ণা। এর আগে ভাসুরদের মুখের উপর কথা বলা দূরে থাক , মুখ তুলে চায়নি পর্যন্ত। কিন্তু এদিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সে। তীব্র শ্লেষ ঝরিয়ে বলে , বটঠাকুর আপনারা কি ? দেখছেন মায়ের কোন সাড়াশব্দ নেই , আর আপনারা দরজার কথা ভাবছেন। মায়ের চেয়েও কি একটা দরজার দাম আপনাদের কাছে বেশি ?
----- কিন্তু এমনও তো হতে পারে মা ঘুমিয়ে আছেন। তখন তো শুধু শুধু দরজাটা নষ্ট হবে।
---- ভগবান করুণ তাই যেন হয়। তখন না দরজার জন্য একটা কিছু নিজেদের নামে লিখে নেবেন।
আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ দেয় না সে। দরজায় গিয়ে ধাক্কা মারতে শুরু করে। তার দেখাদেখি হাত লাগান গোমস্তাকাকাও। বার কয়েক ধাক্কা দিতেই ছিটকানি উপড়ে খুলে যায় দরজা। আর ঘরে ঢুকেই নিজেকে ধরে রাখতে পারে না অন্নপূর্ণা। তার আশঙ্কাই সত্যি হয়। দেখা যায় গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে ছাদের হুকে ঝুলছে শাশুড়িমায়ের নিথর দেহ। টেবিলের উপর চশমা চাপা দেওয়া সুইসাইড নোট। তাতে লেখা -- জমিদারবাড়ির বৌ হয়ে এবাড়িতে ঢুকেছিলাম। জমিদারবাড়ির বৌ হয়েই বেরিয়ে গেলাম।
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment