Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুন মা - ১৮ /







ঠাকরুন মা 

     অর্ঘ্য ঘোষ 


( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 



কিন্তু আর কিছু ভাবার সময় নেই। দরজায় একসঙ্গে অনেক পায়ের লাথির শব্দ পায় অন্নপূর্ণা। সে বলে -- খুলছি বলছি তো। দরজাটা ভেঙে দেবে নাকি শেষ পর্যন্ত ? 
------ তাড়াতাড়ি করো , নাহলে আমাদের তাই করতে হবে। 
অগত্যা এক মুহুর্তে যতগুলো ঠাকুর দেবতার নাম মনে আসা সম্ভব , সবাইকে স্মরণ করে দরজার ছিটকানিতে হাত রাখে অন্নপূর্ণা। আর ছিটকানি খোলার শব্দ বাইরে পৌঁছোতেই আশ্চর্য রকম নিশ্চুপ হয়ে যায় সব কোলাহল। ছিটকানি খুলতে গিয়েও হাত কেঁপে যায় অন্নপূর্ণার। কিন্তু আর তো পিছিয়ে আসার জায়গাও নেই। তাই চোখ বন্ধ করে সে খুলে ফেলে ছিটকানি। আর সঙ্গে সঙ্গে ওঁত পেতে থাকা বাঘের মতো তিনআনিদের মেজ আর ছোটভাই ঝাঁপিয়ে পড়ে সায়ন্তনের উপর। দুজনে খপ করে সায়ন্তনের দুই হাত ধরে টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। বাইরে তখন তিনআনি আর বামাপদদের অনেক লোক। ভয়ে মুখ শুকিয়ে যায় সায়ন্তের।দরজার সামনেই তাকে চড় থাপ্পড় মারতে শুরু করে ওরা। তারপর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই ছেলেমেয়েরা বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলিকে লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে সায়ন্তনকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে ওরা। ছেলেমেয়েদের সামনে ওইভাবে হেনস্থায় বড়ো করুণ দেখায় সায়ন্তনের মুখ।তার চোখে জল গড়িয়ে পড়ে।আর তা দেখে ছেলেমেয়েগুলো কাউকে কাকু, কাউকে জ্যেঠু , কাউকে দাদু বলে পায়ে আছড়ে পড়ে। কেঁদে তারা বলে , মাকালী, রাধারমণের দিব্যি বলছি বাবা চুরি করে নি। তোমরা বাবাকে ছেড়ে দাও। বাবা কতদিন পেট ভরে খেতে পায়নি। মারলে মরে যাবে। বাবা ছাড়া আমাদের যে আর কেউ নেই গো। 
কেউই ওদের কথা কানে তোলে না। বরং টিপন্নী কাটে , সব এক একটা রক্তবীজের ঝাড়। কেমন শেখানো বুলি বলছে দেখ। এরাও বড় হয়ে এক একটা চোর হবে। আর কোন কথা শোনার মত অবস্থা ছিল না অন্নপূর্ণার। তাদের সামনে দিয়েই পিছমোড়া দিয়ে বাঁধা অবস্থাতেই পশুর মতো  টানতে টানতে সায়ন্তনকে দোকান ঘরের দিকে নিয়ে যেতে থাকে উন্মত্তের দল। সেই অবস্থাতেও সায়ন্তনের সঙ্গে চোখাচোখি হয় অন্নপূর্ণার। সে চাউনি বড়ো করুণ। কিসের যেন ছায়া সে দৃষ্টিতে। বলির আগে হাঁড়িকাঠে বাঁধা ছাগশিশুর মতো চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। কিন্তু অন্নপূর্ণার অত ভাবার সময় নেই। সে বুঝতে পারে ওদের পাতা ফাঁদে সে পা দিয়ে ফেলেছে। ফাঁদই তো , না হলে সায়ন্তনকে ধরার পর ওরা একবারও চোরাই মাল খুঁজতে ঘরে ঢুকল না। অন্নপূর্ণা তখনই বুঝে যায় , চুরিটা আসলে সাজানো। সে চেপে ধরে দফাদার , চৌকিদারদের।কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গেই সে বলে , তোমরা যে বললে ঘর খোল চোরাই মাল আছে কিনা দেখব, কই দেখলে না তো ? 
ওরা সবাই আমতা আমতা করে। তা দেখে অন্নপূর্ণা ফের বলে , থাক আর কিছু বলতে হবে না তোমাদের। যা বোঝার তা আমি বুঝে গিয়েছি। আইনের রক্ষক হয়ে আমাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে একদল কসাইয়ের হাতে আমার নির্দোষ স্বামীকে  তুলে দিলে ? তোমরা আইনের লোক , তোমাদের হাত লম্বা। আইনের ফাঁক গলে তোমরা হয়তো বেরিয়ে যাবে। কিন্তু ওই উপরে একজন আছেন , তার বিচারে তোমরা পার পাবে না। তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে , এখন ভালোয় ভালোয় আমার সামনে থেকে বিদায় হও। না হলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমি মাথা ঠুঁকে মরব।


                               
                                    ওই কথা শোনার পরই তাদের বাড়ির সামনের ভীড়টা ফাঁকা হয়ে যায়। সবাই গুটিগুটি পায়ে তিনআনিদের দোকানঘরের দিকে হাঁটা লাগায়। অন্নপূর্ণাদের বাড়ি থেকে ঢিলছোঁড়া দুরত্বেই ওদের দোকানঘর। একটা রাস্তার এপার--ওপার। সেখান থেকেই ভেসে আসে সায়ন্তনের কাতর আর্তনাদ। পরক্ষণেই ওদের পৌশাচিক উল্লাসে চাপা পড়ে যায় সেই আর্তনাদ। আঁধার সরিয়ে সবে তখন উঁকি দিচ্ছে আলো। নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে 
অন্নপূর্ণার। তারই ভুলে আজ সায়ন্তনকে বিনা দোষে কসাইসদের হাতে মার খেতে হচ্ছে। আর ভাবার সময় নেই তার। দ্রুত স্নান সেরে এসে সে ভেজা কাপড়েই পালাক্রমে দুর্গা, কালী আর রাধারমণ মন্দিরে হত্যে দিয়ে পড়ে। ছেলেমেয়েগুলোও ঠায় হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মধ্যেই হাঁফাতে হাঁফাতে হাজির হন গোমস্তাকাকা। অন্নপূর্ণা তার কাছে কেঁদে পড়ে , কাকা যা আশংকা করেছিলাম তাই হোল। লোকটাকে ওরা মেরে ফেলবে বোধ হয়। 
------ আমিও এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম মা। শোন ঠাকুরের কাছে হত্যে পরে দেবে। এখন চলো বন্ধুবরণ আর রমাপতিবাবুর কাছে গিয়ে দেখি কিছু উপায় হয় কিনা। ভেজা কাপড়েই উদভ্রান্তের মতো গোমস্তাকাকার সঙ্গে ছোটে গ্রামেরই ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য বন্ধুবরণ ঘোষের বাড়ি। তার পায়ে আছড়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। কাঁদতে কাঁদতে বলে , দাদা সেদিন আপনারা যা বলেছিলেন ছেলের মৃতদেহ কোলে নিয়ে আমরা তা মেনে নিয়েছিলাম। তারই প্রতিফল আমাদের এইভাবে পেতে হবে ? লোকটাকে আপনি বাঁচান দাদা , নাহলে কসাইরা ওকে মেরে ফেলবে।
সবকিছু শোনার পর বন্ধুবরণবাবু বলেন , শোন মা তোমার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি।কিন্তু ওরা আমার কথা শুনবে না। উল্টে কিছু বলতে গেলে আমাকেও চুরির বমাল সামলায় বলে অপবাদ দেবে। তার চেয়ে  আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি তুমি ইউনিয়নবোর্ডে যাও। সেখান থেকেই বরং কিছু একটা ব্যবস্থা হয় কিনা দেখ।  বন্ধুবরণবাবুর কাছে থেকে চিঠি নিয়ে তারা ছোটে ইউনিয়নবোর্ডের অফিসে। তখন সবে অফিসে এসে বসেছেন প্রেসিডেন্ট রমাকান্তবাবু। চিঠিটা দিয়ে তারও পা জড়িয়ে ধরে অন্নপূর্ণা। পা জড়িয়ে ধরেই সে বলে , বাবু আমি স্বীকার করছি আমার স্বামী চোর। কিন্তু বিশ্বাস করুন কাল রাতে ও বাড়ি থেকে বেরোয়ই নি। তিনআনির বাবুরা আক্রোশ বশে ওকে চোর অপবাদ দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়েছে।আপনাদেরই দফাদার-চৌকিদাররা গিয়েছিল বলে আমি সরল বিশ্বাসে দরজা খুলে দিয়েছি। সেই দফাদার -- চৌকিদারদের দাঁড় করিয়ে ওরা ওকে নৃশংসভাবে মারছে। আপনি একটা কিছু করুন বাবু , নাহলে ওরা ওকে মেরে ফেলবে।
 ---- আমি আর কি করব ?  এর আগেও তো তোমার স্বামী চুরি করে ধরা পড়ে অস্বীকার করেছে। তারপরে আবার মারের চোটে স্বীকার করেছে। এক্ষেত্রেও যে তেমনটা হবে না তার বিশ্বাস কি আছে ?
 ---- আমার কথা আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না বাবু ?  আচ্ছা বলুন তো এর আগে কোনদিন আমি এভাব আপনার কাছে ছুটে এসেছি ?
----- বেশ , তুমি বাড়ি যাও দেখছি আমি কি করা যায়। একজন চৌকিদারকে দিয়ে বরং থানায় খবর পাঠাচ্ছি। পুলিশ এসে যা করার করুক।
------ কিন্তু পুলিশ আসতে আসতে ওরা যে ওকে মেরে ফেলবে বাবু। আপনি গিয়ে যদি একটু দাঁড়াতেন তাহলে লোকটা প্রাণে বেঁচে যেত। আপনি একটু দয়া করুন বাবু।
----- না , সেটা হয় না। সেটা আমার এক্তিয়ারের বাইরে। 
অন্নপূর্ণা বুঝে যায় এখানে কিছু হওয়ার নয়। তার মনে অনেক কথা ভীড় করে আসে। মনে পড়ে যায় , সৌরভ বাস চাপা পড়ার সময় এই রমাপতিবাবুরাই বাসমালিককে আইনী জটিলতা থেকে বাঁচাতে সেদিন নিজে থেকে ছুটে গিয়েছিলেন। তার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে , বাবু গো তোমাদের এক্তিয়ারের সীমাটা কি আমাদের মতো গরীবের ক্ষেত্রেই বাঁধা ? কিন্তু প্রশ্নটা আর করা হয় না অন্নপূর্ণার। উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে আসে গৌরব।  তাকে দেখেই বুকটা ধক করে  ওঠে অন্নপূর্ণার।সায়ন্তনের কিছু হয়ে গেল নাকি ? সেই আশংকায় বুকটা কেঁপে ওঠে। ছেলের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সে।
---- কি হলো রে , ছুটছিস কেন ?
---- মা তাড়াতাড়ি দেখবে চলো , মুখে গামছা বেঁধে তিনআনিদের দোকানের লোকটা ভূধর পুকুরের পাড় আর আমাদের বাড়ির পিছনের বাগানে অনেক চাল , গম আর ডাল ছিটিয়ে দিয়ে চলে গেল। বাবা তো অনেকদিন পেটে ভরে খায় নি , তাই বাবা ফিরে এসে পেট ভরে খেতে  পাবে বলে দিদি সেইসব চালডাল কুড়োচ্ছিল। লোকটা দিদিকে বলল ওইসব কুড়ালে হাত কেটে নেবে। ওরা কি রকম লোক দেখ , সেবারে ভোজে আমাকে খেতে দিল না , কত খাবার কুকুরকে খাইয়ে দিল , আজও কত চালডাল ছড়িয়ে দিল , অথচ আমাদের কুড়োতেও দিল না। 
অন্নপূর্ণা মনে মনে ভাবে , হায়রে শিশুর মন ! অভুক্ত বাবাকে ওইভাবে মার খেতে দেখে কত উতলা হয়ে পড়েছে। বাবা যাতে অন্তত একটা দিন পেটপুরে খেতে পায় তার জন্য ছড়িয়ে দেওয়া চাল গম কুড়িয়ে রাখছে। ওরা জানেও না তাদের বাবাকে ফাঁসাতেই ওইভাবে চাল গম ছড়িয়ে দেওয়া হল। গৌরব বুঝতে না পারলেও অন্নপূর্ণার বুঝতে বাকি থাকে না 
সায়ন্তনের বিরুদ্ধে চুরির মামলাটা জোড়ালো করতেই ওইভাবে চাল গম ছড়িয়ে দেওয়া হল। পুলিশ এলে চুরির চালগম ওইখানে ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে বলে রিপোর্ট লিখিয়ে নেবে। এরকম তো কতবার হয়েছে। অন্নপূর্ণা বুঝতে পারে সায়ন্তনকে ফাঁসাতে বেশ আটঘাট বেঁধেই নেমেছে ওরা। ছেলের হাত ধরে ছুটতে ছুটতে বাড়ির দিকে ফেরে তারা। 


                                               ফেরার পথেই দেখতে পায় তিনআনিদের দোকানের সামনে মেলার মতো লোক ভেঙে পড়েছে। পিছমোড়া দিয়ে তখনও বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে সায়ন্তনকে। আর গোল করে তাকে ঘিরে মাঝেমধ্যেই পৌশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ছে একদল উন্মত্ত মানুষ। অন্নপূর্ণা বুঝতে পারে বাঁধা মানুষটির উপরে নানা ধরণের প্রহারের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ওই ধরণের উল্লাস করা হচ্ছে। মানুষ এত নৃশংসও হয়! সে আর সহ্য করতে পারে না। দ্রুত ঘরে ঢুকে যায়। সায়ন্তনকে বাঁচানোর আর কোন উপায় নেই দেখে শেষপর্যন্ত লজ্জার মাথা খেয়ে বাসন্তীর দেওর সন্দীপনকেই একটা খবর দেওয়ার জন্য গোমস্তাকাকাকে পাঠায়। তারই মধ্যে কোন এক ফাঁকে বাবাকে দেখে এসে সমানে কাঁদতে থাকে গৌরব আর ছোট মেয়ে ছবি। থেকে থেকেই তারা শিউরে ওঠে। গৌরব বলে , জানো মা যে পাচ্ছে সেই বাবাকে মারছে। কেন মা , বাবা তো সবার বাড়িতে চুরি করে নি , তাহলে বাবাকে ওরাও  মারবে কেন ? বাবার সারা শরীরে রক্ত ঝড়ছে। হাতে পায়ের নখও ওরা সাঁড়াশি দিয়ে টেনে তুলে দিয়েছে। বাবা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে আর বলছে , আমি চুরি করি নি , বিশ্বাস করো। আর মেরো না , আমি মরে যাব। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তত ওরা হো হো করে হেসে উঠছে। কখনও গায়ে ছু্ঁচ ফোটাচ্ছে , কখনও বা কাঁটার ঝোঁপে ফেলে দিচ্ছে। আবার কখনও বা পিঁপড়ের ঝাঁকেও ফেলে দিচ্ছে। বাবার কত কষ্ট হচ্ছে বলো মা। একটা পিঁপড়ে কামড়ালেই আমাদের কত জ্বালা করে। আর বাবাকে তো ঝাঁকে ঝাঁকে পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে , হাত বাঁধা থাকায় বাবা তো কিছু করতেও পারছে না। শুধু উঃ-আঃ করছে।
আর শুনতে পারে না অন্নপূর্ণা। কানে আঙুল দেয়। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। কান্নায় ভেঙে পড়ে ছেলেমেয়েরাও। একটু সামলে উঠতেই ফের ছবি শুরু করে , জানো মা বাবা শুধু একটু জল দাও -- একটু জল দাও করছে। আর ওরা শুধু জল খাবি , নে খা বলে বাবার মুখের কাছে জলের গ্লাস নিয়ে গিয়ে ফেলে দিচ্ছে।
ছেলেমেয়ের কথা শুনে আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে অন্নপূর্নার গলায় --  ওরে আর বলিস না।আমি সইতে পারছি না। কেন যে আমি তখন ওদের কথা শুনে দরজা খুলে দিতে গেলাম ---।ছেলেমেয়ে দুটো বলে , মা আমরা যাবো, বাবাকে এক ঘটি জল দিয়ে আসব ?
অন্নপূর্ণা বলে , তাই যা। 
মায়ের অনুমতি পেয়ে জল নিয়ে তিনুআনিদের দোকান ঘরের দিকে উর্দ্ধশ্বাসে ছোটে ওরা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসে । অন্নপূর্ণা জিজ্ঞেস করে --- কি রে কি হলো ? বাবাকে জল দিতে দিল না বুঝি ? 
কান্নার দমকে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারে না ওরা। কিছুটা সামলে ওঠার পর সৌরভ বলে , জানো মা , আমাদের দেখে বাবা জল খাওয়ার জন্য হা করেছিল , আমরা যখন জলটা বাবার মুখে ঢেলে দিতে যাচ্ছিলাম তখন ওদের ছোটবাবু ছুটে এসে লাথি মেরে ঘটিটা ফেলে দিয়ে বলল , বাবাকে তোরা কি জল খাওয়াবি, দেখ আমি কেমন জল খাওয়ায়। তারপর সবার সামনে বাবার মুখে পেচ্ছাপ করে দিল। তেষ্টার চোটে বাবাও তা খেয়ে নিতে বাধ্য হল জানো মা। 
আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না অন্নপূর্ণা। রাধারমণের মন্দিরে কপাল ঠুঁকতে থাকে সে। একসময় তার কপাল ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। মেয়েরা জোর করে তুলে ঘরে নিয়ে যায় তাকে। সেদিন কেউ আর জল স্পর্শ পর্যন্ত করে না। খিদে -- তেষ্টার বোধটাই চলে যায় সবার। দুপুর গড়িয়ে যায়। স্নান -- খাওয়া করে আবার মজা দেখতে ভীড় জমায় মানুষ। পালাক্রমে তিনআনিরাও স্নান খাওয়া করে আসে। আর কুকুরের মতো জিভ বের করে ধুঁকতে থাকে শুধু অভুক্ত একটা মানুষ। আর অভুক্ত থাকে তার পরিবার। মজা দেখতে আসা মানুষদের একবারও মনে হয় না , সকাল থেকে যে অমানবিক মার খাচ্ছে , সেও আসলে একটা মানুষ। তারও খিদে-- তেষ্টা পায়। আবার কারও মনে হলেও বাবুদের দাপটের ভয়ে একটি কথাও বলতে পারে না। ওদিকে তখন নতুন উদ্যমে উল্লাস শুরু হয়েছে। নতুন যারা হাজির হচ্ছে তাদেরও হাত নিশপিশ করে ওঠে। বাঁধা মানুষকে মারার বীরত্ব দেখানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে কেউই চায় না। তার মধ্যে হাজির হয় দুই ভাই ববি আর বীরু। তারা স্থানীয় আর এক প্রভাবশালী পরিবারের ভাগ্নে। তারাই বা প্রভাব দেখানোর সুযোগ ছাড়বে কেন ? তিনআনিদের সাজানো চুরির তত্ত্ব তাদের জানার কথা নয়। তাই তারা নিজেদের বাহাদুরী দেখাতে আর কে ওই চুরির সঙ্গে  জড়িত ছিল তা কবুল করার জন্য শহুরে কায়দায় প্রহার শুরু করে। মামার দৌলতে শহরে থাকার অভিজ্ঞতা তাদের যথেষ্টই রয়েছে। কিন্তু হাজার মারধোরে কোন নাম কবুল করাতে পারে না তারা। পারবে কি করে , যেখানে চুরিটাই হয়নি যেখানে নাম আসবে কি করে ? কিন্তু তাতে যে লোকসমক্ষে দুই ভাইয়ের সম্মান থাকে না। তাই তারা নিজেরাই স্থানীয় ছিঁচকে চোর শ্রীকান্ত দলুইয়ের নাম টেনে আনে। তারপর বলে , বল শ্রীকান্ত ছিল তাহলে তোকে ছেড়ে দেব , না হলে তোকে খুন্তি পুড়িয়ে ছ্যাঁকা দেব। সেই ভয়ে সায়ন্তন ওদের সপক্ষে ঘাড় নেড়ে দেয়। আর যায় কোথায় ? দুই ভাই বুকের ছাতি ফুলিয়ে বলে , দেখেছো আমরা ওর হাবভাব দেখেই বুঝেছিলাম। এ ব্যাটার সঙ্গে  আরও কেউ আছে।
দুই ভাইয়ের প্রশংসায় সবাই ধন্য ধন্য করে ওঠে। সবাই বলাবলি করে , হবে না ওরা বাইরে ঘোরাফেরা করা ছেলে। দেখলে না ওদের মারের ধরণটাই আলাদা। সঙ্গে সঙ্গে  ধরে নিয়ে আসা হয় শ্রীকান্তকে। সে এসেই তার নাম করার জন্য সায়ন্তনের বুকে গুম গুম করে কিল মারতে শুরু করে। ততক্ষণে জ্বালা-যন্ত্রনার বোধ হারিয়ে ফেলেছে সায়ন্তন। সে কেবল ক্ষীণ স্বরে বলে চলে, একটু জল -- একটু জল। 
সেই সময় সেখানে হাজির হন স্কুলমাস্টার প্রত্যুষ ঘোষ। তিনি বলেন, হা রে করেছিস কি ? লোকটা মরে যাবে যে। ওর বাঁধন খুলে মুখে একটু জল দে।
মাস্টারের কথা শুনে ঝাঁঝিয়ে ওঠে তিনআনির বাবুরা। তারা বলে, তুমি এখান থেকে যাও তো মাস্টার। তোমাকে বেশি দালালি করতে হবে না। ও ওইরকম ভান করে পড়ে আছে। খুলে দিলেই ছুটে পালিয়ে গেলে কে দায়িত্ব নেবে শুনি ?
 ----- বেশ ও যদি পালিয়ে যায় তোরা না হয় আমাকেই বেঁধে পুলিশের হাতে তুলে দিস।
ওই কথা শুনে উপস্থিত জনতাও একই কথা বলে। শেষ পর্যন্ত দড়ি খুলে জল দেওয়া হয় সায়ন্তনের মুখে। ছেলেমেয়েরা পালাক্রমে দেখে এসে সব বলে অন্নপূর্ণাকে। আর শুনেই শিউরে ওঠে সে। আর এত নিপীড়ন সহ্য করতে না জানি সায়ন্তনের কত কষ্ট হচ্ছে।ক্রমেই ধৈর্য্য হারা হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা।সন্দীপনকে নিয়ে এখনও আসছে না কেন গোমস্তাকাকা? রাত ভোর থেকে সরগরম হয়ে থাকা  তিনআনিদের দোকান চত্বরটাতে হঠাৎ নেমে আসে আশ্চর্য রকম নিস্তব্ধতা। গুটিগুটি পায়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায় মজা দেখতে আসা মানুষজন। দূর থেকে ভেসে আসে জীপের হর্ণের শব্দ।

          ( ক্রমশ )

No comments:

Post a Comment