ঠাকরুন মা
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
গেট পেরিয়ে হাসপাতাল চত্বরের বাঁধানো গাছতলায় উল্টো দিকে মুখ করে বসে থাকা ছেলেটিকে দেখে চমকে যায় তারা। ছেলেটাকে পিছন থেকে ঠিক যেন গৌরবের মতো দেখতে লাগে তাদের। ছেলেটার অবশ্য কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তাকে একটি মেয়ে কি যেন বোঝাচ্ছে , আর ছেলেটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে এক মনে তা শুনছে।কিন্তু গৌরব এখানে কেমন করে আসবে ? তাই সংশয় সৃষ্টি হয় তাদের মনে। গোমস্তাকাকা সেটা প্রকাশ করেই ফেলেন। সন্দীপনের উদ্দ্যেশ্যে তিনি বলেন, আচ্ছা ওই ছেলেটাকে আমাদের গৌরবের মতো মনে হচ্ছে না ?
--- আমিও কথাটা আপনাকে জিজ্ঞেস করব ভাবছিলাম। পিছন থেকে দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু মুখটা না দেখলে নিশ্চিত ভাবে তো কিছু বলাও যাচ্ছে না।
---- কিন্তু গৌরবদাদা এখানে কি করে আসবে সেটাই ভেবে পাচ্ছি না। আমি বরং গিয়ে একবার দেখেই আসি।বলে যোগনাথ সেখানে ছুটে যাওয়ার উপক্রম করতেই তার হাত ধরে থামায় সন্দীপন। সে বলে , উহু বিনা অনুমতিতে সেটা করা ঠিক হবে না। এখানকার রুগীদের মানসিক অবস্থা কখন কি রকম থাকে তার কোন ঠিক-ঠিকানা আছে ? কাছে গিয়ে হয়তো দেখা গেল আমরা যা ধারণা করছি তা নয়।
উল্টে ছেলেটির মানসিক বিকৃতি আরও বেড়ে গেল। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কি বলবেন তার ঠিক নেই। আমরা তো ওনাকে ভর্তি করানোর জন্য সুপারের কাছে যাচ্ছি। তখন না হয় তার কাছেই ছেলেটির পরিচয় জেনে নেওয়া যাবে।
--- হ্যা , সেটাই ঠিক হবে , সন্দীপনের কথায় সায় দেয় গোমস্তাকাকাও। সবাই আশায় বুক বাঁধেন। মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন , ছেলেটা যেন গৌরবই হয়। কিন্তু সুপার মানবেন্দ্র ঘোষালের সঙ্গে কথা বলে হতাশ হতে হয় তাদের। অন্নপূর্ণাকে ভর্তি করার পর প্রসঙ্গটা সন্দীপনই তোলে। গাছতলায় উল্টো মুখ করে বসে থাকা ছেলেটাকে দেখিয়ে সে বলে , আচ্ছা মানবেন্দ্রবাবু ওই ছেলেটির পরিচয় কি জানা যাবে ?
---- কেন বলুন তো ? কিছু হয়েছে নাকি ?
--- না - না কিছু হয় নি।আসলে যাকে আজ ভর্তি করানো হল , বছর খানেক আগে হঠাৎ তার ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায়। ওই ছেলেটি পিছন থেকে দেখতে অনেকটা ঠাকুরুন মায়ের হারিয়ে যাওয়া ছেলে গৌরবের মতো।
---- আপনাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। ওর নাম তো আকাশ। ভাকুড়ী গ্রামে ওর বাড়ি। মাস ছয়েক হল ওর বাড়ির লোকেরা ওকে ভর্তি করে দিয়ে গিয়েছেন।
এক লহমায় আশার প্রদীপটা নিভে যায়। হতাশ হয়ে পড়েন সবাই।
সন্দীপন বলে , ওঃ তাই ? তা ওই মেয়েটি কে ?
---- মেয়েটি হাসপাতালের নার্স। ওর নাম শিখা। আর বলবেন না ছেলেটি অন্যান্য রোগীদের মেরেধরে এক করে দেয়। কারও শাসন - বারণ মানে না।একমাত্র শিখাকে খুব মান্য করে।সে যা বলে তাই শোনে।তাই শিখাকেই ওর দেখাশোনার ভার দেওয়া হয়েছে।
সেই সময় একজন নার্স অন্নপূর্ণাকে ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য অফিস ঘরে আসেন। তিনি অন্নপূর্ণার হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই ফের একই বিপত্তি দেখা দেয়। অন্নপূর্ণা কিছুতেই আর শ্রীমতীর হাত ছাড়তে চায় না।শ্রীমতীও নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। কান্নায় ভেঙে পড়ে। অন্নপূর্ণাকে প্রণাম করে বলে , মা ঠাকরুন এখানে থাকলে আপনি ভালো হয়ে যাবেন। তখন আবার আমরা এসে আপনাকে নিয়ে যাব।
যোগনাথেরও চোখের জল বাঁধ মানে না। সেও প্রণাম করে কাঁদতে কাঁদতে বলে , নিজের মাকে কবে হারিয়েছি মনে নেই। তুমিই আমাদের মা হয়ে উঠেছিল। মাকে ফেলে সন্তানের মন কি বাড়িতে টেকে ? তুমি খুব তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে ওঠো। নাহলে যে আমরাও তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না মা।
নার্সটি ফের অন্নপূর্ণাকে ওয়ার্ডের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাত ধরে টানতেই সে শ্রীমতী দিকে চেয়ে থাকে। চোখের জল সামলে শ্রীমতী তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলে , যাও মা ওর সঙ্গে যাও। তুমি ভালো হয়ে যাবে দেখো।
শ্রীমতীর কথা শুনে অন্নপূর্ণা কি বুঝল কে জানে , সে তার হাত ছেড়ে দিয়ে কাপড়ের পুঁটলিটি নিয়ে নার্সের সঙ্গে ফিমেল ওয়ার্ডের দিকে যেতে শুরু করে।কিন্তু সে অফিস ঘর ছেড়ে কিছুদুর যেতে না যেতেই ফের তার মাথার গোলমালটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। চিৎকার করে সে বলে ওঠে -- ঠাকুর তুমি এর বিচার কর। আমি বিচার চাই।
সেই চিৎকার শুনে গাছতলায় বসে থাকা ছেলেটি হতচকিত হয়ে অন্নপূর্ণার দিকে তাকায়। দু'জনের চোখাচোখি হয়ে যায় , তবু কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় না। কিন্তু বাকিদের বুকের ভিতরটা যেন দুলে ওঠে। গোমস্তাকাকা চিৎকার করে ওঠেন -- আরে ওই তো আমাদের গৌরব।
বাকিরাও সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে -- হ্যা হ্যা , গৌরবই তো।
কথাটা শুনে বিষ্ময় ঝড়ে পড়ে সুপারের গলায় -- কি বলছেন আপনারা ? ভাকুড়ীর লোকগুলো যে ওকে নিজের বাড়ির ছেলে বলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে গেল।ওই ছেলেটিই যে আপনাদেরই হারিয়ে যাওয়া গৌরব তার কিছু প্রমাণ আছে ?
---- নিশ্চয় আছে । যে আঘাতের জন্য ওর আজ এই অবস্থা সেই আঘাতের চিহ্ন আছে ওর মাথায়। ১০ টি সেলাইয়ের দাগ আজও মিলিয়ে যায় নি। চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি।
কথাগুলো বলে সুপারের দিকে চেয়ে থাকেন গোমস্তাকাকা।
সুপার বলেন , ঠিক আছে চলুন তো দেখি।
গোমস্তাকাকার কথাই মিলে যায়। ছেলেটির মাথার চুল সরিয়ে দেখা যায় স্পষ্ট সেলাইয়ের দাগ। তারপরই ছেলেটি যে গৌরব তা নিয়ে আর কারও সংশয় থাকে না। গৌরব অবশ্য কাউকে চিনতে পারে না। বরং সবাইকে একসঙ্গে দেখে তার মধ্যে এক ধরণের অস্থিরতা দেখা দেয়। জড়োসড়ো হয়ে সে নার্সটির আরও গা ঘেঁষে বসে। সেটা লক্ষ্য করে সবাইকে নিয়ে অফিস ঘরের দিকে ফেরেন সুপার।
অফিস ঘরে যেতে যেতেই বলেন , আশ্চর্য তো , লোকগুলো নিজেদের বাড়ির ছেলে বলে ভর্তি করে দিয়ে গেল। অনেক সময় পাগলের জ্বালাতনের অতিষ্ঠ হয়ে এলাকার লোকেরা এখানে ভর্তি করে দিয়ে চলে যায়। পরবর্তী ঝামেলার হাত থেকে বাঁচতে ভুয়ো ঠিকানা দিয়ে নিজের পরিবারের লোক বলে পরিচয় দেয়। এক্ষেত্রেও তাইই হয়েছে মনে হয়। সেইজন্য ভর্তি করে দিয়ে যাওয়ার পর থেকে আর কেউ ওর সঙ্গে দেখা করতেও আসে নি।
সন্দীপন বলে , সব কিছু জানা যখন হয়েই গেল তখন আমরা ছাড়া কেউ ওকে নিতে এলে যেন তার হাতে তুলে দেবেন না প্লিজ।
---- মাথা খারাপ ? তাই দিই ?
তবে আর কেউ ওকে নিতে আসবে বলে আমার মনে হয় না। তবু লোকগুলোকে ধন্যবাদ জানাতেই হয় , ভাগ্যিস এখানে এনে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন , বলেই না আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। না হলে কোথায় পাগলামি করে ঘুরে বেড়াত তার ঠিক নেই। ওইভাবে কত পাগলই না বেগোরে মরে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকে তার ঠিক নেই।
সুপারের কথা শুনে শ্রীমতী জোড় কপালে ঠেকিয়ে বলে , বালাই ষাট, গৌরবদাদাবাবুকে ভগবান বাঁচিয়েছেন। ভগবানই ওকে রক্ষা করবেন।
কপালে হাত ঠেকান গোমস্তা কাকাও। তিনি বলেন , তবে ভগবানের দুত হয়ে যারা ওকে এখানে ভর্তি করে দিয়ে গিয়েছেন তারাও প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। কারণ যাই হোক না কেন , ওকে তো ঠিক জায়গাতেই পৌঁছে দিয়েছেন ওরা।
---- যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।
---- না -- না মনে করব কেন , কি জানতে চান বলুন ?
--- তার আগে আপনারা বসুন। চা খেতে খেতে কথা হবে।
সুপারের অনুরোধ ফেরাতে পারে না সন্দীপনরা। অফিস ঘরে বসতেই চা আসে। সবাই চায়ের কাপ হাতে নিতেই সুপার জিজ্ঞেস করেন - আচ্ছা আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে এনারা মা- ছেলে দুজনেই একসঙ্গে কি করে পাগল হয়ে গেলেন?
--- সে এক লম্বা কাহিনী। তবে আমার চেয়ে ইনিই সব থেকে ভালো বলতে পারবেন। উনি ওদের খুব কাছে থেকে দেখেছেন। গোমস্তাকাকার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে সন্দীপন।পরিচয় পাওয়ার পর গোমস্তাকাকার দিকে কৌতুহল ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন সুপার।গোমস্তাকাকা সবিস্তারে ঠাকুরুন মায়ের জীবনের করুন কাহিনী সবিস্তারে খুলে বলেন তাকে। সব শুনে সুপার বলেন , মাই গড এ যে দেখছি সিনেমার গল্পকে হার মানিয়ে যায়।
আপনারা তো আছেনই , আমিও প্রাণপণ ওদের সুস্থ করে মুলস্রোতে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।
সুপারের হাত দুটি ধরে গোমস্তাকাকা বলেন , সেটাই একটু দেখবেন স্যার। আমার মন বলছে এখান থেকেই ওদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। না হলে মাকে ভর্তি করাতে এসে হারিয়ে যাওয়া ছেলের সন্ধান পাব কি করে ? ভগবানের বোধহয় সেটাই ইচ্ছা। এখন আপনিই ভরসা।
সুপারও গোমস্তাকাকার হাতদুটি জড়িয়ে ধরে বলেন , আমি নয় , উপরওয়ালাই ভরসা। আপনাদের অত করে বলতে হবে না। কত জ্বালা - যন্ত্রণা নিয়ে মানুষ এখানে আসে তা আমি জানি। তারা যখন সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যায় তখন মনে এক অপার্থিব আনন্দ পাই। সেই আনন্দের জন্য এই হাসপাতাল ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারি না।সুপারের কথা শুনে তাকে খুব ভালো লেগে যায় গোমস্তাকাকার। উচ্ছ্বসিত গলায় তিনি বলেন , দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মন নিয়ে অন্নপূর্ণা মাকে এখানে ভর্তি করতে এসেছিলাম। আপনার মতো মানুষের দেখা পেয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরতে পারছি।
তারপর একে অন্যের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে। অন্নপূর্ণাকে হাসপাতালে রেখে ফিরতে হচ্ছে বলে সবার মন ভারাক্রান্ত। তার মাঝে গৌরবকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ অন্নপূর্ণার বিচ্ছেদ ব্যাথাটা কিছুটা প্রশমিত করে। একদিন মা ছেলেকে একসঙ্গে সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে ভেবেই সান্ত্বনা খুঁজে পায় তারা। শুরু হয়ে সেই দিনটির প্রতীক্ষা। প্রতীক্ষায় থাকে শিখাও।
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment