ঠাকরুন মা
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
চাকরি জীবনের শুরু থেকেই এই হাসপাতালেই রয়েছে সে। তা প্রায় ১৫ বছর কেটে গেল একই ছাদের নীচে।ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে কাকু-কাকীমার সংসারে লাথি - ঝাঁটা খেয়ে মানুষ হয়েছে শিখা। নিজের অদম্য জেদে লেখাপড়া শিখে নার্সিং ট্রেনিংটা নিয়ে চাকরিটা পেয়েছিল। প্রথম পোস্টিং হয় এই হাসপাতালেই। চাকরি পাওয়ার পর থেকে কাকু-কাকীমাদের বাড়ি যাওয়া আসা অনেকটাই কমে গিয়েছে। তা নিয়ে অবশ্য কাকু-কাকীমাদের তেমন কোন আক্ষেপ নেই। তারা পালা করে নিয়মিত মাসের শেষে দেখা করতে আসেন। সেটা যে নিছক স্নেহের টানে নয় তা এতদিনে ভালোই জানা হয়ে গিয়েছে শিখার।আসলে তার মাইনের টাকাটা নিতেই আসেন।নিজেদের আচরণেই তা প্রমাণ করে দিয়েছেন তারা। শিখার টাকাতেই পর পর নিজেদের দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু শিখার বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেনই নি। আসলে বিয়ে হয়ে গেলে মাসে মাসে টাকাটা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে ভেবেই শিখার বিয়ে নিয়ে মাথা ঘামাতে চান নি তারা। শিখাকে পরিবারের সদস্য নয় , তারা যেন সোনার ডিম দেওয়া হাঁস মনে করেন।সব জেনেও শিখা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না।হাজার হোক বাবার মায়ের পেটের ভাই তো। ওরা ছাড়া যে আপনার আপন বলতে আর কেউ নেই। সে আপন ভাবলে তাকে অবশ্য কেউ আপনার জন ভাবে না। তাই নিজেকে তার খুব একা মনে হয়।
গৌরব অবশ্য তার সেই একাকীত্বটা অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছে।হাসপাতালে কতজন কত রকম মানসিক সমস্যা নিয়ে আসে তার ঠিক নেই।কেউ স্ত্রী , কেউ প্রেমিকা , কেউ বা বান্ধবীর কাছে আঘাত পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এখানে আসে। উল্টোটাও ঘটে। অনেক মেয়েও বিভিন্ন ভাবে আঘাত পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এখানে আসে। আর তাদের আঘাতের জায়গায় ভালোবাসা, স্নেহ আর প্রেমের পরশ দিয়ে সুস্থ করে তুলতে হয় শিখাদের। তাকে মূলত ছেলেদের সুস্থতা ফেরানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কারও স্ত্রী , প্রেমিকা কিম্বা বান্ধবীর অভিনয় করতে হয় তাকে। অভিনয় করার সময় অনেকেই তাকে হারিয়ে ফেলা প্রিয়জন ভেবে কত আবেগ - উচ্ছাস প্রকাশ করে।
কেউ কেউ শিখার মনেও রেখাপাত করে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তারা যখন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায় তখন আর তাদের ওইসব আবেগ উচ্ছাসের কথা মনেও থাকে না। মনে থাকলেই বা কি ? একাধিক পুরুষের সঙ্গে অভিনয় করা মেয়েটিকেই বা আর অন্যভাবে মনে রাখতে চায় ? সুস্থ হওয়ার পর পরিজনদের ফিরিয়ে যাওয়ার সময় অনেকে খুশী হয়ে তার হাতে জোর করে কিছু টাকা বখশিশ দিয়ে যায়। শিখা কিছু বলতে পারে না। টাকা ক'টা মুঠোয় ধরে গোপনে চোখের জল ফেলে। সেই জল শুকোতে না শুকোতেই শুরু হয়ে যায় নতুন অভিনয়।
অভিনয় করতে করতে সে হাঁফিয়ে উঠেছে। সেও মনে মনে চায় তার সত্যিকারের একটা প্রিয়জন হোক। গৌরবকে দেখে তার সেই ইচ্ছাটা প্রবল হয়ে ওঠে। ওর চোখের দিকে চাইলেই তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে ওঠে। এর আগে আর কারও ক্ষেত্রে এমনটা তো হয় নি। গৌরবও যেন তাকে চোখে হারায়। অন্য কারও কথা সে কানেই তোলে না। কিন্তু শিখা তাকে যা বলে তা অমান্য করে না।
তাই সুপার তাকেই গৌরবকে দেখা শোনার দায়িত্ব দিয়েছেন। গৌরবের মাও যে এখানে এসেছেন তা সুপারের কাছে থেকেই জেনেছে শিখা। মা-ছেলের যোগসূত্র গড়ে তোলার দায়িত্বও তাকে দিয়েছেন সুপার।সেইজন্য সে মাঝে মধ্যে গৌরবকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যায়। প্রথম প্রথম মা-ছেলের মধ্যে তেমন কোন অনুভুতি ছিল না। শিখাই গৌরবকে বলেছে , উনি তোমার মা , তুমি চিনতে পারছ না ?
গৌরব কিছু উত্তর দেয় না।মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে।মাও চেয়ে থাকেন ছেলের দিকে। মা-ছেলের যোগসূত্র রচনা করতে গিয়ে শিখা একসময় অন্নপূর্ণার মধ্যে যেন নিজের মাকে খুঁজে পায়। অন্নপূর্ণাকে সে মা বলেই সম্বোধন করে। অন্নপূর্ণাও তাকে নিজের মেয়ের মতো বুকে টেনে নিয়ে আদর সোহাগ করেন। সারাজীবন ওইরকম মাতৃস্নেহ পাওয়ার জন্য শিখার বুবুক্ষ হৃদয়টা ব্যাকুল হয়ে ওঠে।গৌরবের মতোই অন্নপূর্ণাও তার খুব বাধ্য হয়ে ওঠেন। মাঝে মাঝে মা ডাক শুনে তার মুখের দিকে অবাক চোখে চেয়ে থাকেন। শিখা বলে , আমি তোমার মেয়ে গো মা। চিনতে পারছ না ?
দু 'হাতের তালুতে শিখার মুখটা তুলে ধরে কি যেন মেলানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু কোন প্রত্যুত্তর করেন না। আস্তে আস্তে মা - ছেলের পারস্পরিক দৃষ্টিটা বদলাতে শুরু করে।দু'জনের চোখ মুখের অভিব্যক্তি দেখে যেন আবছা আবছা স্মৃতি ফিরছে বলে মনে হয় শিখার। একদিন তা স্পষ্টও হয়ে যায়। এমনিতে হাসপাতালে মেল - ফিমেল ওয়ার্ড আলাদা। তবে ক্ষেত্র বিশষে যাতায়াত করা চলে। বিশেষত গৌরব আর তার মায়ের ব্যাপারটিতে কিছুটা ছাড় মেলে। একদিন গৌরবকে গাছতলায় বসিয়ে রেখে শিখা ফিমেল ওয়ার্ড থেকে অন্নপূর্ণাকে নিয়ে আসে। গাছতলার কাছে পৌঁছোতেই অঘটনটা ঘটে যায়।তবে তাকে আদৌ অঘটন বলা যাবে কিনা তা নিয়ে শিখার দ্বিমত রয়েছে।কারণ অঘটনের ফলটা অবশ্য ইতিবাচকই হয়।
ঘটনাটার কথা মনে পড়লে আজও গা সিরসির করে ওঠে তার। অন্যান্য দিনের মতোই গাছতলায় পিছনের দিকে মুখ করে বসেছিল গৌরব। আপন মনে বিড়বিড় করছিল। সেই সময় চুপি চুপি সেখানে এসে পৌঁছোয় তাপস। গৌরব আর তাপসে খিঁটিমিটি লেগেই থাকে। কিন্তু অধিকাংশ সময় গৌরব শিখার সঙ্গে থাকে বলে কিছু করতে পারে না। তাই মনে মনে আক্রোশ থেকে যায়। গৌরবকে একা পেয়ে সেটা মিটিয়ে নিতে একটা লাঠি হাতে পা টিপে টিপে তার পিছনে পৌঁছোয় সে। তারপর লাঠিটা গৌরবের মাথায় মারার উপক্রম করতেই শিখার হাত ছাড়িয়ে ' বাবু সরে যা ' বলে ছুটে গিয়ে তাপসের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা।আচমকা ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায় তাপস। কিন্তু তার হাতের লাঠি ঘুরে গিয়ে লাগে অন্নপূর্ণার কপালে। কপাল কেটে গড়িয়ে পড়ে রক্তের ধারা। হতচকিত হয়ে মুখ ফিরিয়ে মায়ের রক্তমাখা মুখ দেখে স্মৃতি ফিরে আসে গৌরবের। এক লহমায় তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাবার রক্তাক্ত দেহ। সে ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। ব্যাথা বেদনা ভুলে মাও ছেলের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
ব্যান্ডেজ তুলো আনতে অফিসঘরে ছুটে যায় শিখা।সুপারকে ঘটনার কথা সব জানিয়ে এসে দ্রুত ব্যান্ডেজ বেঁধে দেয় অন্নপূর্ণার কপালে। তখনও মা--ছেলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে। মা-ছেলের সেই মিলন দৃশ্য দেখে শিখার চোখও জলে ভরে যায়। ওই মিলনে সে অনুঘটকের কাজ করেছে। তাই তার মনটা খুশীতে ভরে ওঠে। পরক্ষণেই অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে তার মন। মা-ছেলে সুস্থ হয়ে উঠেছে। কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো অন্যান্যদের মতোই ওরাও বাড়ি ফিরে যাবে।
সেই কথাটা ভাবতেই যেন দম বন্ধ হয়ে আসে শিখার।সুপারের কথা শুনে বিষাদটা আরও বেড়ে যায়। গৌরব আর তার মায়ের সুস্থতার কথা শুনে তার খুব প্রশংসা করেন সুপার। খোলাখুলি বলেই ফেলেন -- তোমার জন্যই কঠিন কাজটা এত সহজে সম্ভব হল। আমি তো ভেবেছিলাম ওদের পুরোপুরি সুস্থ হওয়াটা অসম্ভব ব্যাপার। হলেও প্রচুর সময় সাপেক্ষ। কিন্তু তোমার মুখে যা শুনলাম তাতে মনে হচ্ছে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরাটা এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তেমন হলে বাৎসরিক অনুষ্ঠানের পরই ওদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হবে।
---- বাৎসরিক অনুষ্ঠানের পরই ?
---- কেন , কোন অসুবিধা আছে ?
সুপারের কথার কোন জবাব দিতে পারে না শিখা। তার বুকের ভিতরটা হু হু করে ওঠে। চোখের কোনটা চিক - চিক করে।সেটা লক্ষ্য করে সুপার বলেন , ও বুঝেছি।তুমি এক্ষেত্রে একটু বেশি মাত্রায় মানসিক ভাবে জড়িয়ে পড়েছো। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভেবে দেখ সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও আমরা যদি কাউকে এখানে আটকে রেখে দিই তাহলে আর একজনকে চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। সেটা শুধু অনুচিতই নয় , রীতিমতো অন্যায়ও।আর যাদের ছেড়ে দিতেই হবে তাদের বেশিদিন আটকে রেখে মায়া বাড়িয়ে কি লাভ ?
সুপারের কথার যৌক্তিকতা অস্বীকার করতে পারে না শিখা।কিন্তু কিছুতেই মনকে মানাতে পারে না সে।এর আগে তো এত কষ্ট হয় নি।গৌরবের মনের কথাটা জানতেও তার খুব ইচ্ছা করে।গৌরবেরও কি তাকে ছেড়ে থাকতে এমনই কষ্ট হবে ? তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সুপার বলে , শিখা তুমি এই হাসপাতালের সব থেকে বেশি দায়িত্ব সচেতন নার্স। তোমার সেবা-শুশ্রূষায় অনেক রুগী সুস্থতা ফিরে পেয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছে।এখন গৌরব তো অনেকটাই সুস্থ। তাই এবার তুমি গৌরবকে সময়টা কম দিয়ে কাল মানস নামে যে ছেলেটি এসেছে তার কেস হিস্ট্রি জেনে নিয়ে তার সুস্থতা ফেরানোর কাজ শুরু কর।শিখাও সেই কাজে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করে।
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment