ঠাকরুন মা
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
কিন্তু মন লাগাতে পারে না। মানসকে নিয়ে বেরোনোর সময় অভ্যাসবশেই তার চোখ চলে যায় গাছতলার দিকে প্রতিদিনই দেখতে পায় তার প্রতীক্ষায় রাস্তার দিকে চেয়ে সেখানে বসে রয়েছে গৌরব। কিন্তু মানসকে তার সঙ্গে দেখে অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নেয় সে। খুব কষ্ট হয় শিখার। ইচ্ছা হয় ছুটে গিয়ে আগের মতো অভিমান ভাঙায় তার। কিন্তু তার পায়ে বেড়ি পড়িয়ে দেয় কর্তব্যবোধ। মানসকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হয় তাকে। মনটা তার পড়ে থাকে গৌরবের কাছে। সে জানে এটা অন্যায়।একজনের সুস্থতা ফেরাতে এসে মনটা অন্যত্র পড়ে থাকা মানেই তো কাজে ফাঁকি দেওয়ার নামান্তর।কিন্তু সেও তো রক্ত মাংসের মানুষ।তারও তো চাওয়া - পাওয়া থাকতেই পারে।পরক্ষণেই মনে হয় তাদের মতো মেয়েদের চাওয়া-পাওয়ার কিই বা মূল্য আছে ?
মায়া বাড়ানো বই তো নয় ? তাই নিজেকে গৌরবের কাছ থেকে সরিয়ে রাখার জন্য এড়িয়েই চলতে শুরু করে।কিন্তু সেদিন আর গৌরবকে এড়িয়ে যেতে পারে না।মানসকে আনার জন্য সে ওয়ার্ড যখন যাচ্ছিল তখন গাছতলাতেই বসেছিল গৌরব। যেন তারই অপেক্ষায় রাস্তার দিকে চেয়েছিল।তাকে দেখতে পেয়ে হাতের ইশারায় ডাকে। সেই ডাক আর উপেক্ষা করতে পারে না শিখা। গুটি গুটি পায়ে সেদিকে এগিয়ে যায়। তার চলার মধ্যে কেমন যেন আড়ষ্ঠতা ভাব। কয়েকদিন আগেও এই ভাবটা ছিল না।আসলে তখন সে ছিল গৌরবের নার্স। আর এখন গৌরব তার প্রেমাস্পদ। হয়তো এ প্রেমের কোন পরিণতি নেই কিন্তু মনের দরজায় তো আর সে আগল দিতে পারে না। সে গাছতলায় পৌঁছোতেই একরাশ ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে গৌরব বলে , এই তুমি ওই ছেলেটার সঙ্গে অত ঘোরো কেন গো ?
---- ওটাই যে আমার কাজ।
---- আর আমার সঙ্গে ঘোরাটা বুঝি কাজ নয় ?
---- তোমার সঙ্গেও তো ঘুরেছি।এখন তুমি সুস্থ হয়ে উঠেছো , তাই তো আমাকে ওই ছেলেটার সঙ্গে ঘুরতে বলা হয়েছে।
--- তোমাকে ছাড়া আমার বুঝি একা একা কষ্ট হয় না ?
--- অ্যাই , আমার জন্য তোমার কষ্ট হয় ?
---- জানি না যাও। তোমার জন্য কেন কষ্ট হবে ? তুমি আমার কে ? বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বলে গৌরব।
---- তাই বুঝি ? আমি কেউ নয় তো ? তাহলে আমাকে ছাড়া কষ্ট হয় কেন ?
---- আমার কষ্ট হলেই বা তোমার কি ? তোমার তো কষ্ট হয় না।তুমি তো এখন দিব্যি নতুন একজনকে পেয়ে গিয়েছো।
কথাটা গিয়ে শিখার মর্মমূলে আঘাত করে। চোখ ফেটে জল আসে তার। নিজেকে সামলে নিয়ে গৌরবের মাথার চুলটা এলোমেলো করে দিয়ে বলে , অমনি অভিমান হয়ে গেল বাবুর। ঠিক আছে বাবা এবার থেকে তোমার কাছেও একবার করে আসব।
--- চাই না তোমার ওইরকম একবার করে আসা। তুমি ওই ছেলেটাকে নিয়েই থাকো গে যাও।
বলেই তীব্র অভিমানে ওয়ার্ডের দিকে ছুটে চলে যায় গৌরব। অসহায়ের মতো সেদিকে চেয়ে থাকে শিখা। ফের তার চোখ ভিজে যায়।
বুকের ভিতরে একটা যন্ত্রণা দলা পাকিয়ে ওঠে। সেই যন্ত্রণাটাই সেদিন অনেক রাত্রি পর্যন্ত দু'চোখের পাতা এক করতে দেয় না শিখাকে।বার বার গৌরবের অভিমানভরা মুখটা যেন তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তার মাথাটা বুকে চেপে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে ইচ্ছা হয়। শেষ রাতে গৌরবকে নিয়ে মিষ্টি স্বপ্ন দেখে সে।
সকালে ঘুম ভাঙে দানবাহাদুরের ডাকে। দানবাহাদুর হাসপাতালের নাইটগার্ড। মুখে চোখে জল দিয়ে দরজা খুলে বের হতেই দানবাহাদুর বলে , বহিনজী জলদি চলুন। গৌরবভাই আবার পাগলামি শুরু করেছে। কেউ সামলাতে পারছে না। সুপারসাব আপনাকে খবর দিতে বললেন।
কথাটা শুনেই ছুটতে ছুটতে গৌরবের ওয়ার্ডে পৌঁছোয় শিখা। সেখানে তখন সুপার এবং অন্যান্য নার্সরা হাজির হয়েছেন। গৌরব সমানে আগের মতো পাগলামি করছে। কখনও তীব্র চিৎকারে সবার কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে। কখনও বা অন্য রুগীদের উপর চড়াও হচ্ছে। কেউ শান্ত করতে পারছে না তাকে। শিখা সেখানে গিয়ে পৌঁছোতেই সুপার বলেন , আমরা তো কেউ কিছু করতে পারলাম না। দেখ দেখি তুমি ওকে শান্ত করতে পার কিনা।
সুপারের কথা শুনে খুব রাগ ধরে যায় শিখার। তখনই সে ছুটি হওয়ার আগে পর্যন্ত গৌরবের দেখভাল করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার ঘাড়ে মানসের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হল। এখন আবার ফের তাকেই দেখতে বলা হচ্ছে। মনপ্রাণ এক করে সে গৌরবের সুস্থতা ফিরিয়েছিল। সব তো বিফলে গেল। আবার সুস্থ হতে কতদিন লাগবে কে জানে ? হঠাৎ গৌরবের চিৎকারে তার চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে যায়। সে ছুটে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখে। তারপরই অদ্ভুত শান্ত হয়ে যায় গৌরব। তা দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন সবাই।
সুপার বলে ওঠেন , মানসকে দেখভাল করে আর তোমার কাজ নেই। শ্রাবণীই না হয় মানসকে দেখবে। তুমি একেই সামলাও।
কথাটা শুনে মনটা খুশীতে ভরে যায় শিখার। আবার গৌরব তার সঙ্গে থাকবে ভেবেই তার একাকীত্ববোধটা দুর হয়ে যায়। কিন্তু গোল বাঁধে মানসকে নিয়ে। শ্রাবণীর সঙ্গে থাকতে থাকতেই তাকে দেখলেই সে ছুটে তার কাছে চলে আসে। শ্রাবণীর বদলে তার কাছে থাকার আবদার করে। তাই নিয়ে গৌরবের সঙ্গে ঝামেলা বাঁধার উপক্রম দেখা দেয়। এই রকমটা যে হতে পারে সে আশঙ্কা শিখার ছিল। এইসব রুগীরা একবার কারও উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে কিছুতেই আর অন্যকে সহজে মেনে নিতে পারে না। সে মানসকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শ্রাবণীর কাছে পাঠিয়ে দিয়ে গৌরবকে নিয়ে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসে। গঙ্গায় তখন নৌকায় পারাপার করছে মানুষ। সেদিকে চেয়ে থাকে গৌরব। গোধুলির আলো এসে পড়েছে তার মুখে।
এমনিতেই গৌরবের মুখটা খুব মায়াবী , দেখলেই আদর করতে ইচ্ছা করে। গোধুলির আলোয় মুখটা আরও মায়াময় দেখায়। একদৃষ্টে গৌরবের মুখের দিকে চেয়ে থাকে শিখা। তার মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছাটা আবার জেগে ওঠে মনের মধ্যে। শিখাকে ওইভাবে চেয়ে থাকতে দেখে গৌরব আচমকা ফিক করে হেসে বলে , কেমন দিলাম ?
---- মানে ?
---- তোমাদের সবাইকে বোকা বানিয়ে কেমন ঘোল খাইয়ে দিলাম বলতো ?
--- মানে তোমার পাগলামিটা মাথা চাড়া দেয় নি ?
---- আজ্ঞে না ম্যাডাম।
---- তাহলে এরকম করলে কেন ?
---- না হলে যে তোমায় পেতাম না। আমারই সামনে তোমায় অন্য একজনের হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না। তাই তো তোমাকে কাছে পাওয়ার জন্য পাগলামির অভিনয়টা করতে হল।
কথাটা শুনে বুকটা ভরে যায় শিখার। মনে মনে বলে আমি তো তোমার মতোই একটা হাতই ধরতে চাই। যে হাতটা ধরে আমি সারাজীবন পাশাপাশি পথ চলতে পারব।
শিখাকে চুপ করে থাকতে দেখে গৌরব ফের বলে ওঠে -- এই তুমি রাগ করেছো ?
---- করেছিই তো , আমি খুব রাগ করেছি।
শিখার কথা শুনে গৌরবের মুখে ঘনিয়ে আসে বিষন্নতার ছায়া। আচমকাই ফুঁপিয়ে ওঠে সে। কান্না ভেজা গলায় বলে -- বিশ্বাস কর তোমাকে ছেড়ে আর কিছুতেই থাকতে পারছিলাম না।
আর সইতে পারে না শিখা। সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে গৌরবের মাথাটা সে নিজের বুকে টেনে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে , না গো না। আমি একটুও রাগ করিনি। বরং তোমার সঙ্গ লাভের সুযোগ পেয়ে আমারও ভালো লাগছে। আমারও যে তোমাকে ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছিল।
---- সত্যি ?
---- হ্যা গো। সত্যি - সত্যি- সত্যি। কিন্তু খেপুরাম একদিন তো সুস্থ হয়ে তোমাকে ফিরে যেতেই হবে।
--- না গো। তোমাকে না নিয়ে আমি কোথাও যাব না। তুমি যাবে তো আমার সঙ্গে ?
সহসা গৌরবের কথার কোন উত্তর দিতে পারে না। এই কথাটা কেউ তাকে বলে নি কোনদিন। এই কথাটা শোনার প্রতীক্ষায় ছিল সে। তাই আনন্দাশ্রুতে তার চোখ ভিজে যায়। গৌরবের কানের কাছ মুখ নামিয়ে সে বলে -- যাব বলেই তো তোমার পথ চেয়ে বসে ছিলাম এতদিন।
শিখার কথা শেষ হয় না। তার গলাটা জড়িয়ে ধরে ঠোঁটের কাছে গৌরব এগিয়ে দেয় তার ঠোঁট। লজ্জায় বুজে আসে শিখার চোখ। চোখ বন্ধ করেই গৌরবকে তীব্র আশ্লেষে চুম্বন করে সে। গৌরব তার বন্ধ চোখের পাতায় আলতো ঠোঁটের ছোঁওয়ায় এঁকে দেয় আলপনা।
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment