ঠাকরুন মা
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
গৌরবকে নিয়ে শিখা হাসপাতালে ফিরতেই ছুটে আসে অন্নপূর্ণা। ততক্ষণে গৌরবের পাগলামির কথা তার কানেও পৌঁচেচ্ছে। তাই ছেলের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শিখাকে উদ্বেগ ভরা গলায় জিজ্ঞেস - হ্যা গো দিব্যি তো সুস্থ হয়ে উঠেছিল আবার কি হল বল দেখি ? সুস্থ হতে কত দিন লাগবে কে জানে ? তুমিই মা ওকে একটু দেখো। শিখা কিছু বলতে পারে না। কি বলবে সে ভেবে পায় না। তাই ঠোঁট কামড়ায় সে।তার ওই পরিস্থিতি দেখে গৌরব চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে তার মায়ের কানে কানে কি যেন বলে। তারপরই হাসি ফুটে ওঠে অন্নপূর্ণার মুখে।তার চোখে ঝড়ে পড়ে স্নেহ। শিখার দিকে চেয়ে মিস্টি গলায় বলে , ও মা তাই ? শুনে খুব খুশী হলাম মা। ভগবান আমার একটা হারানো মেয়েকেই আবার ফিরিয়ে দিলেন। অন্নপূর্ণার কথা শুনে শিখাও ভুল যায় স্থান কাল পাত্র। অন্নপূর্ণাকে প্রণাম করে সে।অন্নপূর্ণাও তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আর্শিবাদ করে।সেদিনের মতো যে যার ওয়ার্ডে ফিরে যায়। তিনজনের মনই সেদিন পরিতৃপ্তিতে ভরে ওঠে। শিখার নিজের একটা ঘর সংসারের স্বপ্ন ছিল।
সেই স্বপ্ন পূরণের প্রতীক্ষায় দিন গুনতে থাকে সে। বাৎসরিক অনুষ্ঠানের পরই সুপারকে সব খুলে বলবে বলে ঠিক করে শিখা। সুপারও খুব খুশী হবেন তা সে জানে।এই হোম আর হোমের মানুষজনই তার ধ্যানজ্ঞান। তিনিই প্রতিবছর হোমের আবাসিকদের নিয়ে বাৎসরিক অনুষ্ঠান চালু করেন।এবারও তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে।এবার তোড়জোড় একটু বেশি।এবার অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে আসছেন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি অসীমকুমার ঘোষ।তাই সাজো সাজো রব পড়ে গিয়েছে। হোমের আবাসিকদের সবাইকেই এবার কিছু না কিছু অনুষ্ঠান নিয়ে মঞ্চ তুলতে চান সুপার। আবাসিকদের সেইমতো তৈরি করার জন্য দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।অন্নপূর্ণা , গৌরব আর দীপ্তি নামে একটি মেয়েকে তৈরি করার দায়িত্ব পড়েছে শিখার উপরে। শিখাও মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছে। গৌরবকে দিয়ে সে যেমন খুশী তেমন সাজোতে পাগলের অভিনয় করাবে। পাগলের অভিনয় যে ও ভালোই পারে সে কথা অন্য কেউ না জানলেও শিখা তো ভালোই জানে। অন্নপূর্ণাকে গান আর দীপ্তিকে আবৃত্তির প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। প্রথম দিনেই অন্নপূর্ণার গলা শুনে চমকে গিয়েছিল শিখা। সে নিশ্চিত অনুষ্ঠানের দিন ওইভাবে গাইতে পারলে সে সবার প্রশংসা পাবে। দেখতে দেখতে এসে পড়ে অনুষ্ঠানের দিন। অনুষ্ঠান দেখতে প্রতিবছরই আবাসিকদের তো বটেই কর্মীদের বাড়ির লোকেরাও আসেন। কেবল শিখার বাড়িরই কেউ আসে নি। তারা তো আসে মাসের শেষে টাকা নেওয়ার সময়। অনুষ্ঠান দেখতে আসার গরজই নেই তাদের। প্রথম প্রথম খুব অভিমান হত। পরে যখন বুঝল তার অভিমানের কোন মূল্যই নেই তখন আর কিছু মনে হত না।
তবে এবার তার সে অভিমান অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। এবার গোমস্তাকাকা , সন্দীপনদা , যোগনাথদারা অনুষ্ঠান দেখতে এসেছেন। অন্নপূর্ণা ওদের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ওদের দেখেই নিজের প্রিয়জন বলে মনে হয়েছে শিখার।প্রিয়জন তো বটেই। এখন থেকে গৌরবের প্রিয়জনেরা তো তারও প্রিয়জন।
যথাসময়ে শুরু হয়ে যায় অনুষ্ঠান।এক একটা পারফরমেন্স শেষ হয় আর তুমুল হাততালিতে ফেটে পড়েন দর্শকেরা।সব শেষে ছিল অন্নপূর্ণার গান। মঞ্চ উঠে সে যখন ' সংসার যবে মন কেড়ে লয় , জাগে না যখন প্রান ' গানটি শুরু করে তখন সবার মন মোহিত হয়ে যায়। এমন কি খোদ বিচারপতিকে পর্যন্ত মৃদু স্বরে গলা মেলাতে শোনা যায়। এক সময় গান শেষ হয়ে যায়।কিন্তু রেশ থেকে যায় অনেকক্ষণ।সেই স্তব্ধতা ভেঙে বিচারপতি বলেন , তোমার গলাটি মা বড়ো মিষ্টি। তোমাকে কেন এখানে আসতে হল মা ?
অন্নপূর্ণা হাত জোড় করে বলে , হুজুর আমি এক কপাল পোড়া জনম দুখিনী। আপনি আসছেন শুনে আমার হতভাগ্যের কথা বলব বলে অনেকদিন ধরে আশায় বুক বেঁধে আছি। অভয় দেন তো নিবেদন করি হুজুর।
সেই কথা শুনে খুব অস্বস্তিতে পড়ে যান সুপার। তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে বলেন , আ: অন্নপূর্ণাদেবী উনি অনুষ্ঠানে এসেছেন।অন্য কিছু কথা বলার কি ক্ষেত্র এটা ?
সুপারের কথা শুনে অন্নপূর্ণা মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার উপক্রম করতেই বিচারপতি বলেন , থাক না মানবেন্দ্রেবাবু
ওনাকে বলতে দিন।
তারপর অন্নপূর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বলেন , বলুন মা কি বলতে চান নির্ভয়ে বলুন। আমি শুনব আপনার কথা।
অভয় পেয়ে অন্নপূর্ণা বলে, হুজুর গ্রামের জমিদাররা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে খুন করেছে।
কিন্ত কোন বিচার পায় নি।একে একে সব হারিয়ে আমি আর আমার ছেলে আজ এই হোমে।আপনি সুবিচারের ব্যবস্থা করে দিন হজুর। নাহলে আমি মরেও শান্তি পাবো না হজুর।
বলেই বিচারপতির দুই পা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।আর বিব্রত হয়ে পড়েন বিচারপতি।দ্রুত তার হাত ধরে তুলে ধরে বলেন , একি করছেন ? আপনি আমার মায়ের মতো।পায়ে হাত দিয়ে আমাকে অপরাধের ভাগী করবেন না। আমি এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা দিচ্ছি আপনি যাতে সুবিচার পান সেই ব্যবস্থা আমি করব।বিচারপতি হিসাবে এটা আমার কর্তব্য। হ্যা মা আপনার বাড়ির লোকেরা কি কেউ এখানে আছেন আজ ?
--- হ্যা আছেন। যিনি আমাদের হয়ে মামলা লড়েছিলেন সেই উকিলবাবুও আছেন।
--- তাহলে তো খুব ভালোই হল। অনুষ্ঠান শেষে ওনাদের নিয়ে অফিস ঘরে আসুন , আমি কথা বলব।
অনুষ্ঠান শেষে সুপারের অফিসঘরে অন্নপূর্ণাদের ডেকে নেন বিচারপতি। অন্নপূর্ণাই সবার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়। সন্দীপনের মুখে সব কথা শুনে বিচারপতি বলেন , আই সি ! এতবড়ো অন্যায়ের কোন শাস্তি পায় নি অভিযুক্তরা ?
---- হ্যা স্যার , আমরা কিছুই করতে পারি নি। ওরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে গিয়েছে।
--- আপনারা উচ্চ আদালতে যান নি কেন ?
--- স্যার ওখানেও যে বিচার মিলবে সেই ভরসা পাই নি। তাছাড়া টাকা পয়সারও ব্যাপার ছিল।
---- একজন আইনজীবি হিসাবে আপনার মুখে একথা শোভা পায় না। বিচারপ্রার্থীদের বিচার পাইয়ে দেওয়াটাই আইনজীবিদের কর্তব্য। সেখানে আপনারা যদি হতাশ হয়ে পড়েন তাহলে বিচারপ্রার্থীরা তো বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলবেন , তাই না ?
---- হ্যা স্যার ঠিক বলেছেন। আমার ভুল হয়ে গিয়েছিল।
---- ঠিক আছে সেই ভুল সংশোধনের রাস্তা এখনও বন্ধ হয়ে যায় নি। আপনি কালই সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে আমার বাড়িতে চলে আসুন। আমার চেনা ব্যারিস্টার আছেন। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
তারপর অন্নপূর্ণাকে বলেন , মা আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি যাতে দ্রুত ন্যায় বিচার পান তার ব্যবস্থা আমি করব।
সেইমতো পরদিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে বিচারপতির কলকাতার বাড়িতে পৌঁছে যান সন্দীপন আর গোমস্তাকাকা। সেখানে তখন হাজির ছিলেন হাইকোর্টের সবথেকে নাম করা ব্যারিস্টার প্যারীমোহন পাল। সমস্ত কাগজপত্র দেখে তিনি বলেন , নিম্ন আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় বিস্তর ফাঁকফোকর রয়েছে। তথ্য - প্রমাণের পরিবর্তে
স্বাক্ষীদের বয়ানকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন উচ্চ আদালতে কতদুর কি হয় দেখা যাক।
ব্যারিস্টারের কথা শুনে গোমস্তাকাকা আর সন্দীপন আশান্বিত হয়ে ওঠেন। গোমস্তাকাকা হাত জোড় করে বলেন , আমরা বড়ো আশা নিয়ে এসেছি , সুবিচার পাব তো হুজুর ?
--- দেখুন আগে থেকে তো কিছু বলা যায়। তবে সাধ্যমতো চেষ্টা করব সেটুকু বলতে পারি।
জবাবে গোমস্তাকাকা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু চা নিয়ে যে মেয়েটি ঘরে ঢোকে তাকে দেখে বাক্যহারা হয়ে যান তিনি।


No comments:
Post a Comment