Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুন মা -- ৩৩ /



       ঠাকরুন মা 


               অর্ঘ্য ঘোষ 


        ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 




এক পলক দেখেই রঞ্জুকে চিনতে অসুবিধা হয় না তার। কিন্তু রঞ্জু কি করে বিচারপতির বাড়িতে আসবে ভেবে পান না তিনি। তারা তো শুনেছিলেন রঞ্জু কার সঙ্গে চলে গিয়েছে। তার কোন খোঁজখবর আর পাওয়া যায় নি। কোনদিন আর তার খোঁজ পাবেন ভাবতেই পারেন নি। তাই অবাক হয়ে রঞ্জুর মুখের দিকে চেয়ে থাকেন তিনি। ততক্ষণে রঞ্জুরও দৃষ্টি পড়েছে তাদের উপরে। আর তারপরই তার পা থেমে যায়। হাত থেকে পড়ে যায় চায়ের সরঞ্জাম। সে ছুটে এসে তার গোমস্তাদাদুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত হয়ে পড়েন সবাই। সন্দীপনও তাকে চিনতে পেরে বলে , আরে রঞ্জু তুমি এখানে ?
রঞ্জু সহসা কোন উত্তর দিতে পারে না। বিস্মিত হয়ে বিচারপতি জিজ্ঞাসা করেন -- ও আপনাদের পরিচিত? 
উত্তরে গোমস্তাকাকা বলেন , হ্যা পরিচিত মানে একেবারে আপনার জন। আমাদের ঠাকরুন মায়ের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে।
--- কিন্তু ও যে আমাকে বলেছিল ওর কেউ নেই ? 
এবার বিচারপতির পা ধরে  রঞ্জু বলে , আমি তোমাকে মিথ্যা বলেছিলাম জ্যেঠু। কেউ আছে বলার মতো মুখ যে আমার ছিল না। সেই মুখ আমি নিজেই পুড়িয়েছিলাম। তুমি আমাকে যা শাস্তি দেওয়ার দাও জ্যেঠু। বিচারপতির পায়ে মাথা ঠুকতে থাকে রঞ্জু। বিচারপতি তাকে দু'হাত ধরে তুলে বলে, তোকে মারাত্মক কি শাস্তি দেওয়া যায় সেটা আইনের বই খুলে দেখতে হবে। আপাতত শাস্তি হচ্ছে আর একবার চা করে আনা।
রঞ্জুর চোখের জল মুছিয়ে দেন তিনি। আর রঞ্জু ' এখুনি আনছি। ' বলে ছুটে বাড়ির ভিতর দিকে চলে যায়।
রঞ্জুকে দেখে সন্দীপন আর গোমস্তাকাকার মন খুশীতে ভরে যায়। বিশেষ করে বিচারপতির মতো মানুষ  তাকে মেয়ের মতো ভালোবাসেন দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন তারা। গোমস্তাকাকা তো বলেই ফেলেন , আপনার মতো মানুষের বাড়িতে রঞ্জুকে দেখব তা স্বপ্নেও ভাবি নি হুজুর। কোথাই ওকে কিভাবে পেলেন তা যদি একটু খুলে বলেন ---।
---- সে এক কান্ড। ওই মেন্টাল হোমের মতোই মেয়েদের একটি হোমের অনুষ্ঠানে একবার যেতে হয়েছিল আমাকে। ওই হোমে আদালতের নির্দেশে যেসব মেয়েদের কেউ নেই তাদের রাখা হয়। রঞ্জুকে কেউ পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। 
---- কি সাংঘাতিক ব্যাপার।  ---- সাংঘাতিক ব্যাপারই বটে। পুলিশ জানতে না পারলে তো পাচারই হয়ে যেত। পুলিশই পাচারকারী আর রঞ্জুকে কোর্টে পাঠায়। আদালত রঞ্জুকে ওই হোমে রাখার নির্দেশ দেয়। 
---- সেই পাচারকারীর কি হল ?  
---- তার সাজা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রঞ্জু হোমেই থেকে যায়। হোমের বন্দী জীবনে হয়তো ও হাঁফিয়ে উঠেছিল। তাই আমি যেদিন যায় সেদিন ও আমার পায়ে ধরে হোম থেকে উদ্ধার করার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে। মেয়েটাকে দেখে আমার কেমন মায়া পড়ে যায়। জেলাশাসকের অনুমতি ক্রমে আমি এখানে নিয়ে আসি। আমার দুই ছেলেমেয়ে। বিয়ে করে বিদেশবাসী। বছরান্তে একবার আসে। রঞ্জুই এখন আমাদের নিজের মেয়ে হয়ে উঠেছে। আমাদের দেখভাল করে। আবার শাসনও করে। এরই মধ্যে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে মাধ্যমিক পাশও করেছে।

   
                     এতক্ষণ সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো বিচারপতির কথা শুনছিলেন। তিনি থামতেই সন্দীপন বলে ওঠে , ঠিক যেন গল্পের মতো। বিশ্বাসই করতে পারছি না।
--- রঞ্জু মায়ের আমার পুন্যির জোর ছিল বলতে হবে। তাই তো আপনাদের মতো মহান মানুষের কাছে আশ্রয় পেয়েছে। ঠাকরুন মা শুনে খুব খুশী হবে। আবেগ আপ্লুত গলায় বলেন গোমস্তাকাকা।
--- কিন্তু পাচারকারীদের খপ্পরে কি করে পড়ল বলুন দেখি ?  জানতে চান বিচারপতি।
--- আর বলবেন না হুজুর, সেই দায় কিছুটা হলেও এই অধমের উপরেও বর্তায়।
---- মানে ? 
---- আসলে তখন ভিক্ষা করে দিন কাটছিল ঠাকরুন মায়ের। আমারও পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে সামর্থ্য ছিল না। সেই সময় আমাদের পাশের গ্রামের এক অবস্থাপন্ন পরিবারের থেকে রঞ্জুমাকে কলকাতায় কাজ করতে যাওয়ার কথা বলে। ঠাকরুন মা দোটানায় ছিল। আমিই বলে কয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার মত করায়। তারপর তো বাড়িওয়ালাদের কাছে খবর পাই রঞ্জুমা নাকি কাউকে কিছু না বলে পাশের বাড়ির কেয়ারটেকারের ছেলের সঙ্গে কোথায় যেন চলে গিয়েছে।
---- ওই কেয়ারটেকারই মনে হয় সেই পাচারকারী। এবার বুঝতে পারছি রঞ্জুমা কেন বাড়ির লোকের কথা গোপন করেছিল।
সেইসময় চা নিয়ে ঢোকে রঞ্জু। আর তাকে দেখেই থেমে যায় ওইসব আলোচনা। চা-টা খাওয়ার পর ব্যারিস্টার কাগজপত্র নিয়ে বিদায় নেওয়ার উদ্যোগ নেন।পরদিন পুনঃবিচারের আর্জি জানাবেন তিনি। সন্দীপন জিজ্ঞাসা করে -- স্যার খরচাপাতি কত কি দিতে হবে যদি বলেন --।
বিচারপতি সন্দীপনকে হাত তুলে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলেন , ও নিয়ে আপনাদের চিন্তা করতে হবে না। আমি অন্নপূর্ণা মাকে কথা দিয়ে এসেছি , তাই ন্যায় বিচার পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্বও আমার। বেশ আপনারা কথা বলুন। আমি প্যারীকে একটু এগিয়ে দিই , বলে রঞ্জুর সঙ্গে তাদের একান্তে কথা বলার সূযোগ করে দিতেই ব্যারিস্টারকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান তিনি। ওরা চলে যেতেই রঞ্জু গোমস্তাদাদুর কাছে বাড়ির খরব জানার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে। গোমস্তাদাদু পড়েন মহা দুশ্চিন্তায়। পর পর এতগুলো বিপর্যয়ের খবর কি করে রঞ্জুকে বলবেন তা ভেবে পান না। কিন্তু রঞ্জুর পীড়াপীড়িতে সব খুলে বলতেই হয়। শুনতে শুনতে রঞ্জুর চোখ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়তেই থাকে। গোমস্তাকাকা - সন্দীপনকে সংক্রামিত করে সেই কান্না। নিজেকে সামলে নিয়ে রঞ্জুকে শিখা-গৌরবের বিয়ের কথাটাও বলে। সেই কথা শুনে  উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে রঞ্জু। তার গলায় ঝড়ে পড়ে উচ্ছ্বাস - দাদু আমি তাহলে গৌরবের বিয়েতেই বাড়ি যাব। বলেই থমকায় রঞ্জু। বাড়িটা কি আদৌ আর তার আছে ?  সে তো মুখ পড়িয়ে বসে আছে। কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে সে মায়ের সামনে ?  গোমস্তাদাদুর কাছে সেই সংশয়ের কথাই ব্যক্ত করে রঞ্জু। সেই কথা শুনে গোমস্তাদাদু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন , ওরে পাগলি মা কি মেয়ের উপরে রাগ করে থাকতে পারে ? তোকে পাওয়া গিয়েছে শুনে কত খুশী হবে জানিস ? 
---- তুমি সত্যি বলছ দাদু , মা আমাকে মেনে নেবে ? 
---- হ্যা রে হ্যা , তোর কথা তো মায়ের মুখে লেগেই থাকে। 


                                 খুশীতে ভরে ওঠে রঞ্জুর চোখমুখ। সেদিন আর খাওয়া দাওয়া না করে কিছুতেই আসতে দেন না বিচারপতির স্ত্রী নিরুপমা দেবী। তিনিও ভীষণ ভালো মানুষ। আন্তরিক গলায় বলেন , আপনারা আমাদের রঞ্জুর আপনার জন। বাড়িতে এসে না খেয়ে চলে যাব বললেই চলে যেতে দিচ্ছে কে ?
তারপর আর কোন কথা বলেতে পারেন নি গোমস্তাকাকা। ফেরার মুখে নিরুপমাদেবী বলেন , আজ রঞ্জু তার নিজের লোকেদের ফিরে পেল বলে খুব ভালো লাগছে। আবার ওকে ছেড়ে দিতে হবে ভেবে মনটাও খুব খারাপ জানেন ? আমরা ওর উপরেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। 
গোমস্তাকাকা কিছু বলার আগে বিচারপতি বলেন , ওর বাড়ির লোকেদের সন্ধান যখন পাওয়াই গিয়েছে তখন আর তো ওকে আটকে রাখতে পারব না। তবে  পড়াশোনাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওর মা যদি ওকে আমাদের সঙ্গে থাকার অনুমতি দেন তাহলে খুব ভাল হয়। 
বিচারপতির কথা শেষ হতেই রঞ্জু তাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চা মেয়ের মতো বলে ওঠে , ও জ্যেঠু আমি যে তোমাদেরও একেবারে ছেড়ে থাকতে পারব না। তেমন হলে মায়ের কাছেও গিয়ে কিছুদিন করে থাকব। হবে না জ্যেঠু ?  
---- তাই কি হয় মা ? তোমার মা না চাইলে তোমাকে আমরা কিছুতেই ধরে রাখতে পারি না। তিনি তোমাকে এ পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন। কত কষ্ট করে এতখানি বড়ো করেছেন। তার দাবি যে সবার আগে। 
--- আপনাদের দাবিও কম কিছু নয়। আপনারা ওকে নিজের কাছে রেখে নতুন জীবন দিয়েছেন। নাহলে ও কোথাই হারিয়ে যেত আমরা জানতেও পারতাম না। ওর মাও সেটা উপলব্ধি করতে পারবে। 
--- সেটা হলে তো আমাদের মতো সুখী আর কেউ হবে না।
---- ভগবান সেটাই করবেন। আর একটা কথা বলার আছে হুজুর। 
---- কি কথা ?  
---- হোমেরই একজন নার্সের সঙ্গে আমাদের গৌরবের বিয়ের কথা চলছে। দিনক্ষণ অবশ্য এখনও ঠিক হয় নি। হলে আপনাদের জানিয়ে দেব। ঠাকরুন মা আপনাদের যাওয়ার জন্য বার বার অনুরোধ জানিয়েছেন। তখন তো আর রঞ্জুমার কথা জানা ছিল না। রঞ্জুমাকে নিয়ে আপনাদের বিয়ের দিন অবশ্যই আসতে হবে। 
---- আরে এটাও তো সিনেমার মতোই ব্যাপার। চিকিৎসা করাতে এসে সুস্থ হয়ে নার্সকে বিয়ে করে ফিরলেন মানসিক রুগী।
কথা শেষ করে প্রাণ খোলা হাসি হেসে ওঠেন বিচারপতি। হাসি থামিয়ে বলেন, যাব নিশ্চয় যাব। এই রকম একটা বিয়ের স্বাক্ষী থাকার সুযোগ হাত ছাড়া করছি না। ঠাকুরুন মাকে বলবেন রঞ্জুমাকে নিয়ে আমরা ঠিক পৌঁছে যাব। 
ওই আশ্বাস পাওয়ার পরই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন গোমস্তাকাকারা।


   ( ক্রমশ ) 

No comments:

Post a Comment