Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুন মা - ৩৪ /


    


  ঠাকরুন মা 

      অর্ঘ্য ঘোষ 


( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 



ঠিক হয় পরদিন রঞ্জুর এবং মামলার বিষয়টি জানাতে হোমে যাবেন তারা। একই সঙ্গে গৌরবের সঙ্গে শিখার বিয়ের ব্যাপারটাও চূড়ান্ত করে ফেলা হবে।সেইমতো নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে নিয়ে সেদিনের মতো যে যার বাড়ি ফিরে যান।গোমস্তাকাকার বাড়িতে তখন অপেক্ষা করছিল যোগনাথ আর শ্রীমতী। তাদেরকে দেখে স্বস্তি পান গোমস্তাকাকা। কলকাতা যাওয়ার সময় ফিরতে যে এত দেরী হবে ভাবতে পারেন নি। তাই কাউকে কিছু বলেও যাওয়া হয় নি। কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়ায় স্ত্রী কালীকুমারীর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিল তার।বাড়িতে একা সে কি করছে সেই চিন্তা করতে করতেই  ফিরছিলেন তিনি। তাই বাড়িতে ঢোকার মুখে যোগনাথকে দেখে বলেন , যাক তোরা আছিস। তোদের কাকীমার জন্য খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। তা তোরা কি করে জানলি আমি এখনও ফিরি নি ? 
----- আপনি যে আজ কলকাতা যাবেন তা তো জানতাম।তাই বিকালের দিকে কতদুর কি হলো জানার জন্য খোঁজ নিতে এসেছিলাম। তখনই জানতে পারলাম আপনি ফেরেন নি। তারপরই শ্রীমতীকে বললাম , চল , কাকীমা একলা রয়েছে, গোমস্তাবাবু না ফেরা পর্যন্ত ওখানেই গিয়ে থাকতে হবে।
--- খুব ভালো করেছিস।
সেইসময় কালীকুমারী চা - জল নিয়ে আসেন।স্বামীকে জলের গ্লাস আর সবাইকে চা দিতে দিতে বলেন , কিন্তু তোমাদের তো দুপুরের দিকেই ফেরার কথা। এত দেরী হল যে ? 
---- আরে সে এক কান্ড ,  সিনেমার মতো ব্যাপার।
---- সে আবার কি ? 
----  বিচারপতির বাড়িতে গিয়ে দেখি রঞ্জুমা সেখানেই রয়েছে। তাকে কোন একটি হোম থেকে এনে নিজের মেয়ের মতো রেখেছেন বিচারপতি আর তার স্ত্রী। এর মধ্যে একটা পাশও দিয়েছে রঞ্জুমা।
---- বলো কি ? এ যে সত্যিই সিনেমার মতো ব্যাপার। কথাটা ঠাকরুন মা জানে ? 
---- না - না। সেটা জানাতেই কাল আমি আর সন্দীপন হোমে যাব। 
তারপর যোগনাথের দিকে ফিরে বলেন , যোগনাথ ফিরতে দেরি হলে কালও বাবা তোদের এখানে এসে থাকতে হবে।
---- সে নিয়ে আপনাকে কোন দুশ্চিন্তা করতে হবে না। কাল আমরা ঠিক চলে আসব। বেশ আজ তাহলে আমরা আসি ?
--- আসি মানে ? ভাতের চাল দিয়েছি , সেগুলো কে খাবে শুনি ? কালীকুমারী বলেন।
জবাবে শ্রীমতী মিনমিন করে বলে , কিন্তু কাকীমা বাড়িতে যে ছেলে দুটো রয়েছে। ফিরে গিয়ে রান্নাবান্না করব তবেই না ওদের পাতে দুটো ডাল-ভাত দিতে পারব।
---- ওরে তোদের কাকীমায়ের সেই বিবেচনা আছে। ওদের জন্যও চাল নিয়েছি। খেয়ে ওদের জন্যও নিয়ে যাবি।
শ্রীমতী বলে , কাকীমা সেকি আর আমরা জানি না ? যখন সুদিন ছিল তখন তো আপনাদের দয়াতেই বেঁচেছিলাম। সুদিন গেলেও বড়ো মনটা কোথাই যাবে ?

                 
                                                  খাওয়া দাওয়ার পর ওদের ছেলেদের জন্য খাবার বেঁধে দেন কালীকুমারী। পরদিন আসব বলে ওরা বাড়ি ফেরার পথ ধরে।পরদিন সকালেই গাড়ি নিয়ে এসে পৌঁচ্ছে যায় সন্দীপন। সেই গাড়িতেই তারা হোমের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। হোমে পৌঁচ্ছে অফিস ঘরের পাশে ভিজিটারদের জন্য নির্ধারিত ঘরে বসেতেই এগিয়ে আসে শিখা। সে বলে , বসুন আমি মাকে ডেকে নিয়ে আসি।শিখার মুখে অন্নপূর্ণার উদ্দেশ্যে মা ডাক শুনে যেন কান জুড়িয়ে যায় গোমস্তাকাকার। ভাল লাগে সন্দীপনেরও। শিখা বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই গোমস্তাকাকা বলেন , দাঁড়াও দিদিভাই তার আগে তোমার সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।শিখা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তাকায়।
---- ঠাকরুন মায়ের মুখে গৌরব আর তোমার ব্যাপারটা আমরা সব শুনেছি। আজ আমরা তোমাদের বিয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত কথাবার্তা বলতেই এসেছি। তোমার কি মত ? শিখার মুখের দিকে চেয়ে কথাগুলো বলেন গোমস্তাকাকা। 
লজ্জায় সহসা কোন কথা বলতে পারে না শিখা।বেশ কিছুক্ষণ মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।তারপর অনুচ্চ স্বরে বলে , আমি মাকে সব জানিয়েছি।
শিখার লজ্জানত ভাব দেখে গোমস্তাকাকা বলেন , ঠিক আছে দিদিভাই আর বলতে হবে না। তোমার মা আমাদের সব বলেছে। বেশ যাও এবার বরং তাকেই ডেকে দাও।
শিখা চলে যায় ফিমেল ওয়ার্ডের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসে অন্নপূর্ণা।গোমস্তাকাকা তাকে প্রথমে মামলার বিষয়টি জানানোর পর সবিস্তারে রঞ্জুর কথা বলেন। শুনতে শুনতে অন্নপূর্ণার চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। পরক্ষণেই ফুটে উঠে হাসি। কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে , এতদিনে ঠাকুর বুঝি আমার দিকে মুখ তুলে চাইবার সময় পেলেন। এবার শয়তানগুলো সাজা পেলে মনটা জুড়োয়।
--- বিচারপতি তো বললেন সুবিচার মিলবে। দেখা যাক কি হয়। আজ তাহলে ওদের বিয়ের ব্যাপারটা ফাইন্যাল করে ফেলা যাক কি বলো মা ? অন্নপূর্ণাকে প্রশ্ন করেন গোমস্তাকাকা।
ওই প্রশ্নে কিছুক্ষণ থমকে যায় ঠাকরুন মা। তারপর চিন্তিত স্বরে বলে --- কিন্তু বিয়ের পর ছেলেবৌ নিয়ে উঠব কোথায় সেটাই ভেবে পাচ্ছি না। নিজেদের বাড়িটা তো মেরামত না করে তো বাস করা যাবে না। 
--- কেন আমার বাড়ি বুঝি তোমার বাড়ি নয় ? আমার বাড়িতেই উঠবে তোমরা। সেখান থাকতে থাকতেই তোমার বাড়ি সংস্কার করিয়ে নেওয়া যাবে। চাইলে তুমি ছেলে বৌমা নিয়ে আমার বাড়িতেও থেকে যেতে পারো। আমরা দুই বুড়োবুড়ি বই তো কেউ নেই। আমরা তো বাড়িটা গৌরবকেই দিয়ে যাব ঠিক করেছি। আমাদের মৃত্যুর পর গৌরবই তো ওই বাড়ির মালিক হবে।
----- বালাই ষাট আপনারা মরবেন কেন ? গৌরবের ছেলেপুলে মানুষ কে করবে তাহলে ? সে নাহয় আপনার বাড়িতেই ওঠা গেল , কিন্তু পুনঃবিচার চেয়ে মামলা করছি জানার পর শত্রুরা আবার কোন ঝামেলা বাঁধাবে কিনা কে জানে ?  
---- সেটা নিয়ে আর অত দুশ্চিন্তা নেই।শত্রুদের সেই দিন নেই। ওদের নিজেদের মধ্যে আকচাআকচি লেগেই রয়েছে। তোমার ভাসুরদেরও অবস্থা সঙ্গীন। মেয়ের বিয়ে দিতে দিতেই সব ঘুচে গিয়েছে। এখন বাড়িটুকুই সম্বল। হবে না ?কথায় আছে না পাপ বাপকেও ছাড়ে না।সন্দীপন বলে , ওদের সে সাহসও হবে না। থানাতে এখন একজন নতুন অফিসার এসেছেন , আমার বিশেষ পরিচিত। বাড়াবাড়ি কিছু করলেই তাকে বলে দিলে সোজা নিয়ে গিয়ে শ্রীঘরে গিয়ে ঢুকিয়ে দেবে।
---- কিন্তু বিয়ের আগে গৌরবের একটা কাজ-কর্ম কিছু না জুটলে বিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে ? লোকে বলবে বৌমায়ের রোজগারে সব বসে বসে খাচ্ছে। সে বড়ো লজ্জার ব্যাপার হবে।
--- সে নিয়েও আপনাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না মাসীমা।আমি আমার বন্ধুর কৃষিফার্মে গৌরবের একটা কাজের জন্য বলে রেখেছি। মাইনেপত্র খুব একটা বেশি না হলেও মোটামুটি চলে যাবে।
---- মোটামুটি চলে গেলেই আমার হবে। আমি বেশি কিছু আশা করি না। বেশ তাহলে আর কোন সমস্যাই নেই।



                      তারপরই বিয়ের দিনক্ষণ করার ব্যাপারটা চূড়ান্ত হয়ে যায়। সুপারের সঙ্গে কথা বলার জন্য অফিসঘরে যায় তারা। প্রথমে বিয়ের প্রস্তাবটা শুনে চমকে ওঠেন সুপার -- সেকি! গৌরবের না আবার মাথার গন্ডগোল হয়ে গিয়েছে ? এই অবস্থায় কি ভাবে বিয়ে হয় ?
সুপারের কথা শুনে সবার মুখে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। অন্নপূর্ণা তখন আসল ব্যাপারটা খুলে বলে। সেই সময়ই ঘরে এসে ঢোকে শিখা। তার দিকে চেয়ে সুপার বলেন , তোমরা দেখছি সিনেমাকেও ছাড়িয়ে গেলে।বাহ , শুনে খুব ভালো লাগল। তবে অন্নপূর্ণাদেবীর কাছে একটা অনুরোধ।
---- অনুরোধ নয়, আপনি আমাদের আদেশ করতে পারেন। এই হোমের জন্য, আপনাদের জন্য আমরা মা-ছেলে নতুন জীবন পেয়েছি। তাই আপনারা যা বলবেন তা আমাদের কাছে শিরোধার্য। বলুন আপনি কি বলতে চান ? 
--- বিয়েটা যদি হোমেই হয় তাহলে আপনাদের আপত্তি আছে ? হোমের তরফ থেকেই আমরা সব আয়োজন করব। হোমের ইতিহাসে রেকর্ড হয়ে থাকবে এই বিয়ে।
--- না না , আপত্তি কেন থাকবে ? বরং ভালোই হবে।
---- তবে তার আগে শিখার কাকু-কাকীমাকে একবার জানানো দরকার। কি বলো শিখা ?
কি বলবে শিখা ? কাকু-কাকীমার তো তার চাওয়া- পাওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যাথা নেই তা তো আর তার অজানা নেই। সে সারা জীবন কুমারী থাকলেই তারা খুশী হবেন। তারা যে এই বিয়েতে মত দেবেন না তা সে ভালোই জানে। তবু নিজের লোক বলে কথা। তারা সব ভুলে বিয়েতে পাশে থাকলে তার খুব ভাল লাগবে। তাই সে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।সন্দীপনের গাড়িতেই সবাই শিখার কাকুর বাড়ি পৌঁছোন।কিন্তু সেখানে গিয়েই সবাইকে চরম বিব্রত হতে হয়।


( ক্রমশ ) 

No comments:

Post a Comment