Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুন মা -- ৩৬ /




   ঠাকরুন মা 

    অর্ঘ্য ঘোষ 


( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 



সেদিন সন্দীপনের গাড়িতে সবাই হোমের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সবাই বলতে শ্রীমতী আর তার দুই ছেলে। সন্দীপনের সঙ্গে একই গাড়িতে বাসন্তীও আসে। গৌরব তাকে প্রণাম করতে যেতেই তার দু'হাত ধরে  উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ে বাসন্তী। আবেগে গলা বুজে আসে তার। যোগনাথ আর গোমস্তাকাকার অবশ্য যাওয়া হয় না।তাদের বৌভাতের রান্নার তদারকির জন্য বৈঠকখানা বাড়িতেই থাকতে হয়। হোমে সেদিন উৎসবের মেজাজ।  হালকা সানাইয়ের সুরের মুর্ছনায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক।হোমের অন্য আবাসিকরাও যেন ভুলে গিয়েছে তাদের মানসিক অসুস্থতার কথা। সুপার মানবেন্দ্রবাবু বিয়ে উপলক্ষ্যে সবাইকে এক প্রস্থ নতুন পোশাক কিনে দিয়েছেন।সেই পোশাক পড়ে সবাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে। গাড়ি হোমে পৌঁছানো মাত্রই বাসন্তীকে দেখে গাড়ির কাছে এগিয়ে যায় অন্নপূর্ণা।কতদিন পর দেখা হচ্ছে মা-মেয়ের। তাই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে আনন্দাশ্রুতে চোখ ভিজিয়ে ফেলে। শিখা এসে তাদের চোখ মুছিয়ে দেয়।মায়ের কাছে শিখার পরিচয় পাওয়ার পর বাসন্তী বলে , আমাদের ভাইয়ের বৌটার মুখখানা কি সুন্দর গো মা।শিখা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয়। তারপর বাসন্তীকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। অন্নপূর্ণা ব্যস্ত হয়ে পড়ে ছেলের বিয়ের তদারকিতে। গৌরবরা পৌঁছোনোর কিছুক্ষণ পরেই বিচারপতিরাও সরাসরি কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যান। মা আর দিদিকে দেখে ছূটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে রঞ্জু। তাকে বুকে চেপে অন্নপূর্ণারাও কেঁদে ভাসায়।তাদের কান্নাকাটি করতে দেখে এগিয়ে আসেন বিচারপতির স্ত্রী নিরুপমাদেবী। তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি, আজকের মতো আনন্দের দিনে আবার কান্না কেন ? 
ততক্ষণে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে গৌরব। তাকে দেখে মুখে হাসি ফুটে ওঠে রঞ্জুর। ভাইয়ের হাত ধরে সে বলে, আরে তুই তো নায়ক হয়ে গিয়েছিস। যা একখানা কান্ড করেছিস , সিনেমাকেও হার মানাবে। তা আমাদের সেই নায়িকাটি কোথায় ? তাকে দেখার যে তর সইছে না। লজ্জায় গৌরব কোন কথা বলতে পারে না। সে আঙুল তুলে শিখার ঘরটা দেখিয়ে দেয়। বাসন্তীই তাকে শিখার ঘরে নিয়ে যায়।  
--- কই গো আমাদের নায়িকা সুন্দরী কই ? বলতে বলতে ঘরে ঢোকে সে। তারপর শিখাকে দেখে বলে , না,  বলতেই হবে নায়িকা।
সেই কথা শুনে শিখা সহ অন্যান্য মেয়েরা তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।সেটা লক্ষ্য করে রঞ্জু বলে , ওহো পরিচয়টাই তো দেওয়া হয়নি। আমি হলাম গিয়ে তোমাদের নায়কের দিদি গো।


                                   প্রথম দেখাতেই রঞ্জুকে কেমন যেন ভাল লেগে যায় শিখার।সে উঠে গিয়ে প্রণাম করতে যেতেই রঞ্জু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে , আরে আরে করে কি দেখ দেখি। সম্পর্কে দিদি হলেও আমরা সব পিঠোপিঠি ভাইবোন। বন্ধুর মতো মানুষ হয়েছি। তুই তোকারি চলে। তাই নো প্রণাম।কথাটা বলেই বিষন্ন হয়ে যায় রঞ্জুর মন। মনে পড়ে যায় বাবা, সৌরভ, ছবি আর কণার কথা। তার বিষন্নতা অন্যদের আনন্দে যাতে ছায়া ফেলতে না পারে বলে সেই জন্য কনে সাজাতে মেতে উঠে সে। খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দেয় শিখাকে। তারপর চিবুকটা তুলে ধরে বলে , যা লাগছে না তোকে , দেখে তো আমারই প্রেমে পড়তে ইচ্ছা করছে রে।
---- দিদি তুমি না , লজ্জায় কথা শেষ করতে পারে না শিখা।
হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই এসে পড়ে বিয়ের লগ্ন। ততক্ষণে বিচারপতির আসার খবর পেয়ে পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা কার্যত হোমের দখল নিয়ে নিয়েছে। তাদের হাঁকডাক আর ব্যস্ততায় রীতিমতো সরগরম হয়ে উঠেছে হোম। জেলাশাসক কৌশিক সিংহ আর জেলাপুলিশ সুপার অম্লানকুসুম বোস এগিয়ে এসে বিচারপতিকে স্যালুট জানান। বিচারপতি তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন ,  আপনারা শেষ পর্যন্ত খবর পেয়েই গেলেন দেখছি।
--- হ্যা স্যার। একটু খবর দেবেন তো। বিনীতভাবে বলেন জেলাশাসক। 
--- আসলে একেবারেই একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান তো , তাই আর আপনাদের বিব্রত করতে চাই নি।
--- কি বলছেন স্যার! আপনার নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের কর্তব্য , পুলিশ সুপার বলেন।
---- বেশ - বেশ। আপনারা যে কয়েকজন আছেন তারা কিন্তু এখানেই খাওয়া দাওয়া করবেন।
---- না - না স্যার আমাদের নিয়ে আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না। জেলা পুলিশ প্রশাসনের সর্বময় দুই কর্তা বলেন।
--- তা বললে কি করে হয় ? আমার নিরাপত্তা দেওয়াটা যেমন আপনাদের কর্তব্য , তেমনি অতিথি আপ্যায়ণ করাটাও আমাদের কর্তব্য। সেটুকু সুযোগ তো আপনাদের দিতেই হবে।পুলিশ - প্রশাসনের কর্তারা আর কোন কথা বলতে পারেন না। বিচারপতি হোমের সুপার মানবেন্দ্রবাবুকে ডেকে পুলিশ-প্রশাসনের লোকেদের আপায়ণের ব্যবস্থা করতে বলেন। 
মানবেন্দ্রবাবু বলেন , স্যার ওনাদের দেখার পরই আমি ক্যাটারারদের আয়োজন বাড়াতে বলে দিয়েছি।
--- বাঃ ভেরি গুড।


                       প্রথম লগ্নেই শুরু হয়ে যায় গৌরব-শিখার বিয়ে। বিয়ের আসরে বসে খুব মন খারাপ হয়ে যায় শিখার। এই শুভদিনে তার পাশে নিজের বলতে কেউ নেই। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে যায় তার। বাবা-মা থাকলে তারা নিশ্চয় মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারতেন না। তবে হোমের আবাসিক - সহকর্মীরা তার রক্তের সম্পর্কের কেউ না হলেও তাদের আন্তরিকতাই তার মন খারাপ ভুলিয়ে দেয়। সুপার মানবেন্দ্রবাবুই তাকে সম্প্রদান করেন। পাত্রপক্ষের ভূমিকা পালন করেন স্বয়ং বিচারপতি। মন খারাপ হয়ে যায় অন্নপূর্ণারও। স্বামীর কথা , মৃত ছেলেমেয়েদের কথা খুব মনে পড়ে তার। ছেলেমেয়েগুলো সবদিন পেটেপুরে খেতেও পায় নি। আজ এখানে এলাহি আয়োজন। ওরা থাকলে পেটপুরে দুটো ভালো খেতে পেত। চোখের জলে তার বুক ভিজে যায়। মনে মনে স্বামীকে বলে, আজ তোমার গৌরবের বিয়ে। তুমি আর্শিবাদ কর ওরা যেন সুখী হয়।নির্বিঘ্নেই বিয়ে হয়ে যায়। সকালে ছেলে-বৌ নিয়ে গ্রামের উদ্দ্যেশে রওনা দেয় অন্নপূর্ণা। তাকে অনুসরণ বিচারপতি , পুলিশ - প্রশাসনের গাড়িও। ধুলোর ঝড় উড়িয়ে একের পর এক গ্রামে ঢোকে গাড়ির কনভয়।হতচকিত পড়ে গ্রামের মানুষ।  অন্নপূর্ণাদের বৈঠকখানা বাড়িটা মুহুর্তের মধ্যে যেন ভি,ভি,আই,পি জোনে পরিণত হয়ে ওঠে। চারদিকে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে পড়ে পুলিশকর্মী। দূর থেকে তা দেখে গ্রামের মানুষ তো বটেই ,  অন্নপূর্ণার ভাসুর , তিনআনি বাবুদেরও তাক লেগে যায়।গোমস্তাকাকী নবদম্পতিকে বরণ করে ঘরে তোলেন। তারপরই নিমন্ত্রিতরা আসতে শুরু করেন। নিমন্ত্রণ করা স্বত্ত্বেও অবশ্য গৌরবের জ্যেঠু - জ্যেঠুমারা কেউ আসেন নি। কিন্তু আড়ালে থেকে তারা সব লক্ষ্য রাখেন। আর্শিবাদ পর্ব চুকে যাওয়ার পর শুরু হয় খাওয়া-দাওয়ার পালা।
নিমন্ত্রিতদের সঙ্গে পাশাপাশি একাসনে বসে খেতে বসেন বিচারপতি - পুলিশ প্রশাসনের কর্তারাও। খাওয়া শেষে বিদায় নেওয়ার আগে বিচারপতি অন্নপূর্ণাকে ডেকে বলেন , রঞ্জুমা এখন বরং এখানেই কিছুদিন থাক। সন্দীপন তো মামলার কাজে কলকাতা যাবেই। তখন ওর সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেই চলবে।
-- আপনি যা বলবেন তাই হবে। রঞ্জুর উপরে আপনার দাবি সবার উপরে।
বিচারপতি গাড়ির দিকে এগিয়ে যান। রঞ্জুই তাদের গাড়িতে তুলে দিয়ে বলেন , আমি নেই বলে তোমরা কিন্তু অনিয়ম করবে না। ওষুধগুলো ঠিকঠাক খাবে। নাহলে আমি ফিরে গিয়ে খুব বকব কিন্তু।
--- হ্যা তাই থাকব ? এ কয়েকদিন আমরা ইচ্ছেমতো কাটাব। তুমি গিয়েই তো আবার কড়া শাসন শুরু করে দেবে। হাসতে হাসতে বলেন বিচারপতি আর তার স্ত্রী।
ততক্ষণে গ্রামের লোক ভেঙে পড়েছে সেখানে। গাড়ি ছাড়ার মুহুর্তে জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার বিচারপতিকে স্যালুট জানান। বিচারপতি তাদের বলেন , শুনুন শুধু আমার নিরাপত্তা সুরক্ষিত করলেই হবে না। এটা আমার মেয়ের বাড়ির। তার পরিবারের নিরাপত্তা যাতে সুরক্ষিত থাকে সেটা আপনার দেখতে হবে।
--- ঠিক আছে স্যার। এই পরিবারের নিরাপত্তার ব্যাপারটা আমাদের মাথায় থাকবে। আজই স্থানীয় থানায় এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে দিচ্ছি।
তারপরই বিচারপতিকে নিয়ে একে একে গ্রাম ছাড়ে গাড়ির কনভয়। আর বিষয়টি গ্রামবাসীদের আলোচনার খোরাক হয়ে দাঁড়ায়। রাতারাতি যেন ভি,আই,পি হয়ে ওঠে অন্নপূর্ণার পরিবার।


            ( ক্রমশ ) 

No comments:

Post a Comment