অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
ভবানী ডাক্তারের ডিস্পেনসারির কাছে পৌঁছোতেই তার কানে আসে কান্নার শব্দ । ভবানী ডাক্তার এইট পাস হলে কি হবে , একাধারে হোমিওপ্যাথি, এলোপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক এমন কি কবিরাজি চিকিৎসাও করে। গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্র তো থেকেও না থাকা। পাঁচ বছর ধরে সেখানে কোন ডাক্তার নেই। সেই সুযোগে জাঁকিয়ে বসেছে ভবানী ডাক্তার। আসলে মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে লাগে তাক না লাগে তুকের খেলা করে। ডিস্পেনসারির পিছনেই ভবানী ডাক্তারের বাড়ি। রোগী নিয়ে গেলেই তার দেখা মেলে।তাই জ্বরজ্বালা, সাপে কাটা, বিষ খাওয়া যার যাই হোক, সবাই ভবানী ডাক্তারের কাছেই ছোটে। অনেকে বলে ভবানী ডাক্তার নাকি মোটা টাকার বিনিময়ে গর্ভপাতও করায়। ওইভাবে লাগে তাক না লাগে তুকের খেলায় ভবানী ডাক্তারের হাতে কত রোগীর যে মৃত্যু হয়েছে তার ঠিক নেই। তা নিয়ে মাঝে মধ্যে তুমুল ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তখন ভবানী ডাক্তারের ঘনিষ্ঠ কিছু লোক আসরে নামে। তারা বলে , এত যে ক্ষোভ দেখাচ্ছিস ভবানী তো তোদের কাউকে বাড়ি থেকে ডেকে আনতে যায় নি। ভবানী আছে বলে তবু তো জ্বরজ্বালা হলে চিকিৎসা পাচ্ছিস। না হলে তো বিনা চিকিৎসায় মরতে হতো। ওই যুক্তির কাছে বিক্ষোভকারীদের হার মানতে হয়। শেষ পর্যন্ত ভাবানী ডাক্তারের ঘনিষ্ঠ লোকগুলোই একটা মধ্যস্থতা করে দেয়। সৎকারের খরচাটুকু দিয়ে বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তারা।
তারপর মৃতদেহ নিয়ে শ্মশানে ছোটে শবযাত্রীরা। আর স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। সেই রকমই কিছু যে একটা হয়েছে তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না প্রিয়র। তাই ভবানী ডাক্তারের ডিস্পেনসারির দিকে সাইকেল হাঁকায় সে।ডিস্পেনসারির কাছে পৌঁছোতেই বাকরুদ্ধ হয়ে যায় তার। সে দেখতে পায় ভবানী ডাক্তারের ডিস্পেনসারির কাছে পড়ে রয়েছে সুবল দাসের একমাত্র ছেলের মৃতদেহ। সুবলের স্ত্রী আল্পনা ছেলের মৃতদেহ আঁকড়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘন ঘন জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। পাশে বসে যেন পাথর হয়ে গিয়েছে সুবল। ফুলের মতো শিশুটির মৃত্যুতে কারও চোখ শুকনো নেই। কেঁদে ফেলে প্রিয়ও।এই তো সন্ধ্যের আগেই মায়েদের সঙ্গে ছেলেটাকে নিয়ে মাঠপালুনি করে এলো সুবলের স্ত্রীও। এরই মধ্যে আবার কি হলো ? সুবল আর তার স্ত্রী তো কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।
বিভিন্ন জনের কাছ থেকে যেটুকু জানা গেল তা হলো , মাঠপালুনিতে গিয়ে সুবলের স্ত্রী ছেলেকে একটা বাটিতে চিঁড়ে দই কলা মেখে দিয়েছিলেন। ছেলেটা সেই বাটি নিয়ে একাই জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় ঘুরে ঘুরে খাচ্ছিল। বাড়ি ফেরার মুখে সে বার বার মাকে পেট ব্যাথার কথা বলছিল। সুবলের স্ত্রী প্রথম দিকে তেমন আমল দেন নি, ভেবেছিলেন বাচ্চাদের তো অমন পেট ব্যাথা কতই হয়। কিন্তু বাড়ি ফিরেই তার টনক নড়ে। সমানে বমি আর পাইখানা করতে করতে ছেলেটা নেতিয়ে পড়ে। নুন চিনির সরবত , নানা টোটকা দিয়ে ছেলেকে সুস্থ করার চেষ্টা করেন আল্পনা। কিন্তু ছেলে যেন ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে নিয়ে তারা ছুটে আসেন ভবানী ডাক্তারের চেম্বারে। সব দেখে শুনে ভবানী ডাক্তার বলে , মাঠপালুনিতে ঝোঁপ জঙ্গলে খাওয়ার সময় নিশ্চয় খাবারে বিষাক্ত কিছু পড়েছিল। তারপর একটা ইঞ্জেকশান দেয় সে। ইঞ্জেকশানটা দেওয়ার পরই বার কয়েক বমি করে চোখ বন্ধ করে দেয় ফুলের মতো শিশুটি। অবস্থা বেগতিক দেখে চেম্বারে তালা ঝুলিয়ে চম্পট দেয় ভবানী ডাক্তার।
বছর খানেক আগেও একই ঘটনা ঘটেছিল। মর্মান্তিক সেই দৃশ্যটা আজও চোখের সামনে ভাসে। সেবারেও বেলিয়া গ্রামের এক আদিবাসী দম্পতি তাদের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন।বন্ধুদের সঙ্গে খড়ের পালুইয়ের আড়ালে লুকোচুরি খেলতে গিয়ে সাপে কেটেছিল ছেলেটিকে। সাপে কাটার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা ভবানীডাক্তারের ডিস্পেসারিতে নেই। কিন্তু স্রেফ টাকার লোভে ছেলেটিকে আটকে রেখে স্যালাইন দেওয়া শুরু করেছিল ভবানী। সেবারেও কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয়েছিল ছেলেটির। সুবল আর তার স্ত্রীর মতোই ছেলের মৃতদেহ আঁকড়ে কান্নায় লুটিয়ে পড়েছিল সেই আদিবাসী দম্পত্তি। সেই সুযোগে গা ঢাকা দিয়েছিল ভবানী ডাক্তার। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক জলঘোলা হয়েছিল। ভবানীর মোসাহেবদের মধ্যস্থতায় অবশ্য সেই ঘোলা জল আবার থিতিয়েও যায়। এইভাবে যে কত মানুষ, ভুল কিম্বা বিনা চিকিৎসায় মারা যায় তার হিসাব পুলিশ প্রশাসনের কাছে পৌঁছোয়ই না। ভবানীর মোসাহেবদের মধ্যস্থতায় গোপনে সৎকার করে দেওয়া হয় ওইসব মৃতদেহ। তাই সরকারি নথিতে বছরের পর বছর জীবিতই থেকে যায় মৃতরা। আর তাদের নামে বরাদ্দ রেশন , সহ বিভিন্ন সরকারি সাহায্য ধারাবাহিক ভাবে লোপাট হতেই থাকে।
এবারে ভবানীকে না পেয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপর।সবাই বলাবলি করতে শুরু করে , স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার থাকলে আজ ছেলেটাকে হারাতে হত না। আগে এর চেয়ে কত বড়ো বড়ো অসুখ সেরেছে। ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা না থাকা সমান। আমরাই স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়তে জমি দিয়েছিলাম। চলো ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে সেই জমি ফিরিয়ে নিই। সেই কথা শোনা মাত্রই একদল লোক কুড়ুল, গাঁইতি, শাবল যে যেখানে হাতের কাছে যা পায় তাই নিয়ে উন্মত্তের মতো ছুটে যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে। প্রিয়ও মানে গ্রামের মানুষের ক্ষোভ থাকাটাই স্বাভাবিক।নিজেদের দারিদ্রতা স্বত্ত্বেও একদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়তে শুধু জমিই নয় , স্বেচ্ছাশ্রমও দিয়েছিলেন গ্রামের মানুষ।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বড়ো সড়ো অসুখ বিসুখ নিরাময়ের আশা নয় , তারা আশা করেছিলেন জ্বরজ্বালা , পেটের রোগ, সাপে কাটা, বিষ খাওয়ার চিকিৎসাটুকু তারা পাবেন। বড়ো কিছু রোগ ব্যাধি হলে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের তো ভগবানই ভরসা। কিন্তু বছরের পর বছর প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে ডাক্তারের দাবি জানিয়েও কোন কাজ না হওয়ায় গ্রামবাসীদের মনে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়েছিল। চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় শিশুটিকে মরতে দেখে সেই ক্ষোভের আগুনে যেন ঘি পড়ে। কিন্তু এভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর করে কোন লাভ হবে না তা ভালোই জানে প্রিয়। সরকারকে দেওয়া জমি তো সহজে ফিরবেই না , ফিরলেও সে জমি চাষযোগ্য করার সামর্থ্য চাষিদের নেই। মাঝখান থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটাই উঠে যাবে।
সে তার আশঙ্কার কথা ঋজুদা, রাজুদা, স্কুলের সহপাঠীদের জানায়। তাদের বলে , যে কোন মূল্যে আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বাঁচাতেই হবে। তারপর সবাইকে নিয়ে তারাও ছোটে স্বাস্থ্যকেন্দ্র অভিমুখে। ততক্ষণে উন্মত্ত গ্রামবাসীরা জি,ডি,এ অজিতবাবুকে ধরে টানাহ্যাঁচড়া শুরু করে দিয়েছেন। যত রাগ গিয়ে আছড়ে পড়ে তার উপরে। বেচারি অজিতবাবু বুঝতে পারেন না তার কি অপরাধ। তিনি একাই পড়ে রয়েছেন স্বাস্থ্যকেন্দ্র আগলে। তিনি আছেন বলে তবু এখনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দরজা-জানলাগুলো আছে। সে কথা বলতেই গ্রামের মানুষগুলো ঝাঁ - ঝাঁ করে উঠে। সরকারের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা না থাকার সমান। ততক্ষণে কিছু লোক দরজা- জানলায় কোপ বসাতে শুরু করেছে। প্রিয় দ্রুত তাদের সামনে গিয়ে হাত জোড় করে বলে -- শুনুন এভাবে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করবেন না। মনে রাখবেন সরকার কোন ব্যক্তি নয়। সরকার মানে আমরা। তাই এই সম্পত্তির ক্ষতি হলে সেটা আমাদেরই ক্ষতি হবে।
সঙ্গে সঙ্গে জনতা গর্জে ওঠে -- যে সম্পত্তি কোন কাজেই লাগে না তা থেকেই বা কি লাভ ?
--- যাতে কাজে লাগে আমাদের সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে। আপনারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙার জন্য যেভাবে এককাট্টা হয়েছেন সেই ভাবেই যদি ডাক্তারের দাবিতে সোচ্চার হন তাহলে কিছু সুরাহা হবে বলেই আমার মনে হয়।
উপস্থিত জনতা সমস্বরে প্রিয়কে বলে -- বেশ তুমি তো বাইরে ঘোরা ফেরা কর। অনেকের সঙ্গেই আলাপ পরিচয় রয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কি ভাবে ডাক্তার আনা যায় তার পথ বের করো । আমরা তোমার সঙ্গে আছি।
--- ঠিক আছে আগে আমরা সুবলের ছেলের সৎকারের ব্যবস্থা করি। এবারে ভবানী ডাক্তারের কাছে থেকে কোন টাকা নেব না। নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে সৎকার করব।
তার কথা শুনে গ্রামবাসীদের মধ্যে দ্বিমত তৈরি হয়। বেশিরভাগ মানুষ তাকে সমর্থন জানালেও কয়েকজন তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তারা বলে -- ভবানী ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার জন্য সুবলের ছেলের মৃত্যু হয়েছে , তাহলে ওর কাছে থেকে টাকা নেওয়া হবে না কেন ?
প্রিয় তাদের বলে, এভাবে টাকা দিয়ে পার পাওয়া যায় বলে ভবানী ডাক্তারের সাহস বেড়ে গিয়েছে। আমরা যদি টাকা না নিই তাহলে ও ভয় পাবে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহসটা কমে যাবে। আমরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার আনার পাশাপাশি ভবানী ডাক্তাদের ডাক্তারির নামে মানুষ মারার কারবার বন্ধ করে দেব।
যুক্তিটা মনোঃপুত হয় সবার। সবাই বলে , তবে তাই হোক। সুবলের ছেলেকে নিয়ে শ্মশানে পৌঁছোয় তারা। চোখের সামনে চিতার লেলিহান শিখা গ্রাস করে নেয় ফুলের মতো ছোট্ট শিশুটিকে। সেই চিতা ছুঁয়ে সবাই প্রতিজ্ঞা করে , আর কাউকে এভাবে বিনা চিকিৎসায় মরতে দেবে না তারা।
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment