Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৮০





         অন্তরালে 



                  অর্ঘ্য ঘোষ 




   ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 




প্রিয়দের বাড়ির দরজায় মোটর বাইক থেকে নেমে বৈশাখী সৌমিককে বলে , তুমি একটুক্ষণ বাইরে অপেক্ষা কর।আমরা পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করে যখন ডাকব তখন ভিতরে যাবে।সেই মতো সৌমিককে রেখে সবাই বাড়ির ভিতরে যায়। মালা তখন রান্না ঘরে কোন কাজে ব্যস্ত ছিল। আচমকা এক মহিলাকে নিয়ে দরজায় পিসেমশাই আর আর্য জ্যেঠুকে ঢুকতে দেখে অজানা আশংকায় তার বুকটা ধক করে ওঠে। বাবা - দাদারা সব বোলপুরে। তাহলে জ্যেঠুরা এসময় পিসেমশাইকে নিয়ে  তাদের বাড়িতে কেন ? বিপদ-আপদ কিছু হলো না তো ? উদ্বেগ চেপে রেখে সে বলে -- আসুন জ্যেঠু , হঠাৎ আপনারা এ সময় কোথা থেকে ? বাবা -- দাদার কিছু হয় নি তো ? 
আর্যর পরিবর্তে বৈশাখী বলে ,  না রে বাবা না , কারও কিচ্ছু হয় নি। কেন মেয়ের কাছে আসতে কি আবার সময় অসময় লাগে নাকি ? 
---- না - না , তা কেন ? আপনি নিশ্চয় জ্যাঠাইমা ? বলেই তাকে প্রনাম করে মালা।। 
বৈশাখী তাকে বুকে টেনে নিয়ে  বলে , মাকে চিনতে মেয়ের আমার এত সময় লাগল ? 
--- জ্যেঠুর সঙ্গে আপনাকে দেখেই আমি আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে আপনাদের সঙ্গে পিসেমেশাইকে দেখে বাবা-দাদার  বিপদের আশঙ্কায় সব যেন কেমন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল।
---- বালাই ষাট , বিপদ আপদ হতে যাবে কেন ? তোমার কথা জ্যেঠুর মুখ থেকে খুব শুনেছি। তুমি নাকি একাই দশভুজা হয়ে সবদিক সামলাচ্ছ। তাই আমার সেই দশভুজা মাকে দেখতে চলে এলাম।
--- ধ্যাত, জ্যেঠু সব বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেছেন। তবে এক হিসাবে ভালোই করেছেন। বাড়িয়ে বলেছিলেন বলেই না মায়ের দেখা পেলাম। বসুন আপনারা , আমি চা করে আনি।
--- না মা, তোমার বাড়িতে বসতে তো পারব না ?
---- কেন কি করছি আমি ? 
---- তুমি আমার ছেলেকে কষ্ট দেবে আর আমি তোমার কাছে কি করে বসি বলো ? 
বৈশাখীর কথায় ভ্রু কু্ঁচকে যায় মালার। সে কথার কোন  মাথামুন্ডু খুঁজে পায় না। 
তাই জিজ্ঞেস করে -- আমি আপনার ছেলেকে কষ্ট দিয়েছি ? 
---- হ্যা, এখনও দিচ্ছ।
---- আমি কি করে আপনার ছেলেকে কষ্ট দেব ? তাছাড়া দাদার মুখে শুনেছি আপনাদের তো একটাই মেয়ে।
---- জন্ম না দিলে বুঝি মা হওয়া যায় না ? এই যে তোমার দাদাকে, তোমাকে আমি জন্ম দিই নি তাহলে কি তোমরা আমার সন্তান নও ?
---- না - না , আপনি আমাদের মায়ের মতো।
---- তেমনি বাইরে একজনকে দাঁড় করে রেখে এসেছি , সেও আমার একটা ছেলে।
---- ওমা তাহলে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন কেন ? ভিতরে ডাকুন , কিন্তু তেমন আমি কাউকে কষ্ট দিয়েছি বলে তো মনে হয় না।
--- তোমাদের বাড়ি। ভিতরে ডাকতে হয় তো গিয়ে তুমিই ডেকে আনো। আর দেখ তাকে তুমি কষ্ট দিয়েছ কিনা ?




                 সেই কথা শুনে ছুটে বাইরে যায় চৈতী। দরজার বাইরে পা রাখতেই যেন হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। এ কাকে দেখছে সে ? মনে মনে সে এতদিন তারই প্রতীক্ষায় দিন গুনেছে। তাই অদুরেই সৌমিককে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু অভিমান তার পা দুটো যেন আটকে রাখে। সৌমিককে অনেক দুরের মানুষ মনে হয় তার। কিছুতেই সেই দুরত্বটা অতিক্রম করতে পারে না সে। তাই বাড়ির ভিতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। সেটা দেখে সৌমিক মুখ তুলে বলে -- বাড়ির ভিতরে যেতে বলবে না ? 
সেই কথা শুনে মুখ ফেরায় মালা। সৌমিকের চোখে চোখ পড়ে যায় তার। আর সব কিছু ওলোট-পালট হয়ে যায়। রাগ অভিমান ভুলে বলে --- ভিতরে এসো।
মালার পিছনে সৌমিককে ঢুকতে দেখে হাসি ফোটে বৈশাখীর মুখে। মালাকে সে বলে -- কিরে মা আমার এই ছেলেটাকে চিনিস তো ? একে তুই কষ্ট দিয়ে নিজে কষ্ট পাস নি বল ?
কোন কথা বলতে পারে না মালা। লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয়। বৈশাখী তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে , মা রে ভুল মানুষ মাত্রেরই হয়। মানুষকেই সেই ভুল সংশোধন করে নিতে হয়। নাহলে দু'পক্ষকেই যে কষ্ট পেতে হয় রে মা।
সেই সময় আর্য বলে ওঠে, আর এই ভুল সংশোধনের অব্যর্থ দাওয়াই হচ্ছে ' উত্তম - সুচিত্রা ' থেরাপি। সেই থেরাপিই তো আজ কাজে লাগল। 
ওই কথা শুনে হাসি ফুটে ওঠে সৌমিকের মুখে। মালা আর্যর মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। আর্য বলে , মানেটা বুঝলে না তো ? কিন্তু মা আজ তো আমারও আর বোঝানোর সময় নেই। ছেলেমেয়ে দুটোর কলেজ থেকে ফেরার সময় হয়ে এলো। আমরা যাব তবে শঙ্খ বাবাকে নিয়ে ফিরতে পারবে। তুমি বরং মানেটা সৌমিকের কাছেই বুঝে নিও।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে তারা। বাইকে ওঠার আগে সৌরভকে কাছে ডেকে নেয় আর্য। মালার আর সৌমিকের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে শীঘ্রই আবার আসবে বলে বাইকে স্টার্ট দেয় সে। যেতে যেতে আর্য জিজ্ঞেস করে , মেয়ের হবু শ্বশুরবাড়ি কেমন দেখলে ?  
---- কেন ভালোই তো ?
---- না , একেবারে গ্রাম্য পরিবেশ। তার উপরে ধরো মালার বিয়ে হয়ে গেলে বাড়ি একেবারে ফাঁকা। তোমার মেয়ে এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারবে তো ? 
---- দেখ ভালোবাসা পেলে মেয়েরা সব পরিস্থিতিতেই মানিয়ে নিতে পারে।
---- সে আর জানি না। তোমাকে দেখেই তো সেটা বুঝেছি।
---- মানে ? 
---- মানে আমাদের যখন বিয়ে হয় তখন আমার চাকরি ছিল না। প্রেসে নামমাত্র বেতনে প্রুফ দেখার কাজ করতাম। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো হাল ছিল সংসারে। তবু হাসিমুখে তুমি সব সামলে নিতে কিসের জন্য ? 
--- এই তুমি আমাকে  ভালোবাসো ? 
স্ত্রীর গলায় রোমান্সের ছোঁওয়া পায় আর্য। সে গুনগুনিয়ে ওঠে -- ' ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে।' তার গান শেষ হতেই বৈশাখীও মাথাটা স্বামীর পিঠে  এলিয়ে দিয়ে গেয়ে ওঠে -- ' এই পথ যদি না শেষ হয় --। '
তবু পথ শেষ হয়। গান শেষ হতেই তারা পৌঁচ্ছে যায় বাড়ির দোর গোঁড়ায়। বাইকের শব্দ পেয়ে দরজা খুলে দেয় চৈতী। কিছুক্ষণ আগেই কলেজ থেকে ফিরেছে তারা। বসার ঘরে বসে টিফিন খাচ্ছিল দু'জনে। তারা ভিতরে আসতেই চৈতী জিজ্ঞেস করে , তোমাদের সারপ্রাইজটা কি এবার বলা যাবে ? তারপর মায়ের মুখে ঘটনাটা শুনে বলে , বাব্বা এ যে একবারে সিনেমার মতো ব্যাপার দেখছি।
---- তোর বাবা তো নাম দিয়েছে ' উত্তম -- সুচিত্রা থেরাপি '।
---- উত্তম - সুচিত্রা থেরাপিই বটে।




                  কথাটা শুনে মনটা খুশীতে ভরে ওঠে শঙ্খর। সে তো ভেবেইছিল জ্যেঠু লাগলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কি বলে যে জ্যেঠু - জ্যাঠাইমাকে কৃতজ্ঞতা জানাবে তা ভেবে পায় না। সেদিনের মতো বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসে সে। চৈতী তাকে এগিয়ে দিতে এসে বলে , সাবধানে যেও। 
শঙ্খ ঘাড় ঘুরিয়ে হাসি মুখে বলে -- ঠিক আছে।
তারপরই  ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারের দিকে পা বাড়ায় শঙ্খ । সেখান থেকে বাবাকে নিয়ে বাড়ির ফেরার বাস ধরে। অনেকদিন পর বোনটার হাসিমুখ দেখতে পাবে ভেবে মনটা তার খুশীতে ভরে ওঠে তার। বাইরে থেকে কিছু বোঝা না গেলেও মালা যে মনমরা হয়েছিল তা শঙ্খর অজানা নয়।
শঙ্খ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই সোমনাথরা এসে পৌঁছোয়। তাদের নিয়ে দায়বদ্ধ- এর পরবর্তী সংখ্যার বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে আর্য। শুরুতেই সে বলে , আমার মনে হয় আমাদের পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা যদি আলাদা আলাদা একটি করে বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয় তাহলে পাঠকের কাছে সমাদর পাবে।
সোমনাথ বলে, গুড আইডিয়া দাদা।
---- তোমরা কি সেই রকম কোন বিষয়ের কথা বলতে পারবে ? 
কেউ কোন উত্তর দেয় না।  সবাই আর্যর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাই দেখে আর্য বলে , ঠিক আছে আমি এ সপ্তাহের একটা বিষয় প্রস্তাব করছি। তোমরা ভেবে বলো কেমন হবে ? 
---- কি প্রস্তাব দাদা ?
---- এ সপ্তাহে যদি আমরা শিক্ষা দফতরের বঞ্চনা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সংখ্যা করি কেমন হয় ? 
আর্যর কথা শেষ হতেই চন্দন বলে ওঠে , খুব ভালো হবে দাদা। বিশেষ করে পার্শ্বশিক্ষকদের বঞ্চনা নিয়ে লেখা হলে খুব ভালো  সাড়া পড়বে। সব মহলে এখন বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।
---- ঠিক ধরেছ। আমাদের বাছতে হবে গুরুত্ব না পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ খবর।
--- সেটা কি রকম দাদা ? 
--- লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবে একই প্রতিষ্ঠানে একই কাজ করে সমযোগ্যতা সম্পন্ন পার্শ্বশিক্ষকরা স্থায়ী শিক্ষকের তুলনায় বেতন পান অনেক কম। অন্য কোন সুযোগ সুবিধাও তারা পান না। তাই তাদের সংসারে নিত্য অভাব। 
---- যা বলেছেন দাদা। আমাদের পাড়াতে একই স্কুলের স্থায়ী এবং পার্শশিক্ষক থাকেন। স্থায়ী শিক্ষকের দোতলা বাড়ির ঘরে ঘরে এ,সি আর পার্শ্ব শিক্ষকের চালে খড় জোটে না।
---- তাহলেই বোঝ এদের বঞ্চনার জ্বালাটা কত তীব্র। অথচ উচ্চবাচ্য করার উপায় নেই। তাহলে চাকরি ' নট ' হয়ে যাবে। আমাদের লেখনীতে তাদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরতে হবে।
---- তাহলে দাদা  পার্শ্বশিক্ষকদের পরিবার আমাদের দুহাত তুলে আর্শিবাদ করবে।
---- সেই আর্শিবাদকে পাথেয় করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের দ্বিচারণ নীতির কথাও থাকবে এই সংখ্যায়।
---- সেটা কি রকম দাদা ? 
---- এখন দেখবে বিভিন্ন নতুন স্কুলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অস্থায়ীভাবে নিয়োগ করা হচ্ছে।
---- হ্যা তা হচ্ছে বটে।
---- সরকারি নীতি অনুযায়ী ৬০ বছর বয়সের পর আর পড়ানোর ক্ষমতা নেই ধরে নিয়েই অবসরের নিয়ম চালু হয়েছে।তাহলে কোন যুক্তিতে বেকারদের বঞ্চিত করে তথাকথিত অকর্মণ্য হয়ে যাওয়া শিক্ষকদের নিয়োগ করা হচ্ছে ? 
আর্যর কথা শেষ হতেই সবাই হাততালি দিয়ে বলে ওঠে -- ফাটাফাটি হবে দাদা। এই সংখ্যাও লোকের হাতে হাতে ঘুরবে। সেই কথাই সত্যি হয়।



                    ( ক্রমশ ) 




     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---

No comments:

Post a Comment