Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৮১






           অন্তরালে 



                       অর্ঘ্য ঘোষ 



     ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 




সবাই মিলে দিনরাত এক করে খেটে সাত দিনের মাথাতেই তারা পাঠকের হাতে তুলে দেয় 'দায়বদ্ধ'র দ্বিতীয় সংখ্যা। আর তারপরেই ব্যাপক সাড়া পড়ে যায় পাঠক মহলে। সব জায়গা থেকে প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে। প্রথম ফোনটা পার্শ্বশিক্ষক সংগঠনের জেলা  সম্পাদক বৃন্দাবন মন্ডলের কাছে থেকে আসে। তিনি বলেন , ধন্যবাদ জানিয়ে আপনাকে ছোট করতে চাই না। সত্যি বলতে কি আমাদের  বঞ্চনার কথা এর আগে কেউ এভাবে তুলে ধরে নি। সাপ্তাহিক সংবাদপত্র চালাতে কি সমস্যা হয় আমরা জানি। আমাদের সামর্থ্যও  সীমিত। তাস্বত্ত্বেও বলছি যদি কখনও কিছু প্র‍য়োজন হয় আমাদের জানাতে দ্বিধা করবেন না। দেখবেন কোনক্রমেই ' দায়বদ্ধ ' যেন বন্ধ হয়ে না যায়।
--- আপনারা এভাবেই সদিচ্ছা নিয়ে পাশে থাকলে আমরা ঠিক পথ চলতে পারব। প্রয়োজন হলে নিশ্চয় আপনাদের জানাব। 
ওসি প্রণববাবুও একই কথা বলেন। এবার অবশ্য আর্য কাগজ নিয়ে মনোহরপুর যেতে পারে নি। সোমনাথকে দিয়ে ওখানে কাগজ পাঠিয়ে দিয়েছিল। ওসি , ডাক্তারবাবু আর গঙ্গাধরবাবাজীর কাছেও কাগজ পৌঁছে দিতে বলেছিল। সেই কাগজ হাতে পেয়েই ফোন করে ওসি বলেন -- আরে মশাই করছেন কি ? আপনি তো দেখছি দৈনিক কাগজগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেবেন। সময় করে একদিন আসুন। পুলিশ মহলেও কিন্তু বঞ্চনা কম নেই। সব বলব আপনাকে। দেখবেন একটা ভালো সংখ্যা হবে।
--- নিশ্চয় ,  খুব শীঘ্রই আসছি।
বিষয়টি আর্যরও অজানা নয়। পুলিশ বিভাগেও হোমগার্ড, এন,ভি এফ'দের দিয়েও পুলিশের মতোই কাজ করানো হয়। কিন্তু তারা ' নো ওয়ার্ক - নো পে ' হিসাবে বেতন পান। অবসরকালীন কোন সুবিধাও তারা পান না। স্থায়ী পুলিশদের ক্ষেত্রেও বদলি কিম্বা প্রমোশন নিয়ে বঞ্চনা হয়। শাসকদলের নেতাদের তেল দিতে না পারলে যোগ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও প্রমোশন কিম্বা সুবিধাজনক জায়গায় বদলি হয় না। বিষয়টি নিয়ে একটা সংখ্যা করবে বলে ঠিক করে সে।বিকালের দিকে ফোন আসে হাসপাতালের ডাক্তারবাবুর। তিনি বলেন , সত্যি বলতে কি আপনার মুন্সীয়ানায় সাধারণ বিষয় অন্য মাত্রা পেয়েছে। আমি 'দৈনিক অন্তরালে' পত্রিকায় লেখা খবর পড়েছি। কিন্তু সেই খবরে থেকে ' দায়বদ্ধ'র  আর্য ঘোষকে অনেক বেশি করে খুঁজে পাচ্ছি। আসলে দৈনিকে আপনার লেখনীর ঠিক স্ফুরণ ঘটত না। এভাবেই চালিয়ে যান। আমরা আপনার সঙ্গে আছি।
ডাক্তারবাবু কথাটা যুক্তিসঙ্গত বলে আর্যরও মনে হয়। সত্যি বলতে কি ' দৈনিক অন্তরালে ' পত্রিকায় কাজ করতে করতে সে হাঁফিয়ে উঠেছিল। প্রতিদিন কাগজের পাতা ভরানোর জন্য হাবিজাবি ফরমায়েশি খবর লিখতে হত।  সব সময় ' কি লিখব -- কি লিখব ' চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেত। চিন্তাভাবনার কোন অবকাশই মিলত না। তাই আর ওই কাজে কোন আনন্দ খুঁজে পেত না। অথচ একদিন ভালোবেসেই এই কাজে ঢুকেছিল সে।কাজটা ছাড়তে তার খুব কষ্ট হয়েছিল। ' দায়বদ্ধ ' এখন তার সেই কষ্টটা অনেকখানি ভুলিয়ে দিয়েছে। শুধু কিছুটা আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তার পরিবারে। একটা স্থায়ী আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার সামলাতে বেকায়দার মধ্যে পড়েছে বৈশাখী। কিন্তু 
তাকে কিছু বুঝতে দেয় না। নিজের বেতনের টাকায় কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে সংসার চালিয়ে নেয়।




                                            এমনিতে বৈশাখীর বেতনে তাদের তিনজনের সংসারে সংকট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু প্রিয়র চিকিৎসা , শঙ্খর পড়াশোনার খরচ বৈশাখীকে তার বেতনের টাকা থেকেই চালাতে হয়। তাই সংকট সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবু তার কোন বিরক্তি নেই , বরং হাসিমুখেই সব সামাল দেয়। লোকে বলে , তার নাকি স্ত্রী ভাগ্য খুব ভালো। আর্যও সেটা অস্বীকার করতে পারে না।বৈশাখী পাশে ছিল বলেই বহু প্রতিকূল পরিস্থিতি সে পেরিয়ে আসতে পেরেছে। এই তো সেদিন বৈশাখী ছিল বলেই না মালা-সৌমিকের ভুল বোঝাবুঝিটা অত সহজে দুর করা সম্ভব হয়েছে। সংসারের ক্ষেত্রেই বৈশাখী কার্যত যেদিকে জল পড়ে সেদিকেই ছাতা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের গায়ে কোন আঁচ লাগতে দেয় না। সংসার নিয়ে কিছু ভাবতে না হলেও প্রিয়র ব্যাপারটা ইদানীং তাকে কিছুটা দুর্ভাবনায় ফেলেছে। প্রিয়র বকেয়া টাকার ব্যাপারে দরখাস্ত করা বেশ কিছুদিন হয়ে গেল। কিন্তু প্রশাসনের কোন সাড়াই মেলে নি। আর্য বার কয়েক জেলাশাসক, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের দফতরে ছোটাছুটি করে শুধু ' হচ্ছে হবে ' আশ্বাস শুনে এসেছে।তাকে ওইভাবে দৌড়ঝাঁপ করতে দেখে প্রসেঞ্জিতদা একদিন তাকে নিজের ঘরে ডেকে বলেন , আপনাকে একটা কথা বলি আর্যবাবু , এভাবে টাকা আদায় করতে গিয়ে পরমায়ু ক্ষয় হয়ে   যাবে। সরকার সহজে এইসব পাওয়াগন্ডা মেটাতে চায় না। 
--- তাহলে উপায় ?  
--- আপনি আদালতের আশ্রয় নিন।
--- নিজের হকের টাকা পেতেও আদালতে যেতে হবে ? 
--- কি করবেন , করার কিছু নেই। যে দেশের যা দস্তুর। এ  অফিসে আমার চাকরি করা তো কম দিন হলো না। আপনার মতো কত মানুষকে ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে হাল ছেড়ে দিতে দেখলাম। আবার আদালতের গুঁতো খেয়ে কত লোককে সুড়সুড় করে টাকা মিটিয়ে দিতেও দেখেছি।সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি এখানে ঘোরাঘুরি না করে আদালতে যান।
--- কিন্তু যাদের আদালতে যাওয়ার সামর্থ্য নেই তাদের কি হবে ? 
---- ওই যে বললাম ঘুরে ঘুরে জুতোর সুকতলা খুঁইয়ে হাল ছেড়ে দিতে হবে। তারপর আপনাদের তো আবার চাকরি ফেরানোর ব্যাপার আছে , আদালতে যেতেই হবে। কালেভদ্রে পাওনা-গন্ডা যদিও বা পাওয়া যায় , কেড়ে নেওয়া চাকরি সরকার সহজে ফিরিয়ে দেয় না।প্রসেঞ্জিতদা জেলা স্বাস্থ্য দফতরের হেড ক্লার্ক। অভিজ্ঞ মানুষ।বহু ঘাটের জল তার পেটে রয়েছে। তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের চেনাশোনা। তাই তার পরমর্শটা উড়িয়ে দিতে পারে না সে। তাছাড়া তার নিজের অভিজ্ঞতাও কম নেই।সে নিজেও তো কতবার ' পাওনা দেয়নি সরকার , আদালতের দ্বারস্থ শিক্ষকের বিধবা স্ত্রী ' কিম্বা   'আদালতের রায়ে কাজে ফিরলেন বরখাস্ত শিক্ষক ' শীর্ষক সংবাদ করেছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তার মনে কয়েকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। যারা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে না তাদের কি হয় ? আদালতেও কি সবক্ষেত্রে সুবিচার মেলে ? পাওনা গন্ডার কথা না হয় বাদই দেওয়া গেল। অনেকক্ষেত্রে নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি বছর খানেক সাজা খাটার পর উচ্চ আদালতে গিয়ে বেকসুর খালাস পেয়ে গিয়েছেন এমন নজির অনেক আছে। স্বাভাবিক ভাবেই যে প্রশ্নটা সামনে চলে আসে তা হলো , যদি ওই ব্যক্তি উচ্চ আদালতে যেতে না পারতেন তাহলে কি হতো ? যারা নিম্ন আদালতের রায় শিরোধার্য করে নিয়ে বছরের পর বছর সাজা খেটে চলেছেন তারা উচ্চ আদালতে গেলে বেকসুর খালাস পেতেন না তো ? নিম্ন আদালতের রায়ে সাজা খাটা দিনগুলো কি আর কোনদিন ফিরে পাবে সাজাপ্রাপ্ত ? যদি ঘটনাটি ফাঁসির মতো চরমতম দন্ডের ক্ষেত্রে ঘটে যায় ? প্রশ্নগুলো তার মাথায় ঘুরপাক খেতেই থাকে।





                                                     দুশ্চিন্তা গ্রাস করে নেয় তাকে। উচ্চ আদালতে যাওয়া তো আর মুখের কথা নয়। ভালোরকম খরচখরচার ব্যাপার আছে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মন নিয়েই সে সুশোভনবাবুর চেম্বারে পৌঁছোয়। রোগী দেখা শেষ করে ডাক্তারবাবু তখন চেম্বারে একাই বসেছিলেন। তাকে দেখে বলেন , এসো এসো তোমার কথাই ভাবছিলাম। একটা ভালো খবর আছে।
---- ভালো খবর ? 
---- হ্যা , প্রিয় খুব দ্রুত স্বাভাবিকতা ফিরে পাচ্ছে। দাগ - দাগ বাতিকটা আর নেই। এমন কি ওর করা পরীক্ষার রিপোর্টের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে অন্য কর্মীদের পরীক্ষার রিপোর্ট।
--- এটা সত্যিই খুব ভালো খবর দাদা।
---- ওর ডাক্তার কিশোরকেও বিষয়টা জানালাম। সে বলল  মাস কয়েকের মধ্যেই প্রিয় পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে। তারপরই ও ' ফিটনেস ' সার্টিকেট দিয়ে দেবে।
---- তাহলে খুব ভাল হয়। ওটার জন্যই উচ্চ আদালতে যেতে পারছি না।
---- উচ্চ আদালতে ? 
---- হ্যা , প্রিয়র প্রাপ্য টাকা পয়সা তো সরকার এমনিতে দেবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই একেবারে প্রাপ্য টাকা পয়সার পাশাপাশি চাকরির দাবিতে উচ্চ আদালতে মামলা করব ভাবছি।
---- খুব ভাল সিদ্ধান্ত। কিন্তু উচ্চ আদালত খরচাপাতিও উচ্চ রকমেরই হয় বলে শুনেছি। সব কিছুই তো তুমি একা সামলাচ্ছ। মামলার ব্যাপারে আমাদেরও যেন প্রিয়র পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দিও।
---- নিশ্চয়। দরকার হলে তো আপনাদের তো বলতেই হবে। সব কিছু একা আর কোথায় সামলাচ্ছি ? আপনি চিকিৎসার ব্যবস্থা করে না দিলে প্রিয় এত তাড়াতাড়ি স্বাভাবিকতার পথে ফিরতে পারত না।
বাড়ি ফিরে কথাটা স্ত্রীকে বলে আর্য। শুনে বৈশাখী তো উচ্ছ্বসিত। সে বলে , আমি জানতাম তোমার প্রচেষ্টা সফল হবেই।
---- এটা তোমার বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। আমিই যেখানে স্থিরতা পাচ্ছিলাম না সেখানে তুমি কি করে নিশ্চিত হতে পেরেছিলে ? 
---- না গো বাড়াবাড়ি নয়। বিয়ে হওয়ার পর থেকেই তো দেখছি তুমি কারও ভালো ছাড়া খারাপ করনি। তাই তোমার অন্যের ভালো করতে চাওয়ার প্রচেষ্টা কিছুতেই ঠাকুর বিফলে যেতে দিতে পারেন না।
স্ত্রী কথা শুনে তার মুখের দিকে মুগ্ধ বিষ্ময়ে চেয়ে থাকে আর্য। সব কাজে এভাবেই তাকে প্রেরণা যুগিয়ে এসেছে বৈশাখী। আজও তার অন্যথা হয় না। উচ্চ আদালতে খরচের ব্যাপারে দুশ্চিন্তার কথা শুনে তার কাছে সরে এসে -- বলে তুমি অত ভেব না তো। ম্যায় হু না ?  
স্ত্রীর কথা বলার ঢঙে মজা পায় আর্য। সে'ও মাঝে মধ্যে কেউ কোন সমস্যা নিয়ে এলে তাকে আশ্বস্ত করতে ওইভাবে কথা বলে। সেটা রপ্ত করে বৈশাখীও মাঝেমধ্যে কথাটা তাকে শোনায়। স্ত্রীর কথা শুনে আর্যও মজা করে বলে , তুমি কিন্তু আমার থেকে ধার করে কথাটা বললে।
---- তোমার থেকে ধার নেব না তো কার কাছে নেব মশাই। তুমিই তো আমার মহাজন গো। সেই মহাজনকে আমি অন্য কারও কাছে হাত পাততে দেব না।
---- কিন্তু তুমি একেই সব দিক সামলাচ্ছ , তার উপরে মামলার খরচের টাকা কোথায় পাবে ? 
---- আছে মশাই আছে। বিপদ আপদের জন্য সব মেয়েদেরই একটা গোপন সঞ্চয় থাকে। আমারও আছে। তাতেও না হলে গয়নাগুলো তো আছে।
--- সে কি , তুমি মামলা করতে গয়না বিক্রি করবে নাকি ? 
---- কেন , তুমি যে কাজের জন্য সর্বস্ব পণ করতে পারো আর আমি তোমার স্ত্রী হয়ে সামান্য গয়না বিক্রি করতে পারব না ? 
---- না , মেয়ের বিয়ে কিম্বা নিজের ভবিষ্যত বলে তো একটা কথা আছে।
---- দেখ, আমাদের তো একটাই মেয়ে। আমাদের যা থাকবে তা তো মেয়ে -জামাই'ই পাবে। মেয়ে যাকে মন দিয়ে বসে আছে তারই বাবা অর্থাভাবে কষ্ট পাবে আর আমি বুঝি ভবিষ্যতের  ভাবনায় গয়নাগুলো বাক্সে ভরে রেখে কবে কি হবে সে দিকে তাকিয়ে থাকব ? আর ভবিষ্যতের কথা বলছ ?  আমার ভবিষ্যত তো তুমিই গো।
কথাগুলো শুনে আর্যর নির্বাক হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। বৈশাখী স্বামীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে -- কি গো অমন করে চেয়ে আছো কেন , আমি কি কিছু ভুল বললাম ? 
আর্য এবারও কোন জবাব দেয় না। স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে ধরে। গভীর সেই আলিঙ্গনে তারা একে অন্যের বুকের স্পন্দন টের পায়।




         ( ক্রমশ ) 



     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---


No comments:

Post a Comment