Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৮২






          অন্তরালে 



                      অর্ঘ্য ঘোষ  



      (  ধারাবাহিক উপন্যাস ) 






ওই ভাবেই  অনুভবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায়। সেই সময় দরজার কড়া নড়ে ওঠে। আর স্বামীর আলিঙ্গন ছেড়ে ছিটকে সরে যায় বৈশাখী। তার মনে হয় চৈতীরাই কলেজ থেকে ফিরেছে। কারণ চৈতী সাধারণ কলিংবেল বাজায় না।সে কড়াই নাড়ে। তার একটা কারণও আছে। চৈতী তখন বেশ ছোট্ট। প্রাইমারী স্কুলে পড়ে। তার সঙ্গেই স্কুল থেকে ফিরত। কলিংবেলের সুইচটা ছিল চৈতীর নাগালের বাইরে। তুলনায় দরজার কড়াটা ছিল নীচে। সে সুইচে হাত ছোঁওয়ানোর আগেই চৈতী তাড়াতাড়ি দরজার কড়াটা নাড়িয়ে দিত।
শঙ্খও ডায়রিটা ছিনিয়ে  নেওয়ার জন্য তার পিছনে ছুটতে ছুটতে এসে বলে --- ডায়রিটা আমার হাতে দিয়ে দাও। নাহলে ভালো হবে না বলছি।
চৈতি ততক্ষণে বাবার হাতে ডায়রিটা তুলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখ পাকিয়ে বলে , কি ভালো হবে না ? আজ তোমার হচ্ছে দাঁড়াও। বাবা সেদিন আমি যা বলেছিলাম তা সত্যি কিনা মিলিয়ে দেখে নাও।
ছেলেমেয়ে দুটোর কান্ড দেখে আর হেসে বাঁচে না বৈশাখী। যতদিন যাচ্ছে দুটোতে যেন আরও ছেলেমানুষ হয়ে উঠছে। যতক্ষণ একসঙ্গে থাকে খুনসুটি আর হুটোপাটিতে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখে। বৈশাখীর খুব ভালো লাগে। তাই সে ওদের সবসময় প্রচ্ছন্ন প্রশয় দেয়। এখনও তার অন্যথা হয় না।
প্রশয়ের সুরেই সে বলে , সারাক্ষণ দুটিতে হুটোপাটি করেও হচ্ছে না। কলেজ থেকে ফিরেই আবার বাবাকে স্বাক্ষী মানামানি শুরু করলি দুটিতে। যা হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নিবি আয়। এরপর শঙ্খকে তো আবার ফিরতে হবে।
--- কিন্তু আগে ফয়সালা হোক ,  তবে ওইসব হবে।
---- কিসের ফয়সালা ? মেয়েকে জিজ্ঞেস করে আর্য।
---- তুমি ডায়রিটা পড়ো আগে তাহলেই বুঝতে পারবে।
---- অন্যের চিঠি , ডায়রি পড়াটা উচিত নয়।
----- কিন্তু আমি তো পড়েছি।
----- সেটা ঠিক করো নি। বিশেষকরে যার ডায়রি তার যখন ঘোরতর আপত্তি রয়েছে।
----- হ্যা , বলুন তো জ্যেঠু। কলেজে পড়ছ  তুমি এই সেন্সটুকু নেই। আর্যর কথায় সমর্থন পেয়ে সাহস করে বলে শঙ্খ।
চৈতী ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। সেও চোখ পাকিয়ে বলে ---- অ্যাই তুমি চুপ করো তো। 
বাবাকে ভালোমানুষ পেয়ে স্বাক্ষী মানা হচ্ছে ? বাবাও তো আপত্তি করবেই। কিন্তু না পড়লে ও যে ডুবে ডুবে জল খায় তাতো জানতেই পারতাম না।
মেয়ের কথায় চমকায় বৈশাখী। তাহলে কি শঙ্খর অন্য কোন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ? সেই মেয়েটির কথাই কি ডায়রিতে লেখা ছিল। সেটা কোনও ভাবে চৈতীর হাতে চলে আসায় ছুটে বাবার কাছে নিয়ে এসেছে ? সেটার  সম্ভাবনাই বেশি। নাহলে শঙ্খই বা ডায়রিটা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য পড়িমরি করে ওর পিছনে পিছনে ছুটবে কেন ? কথাটা ভাবতেই মনটা বিষন্ন হয়ে যায় তার। চৈতী যে ইতিমধ্যে শঙ্খকে মন দিয়ে বসে আছে। খুব কষ্ট পাবে মেয়েটা। কষ্ট কি তারাও কম পাবে ?




             মেয়ের কথা শুনে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয় বৈশাখীর। যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিল মেয়েটা। চৈতীর উপরে খুব রাগ হয়ে যায় তার। কাছে গিয়ে মেয়ের মাথায় আলতো হাতের একটা চাঁটি বসিয়ে দিয়ে বলে , আচ্ছা মেয়ে তুমি, সামান্য একটা ডায়রি নিয়ে তুমি যা করলে আমি ভাবলাম কি না কি ? 
---- তা তুমি কি ভেবেছিলে ? 
----- সেটা আর তোমার জেনে কাজ নেই , তাড়াতাড়ি ফয়সালা করে খেয়ে নেবে এসো।রান্নাঘরের দিকে চলে যায় বৈশাখী। আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে আর্য বলে , তার মানে এটা কবিতার ডায়রি। পড়া যেতেই পারে কি বলছিস ?
---- তবে আর বলছি কি বাবা। কলেজে একা একা ডায়রিটা নিয়ে বসে লিখছিল। আমি চুপি চুপি গিয়ে যাকে বলে একেবারে বমাল সহ ধরে ফেলেছি। তাই দেখি ও কি করে পটাপট অন্তাক্ষরী মেলায়।
আর্য ততক্ষণে ডায়রিতে চোখ বোলাতে শুরু করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর শঙ্খকে বলে , বাহ্ তোমার লেখার হাতটি তো বেশ চমৎকার।
----- কি যে বলেন জ্যেঠু , যখন যা মনে আসে তা মনের খেয়ালে ডায়রিতে লিখি রাখি।
---- আরে এত লজ্জা-সংকোচের কি আছে ? লেখা তো মনের খেয়ালেই হয়।আগামী সপ্তাহ থেকে আমাদের কাগজে সাহিত্যের একটা বিভাগ রাখব ঠিক করেছি। তাতে প্রতি সপ্তাহে তোমার একটা করে কবিতা ছাপা হবে।শঙ্খ কোন জবাব দেয় না। চৈতীই বলে ওঠে , তাহলে আমি কেমন জহুরী বলো ? খাঁটি সোনাটা কেমন খুঁজে বের করলাম।
---- তুমি কার মেয়ে দেখতে হবে তো ? 
---- তাহলে আমি যোগ্য বাপের যোগ্য মেয়ে তাই তো নাকি ?  সেই যে বলে না বাপ কো বেটি।
---- সে আর বলতে।
বাবার কথার আর কোন প্রত্যুত্তর করে না চৈতী। সে শঙ্খর দিকে তাকিয়ে বলে , দেখো প্রশংসা শুনে তুমি আবার ফুলে যেও না। কথায় আছে অহঙ্কার পতনের মুল। নাকি বলো বাবা ? 
মেয়ের কথা শুনে শব্দ করে হেসে ওঠে আর্য। হাসতে হাসতেই বলে , তোকে নিয়ে আর পারা যায় না। প্রতিটি কথায় ফুট কাটা চাই তোর।
সেই সময় রান্নাঘর থেকে বৈশাখী বলে , কি রে তোদের ফয়সালা হল না আমি গিয়ে ফয়সালা করে দিয়ে আসব ? 
---- ওরে বাবা মূর্তিমতী স্বমূর্তি ধারণ করেছে। চলো চলো খেয়ে নিই , না হলে খেপচুরিয়াস ব্যাপার হয়ে যাবে।
আর্য লক্ষ্য করেছে চৈতী আড়ালে মাকে মাঝে মধ্যে মূর্তিমতী বলে। কি কারণে বলে তা অবশ্য জানে না। একদিন চৈতীকে জিজ্ঞেসে করতে হবে। তারও ওইরকম কোন নাম দিয়েছে কিনা কে জানে ? ছেলেমেয়ে দুটো ততক্ষণে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিয়েছে। আর্য শুনতে পায় যেতে যেতে চৈতী গুনগুনিয়ে গাইছে --- ' তোমার আমার জীবন বীণা একতারেতেই বাঁধা।' 





                                          আর্যর মনে হয় সুরে বাঁধতে পারলে জীবনটা কত সুন্দর হয়। বাড়ি ফেরার আগে প্রিয়র কথাটা শঙ্খকে বলে আর্য। শুনে শঙ্খ বলে , আমরাও কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছিলাম বাবা আবার আগের মতো হয়ে যাচ্ছে।
---- ডাক্তারবাবু বলেছেন শীঘ্রই প্রিয় পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবে। আর চিকিৎসার দরকার হবে না। উনিই সুস্থতার সার্টিফিকেট দিয়ে দেবেন। সেটা দাখিল করে চাকরিটা ফেরানো যায় কিনা দেখতে হবে।
---- খুব ভালো হবে জ্যেঠু।
---- আমার মনে হয় পুরোপুরি ভালো হয়ে যাওয়ার পরও যতদিন চাকরিটা ফেরত না পাওয়া যায় ততদিন ডাক্তারবাবুর ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারেই কাজ করা ভালো। কাজের মধ্যে থাকলেই ভালো থাকবে।
---- সে আপনি যেটা ঠিক করবেন সেটাই হবে।
সেদিনের মতো বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসে শঙ্খ। অন্যদিনের মতো তাকে এগিয়ে দেয় চৈতী। বাবাকে নিয়ে সেদিন খুশী মনে বাড়ি ফেরে শঙ্খ। মালাকে  কথাটা বলে। কপালে হাত ঠেকিয়ে মালা বলে , জ্যেঠু ভগবানের দুত হয়ে এসেছিলেন বলেই বাবাকে আবার আমরা আগের মতোই ফিরে পেতে চলেছি।
তারপর থেকেই শুরু হয় তাদের ফিরে পাওয়ার প্রতীক্ষা। বেশিদিন প্রতীক্ষা করতে হয় না। ডাক্তারবাবুর কথা মতোই মাস তিনেকের মাথায় পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে প্রিয়। তার বুকের ভিতরের অদৃশ্য দাগটা যেন মুছে দেয় সময়ের রাবার।  কপালের দাগটাও প্রায় মিলিয়ে আসে। সব দেখেশুনে কিশোরবাবু তাকে সুস্থতার সার্টিফিকেটও দিয়ে দেন।সেটা হাতে পেয়েই আর্য তার কাজ শুরু করে দেয়। প্রথমেই কিশোরবাবুর দেওয়া সুস্থতার সার্টিফিকেট সহ আরও একবার প্রশাসনের সকল স্তরে বকেয়া পাওনা এবং চাকরি ফেরতের দাবি সম্বলিত আবেদনপত্র জমা দেয় সে। কিন্তু যথারীতি কোন কাজ হয় না।কাজ যে হবে না সেটা জানাই ছিল আর্যর। তবু আবুল বারির পরামর্শেই আবেদনপত্র জমা দিতে হয়েছিল। আবুল বারি হাইকোর্টের প্রবীণ  আইনজীবি। ঘাঘু উকিল বলতে যা বোঝায় , তাকে বারের লোকেরা সেই হিসাবেই চেনেন। ব্যাপারটা ওসিকে বলেছিল আর্য। পরদিন ওসিই ফোন করে জানান , বললে তো আপনি আমাদের সাহায্য নেবেন না। হাইকোর্টে আমার চেনা খুব বড়ো একজন উকিল রয়েছেন। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। সব শুনে উনি কেবলমাত্র আদালতের খরচটুকু নিয়ে মামলা লড়তে রাজী হয়েছেন। আপনি একবার কথা বলে নিন।
আবুল বারির নাম আর্যও আগেই শুনেছিল। কিন্তু তার পারিশ্রমিক নাকি খুব বেশি। সব মামলা লড়েনও না। তাই মামলাটা কাকে দেওয়া যায় তা নিয়ে খুব দু:শ্চিন্তায় ছিল। ওসির কথায় সেই দুঃশ্চিন্তা  দুর হয় তার। ওসিকে বলে , এর চেয়ে বড়ো সাহায্য আর হয় নাকি ? উনি মামলা লড়লে রায় আমাদের পক্ষেই যাবে বলে মনে হয়।
---- বেষ্ট অফ লাক। কি হলো না হলো আমাকে জানাতে সংকোচ করবেন না যেন। লড়াইটা আমাদেরও।
---- অবশ্যই। 
ওসির কাছে থেকেই নম্বর নিয়ে ফোনে আবুল বারির সঙ্গে কথা বলে আর্য। তখনই উকিলবাবু বলেন , চাকরি ফেরতের দাবির আবেদনপত্র জমা দিয়ে রিসিভ নিন। তারপর সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে চলে আসুন।
সেইমতো একদিন সে প্রিয়কে নিয়ে কলকাতায় উকিলবাবুর চেম্বারে কাগজপত্র জমা দিয়ে আসে।


      ( ক্রমশ ) 




     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---


No comments:

Post a Comment