Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৮৩





          অন্তরালে 

 
                 অর্ঘ্য ঘোষ 




    ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 




উকিলবাবু সব দেখেশুনে বলেন , যত দ্রুত সম্ভব মামলার রায় করিয়ে দিচ্ছি।আশা করছি রায় আমাদের পক্ষেই যাবে। উকিলবাবুর কথায় এক বুক ভরসা নিয়ে বাড়ি ফেরে তারা। প্রিয়র মুখে সেইসব কথা শুনে  প্রশান্তকাকা , জীতেনকাকা সহ গ্রামের প্রায় সবাই খুশী হন। এমনিতেই প্রিয় স্বাভাবিকতা ফিরে পাওয়াতেই খুশীর আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল  মনোহরপুরে। প্রসাদ মোড়লরা জেলে যাওয়ার পরই অবশ্য খুশীর বাতাবরণটা সৃষ্টি হয়েছিল। শয়তান দুটো এখনও জেলে রয়েছে। পুলিশ ওদের বিরুদ্ধে আরও তিনটে মামলা করেছে। একটা মামলায় জামিন পেয়ে কোর্ট চত্বর থেকে বেরনো মাত্র আরও একটা মামলায় ধরে জেলে পুরে দিয়েছে। সেইজন্য গ্রামের মানুষ স্বস্তিতে রয়েছেন। তারা তাই বর্তমান ওসি প্রণববাবুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তবে সবকিছুই যে  আর্যর জন্য সম্ভব হয়েছে তা শুধু  মনোহরপুর নয় , আশেপাশের  মানুষজনও স্বীকার করেন। প্রিয়র কথা তো বলতেই নেই , তার মুখে শুধুই আর্যর স্তুতি। আর্যর জন্যই যে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছে তা জনে জনে বলে বেড়ায়। এখন সে আগের মতোই সেই রকম পরোপকারবৃত্তি শুরু করেছে। কারও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে কিম্বা কোন পরীক্ষা করাতে হলে তাদের নিয়ে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে দেয়।আবার আগের মতোই বাড়িতে বাড়িতে রিপোর্ট পৌঁচ্ছে দিয়ে আসে। হাসপাতালেই পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা স্বত্ত্বে কর্মী না থাকায় বাইরে পরীক্ষা করতে যেতে হচ্ছে বলে গ্রামের মানুষের আক্ষেপের অন্ত নেই। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই অভাবী। টাকা খরচ করে বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে গিয়ে তাদের ঘটিবাটি বিকিয়ে যায়। তাই তারা প্রিয়র কাজে ফেরার প্রতীক্ষায় দিন গুনতে থাকে। খুব বেশি দিন তাদের সেই প্রতীক্ষা করতে হয় না। মাস খানেকের মাথায় ভালো খবর নিয়ে ফোন আসে। ফোনটা প্রথম আসে আর্যর কাছে। সেদিন কলেজ ছুটি থাকায় শঙ্খ আসে নি বলে প্রিয়ও আসে নি। আর্য সুশোভনবাবুর চেম্বারে বসে গল্প করছিল।সেইসময়ই আবুল বারির ফোনটা আসে। উকিলবাবু জানান , আর্যবাবু খুব ভালো খবর আছে। মামলাটা আমরা জিতেছি। আদালত স্বাস্থ্য দফতরকে সাতদিনের মধ্যে সুদ সহ পাওনা গন্ডা এবং চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আজই অর্ডার বেরিয়ে গিয়েছে। কালই সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিতে পৌঁছে যাবে। দেখুন সাতদিনের মধ্যে কি হয়। নাহলে আবার আদালত অবমাননার মামলা করতে হবে। তবে তা আর করতে হবে বলে মনে হয় না।
খবরটা শুনে আর্য যেন আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়ে। আবেগে কথাই বলতে পারে না। কিচ্ছুক্ষণ পর আবেগ সামলে বলে , কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাব তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। খুব বড়ো একটা অপরাধবোধ থেকে আপনি আমাকে মুক্তি দিলেন। আমি শীঘ্রই আপনার বকেয়া টাকাটা পৌঁছে দিয়ে আসব।
---- ওটা নিয়ে আপনাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। প্রণববাবুর মুখে আমি সব শুনেছি। ধরে নিন আপনাদের ওই লড়াইয়ে আপনাদের সঙ্গে আমিও আছি।
উকিলবাবুর সঙ্গে কথা শেষ করে খবরটা সুশোভনবাবুকে জানায় আর্য। সুশোভনবাবু আর্যর পিঠ চাপড়ে বলেন , সাবাস ভাই তুমি দেখিয়ে দিলে লড়াই কি করে লড়তে হয়। তোমার জন্য গর্ব বোধ হচ্ছে।
--- দাদা , আপনারা সবাই পাশে ছিলেন বলে লড়াইটা লড়তে পেরেছি। 
---- এই লড়াইয়ে পাশে থাকতে পারাটাও যে ভাগ্যের ব্যাপার। বেশ খবরটা তো এখনই প্রিয়দের জানিয়ে দিতে হয়।
---- হ্যা , দাদা এখনই সবাইকে ফোনে ধরছি।
ওসি , হাসপাতালের ডাক্তারবাবুর পর ঋজুকে ফোনে ধরে আর্য। নবান্নের যাত্রা উপলক্ষ্যে মিটিং ছিল বলে প্রিয়ও তখন মাচানতলাতেই ছিল। খরবটা শোনার পরই ঋজু চিৎকার করে ওঠে --- আমরা মামলায় জিতে গিয়েছি। হিপ - হিপ - হুরে।




                                       আর্য শুনতে পায় আরও অনেক গলা থেকে ঝড়ে পড়ছে একই উচ্ছাস।উচ্ছাস সেদিন সব জায়গায়। বাড়ি ফিরে খবরটা দিতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ে বৈশাখীও। সে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে, ঠাকুর আমার কথা শুনেছেন।আদালতে মামলা দায়েরের পর থেকে ঠাকুরকে ডেকে চলেছি। বলেছি , ঠাকুর ওর মুখ রেখ। ওর বুকে জমে থাকা অবরাধ বোধের পাষাণভারটা তুমি নামিয়ে দিও।
---- সত্যি বৈশাখী, একটা অবরাধ বোধ আমার বুকে পাষাণভার হয়ে বসেছিল। আদালতের রায়ে সেই ভার কিছুটা হালকা হল। এবার ছেলেমেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়ে স্থিতু করে দিতে পারলে আমি পুরোপুরি ভার মুক্ত।
মুখে পুরোপুরি ভার মুক্ত হওয়ার কথা বললেও আর্য মনে মনে ভাবে পুরোপুরি পাষাণভার মুক্ত কি সত্যিই হতে পারবে ? পারবে কি শঙ্খ - মালার মাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে ? মেয়েটার সেই প্রশ্নটা যেন অহরহ শুনতে পায় আর্য। মনে হয় মালা যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে তীরের ফলার মতো সুতীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে -- পারবেন আমাদের মাকে ফিরিয়ে দিতে ? বলুন পারবেন -- পারবেন ?
ওই প্রশ্ন যেন তার বুকটা এফোঁড় ওফোঁড় করেই চলেছে। মাথার ভিতরটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করে ওঠে তার। সেটা নজর এড়ায় না বৈশাখীর। দ্রুত স্বামীর কাছে সরে গিয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে -- কি হলো হঠাৎ , শরীর খারাপ লাগছে ? 
---- না - না, শরীর খারাপ নয়। মনে হচ্ছে সবই তো হল , ছেলেমেয়ে দু'টোর মাকেও যদি ফিরিয়ে দিতে পারতাম !
---- ওই কথা ভেবে মন খারাপ কোর না। যে চলে যায় তাকে তো ফেরানো যায় না। তবু তুমি সাধ্যের বাইরে গিয়ে যা করেছ তা কতজন করে ? খবর তো সেদিন তুমি একা করনি , সবাই করেছিল। তোমার মতো কেউ আর ওদের কথা মনে রাখে নি। কেউ তো তোমার মতো করে ভাবেও নি। 
---- কিন্তু আমি যে ওদের মতো হতে পারি না। কারও বিপন্নতার কথা শুনলে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারি না।
--- সেই জন্যই তো তোমার মতো মনের মানুষকে স্বামী হিসাবে পেয়ে আমি গর্বিত।আমি খুব সুখী।
---- তোমাকে স্ত্রী হিসাবে পাওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার। তুমি সব সময় আমার পাশে থাকো বলেই আমি ওইসব কাজে প্রেরণা পাই। অথচ আমি তোমাকে সুখী করতে পারি না।
---- দেখ , সুখ এক এক জনের  কাছে এক এক রকম। কেউ স্বামীর কাছে আলমারি ভর্তি গয়না, শাড়ি পেলেই নিজেকে সুখী মনে করে। কেউ আবার স্বামীর জন্য বুক ভরা গর্ব অনুভব করতে পারলেই সুখী হয়। তোমার  জন্য আমার বুক গর্বে ভরে গিয়েছে। কিন্তু মশাই শুধু আমাদের সুখী হলেই হবে ? ওদের ব্যাপারটাও তো এবার দেখতে হবে নাকি ?
---- কাদের ব্যাপার ? 
---- মালার -- সৌমিকের বিয়ের ব্যাপারটা তো এবার দেখতে হবে তো নাকি ? ওদের চারহাত এক করে দিয়ে তবেই না চৈতীর বিয়ের প্রস্তাবটা শঙ্খর বাবাকে দিতে পারবে। শঙ্খরও ফাইন্যাল পরীক্ষা চলে এল। আমি বাপু ওর ফাইন্যাল পরীক্ষার পরই ওদের চারহাত এক করে দিতে চাই।
--- হ্যা , সে তো দেখতেই হবে। ভাবছি প্রিয়র ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হয়ে গেলেই ওদের গ্রামে যাব। প্রিয় আর সৌরভকে নিয়ে সৌমিকদের বাড়ি গিয়ে একেবারে সব ফাইন্যাল করে দিয়ে আসব।
---- সেটাই ভালো হবে। সাতটা তো মোটে দিন। দেখতে দেখতেই পেরিয়ে যাবে।




                   সাতদিনও দেখতে হয় না। পাঁচদিনের মাথায় বকেয়া পাওনার চেক সহ পুনঃনিয়োগের চিঠি পৌঁছে যায় প্রিয়র ঠিকানায়।খামটা খুলে দেখেই সঙ্গে সঙ্গে আর্যকে ফোন করে কথাটা জানায় প্রিয়। তার গলায় তখন কৃতজ্ঞতার ছোঁয়া।কৃতজ্ঞতার বহ্বিপ্রকাশ ঘটার আগেই আর্য তাকে নিরস্ত করে বলে , সাক্ষাতে সব কথা হবে। আগে আপনি কালই নিয়োগের চিঠিটা নিয়ে কাজে যোগ দিয়ে আসবেন। বিকালের দিকে আমি আর সোমনাথ আপনাদের গ্রামে যাচ্ছি। তারপর আপনি , আমি ,আর সৌরভ সৌমিকদের বাড়ি যাব।
---- সৌমিকদের বাড়ি ? 
---- বা রে , এবার মালার বিয়েটা দিতে হবে না , আর ঝুলিয়ে রাখলে হবে ?
--- কিন্তু ওরা তো সমন্ধটা ভেঙে দিয়েছে। মালাও বিয়ে করব না করে গোঁ ধরে বসে আছে।
আর্য বুঝতে পারে মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে ভেবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা কেউ প্রিয়র কানে তোলে নি।সেদিনের পর থেকে সৌভিকের ও বাড়িতে আগের মতোই যাতায়াত শুরু হলেও নিশ্চয় প্রিয়র চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। এই মুহুর্তে সে নিজেও দো'টানায় পড়ে যায়। বিষয়টা প্রিয় কেমনভাবে নেবে তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা শুরু হয় তার। তাকে না জানিয়ে আগবাড়িয়ে ভেঙে যাওয়া সমন্ধ জোড়া লাগানোর জন্য ছেলের বাড়িতে উমাদারি করতে যাওয়ায় তার আত্মসম্মানে ঘা লাগবে না তো ? পরক্ষণেই তার মনে হয় যা হওয়ার হবে। সে তো প্রিয়র ভালোই করতে গিয়েছিল। তাতে প্রিয় যদি রাগ করে তাহলে তার কিছু করার নেই। তাই সে সৌমিকদের বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারটা প্রিয়কে খুলে বলে। মালারও যে আর বিয়েতে আপত্তি নেই সেই কথাও গোপন করে না।সবটা শুনে প্রিয় বলে , আঃ বাঁচালেন। জেল থেকে ফেরার পর আমি প্রায় বোধবুদ্ধির বাইরে চলে গিয়েছিলাম। তবু যেটুকু সময় স্বাভাবিক থাকতাম তখনই  কানাঘুষোয় মালার বিয়ে ভেস্তে যাওয়ার কথাটা কানে এসেছিল। তারপর থেকে যতক্ষণ স্বাভাবিক থাকতাম ততক্ষণ  নিজেকে বড়ো অপরাধী লাগত। মেয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। সুস্থতা  ফেরার পর কতবার ভেবেছি সৌমিকদের বাড়ি গিয়ে ওর বাবা মায়ের হাতে পায়ে ধরে আবার তাদের বিয়েতে রাজী করাব। কিন্তু মেয়েটার আত্মসম্মানে ঘা লাগবে বলে যেতে পারি নি। আপনি নিজে উদ্যোগী হয়ে একের পর এক সমস্যার সমাধান করে দিয়ে আমার ঋণেরপরিমাণ বাড়িয়েই চলেছেন।
---- নিজেকে ঋণী ভাববেন না। মানুষ হিসাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা আমাদের কর্তব্য। তাহলে ওই কথাই রইল। বিকেলে দিকে আমি সময় মতো পৌঁচ্ছে যাব।
---- হ্যা , আসুন। 
সেইমতো সোমনাথকে সঙ্গে নিয়ে বিকালের মধ্যেই মনোহরপুর গ্রামে পৌঁছোয় আর্য। সেখানে তখন সৌরভও অপেক্ষা করছিল। প্রিয়কে আর্য জিজ্ঞেস করে , কাজে যোগ দিয়ে এসেছেন তো ?
--- হ্যা ওই যোগ দিয়ে আসাই হয়েছে। কাজ কিছু হয় নি। এতদিন ঝাড়াপোছা হয় নিয়ে বলে মেসিনগুলোতে ধুলো আর মাকড়সার জালে ভর্তি। কে জানে ইঁদুরে ভিতরে তারটার কিছু কেটে দিয়েছে কিনা। আজ আর কিছু দেখা সম্ভব হল না। আপনারা আসবেন বলে তাড়াতাড়ি চলে আসতে  হল। কাল সব চালু করে দেখব। 
সৌরভ বলে , চলুন যেতে যেতে কথা হবে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। আমি সৌমিকের বাবা-মাকে খবর পাঠিয়েছি। ওরা অপেক্ষা করবেন। তেমন হলে আজ সব দিনক্ষণ পাকা করে চলে আসব।
---- আমারও তাই মত। কথায় আছে ' শুভ কাজে দেরি করতে নেই ,  বলে আর্য।   তারপর চারজনে সৌমিকদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।



     

           ( ক্রমশ ) 






     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---


No comments:

Post a Comment