অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
সেদিনের মতোই আসার পথে ফোন করে সবাইকে তার বাড়িতে চলে আসতে বলে আর্য। সবার শেষে সুশোভনবাবুকে বলে , দাদা প্রিয়র চাকরি ফেরত পাওয়া নিয়ে কাল দায়বদ্ধ' এর একটা বিশেষ সংখ্যা বের করব ভাবছি।
---- হ্যা , সেটা তো করতেই হবে। বিষয়টি জানতে পারলে প্রিয়র মতোই যারা অবিচারের শিকার হয়েছেন তারা লড়াইয়ের পথ খুঁজে পাবেন।
---- সেইজন্যই তো আপনাকে ফোন করলাম।
---- কেন কি হলো আবার ?
---- প্রিয়কে নিয়ে ' সহকর্মীর চোখে ' শীর্ষক একটি লেখা রেডি করে নিয়ে আগের দিনের মতোই চলে আসুন আমার বাড়ি। সবাইকে ডেকে নিয়েছি।
---- ওরে বাবা , খুব চাপে ফেললে দেখছি। দেখি কি করা যায়।
---- দেখি নয়, চলে আসুন ফিস্টের মেজাজে কেটে যাবে।
---- তাহলে তো যেতেই হবে। ঠিক আছে আমি লেখাটা রেডি করে নিয়েই আসছি।
বাড়ি পথে একেবারে মাংস কিনে নিয়ে বাড়ি ঢোকে আর্য। সেটা হাতে নিয়ে বৈশাখী জিজ্ঞেস করে --- আজও কি কোন প্রোগ্রাম আছে ?
--- হ্যা গো , কাল একটা সংখ্যা বের করব ভাবছি। তাই ----।
---- ঠিক আছে , আর তাই করতে হবে না। ওদিকের খবর কি ?
---- সব ওকে। একেবারে দিনক্ষণ সব পাকা করে এসেছি। পরে সব বলব। আমরা কাজ শুরু করে দিই। নাহলে অনেক রাত হয়ে যাবে। তুমি বরং সবাই এলে এক রাউন্ড চা পাঠিয়ে দিও।
---- সেটা তুমি না বললেও যাবে মশাই।
স্ত্রীর দিকে চেয়ে মুচকি হেসে বসার ঘরে যায় আর্য। সোমনাথ ততক্ষণে কাজ শুরু করে দিয়েছে। দুটো সংখ্যাতেই সোমনাথ কাজটা অনেকখানিই ধরে নিয়েছে। তাই আর্যর চাপ কমেছে। এ সংখ্যায় চাপ আরও অনেকটাই কম হবে। এই সংখ্যা থেকে সাহিত্যের একটা পাতা হবে। সেই পাতার লেখা আগেই ইকবালকে দেওয়া ছিল। সেগুলো কম্পোজ হয়ে থাকার কথা। তার উপরে ওসি আর ডাক্তারবাবুর লেখা আছে , আছে কিছু বিজ্ঞাপনও।আর্য ওসি আর ডাক্তারবাবুর লেখা দুটিতে চোখ বোলানো শুরু করতেই ইকবাল আর চন্দনরা এসে পৌঁছোয়।
আর্য সবাইকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে নিজে লেখা শুরু করে। তারই মধ্যে এসে পৌঁছোন সুশোভনবাবু। তার লেখাটা ইকবালকে ধরিয়ে দিতেই ঘরে আসে চৈতী।আর্য তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই চৈতী বলে , তুমি বলেছিলে না এই সপ্তাহে শঙ্খদার একটা ছাপবে। সেটা দেবে না ?
--- তাই তো মা। খুব সময়ে মনে পড়িয়ে দিয়েছো। যাও আমার ঘরে ওর ডায়রিটা আছে নিয়ে এস।
--- সেটা আমি নিয়েই এসেছি। তুমি দেখেশুনে একটা বেছে নাও।
বাবার দিকে ডায়েরিটা বাড়িয়ে ধরে চৈতী।
--- উহুঃ তুমিই ওকে আবিস্কার করেছে। তাই কবিতাটা তুমিই বেছে দাও।
---- একটা কবিতা আমার খুব ভালো লেগেছে। পড়ব, শুনবে ?
---- হ্যা নিশ্চয়।
ডায়রি দেখে কবিতা পড়া শুরু করে চৈতী।
মানুষ
একটার পর একটা পোশাক খুলছে মানুষ।
আবার পড়ে নিচ্ছে নতুন পোশাক।
এত বিচিত্র পোশাকে মানুষকে মানায়ও বটে।
একটার পর একটা মুখোশ খুলছে মানুষ।
আবার পড়ে নিচ্ছে অন্য মুখোশ।
এত রকমারি মুখোশে মানুষকে দিব্যি মানিয়েও যায়।
পোশাক আর মুখোশের আড়ালে মানুষেরই দেখা মেলে না আর।
সাদা গায়ে আজ মানুষের কাদার পাহাড়।
সর্বক্ষণ শুধু ঠকে যাব, ঠকে যাব এই ভয় হয়।
অথচ সারাটা জীবন আমরা ঠকি, নয়তো ঠকায়।
কবিতা পড়া হতেই সবাই হাততালি দিয়ে ওঠে। ডাক্তারবাবু বলেন , দারুণ উপলব্ধি! আহা কি লেখা -- 'সারাটা জীবন ঠকি নয়তো, ঠকায়। একেবারে খাঁটি কথা। কার লেখাটা এটা ?
--- এটা আমার মামনির আবিস্কার , শঙ্খর লেখা।
---- ভাবাই যায় না। এই বয়সেই ভাবনা কত পরিনত। ওর লেখা নিয়মিত দাও।
---- আমিও সেটাই ঠিক করেছি।
কবিতাটা কম্পোজ হতেই কাগজের কাজ সম্পূর্ন হয়। তারপর খাওয়া দাওয়া সেরে যে যার বাড়ির পথ ধরে। যেতে যেতে ডাক্তারবাবুকে শঙ্খর কবিতা আবৃতি করতে শোনা যায়। চৈতীও রাতে শুয়ে শুয়ে বার কয়েক অনুচ্চ স্বরে সেই কবিতা আবৃত্তি করে আর শঙ্খদার কথা ভাবতে থাকে। শঙ্খদার কবিতার সবাই কত প্রশংসা করল। গর্বে বুকটা ভরে ওঠে চৈতীর।শঙ্খদা তো কবিতা ছাপার কথা জানে না।
তাকে চমকে দেবে বলেই কিছু জানায় নি।কাল যখন চোখের সামনে কাগজটা মেলে ধরবে তখন শঙ্খদার অভিব্যক্তিটা কেমন হবে তা উপলব্ধি করতে চেষ্টা করে সে। নিশ্চয় খুব খুশী হবে। হওয়ারই কথা , বাবার মুখেই চৈতী শুনেছে জীবনে ছাপার অক্ষরে নাম দেখাটা যারা লেখে তাদের কাছে স্বপ্ন। শঙ্খদার নাম কাল কত মানুষের কাছে পৌঁচ্ছে যাবে। শঙ্খদার কথা ভাবতে ভাবতেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে চৈতী।পাশের ঘরেও তখন একই আলোচনা। বৈশাখী বলে , ওর লেখার হাতটা যখন এত ভালো বলছ তখন পরীক্ষাটা হয়ে যাওয়ার পর গল্প কবিতা লেখার পাশাপাশি সংবাদের তালিম দাও না।
---- প্রথমে কথাটা যে আমার মনে আসে নি তা নয়। কিন্তু নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্য সেই ইচ্ছাটা মনে ঠাঁই দিই নি।
---- দেখ তোমাদের পেশায় নিজেদের অনেক বঞ্চনা আছে ঠিকই , কিন্তু ওই পেশায় থেকে অনেকের বঞ্চনা দুর করা যায়। সেটা তো কম কথা নয়।
--- তা অবশ্য ঠিক।
---- ভেবে দেখ তো , তুমি যদি আজ ওই পেশায় না থাকতে তাহলে শঙ্খর বাবার চাকরিটা অত সহজে ফেরাতে পারতে ? তাই বলি ওতো আমাদের ছেলেই। তুমিই ওকে গড়েপিঠে যোগ্য করে তোল।
---- যথা আজ্ঞা দেবী। পরীক্ষার পর থেকেই তোমার কথা মতো ওকে তালিম দেওয়া শুরু করব।
--- তারপর মেয়েটাকে ওর হাতে তুলে দিতে পারলেই নিশ্চিন্ত। দুটিতে ভারি মিলমিশ হবে। শঙ্খ তোমার মতো একটু আলাভোলা গোছের কিন্তু মেয়েটা আমাদের কড়া ধাতের। সংসারে এটাই তো চাই।
---- শঙ্খ না হয় আমার মতো একটু আলাভোলা গোছের। কিন্তু মেয়েটা কার মতো কড়া ধাতের কই বললে না তো ?
---- কার মতো আবার ?
---- কেন , আমার এই মাস্টারিনী বৌ'টার মতো।
স্ত্রীকে বুকের কাছে টেনে নেয় আর্য। আর স্বামীর বাহু বন্ধনে পিষ্ট হতে হতে দুর্যোগের আভাস টের পায় বৈশাখী। সেই দুর্যোগে উপুরচুপুর ভিজে যায় দু'জনে। পরদিন সকালেই কাগজ পৌঁচ্ছে দিয়ে যায় ইকবালরা। সোমনাথ - চন্দনরাও সব এসে যে যার কাগজ নিয়ে চলে যায়। কলেজের বন্ধুদের দেবে বলে চৈতীও বাবার কাছে থেকে খান কতক কাগজ চেয়ে রাখে।
তবেই না সবাই শঙ্খদার প্রতিভার কথা জানতে পারবে। কিন্তু তার আগ্রহের আতিশয্য দেখে বান্ধবীরা তার পিছনে লাগতে ছাড়বে না। বিশেষ করে অন্তরা তো তাকে খেপিয়ে মারবে। তাকে সেই যে মাসতুতো দাদা বলেছিল তারপর আজও আসল কথাটা বলা হয় নি। কিন্তু তাদের একসঙ্গে সাইকেল পাল্টাপাল্টি করে কলেজে যাওয়া আসা একে অন্যের কেয়ার নেওয়া দেখে কারোর বোধহয় আর তাদের আসল সম্পর্কটা আন্দাজ করতে বাকি নেই। সে এক মন্দের ভালো হয়েছে। সেইজন্যই বোধ হয় কেউ আর শঙ্খদার পিছনে পড়ার আগ্রহ বোধ করে নি। শঙ্খদার কথা ভাবতে ভাবতেই সে এসে পড়ে। আর অমনি চৈতী তার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলে , এদিকে এসো, তোমাকে দেখে যতটা ভালো মনে হয় ততটা ভাল ছেলে তো তুমি নও।
শঙ্খ ভেবে পায় না খারাপটা কি করল সে। তাহলে কাল দেবিকার কাছে নোটসের খাতা নেওয়া দেখেই কি ওই কথা বলছে চৈতী ?
তাই সে ভয়ে ভয়ে বলে , আমি আবার কি করলাম ?
---- এখনও মুখে মুখে বলছ , কি করলাম ?
এবারে আরও ভড়কে যায় শঙ্খ। তার মুখ থেকে আর কথা সরে না। অদুরে দাঁড়িয়ে মেয়ের কান্ড দেখছিল আর্য আর বৈশাখী। মেয়েটাও তারই মতো মজা করার স্বভাব পেয়েছে দেখে মুচকি মুচকি হাসতে থাকে আর্য। বৈশাখী আর থাকতে না পেরে বলেই ফেলেন --- চৈতী হচ্ছেটা কি ? ছেলেটার সঙ্গে কি শুরু করেছিস তুই ? তোর এই স্বভাবটা কি আর বদলাবে না ?
--- আঃ মা, তুমি আবার এই ব্যাপারে নাক গলাচ্ছ কেন ? তোমার ছেলেটা ডুবে ডুবে জল খাবে আর কিছু বলা যাবে না ?
চৈতি যে দেবিকার ব্যাপারটাই ইঙ্গিত করছে , ওই কথা শুনেই ধারণাটা আরও বদ্ধমূল হয় শঙ্খর। তাই সে বলে , বিশ্বাস কর সেইরকম কোন ব্যাপার নয়। আসলে দেবিকার কাছে একটা নোটসের খাতাই নিয়েছিলাম।
---- এই তো পথে এসো। এ যে দেখছি ' ঠাকুরঘরে কে, আমি কলা খাইনি'র মতো ব্যাপার ? আমি তোমাকে বলি নি নোটস - ফোটস যা লাগবে আমি যোগাড় করে দেব ।দয়া করে কারও খপ্পড়ে পড়তে যেও না। তা কতদিন ধরে এসব চলছে শুনি ?
এবারে চিৎকার করে ওঠে আর্য --- আঃ চৈতী, তখন থেকে কি হচ্ছে কি ? সব কিছুরই একটা লিমিট থাকে।
---- বাবা, তুমি ওকেই বলতে দাও।
শঙ্খ বলে -- সত্যি বলছি তেমন কোন ব্যাপার নেই। আসলে তুমি ' ডুবে ডুবে জল খাওয়া'র কথা বললে তাই ----।
এবারে কাগজটা শঙ্খর চোখের সামনে মেলে ধরে চৈতী বলে --- কি এটা ডুবে ডুবে জল খাওয়া নয় ? আমি তোমার প্রতিভা আবিস্কার করলাম , আর আমাকে না জানিয়েই তুমি সম্পাদকের কাছে কবিতা পাঠিয়ে দিলে ?
মেয়ের কান্ড দেখে এবার হেসে ফেলে বাবা-মা। হাসির রেখা ফুটে ওঠে শঙ্খর মুখেও। চৈতী শঙ্খর দিকে চেয়ে বলে , কি কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বলো ?
শঙ্খ কোন উত্তর দিতে পারে না। চৈতীর মুখের দিকে আবেশভরা দৃষ্টিতে তাকায় সে।
( ক্রমশ )
----০---




No comments:
Post a Comment