অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
তার লেখা যে কোনদিন ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পাবে তা সে ভাবতেই পারে নি।চৈতীই সেই সুযোগ করে দিয়েছে।সেইজন্য এতক্ষণ চৈতীর তাকে বিড়ম্বনায় ফেলার অপরাধ সে মনে মনে ক্ষমা করে দেয়। তার চোখে মুখে প্রসন্নতার ছাপ ফুটে ওঠে। সেটা দেখে বৈশাখী বলে , সবাই বলছিল তোমার লেখার হাত , চিন্তা ভাবনা খুব ভাল। আমি নিজেও পড়ে দেখেছি। আমারও খুব ভালো লেগেছে। তাই তোমার জ্যেঠুকে বলছিলাম তোমাকে সাংবাদিকতার তালিম দিতে।তোমার কি মত ?
---- জ্যেঠুকে দেখে আমারও খুব সাংবাদিকতা করার ইচ্ছা হয়। কত লোকের উপকার করা যায়।
---- সে হয়তো যায় , কিন্তু তাতে নিজের বিশেষ উপকার হয় না। বরং অপকার হওয়ারই সমূহ আশঙ্কা থাকে। এমন কি চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও পড়তে হতে পারে।
শঙ্খর মনোভাব যাচাই করার জন্য কথাগুলো বলে আর্য।
শঙ্খ একটুও না ভেবে বলে , নিজের ক্ষতির বিনিময়ে যদি অন্যের ভালো করা যায় তাহলে সেটা তো গৌরবের ব্যাপার। আর আর্থিক সংকটের মধ্যে থাকার অভিজ্ঞতাও আমাদের হয়েছে।
--- ভালো কথা। তবে আরও একটা কথা বলার আছে।
--- কি কথা ?
--- এই লাইনে অর্থাভাব যেমন আছে তেমনই অর্থাগমের হাতছানিও রয়েছে। মাফিয়া , দুর্নীতিগ্রস্থ রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ প্রশাসনের অসাধু কর্মী - অফিসার সবাই নিজ নিজ কুকর্ম ঢাকার জন্য সাংবাদিকদের মাসোহারা দিয়ে কিনে রাখার চেষ্টা করে। সেই প্রলোভন জয় করা খুব কঠিন। তাদের সঙ্গে হাত মেলালে খুব আয়েসী জীবনযাপন করা যায়। কিন্তু মেরুদণ্ড বলতে কিছু থাকে না। থাকে না মানসম্মানও। লোভ জয় করতে গেলে অভাব আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। প্রাণ সংশয় পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। কিন্তু বহু মানুষ সম্মান করে, দুনীর্তিগ্রস্তরা ভয় পায়। এই লাইনে আসার আগে এইসব কথা তোমার জেনে রাখা দরকার।
---- অল্পদিন হলেও আমি আপনাকে খুব কাছে থেকে দেখছি। আপনার আর্দশেই আমি নিজেকে গড়ে তুলতে চাই।
--- বেশ তাহলে আর কোন কথা বলার নেই। প্রথমে দুটি কাজ তোমাকে করতে হবে। একটি হলো মোটরবাইক চালানো শেখা। আর অন্যটি ল্যাপটপ চালানো।
---- মোটরবাইক চালাতে আমি জানি। কলেজের এক বন্ধুর কাছে শিখেছিলাম। ড্রাইভিং লাইসেন্সও আছে। বাবা একবার মোটরবাইক কিনব ঠিক করেছিল। তারপর ওই ঘটনার জন্য আর কেনা হয় নি। ল্যাপটপও একটু আধটু চালাতে পারি।
---- বাহ্ তাহলে আজ থেকেই হাত প্রাকটিস শুরু করে দাও। এখনই দূরে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই।
সাইকেলের পরিবর্তে তোমরা আজ থেকে মোটরবাইকেই কলেজ যাতায়াত করো।
----- কলেজে যাওয়ার জন্য মোটরবাইকের কি দরকার ? দিব্যি তো সাইকেলে যাওয়া আসা করছি।
---- আরে আমি কি তোমায় লাক্সারি দেখানোর জন্য যেতে বলেছি। চালানোটা ভালোভাবে রপ্ত করার জন্য নিয়মিত অভ্যাস থাকা প্রয়োজন।
শঙ্খদার সঙ্গে মোটরবাইকে কলেজ যাওয়ার কথা শুনে মনে মনে খুব পুলক অনুভব করে চৈতী। কলেজের বান্ধবীরা অনেকে তাদের প্রেমিকের বাইকে যাওয়া আসা করে। অনেকে দুরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার গল্প করে। তারও খুব ইচ্ছা করে শঙ্খদার কোমর জড়িয়ে ধরে মোটরবাইকের পিছনে বসে ওইভাবে কোথাও বেড়াতে যেতে।
কিন্তু শঙ্খদা বাইক চালাতে জানে সেইকথা এতদিন জানা ছিল না। জানার পর সেই ইচ্ছাটা পূরণ হতে যাচ্ছে বিশেষ করে বাবা নিজে থেকে তাকে নিয়ে মোটরবাইকে কলেজ যাওয়ার কথা বলতেই তার মনটা খুশীতে ভরে ওঠে। কিন্তু শঙ্খদাটা যেন কি ? এমন সুযোগ সচরাচর কেউ পায় না , আর উনি কিনা বলে দিচ্ছেন 'সাইকেলই ঠিক আছে'। পাছে প্রস্তাবটাই বানচাল হয়ে যায় সেই আশংকায় শঙ্খদা কিছু বলার আগেই সে তড়িঘড়ি বলে ওঠে -- আচ্ছা তুমি কি বলতো ?
বড়োদের মুখে মুখে কথা বলছো যে বড় ? সাংবাদিকতা করতে যাচ্ছ , আর এই তোমার আচরণ ? বাবার মুখেই শুনেছি , প্রকৃত সাংবাদিক হতে হলে আগে বিনয়ী হতে হয়।
চৈতীর ওই কথার অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে বৈশাখীর অসুবিধা হয় না। মেয়ে যে তার শঙ্খদার মোটরবাইকে চেপে মাঝে মধ্যে এখানে ওখানে যেতে চায় তা সে বুঝতে পারে। কিন্তু তার জন্য চৈতী যেভাবে ফের শঙ্খকে খোঁচাতে শুরু করেছে তাতে তার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে ভেবে বলে , ও তো যাবে না বলে নি। তোমাকে আর ওর পিছনে লাগতে হবে না। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে এসো।
রান্নাঘরের দিকে চলে যায় বৈশাখী। আর শঙ্খর দিকে চেয়ে মুচকি হেসে বাথরুমে ঢোকে চৈতী। শঙ্খ কটাক্ষের অর্থ খুঁজতে আকাশ - পাতাল ভাবতে শুরু করে। সেদিন থেকেই ওদের মোটরবাইকে কলেজ যাত্রা শুরু হয়ে যায়। তাকে শঙ্খদার কোমর জড়িয়ে ধরে মোটরবাইকে কলেজ যেতে দেখে হই হই করে ওঠে কলেজের বান্ধবীরা। মোটর বাইক থেকে নেমে তাদের দিকে এগিয়ে যেতেই সবাই বলে , আরে দেখ দেখ কি মারকাটারি ব্যাপার। ঠিক যেন উত্তম-সুচিত্রা ' এই পথ যদি না শেষ হয় ' গাইতে গাইতে ঢুকছে।
--- ধ্যাত, কি যে বলিস না তোরা। আরে ও যে বাইক চালাত জানত তা আমরা জানতাম না।
জানার পর বাবাই ওকে জোর করে বাইক নিয়ে পাঠাল।
---- ওঃ ওকে। বাঃ ভালো ভালো। এযে দেখি ওগো হ্যা গো'র পথে হাঁটার প্রথম ধাপ।
--- তোদের নিয়ে আর পারা যায় না।
অন্যান্য বান্ধবীদের এড়িয়ে যেতে পারলেও অন্তরার কাছেসেদিন আর সে এড়াতে পারে না। একান্তে পেয়ে অন্তরা তাকে চেপে ধরে --- অ্যাই এবার সত্যিটা বলতো ?
---- কিসের সত্যিটা ?
---- আবার নেকুপনা করছিস ? শঙ্খদার সঙ্গে তোর সম্পর্কটা কি ?
--- কেন , বলেছি তো তোকে ?
--- দেখ আমার কাছে লুকিয়ে লাভ হবে না। যেভাবে শঙ্খদার কোমর জড়িয়ে ধরে এলি তাতে মনে হয় না ও তোর মাসতুতো দাদা।
---- কেন , মনে হয় না কেন ?
---- কারণ সচরাচর কেউ দাদাদের কোমরে ওইভাবে ধরে না, কাঁধে হাত দেয়।
---- হ্যা তুই সব জেনে বসে আছিস। আমি কতজনকে কোমরে হাত দিয়ে বসতে দেখছি।
---- হ্যা তা হয়তো দেখে থাকবি। কিন্তু তাদের চোখে মুখে তোর মতো ওইরকম ভাব ফুটে ওঠে না।
ওইসময় তোর মুখে কি রকম ভাব ফুটে উঠেছিল তা তো তুই দেখিস নি। দেখলেই বুঝতে পারতিস একেবারে ' ধরো ধরো সখা ' ভাব ফুটে উঠেছিল তোর মুখে।
--- যাঃ।
অন্তরার কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও একেবারে কথাটা উড়িয়ে দিতে পারে না চৈতী। শুধু মোটরবাইকে আসার সময়ই নয় , শঙ্খদার কাছাকাছি হলেই তার বুকের ভিতর একটা অন্যরকম অনুভুতির জন্ম হয়। সেটা তো তার চোখেমুখেও প্রতিফলিত হবেই। তাই আর লুকোছাপা করে না সে। আসল কথাটা স্বীকার করে নেয়। শুনে অন্তরা বলে , আমি অবশ্য প্রথম দিনেই ব্যাপারটা আন্দাজ করেছিলাম।
---- কি করে ?
--- তোর ওকে আগলে রাখার প্রবণতা দেখে , মৃদু হেসে বলে অন্তরা।
চৈতীও হাসতে হাসতে বলে , আগলে না রেখে উপায় আছে ? তোরা তো তাহলে চিল-শকুনের মতো ছোঁ মেরে তুলে নিতিস।
---- তুই খুব লাকি রে, ছেলেটা খুব ভালো। তোকে দেখে তো মনে হয় তুই ওকে চোখে হারাস। ওর ব্যাপারটা কি ?
---- তা তো জানি না।
---- মানে ?
---- কোনদিন বলাই হয় নি।
---- সে কি রে ? যাকে মন দিয়ে বসে আছিস , তার সঙ্গে এতদিন যাওয়া আসা করেও তার মনের খবরটা নিতে পারলি না ? যদি সত্যি সত্যি ওর মনে অন্য কেউ বাসা বেঁধে বসে থাকে বা বাসা বাঁধতে শুরু করে তখন কি করবি ? তখন যে আর চোখের জলে বুক ভেজানো ছাড়া আর কোন পথ থাকবে না রে।
চৈতীও সেটা উপলব্ধি করে। মনে মনে ঠিক করে এবারে তাকে শঙ্খদার মনের কথাটা জানতেই হবে। সেই জন্যই মোটরবাইকে ফেরার পথে শঙ্খকে সে বলে , এই যে ছেলে ----?
তার কথা শুনেই বাইকের গতি কমে আসে। শঙ্খদা বলে , আচ্ছা তুমি মাঝে মধ্যে আমাকে ' এই যে ছেলে -- এই যে ছেলে ' বলে ডাকো কেন ?
---- কেন তোমার খারাপ লাগে ?
---- না , খুব ভয় পায়।
---- কেন , ভয় পাও কেন ?
---- আসলে যখন তুমি ' এই যে ছেলে বলো , তখনই উঁচু ক্লাসের ছেলেদের রিগিংয়ের মতো নাস্তানাবুদ করে ছাড়।
---- ওঃ তাই বুঝি ? শঙ্খর কথা শুনে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে চৈতীর মুখে। শঙ্খদার কথাটা উড়িয়েও দিতে পারে না। যখনই শঙ্খদাকে নিয়ে মজা করার ইচ্ছা করে তখনই সে ওই সম্বোধনই করে। তাই নিয়ে মায়ের কাছে কম বকা খেতে হয়েছে ! মা বলে , ওকি রে ? শঙ্খদা বলতে কি হচ্ছে ? সে অবশ্য মায়ের কথা কানেই তোলে না। কিন্তু এখন শঙ্খদার কথা শুনে তার খুব খারাপ লাগে। শঙ্খদা তার মধ্যে ভয়টাই দেখল, আর কিছু চোখে পড়ল না ? তীব্র অভিমান হয় তার। অভিমানহত হয়ে চুপ করে থাকে সে। অভিমানে শঙ্খদার কোমর জড়িয়ে ধরা হাতের বাঁধনটাও আলাগা হয়ে আসে। সেটা টের পেয়েই শঙ্খ বলে , কি হলো ? কথা বলতে বলতে চুপ করে গেলে কেন ? তুমি চুপ করে গেলে আমার আরও ভয় করে। তার থেকে তোমার ' এই যে ছেলে ' বলাটা অনেক কম ভয়ের। ঠিক আছে তুমি বরং ওটাই বল।
শঙ্খদার কথা শুনে ফের হেসে ফেলে চৈতী। শঙ্খদা সত্যিই খুব সরল মনের ছেলে। ওর মতো ছেলেকে ভালো না বেসে পারা যায় না। ওর উপরে বেশিক্ষণ রাগ - অভিমান করেও থাকা যায় না। তাই সব ভুলে সে বলে --- জানো তো আজ আমাদের ওইভাবে মোটর বাইকে আসতে দেখে বান্ধবীরা নানা রকম কথা বলছিল।
---- সে তো দেবিকারাও আমাকে রাগাচ্ছিল। কে কি বলল তা নিয়ে অত মাথা ঘামিয়ো না তো।
--- কে কি বলল তা নিয়ে আমারও মাথাব্যাথা নেই। আমি শুধু তোমার মনের কথাটা জানতে চাই। ঠোঁটের ডগায় এলেও কথাটা আর বলা হয় না চৈতীর। মেয়েদের স্বাভাবিক লজ্জা বোধ তার কন্ঠ রোধ করে দেয়। তারপর থেকে শঙ্খদার মনের কথাটা জানার জন্য বার বার কথাগুলো তার মনে ঘুরপাক খেতে থাকে।
( ক্রমশ )
----০---




No comments:
Post a Comment