অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
কয়েকদিনের মধ্যেই কথাটা জানার সুযোগ এসে যায় । দেখতে দেখতে এসে পড়ে কলেজের পরীক্ষা। অন্যান্য বার সাধারণত তিনটি বর্ষের পরীক্ষা আলাদা আলাদা ভাবে হয়। কিন্তু এবারে বিধানসভা নির্বাচনের জন্যই সব পরীক্ষাই একসঙ্গে করানোর নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা দফতর। সেই হিসাবে চৈতীর প্রথম বর্ষ আর শঙ্খর তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা হচ্ছে একই সঙ্গে। দু'জনেরই সেন্টার পড়েছে লাভপুর কলেজে। প্রথমে ঠিক ছিল বাসেই পরীক্ষা দিতে যাবে দু'জনে। কিন্তু আর্যই সেই সিদ্ধান্তটা বাতিল করে দিয়ে বলে , এখনকার বাসের কোন সময়ের ঠিক আছে ? সব এক একটা ইচ্ছামতী বাস সার্ভিস। নিজেদের ইচ্ছা মতো চলে। কখন যায় কখন আসে তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। হয়তো দেখা যাবে সময় মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁচ্ছোতেই পারল না। কিম্বা পরীক্ষা শেষে আর বাড়ি ফেরার বাসই পেল না।
--- তাহলে কি হবে ? উদ্বেগ ঝড়ে পড়ে বৈশাখী গলায়।
---- কেন , মোটর বাইকে যাবে। নিজের ইচ্ছা মতো আসা যাওয়া করতে পারবে। এখন তো শঙ্খর হাত পোক্ত হয়ে উঠেছে।
---- অত দুরের রাস্তা ছেলেমেয়ে দুটো বাইকে যাবে ?
---- না যাওয়ার কি আছে ? লাভপুর এমন কিছুদূরও নয়। এরপর তো জীবনে দু'জনকে আরও লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে।
অগত্যা স্বামীর কথা মতো ওদের মোটরবাইকে যাতায়াতে সম্মতি দিতে হয় বৈশাখীকে। কথাটা শুনেই শঙ্খদার সঙ্গে প্রথমদিন মোটরবাইকে কলেজ যাওয়ার থেকেও বেশি আনন্দ হয় চৈতীর। তাদের বাড়ি থেকে কলেজের দুরত্ব মেরে কেটে ১ কিমি।দেখতে দেখতেই রাস্তা ফুরিয়ে যেত। কিন্তু পরীক্ষা দিতে গিয়ে অনেকক্ষণ তারা একসঙ্গে থাকতে পারবে। সেই সুযোগে সে শঙ্খদার মনের কথাটা জেনে নেবে। বলবে তার মনের কথাও। কিন্তু বলি বলি করে আর বলা হয়ে ওঠে না। পরীক্ষা ক'দিন শঙ্খদা তাদের বাড়িতেই রয়েছে।
প্রতিদিন পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে তারা দুজনে বাবা-মাকে প্রণাম করে। মা দু'জনের কপালে দইয়ের ফোঁটা দিয়ে দেন। প্রতিদিন বোরবার সময় চৈতী মনে মনে ঠিক করে আজ কথাটা শঙ্খদাকে বলতেই হবে।কিন্তু আসার সময় কার কেমন পরীক্ষা হল আলোচনা করতে করতেই বাড়ি পৌঁছে যায় , কথাটা আর বলা না চৈতীর। শেষ পরীক্ষার দিন কথাটা বলার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় সে। অন্যান্য দিনের মতোই পরীক্ষার আলোচনা করতে করতে মোটর বাইকটা পুরন্দরপুরের কাছে পৌঁছোতেই চৈতী আচমকা বলে ওঠে -- এই যে ছেলে ---।
সেই কথার পর যথারীতি বাইকের গতি কমে আসে। শঙ্খ গাড়িটা থামিয়ে ভয়ে ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে চৈতীর মুখের দিকে চেয়ে বলে , কি হলো আবার ?
---- কি আবার হবে ? বলি প্রতিদিন যে আমরা এই রাস্তার উপর দিয়ে পরীক্ষা দিতে যায় , তা এখানে একটা জাগ্রত কালী আছে তা জানা আছে ?
---- থাকলেই বা , তাতে কি ?
----- বা রে শেষদিন যদি তাকে প্রণাম করে না যায় , তাহলে রেগেমেগে উনি যদি আমাদের ফেল করিয়ে দেন , তখন কি হবে ? আমার কথা না হয় বাদই দাও। তোমার জন্য সেই তো আমার বাবাকেই খোঁটা শুনতে হবে। লোকে বলবে ভালো ছেলেটাকে নিয়ে গিয়ে একেবারে গোল্লায় পাঠিয়ে দিয়েছে। মেয়ে হয়ে বাবার সেই বদনাম আমি সহ্য করতে পারব না।
---- এই দেখ , যেতে চাও চলো। কিন্তু কালীদর্শনের সঙ্গে পরীক্ষায় পাশ ফেলের কোন সম্পর্ক নেই। ভালো পরীক্ষা দিলে তোমার কালীর ফেল করানোর সাধ্যি নেই। আবার পরীক্ষা খারাপ হলে হাজার প্রণাম করলেও উনি পাশ করিয়ে দিতে পারবেন না। তা যদি হতো তাহলে আর কেউ কষ্ট করে পড়াশোনা করত না। সবাই সারাবছর তোমার ওই কালীর থানে জোড়হাত করে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকত।
---- এই যে ছেলে খুব যে বড়ো বড়ো বুকনি ঝাড়ছ , কালী শুধু আমার একা নয় , তোমারও। তাকে যে ওইভাবে উপহাস করে কথা বলছ , পাপ দেয় তো কি হবে ?
বলে প্রথমে হাত জোড় করে নিজের কপালে ঠেকায়।তারপর শঙ্খর বুকে আর কপালে হাত ঠেকিয়ে বিড় বিড় করে বলে , মা গো অপরাধ নিও না। অবোধ সন্তান , না জেনে তোমার অবমাননা করে ফেলেছে নিজগুণে ক্ষমা করে দিও মাগো।
চৈতীর কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেলে শঙ্খ। আর যায় কোথাই ? চোখ পাকিয়ে চৈতী বলে ওঠে -- এই যে ছেলে হাসলে কেন ? অপরাধের মাত্রা না বাড়ালে বুঝি হচ্ছে না ? আমি কোথায় সমানে মায়ের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে চলেছি। আর উনি অবজ্ঞার হাসি হেসে অবমাননা করে চলেছেন। চলো নিজে মুখে মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে চলো।
বকুনি খেয়ে বেহিরা কালীবাড়ির দিকে মোটরবাইক ঘোরাতে হয় শঙ্খকে। মন্দিরের সামনে বাইক থেকে নামতেই চৈতী বলে , এসো হাত পা ধুয়ে নিয়ে মায়ের কাছে যায়।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নেবে। কি নেবে তো ?
শঙ্খ কোন উত্তর দেয় না। অদুরের মন্দিরের দিকে চেয়ে থাকে সে। সেটা লক্ষ্য করে চৈতী আচমকা শঙ্খর ডান হাতটা নিজের মাথায় তুলে নিয়ে বলে , আমার মাথার দিব্যি রইল। মায়ের সামনে মিথ্যাচারণ কোর না।
তারপর শঙ্খর হাত দুটো ধরে তার মুখের দিকে চেয়ে বলে , বলো আমার কথা রাখবে।এমনিতে শঙ্খর দেবদ্বিজে খুব একটা বিশ্বাস নেই। কিন্তু চৈতীর চোখের দিকে তাকিয়ে তার কি যেন হয়ে যায়। তার মুখ থেকে যেন আপনা থেকেই বেরিয়ে আসে -- তুমি মাথার দিব্যি দিয়েছ , আর আমি তা অমান্য করতে পারি ?
কথাটা শোনার পর চৈতীর বুকটা যেন কানায় কানায় ভরে যায়। ওইরকম কথা শোনার জন্যই তো মেয়েরা জন্মজন্মান্তর প্রতীক্ষায় কাটিয়ে দিতে পারে।
চৈতীকে আর কিছু বলতে হয় না। তার হাত ধরে মন্দিরের দিকে এগিয়ে যায় শঙ্খ। ঘন্টা বাজিয়ে কালীমূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই পুরোহিত দু'জনের হাতে দুটো ফুল আর কপালে সিঁদুরের টিপ পড়িয়ে দিয়ে বলেন , নাও মনের যা খেদ--গ্লানি সব মাকে খুলে বলো। মা তোমাদের মনে অক্ষয় প্রশান্তি ফিরিয়ে দেবেন।
সেইমতো তারা দু'জনে সেই ফুল হাতে নিয়ে মা'কে প্রনাম করে। পুরোহিতের হাতে দক্ষিণা দিয়ে মন্দির ছাড়ার আগে নিজের হাতের ফুলটা শঙ্খর কপালে ছুঁইয়ে দেয় চৈতী। তখন চৈতীর মুখের দিকে চাইতেই কেমন যেন ঘোর লাগা আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে শঙ্খ। বিন্দু বিন্দু ঘামের মাঝে কপালে লাল টিপে চৈতীকে তখন অন্যরকম লাগে তার। চৈতীর দিক থেকে মুখ ফেরাতে পারে না। সে হাতটা বাড়িয়ে ধরে। চৈতী সেই হাত ধরে ধীর পায়ে মন্দির থেকে বেড়িয়ে আসে। বাইরে তখন পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে সূর্য। তার রক্তিম আভা অদুরে বয়ে বক্রেশ্বর নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে নদীপাড়ে এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। সেদিকে চেয়ে চৈতী বলে , এই যে ছেলে ওখানে গিয়ে একটু বসবে ?
চৈতীর মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে শঙ্খ। তারপর একে অন্যের হাতে ধরে মুক্ত বিহঙ্গের মতো নির্জন নদীতট অভিমুখে ছুটে চলে। চৈতীর পায়ের নুপুরের রুনুঝুনু শব্দে শঙ্খর মনে অনুরাগের ছোঁয়া লাগে। চৈতীও যেন আবিষ্ট হয়ে পড়ে। অদুরেই তখন পাড়ের প্রান্ত ছুঁয়ে কুল কুল শব্দে বয়ে চলেছে ক্ষীণকায়া নদী। সেই শব্দ নির্জন পরিবেশকে সুরময় করে তুলেছে। পরস্পর হাত ধরাধরি করে নদী কিনারে গিয়ে বসে দু'জনে। চৈতী তার পা দু'খানি নদীর জলে ডুবিয়ে দেয়। শঙ্খ নিজের হাতে তুলে নেয়
চৈতীর হাত। শঙ্খর চোখে চোখ রেখে চৈতী অনুচ্চ স্বরে বলে -- অ্যাই শোন , মাকে কি বললে তুমি ?
---- তোমাকে বলব কেন ? অন্যকে বললে প্রার্থনার কোন গুণ থাকে না।
---- এই তো দিব্যি ধর্মজ্ঞান আছে দেখছি। আমাকে বললে কোন ক্ষতি হবে না।
---- কেন তুমি আমার কে যে তোমাকে বলতে যাব ?
ওই কথা শুনে অভিমানহত হয়ে ওঠে চৈতীর মন। সে চুপ করে যায়। মনে মনে বলে , আমি তোমার কে তা এতদিনেও বুঝতে পারলে না ? মুখে বলে দিতে হবে ?
চৈতীকে চুপ করে যেতে দেখে প্রমাদ গোনে শঙ্খ। বুঝতে পারে কথাটা বলে চৈতীর অন্তরে আঘাত দিয়ে ফেলেছে সে।
তাই দ্রুত সে বলে ওঠে , বেশ তুমি আগে বলো , তুমি কি প্রার্থনা জানালে ?
ওই কথা শুনেও চুপ করে থাকে চৈতী। লজ্জায় সে মুখ ফুটে বলতে পারে না তার প্রার্থনার কথা। বলতে পারে না মাকে বললাম ভালোবাসার এই মানুষটিকে যেন আমি নিজের করে পাই। চৈতীকে চুপ করে থাকতে দেখে শঙ্খ বলে , ঠিক আছে আমিই বলছি শোন , আমি বললাম মাগো এই মেয়েটাকে ভয় পাওয়া থেকে আমাকে উদ্ধার কর।
শঙ্খর কথা শুনে চৈতীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে বলে , আচ্ছা আমাকে কি তোমার শুধু ভয়ই পায় ? অন্য কোন অনুভুতি হয় না ?
---- হয় তো। কিন্তু তোমাকে আমি খুব ভয় পাই যে। কিছুতেই বলতে পারি না আমি তোমাকে -----।
শঙ্খকে কথা শেষ করতে দেয় না চৈতী। দ্রুত তার ঠোঁটে আঙুল চাপা দেয়। তারপর বলে , ভালোবাসার কথা মুখে বলতে নেই। ভালোবাসা অনুভবের ব্যাপার।
নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দেয় শঙ্খর ঠোঁটে। তারপর শঙ্খর বুকে নিজেকে এলিয়ে দেয়। তাদের সেই মিলন মুহুর্তের স্বাক্ষী হয়ে থাকে নির্জন নদীতট , রক্তিম আকাশ আর নীড়ে ফেরা বলাকার সারি।
সেইদিকে চেয়ে চৈতী বলে , অ্যাই একটা কবিতা শোনাবে ?
সেই আবদার ফিরিয়ে দিতে পারে না শঙ্খ। চৈতীর হাত ধরে সে আবৃতি শুরু করে ---
বিদায়ী সূর্যের অস্তরাগ আবেশ ছড়ায়।
হাওয়ায় ওড়ে তোমার সুগন্ধি ওড়না।
চলো এসময় নদীর জলে পা ডুবিয়ে একটুক্ষণ বসি।
তারপর জ্যোৎস্না উঠবে।
সেই জ্যোস্না মেখে পায়ে পায়ে আমরা পেরিয়ে যাব জনপদ।
তুমি সেই না বলা কথাটা বলবে।
বলি বলি করে যে কথা বলা হয় নি বহুবার।
সেই কথা শেষ হওয়ার আগেই
আমরা পৌঁছে যাব ছাপোষা গৃহস্থের নিকানো উঠোন।
সেখানে শীতলপাটির উপর টিমটিমে লন্ঠন ঘিরে
গোটা কয় আদুর গায়ের ছেলেমেয়ে বসে থাকে।
বইপত্তর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে তারা সব দুলে দুলে পড়ে।
তাদের কেউ যেন বলে ওঠে মেঘালয়ে বৃষ্টি সব থেকে বেশি।
তুমি আমি বলবো , বৃষ্টি মানুষের চোখেই বেশি।।
আবৃত্তি শেষ হতেই চৈতী তীব্র আশ্লেষে চুমু খায় শঙ্খকে। তারপর বলে , অপূর্ব - অনবদ্য। আজকের এই মুহুর্তের সঙ্গে অদ্ভুত মিল রয়েছে তোমার কবিতায়। তুমি কি এমন দিনের কথা ভেবেই লিখেছিলে নাকি?
শঙ্খ কোন কথা বলে না। সেও একের পর এক চুম্বন এঁকে চলে চৈতীর কপাল, চোখের পাতা , গাল আর ঠোঁটে।
চৈতীর গায়ে ফুটে ওঠে পদ্মকাঁটা। শঙ্খর হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়ে সে বলে , চলো এবার ফেরা যাক। নাহলে বাড়িতে চিন্তা করবে।
হাত ধরাধরি করে নদীতট ছেড়ে আসে তারা।
( ক্রমশ )
----০---




No comments:
Post a Comment