Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৮৮





           অন্তরালে 


                   অর্ঘ্য ঘোষ 



     ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 




বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে যায়। ততক্ষণে তাদের ফিরতে দেরি দেখে ঘর বার করতে করতে ধৈর্য হারা হয়ে পড়েছে বৈশাখী। আর সমস্ত তাল গিয়ে পড়ে আর্যর উপরে। তীব্র ঝাঁঝের সঙ্গে সে বলে , তখনই বলেছিলাম এত দুরের রাস্তা বাসে যাওয়া আসাই ভাল। তা আমার কথা কানে তুললে তো ? ভগবান না করুন , বিপদ আপদ হল কিনা কে জানে ?
আর্য হাত তুলে স্ত্রীকে আশ্বস্ত করতে বলে , আরে অত দুঃশ্চিন্তা কোর না তো। আজ পরীক্ষার শেষদিন , তাই হয়তো কোথাও গল্পগুজব করছে।বোঝ না কেন , এই বয়েসটা তো আমরাও পেরিয়ে এসেছি।দু'জনে একসঙ্গে কোথাও বেরোলে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা হত ? দুশ্চিন্তা কোর না , দেখ ঠিক ফিরে আসবে।
জোর হাত কপালে ঠেকিয়ে বৈশাখী বলে, তাই যেন হয় ঠাকুর , ওদের ভালো ভাবে ফিরিয়ে দিও।
তার কথা শেষ হতেই বাইরে মোটর বাইকের শব্দ শোনা যায়। বৈশাখী তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুলে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে , কিরে এত দেরি হল ? বিপদআপদ কিছু হয় নি তো ?
---- তা বিপদ আপদই বটে বই কি ? 
---- সে কি রে ? কি হয়েছিল?  উদ্বেগ ঝড়ে পড়ে বৈশাখীর গলায়। তারপর স্বামীর দিকে চেয়ে বলেন -- হলো তো ? কি বলেছিলাম আমি ?  বিপদ আপদ নিশ্চয় কিছু হয়েছে।
এবারে মুখ খুলতে হয় আর্যকে। স্ত্রীর দিকে চেয়ে সে বলে , আচ্ছা বিপদ আপদটা কি হয়েছে সেটা আগে ওদের বলতে দাও।
তারপর মেয়ের দিকে ফিরে বলে -- কি হয়েছিল বল তো মা ?  
চৈতী বলে --- আর বোল না , তোমাদের কাছে তো শঙ্খদার মতো নাকি ছেলে হয় না, তোমরা ওর কোন দোষ দেখতে পাও না। তা বিপদটা তো ওকে নিয়েই।
---- যাঃ  কি বলছিস তুই ?  ওকে নিয়ে আবার কিসের বিপদ হবে ? 
শঙ্খ ঘটনার গতি প্রকৃতি কোনদিকে যাচ্ছে আন্দাজ করতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।মেয়েটা কি শেষে আজকের ঘটনার কথা বাবা-মাকে বলে দেবে নাকি ? মনে মনে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অবাক চোখে চৈতীর মুখের দিকে চেয়ে থাকে সে। আর সেটা লক্ষ্য করেই রহস্যময় গলাতে চৈতী বলে , বিপদ বলে বিপদ। আসার সময় পুরন্দরপুরে তোমাদের ভালো ছেলেকে বললাম , আজ তো শেষদিন , চলো বেহিরার কালীমাকে একবার প্রণাম করে আসি। তা উনি তো সেই কথা অবজ্ঞা আর উপহাস করে উড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আমি তো আর উড়িয়ে দিতে পারি না। মায়ের রোষানল থেকে রক্ষা পেতে ওনাকে নিয়ে গিয়ে মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে এলাম। সেই জন্যই তো ফিরতে এত দেরি হয়ে গেল।
বাবা মাকে আড়াল করে শঙ্খ দিকে চেয়ে একটা অর্থপূর্ণ কটাক্ষ হেনে ভালোমানুষের মতো মুখ করে বলে --- কি মা ঠিক করি নি বলো ? 
বৈশাখী হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলে , খুব ভালো করেছিস মা। উনি খুব জাগ্রত দেবী। কি থেকে কি হয়ে যায় তা কে বলতে পারে ?
স্ত্রীকে ওইভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দেখে আর্য বলে , এই যে ম্যাডাম এতক্ষণ যে আমাকে খুব তড়পাচ্ছিলে , মোটরবাইকে না গেলে তোমার জাগ্রত মাকে সন্তুষ্ট করতে যেতে পারত ওরা ? 
--- তুমি থামো তো। কি কথারছিরি ? তোমার মা কি কথা ? মা কি তোমার আমার হয় নাকি ? মা তো জগৎজননী ।  তারপর শঙ্খর দিকে ফিরে বলে -- তুমি বাবা তোমার জ্যেঠুর এই বিষয়টাকে আবার আদর্শ করে বোস না।




                     শঙ্খ কি বলবে কিছু ভেবে উঠতে পারে না। জ্যাঠাইমার কথায় সমর্থন করলে জ্যেঠুকে অবমাননা করা হয়। আবার কিছু না বললেও জ্যাঠাইমাকে অবজ্ঞা করা হয়।  তাই খুব দোটানায় পড়ে সে। চৈতীই তাকে সেই দোটানা থেকে উদ্ধার করে। সে'ই বলে ওঠে --- কাকে কি বলছ মা ? উনি তো সেই একই পথের পথিক গো। উনিও তো 'তোমার মা  তোমার মা ' করেই কথা বলছিলেন। বলেই না মায়ের থানে ক্ষমা চাইতে যেতে হলো।
--- যাক বাবা শেষ ভালো যার সব ভালো তার। ভাগ্যিস তুই ওকে মায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে এসেছিস। বেশ বেশ যা এবার সব হাত মুখ ধুয়ে আয়। রান্না হয়ে গেলে সকাল সকাল খেয়ে নিবি সব। ক'দিন ধরে যা ধকল গেল।
বৈশাখী রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। আর্যও বসার ঘরে যায়। আর সেই সুযোগে শঙ্খকে ভেংচি কেটে দিয়ে বাথরুমের দিকে চলে যায় চৈতী। তার মনটা আজ বড়ো ফুরফুরে। নিজের মনের কথাটা শঙ্খদাকে বলতে পেরেছে। শঙ্খদার মনের কথাও জানা হয়েছে। তাই সে মনের আনন্দে গুনগুনিয়ে তার প্রিয় গান ' তোমার আমার জীবন বীনা একতারেতেই বাঁধা ' গাইতে গাইতে বাথরুমে ঢোকে। চৈতীর ওই ভঙ্গিমাটা খুব ভালো লাগে শঙ্খর। তার গমন পথের দিকে চেয়ে থাকে। তারও হৃদয়তন্ত্রীতে যেন বেজে ওঠে সপ্তসুর। রাতে খেতে বসে নানা গল্পগুজবে মেতে ওঠে সবাই। সকালেই শঙ্খ বাড়ি ফিরে যাবে। তাই আসন্ন বিচ্ছেদ ব্যাথায় বিরহ কাতর হয়ে ওঠে চৈতীর মন। পরশুই অবশ্য তারা সবাই শঙ্খদাদের বাড়ি যাবে। ওইদিন শঙ্খদাদের গ্রামে নবান্ন। সেই উপলক্ষ্যে যাত্রা হবে।এখানকার ডাক্তারবাবু , সোমনাথকাকুরা সন্ধ্যেবেলায় যাত্রা শুনতে যাবেন। তারা সকালের দিকেই আর্যদাদের বাড়ি পৌঁছে যাবে। মাঝে একটা দিন। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন কত দীর্ঘ সময়। মন জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর শঙ্খদাকে যেন চোখে হারাচ্ছে সে। সেই সময় আর্য শঙ্খকে বলে , রেজাল্ট বের না হওয়া পর্যন্ত তুমি খবর সংগ্রহ আর লেখায় হাত পাকাতে শুরু কর। যাওয়ার সময় আমার নিউজের কাটিং ফাইলটা নিয়ে যাবে। ওটা পড়লেই খবর সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে উঠবে।
---- আমি এখন কি ধরণের খবর সংগ্রহ করব ? 
---- তোমাদের ওখানে গুনুটিয়ায় ইংরেজ আমলের একটা ভগ্নপ্রায় কুঠি রয়েছে না ? 
---- হ্যা, অনেকে বেড়াতে যায়। আমিও অনেকবার গিয়েছি। ইংরেজ আমলের বহু জিনিস এখনও রয়েছে। 
---- ওই কুঠির ইতিহাস আর বর্তমান অবস্থাকে ধরে খুব সুন্দর একটা প্রতিবেদন হতে পারে। তার আগে ওই কুঠি সম্পর্কে একটু পড়াশোনা মানে একটু হোমওয়ার্ক করে নিতে পারলে ভাল হয়। 
---- আমি বাড়ি গিয়ে কালই কুঠিতে চলে যাব।
শঙ্খর কথাটা লুফে নেয় চৈতী। বাবার দিকে চেয়ে সে বলে , বাবা আমিও কাল শঙ্খদার সঙ্গে যাব ? তাহলে আমারও কুঠিটা দেখা হয়ে যাবে।
মেয়ের কথা শুনে স্ত্রীর মুখের দিকে চায় আর্য। বৈশাখী বলে , যেতে চাইছে যখন যাক না। অসুবিধা কোথাই ? আমরা তো পরশুই যাচ্ছি। ততক্ষণে ওর মালা , ওদের পিসেমশাই , পিসিমনি , গ্রামের লোকের সঙ্গে আলাপ হয়ে যাবে।
আর্য বলে , অসুবিধা কিছুই নেই। কিন্তু কথাটা আমি বললেই তুমি নানা ফ্যাকরা তুলতে। তাই সেই ভুলটা আর করলাম না।বাবা-মায়ের কথা শুনে চৈতী মনে মনে বলে --- ' মার দিয়া কেল্লা। ' শঙ্খর মনেও একই অনুভূতির জন্ম হয়। তারও চৈতীকে ছেড়ে যেতে মন কেমন করছিল। কবে থেকে যে মেয়েটা তার মনে এতখানি জায়গা জুড়ে বসেছিল তা সে টের পায় নি। 




                                 সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসে না দু'জনের। মনের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসে নির্জন নদীতট, রক্তিম সন্ধ্যায় প্রথম স্পর্শানুভুতির কথা। ঘুম নেই আর্য - বৈশাখীর চোখেও। শঙ্খ আর চৈতীকে নিয়ে তাদেরও আলোচনার শেষ নেই। ওদের মন দেওয়া নেওয়ার বিষয়টি উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয় না তাদের। মালার বিয়ের পর ওদের বিয়েটা দিয়ে দিতে চাই বৈশাখী। সেইজন্যই বেশি করে নবান্নে মনোহরপুর যাওয়া।এমনিতে ছেলেমেয়েদুটোর মেলামেশার কথা দুই পরিবারের কারও অজানা নেই। তবু এবারে নবান্নে মনোহরপুরে গিয়ে ওদের বিয়েটা চূড়ান্ত করে আসতে চাই সে। পরদিন সকালেই আর্যর মোটরবাইকে চৈতীকে নিয়ে মনোহরপুর অভিমুখে রওনা দেয় শঙ্খ। পরিচিত এলাকাটা ছাড়িয়ে আসতেই শঙ্খর ঘাড়ে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে গুনগুনিয়ে ওঠে চৈতী।শঙ্খ মুহুর্তের জন্য চৈতীর দিকে মুখ ফিরিয়ে এগিয়ে দেয় তার চুম্বন পিয়াসী ঠোঁট। গান থামিয়ে চৈতী চোখ পাকিয়ে বলে , সামনে তাকাও , বিপদ ঘটে যাবে যে। তখনকার মতো মুখ ফিরিয়ে নিলেও মাঝে মাঝে একই ভাবে চৈতীর ঠোঁটের কাছে ঠোঁট এগিয়ে দেয় শঙ্খ। বার বার মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না চৈতীও। একসময় সেই ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁওয়াতে হয় তাকে।
তারপর বলে , এই যে ছেলে , সাহস যে খুব বেড়ে গেছে দেখছি।
আগের মতোই মোটরবাইকের গতি কমে আসে। কিন্তু শঙ্খর চোখে মুখে আগের মতো ভয়ের চিহ্ন মাত্র নেই। বরং তার চোখে অনুরাগের ছোঁওয়া। প্রত্যুত্তর দেওয়ার পরিবর্তে আপ্লুত গলায় সে গেয়ে ওঠে -- ভয় সরিয়ে তুমি যে গো ভালোবাসায় ভরেছ /আঁধার সরিয়ে তুমি যে আলোর মিনার গড়েছ।
তার গান শেষ হতে  চৈতী এবার নিজে থেকেই শঙ্খর গালে চুমু খেয়ে বলে , আর দুষ্টুমি করবে না কিন্তু।
--- যথা আজ্ঞা দেবী।
---- অ্যাই জানো , তুমি চলে আসবে বলে আমার খুব মন কেমন করছিল। সেইজন্যই তো বাবাকে কায়দা করে তোমার সঙ্গে কুঠি দেখতে আসার কথাটা বললাম।
---- তোমায় ছেড়ে আসতে আমারও মন কেমন করছিল। ইচ্ছা হচ্ছিল জ্যেঠু-জ্যাঠাইমাকে তোমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে আসার কথা বলি। কিন্তু লজ্জায় মুখ ফুটে বলতে পারি নি।
----- ওরে আমার লজ্জাবতী লতা, সবকথা আমাকেই বলতে হবে ? মেয়ে হয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে ভালোবাসার কথাটাও সেই আমাকেই বলতে হলো। আর বাবু মনে মনে চৈতীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। বলেই শঙ্খর গালটা টিপে দেয় চৈতী। আর শঙ্খ অনুরাগ মিশ্রিত গলায় বলে ---- অ্যাই তুমি রাগ করেছ ? 
---- না গো , তোমার ওই লাজুক লাজুক ভাবটা আমার খুব ভালো লাগে। তুমি এমনই থেক।
আরও একবার নির্জন রাস্তায় শঙ্খর গালে ঠোঁট ছোঁওয়ায় চৈতী। ওইভাবে খুনসুটি করতে করতে এক সময় বাড়ির দোরগোঁড়ায় পৌঁচ্ছে যায় তারা। মালা দরজা খুলতে এসে দাদার সঙ্গে প্রায় তারই সমবয়সী একটি মেয়েকে দেখে প্রথমে কিছুটা আশ্চর্যই হয়। কিন্তু মেয়েটা যে চৈতী তা আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না তার। তা নাহলে দাদা অন্য কোন মেয়েকে ওভাবে পিছনে বসিয়ে আনত না। দাদা কোনদিন তাদের সম্পর্কের বিষয়টি খোলসা করে নি। কিন্তু মেয়েটি যে দাদার মনের কুঠুরিতে স্থান করে নিয়েছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত মালা। সে এগিয়ে গিয়ে চৈতীর দুই হাত ধরে ' এসো ভাই ' বলে ঘরের ভিতরে নিয়ে আসে। সেটা দেখে পুরনো কথা মনে পড়ে যায় প্রিয়র। বিয়ের পর স্বাতীও মধুরিমা বাপের বাড়িতে এলে ওইভাবে হাত ধরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে আসত। সম্পর্কে বৌদি-ননন্দ হলেও ওরা ছিল বন্ধুর মতো। বিয়ের আগে মধুরিমাই তাদের একান্তে মেলামেশার সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের বিয়ের ঘটকালিটা বলতে গেলে মধুরিমাই করেছিল। সেইসব কথা মনে পড়তেই মনটা ভারী হয়ে ওঠে প্রিয়র।



                      (  ক্রমশ ) 






     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  






                                      ----০---



No comments:

Post a Comment