Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৮৯











       অন্তরালে 


              অর্ঘ্য ঘোষ



     ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 





সেইসময় চৈতী ' ভালো আছেন কাকু ' বলে এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করে প্রিয়কে। প্রিয়ও তার মাথায় হাত রেখে আর্শিবাদ করে বলে, হ্যা মা ভালো আছি। তুমি , তোমার বাবা - মা সবাই ভালো তো ?
---- হ্যা কাকু সবাই ভালো আছেন।
---- বেশ বেশ শুনে খুব ভালো লাগল। তোমার বাবা - মা দুজনেই খুব ভালো মনের মানুষ। তাদের ঋণ আমরা কোনদিন শোধ করতে পারব না। যাও মা হাত মুখ ধুয়ে কিছু মুখে দাও। মালা চৈতীকে জলটল কিছু দে মা।
--- হ্যা, দিই বাবা। তুমি চা-টা কিছু খাবে এখন ? 
--- চা , তা করবি কর।
--- বেশ আমি এক্ষুনি করে আনছি। 
চৈতীকে নিয়ে ভিতরের ঘরের দিকে চলে যায় মালা।চৈতীকে দেখে প্রিয়র মনে   একটা ইচ্ছা জাগে। কয়েকটা দিন পরেই মালা শ্বশুরঘর করতে চলে যাবে। তারপর তাদের বাড়ি প্রায় ফাঁকা।গোটা বাড়িটাতে তখন তারা দুই বাপ-ব্যাটা।প্রিয়র মনে পড়ে যায় মায়ের কথা। তার বিয়ের আগে মা বলত , মেয়েরা হলো ঘরের লক্ষ্মী।যে বাড়িতে মেয়ে নেই সে বাড়িতে লক্ষ্মীশ্রীও নেই। কবে চোখ বুজব তার ঠিক নেই। তার আগে আমি তোর বিয়ে দিয়ে বাড়িতে লক্ষ্মী প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যেতে চাই। মায়ের মতোই প্রিয়রও মনে হয় এই মেয়েটাকেই যদি শঙ্খর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ঘরে তুলতে পারত তাহলে আবার তার বাড়িতে লক্ষ্মী বিরাজ করত। কিন্তু সেটা কি আদৌও সম্ভব হবে ? আর্যদা খুব বড়ো মনের মানুষ বলেই তাকে চাকরি, প্রাপ্য টাকা পয়সা সব ফিরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয় নি , মালার ভেঙে যাওয়া বিয়ে জোড়া লাগিয়ে দিয়েছেন , শঙ্খকে নিজের বাড়িতে রেখে পড়িয়েছেন, নিজের মেয়ের সঙ্গে খোলা মেলা ভাবে মিশতে দিয়েছেন।তার মানেই যে শঙ্খর সঙ্গে  মেয়ের বিয়ে দিতে রাজী হয়ে যাবেন এমনটা ভাবা বোধ হয় উচ্চাশা হয়ে যাবে। একেই চৈতীরা শহরের পরিবেশে মানুষ , তার উপরে আর্যদা নামী  সাংবাদিক। কত উচু মহলে তার ঘোরাফেরা। চৈতী তার একমাত্র মেয়ে।তাই তিনি হয়তো কোন উঁচু মহলেই ভালো ঘর বরে মেয়েকে দেবেন। সেটাই স্বাভাবিক , সব বাবা-মা'ই সেটাই চান।কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই শঙ্খ আসে ঘরে। ছেলেকে দেখে প্রিয় জিজ্ঞেস করে -- কি রে কিছু বলবি ? 
--- বাবা তোমার কাছে বীরভূমের ইতিহাস সম্পর্কিত একটা বই ছিল না ? 
--- আছে তো। তোর দরকার ? 
---- হ্যা , জ্যেঠু তার কাগজে  গুনুটিয়া কুঠি নিয়ে আমাকে একটা প্রতিবেদন লিখতে বলেছেন। তাই আজ একবার কুঠি যাব ভাবছি। তার আগে কিছুটা হোমওয়ার্ক করা থাকলে খুব সুবিধা হয়।
--- তা তো হবেই।দাঁড়া দেখছি। বলে আলমারি থেকে বইটা বের করে এনে ছেলের হাতে দেয় প্রিয়।বইটা নিয়ে নিজের ঘরে চলে যাওয়া জন্য পা বাড়াতেই চা নিয়ে ঘরে ঢোকে চৈতী। প্রিয়র হাতে চায়ের কাপটা তুলে দিয়ে শঙ্খর দিকে ফিরে সে বলে , তুমি খাবে চা ? 
---- থাকলে দাও। আমি ঘরে যাচ্ছি বইটা একবার চোখ বুলিয়ে নিই ।বইটা নিয়ে নিজের ঘরের দিকে যায় শঙ্খ। চৈতীও তার পিছনে পিছনে যায়। দু'জনকে একসঙ্গে দেখে ইচ্ছাটা আবার ফিরে আসে প্রিয়র মনে। মনে মনে ঠিক করে সময় সুযোগ পেলে প্রস্তাবটা একবার দিয়েই দেখবে। নিজের ছেলে বলে হয়তো গর্ব করা হবে , কিন্তু শঙ্খ এখনকার  ছেলেদের মতো নয়। ওর মধ্যে একটা ইতিবাচক মুল্যবোধ রয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার আগ্রহও রয়েছে।  একসময় তার নিজেরও অল্পবিস্তর লেখালিখির অভ্যাস ছিল। ছোটখাটো দু/একটি পত্রিকায় বেরিয়েও ছিল কিছু লেখা। সেই সুবাদেই তার পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। সেইজন্যই ওইসব বই কিনেছিল সে। তার সেই লেখাপড়ার অভ্যাসটা ছেলের মধ্যেও বাহিত হয়েছে জেনে ভালো লাগে প্রিয়র। ছেলেকে যদি ধনসম্পদের চাইতে বইপত্র দিয়ে যেতে পারে তার মতো ভালো আর কিছু হয় না।আর্যদা শঙ্খকে তার কাগজে লেখার জন্য গড়েপিঠে নিতে শুরু করেছে জেনেও মনটা খুশীতে ভরে যায়। নিরাশার মাঝে ক্ষীণ হলেও আশার আলো দেখতে পায় সে। 



               
                                                আলো দেখতে পায় শঙ্খও। জ্যেঠু যখন তাকে প্রতিবেদনটা লেখার জন্য বলেছিলেন তখন সে যেন দু'চোখে অন্ধকার দেখেছিল। কারণ বার কয়েক কুঠি ঘুরে এলেও তার ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না। তাই সে যেন এতক্ষণ অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল। বাবার বইটা তাকে আলো দেখাল। ঠিক হয় খাওয়া-দাওয়ার পর তারা কুঠিতে যাবে।  সৌমিককেও সেইজন্য চলে আসতে বলে শঙ্খ। খাওয়া দাওয়া চুকতে না চুকতেই নতুন মোটরবাইক নিয়ে হাজির হয় সৌমিক। বিয়ে উপলক্ষ্যে মোটরবাইকটা জামাইকে প্রিয়ই কিনে দিয়েছেন। সৌমিক কিম্বা তার বাবা কেউই প্রথমে নিতে রাজী হন নি। প্রিয়ই একপ্রকার জোর করে কিনে দিয়েছে। সৌমিকের বাবাকে প্রিয় বলেছিল ,  আমার কাছে ছেলেমেয়ে সমান। ছেলের জন্য মোটরবাইক কিনব ঠিক করেছি। তাহলে মেয়েকেই বা বঞ্চিত করব কেন ? 
অরবিন্দবাবু আর আপত্তি করেন নি। সৌমিককে নিয়ে গিয়ে মোটরবাইকটা কিনে আনে প্রিয়। সৌমিক পৌঁছোতেই দুটি মোটরবাইকে চারজনে বেরিয়ে পড়ে ওরা। ওদের দেখে বুকটা ভরে যায় প্রিয়র। সে মনে মনে স্ত্রীর উদ্দেশ্য বলে , খুব তো আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে , দেখ তুমিও কেমন ফাঁকি পড়ে গেলে। ছেলেমেয়েদের এমন খুশীতে ভরা মুখ তুমি দেখতে পেলে না। স্ত্রীর কথা ভাবতে ভাবতে তার চোখে জল আসে। সেই সময় বাইরে থেকে প্রশান্তকাকা হাঁক পাড়েন -- কই প্রিয় , মাচানতলায় যাবে তো নাকি ?
---- যাই কাকা , বলে চোখের জল মুছে বেরিয়ে আসে সে। তারপর দু'জনে মাচানতলা অভিমুখে হাঁটতে শুরু করে।
মাচানতলায় তখন সাজো সাজো রব। রাত পোহালেই নবান্ন। কয়েকবছর বন্ধ থাকার পর এবার আবার যাত্রা হচ্ছে। সেই যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছে প্রিয়। অন্যান্যদের মতো রয়েছেন গঙ্গাধর বাবাজীও। তার মুখে মুখেই আশেপাশের গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়েছে যাত্রার কথা। কয়েক বছর পর আবার যাত্রা দেখতে পাবে বলে ওইসব গ্রামের মানুষজনের মধ্যেও সাড়া পড়েছে। সবাই বলাবলি করছে এবারে নাকি যাত্রা দেখতে লোক ভেঙে পড়বে।তাই আয়োজন সর্বাঙ্গ সুন্দর করতে সবাই উঠে পড়ে লেগেছেন। মাচানতলার পাশ দিয়ে আসার সময় সেই আয়োজন দেখে চৈতীও কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। শঙ্খর মুখে যাত্রা কথা শুনে সেও খুব উৎসাহী হয়ে পড়ে। কলকাতার যাত্রা দেখলেও গ্রামের যাত্রা দেখার অভিজ্ঞতা নেই তার। তাই শঙ্খর কাছে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সে জেনে নেয় গ্রামের যাত্রার কথা। চৈতীকে গ্রামের যাত্রার  কথা বলতে বলতে তারা কুঠিতে পৌঁচ্ছে যায়। কুঠির সামনে দিয়ে তখন কুল কুল করে বয়ে চলেছে ময়ূরাক্ষী নদী। বাঁশের মাচার সাঁকোর উপর দিয়ে নদী পারাপার করছেন মানুষ। গরুর গাড়িতে করে কৃষিপণ্য নিয়ে হাটে যাচ্ছেন চাষিরা।হাঁটু সমান জল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একদল ছেলেমেয়ে। দুদিকে দু'জন গামছা ছেঁকে মাছ ধরেছে।  সেসব দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে চৈতী। আনন্দে বাচ্চাদের  মতো হাততালি দিয়ে সে বলে ওঠে, ঠিক যেন ' আমাদের ছোটনদী চলে বাঁকে বাঁকে / বৈশাখ মাসে তার হা্ঁটুজল থাকে। '
চৈতীকে দেখে তখন স্কুল বালিকার মতো দেখাচ্ছিল। তাকে ওইভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখে মালা বলে ওঠে , কিন্তু ম্যাডাম মাসটা কিন্তু বৈশাখ নয় , অগ্রহায়ণ। সে খেয়াল আছে ? 
--- হলেই বা  , কবিগুরু যখন কবিতাটা লিখেছিলেন তখন বৈশাখ মাস ছিল। কিন্তু দেখ সব যেন মিলে যাচ্ছে। চলো চলো, কুটির ভিতরে চলো। দেখি সেখানে কি অপার বিষ্ময় অপেক্ষা করে আছে।




                                চৈতীর তাড়ায় কুঠির ভিতরে ঢুকতেই শঙ্খর চোখে সত্যিই বিষ্ময় ফুটে ওঠে। তার মনে হয় যেন ইতিহাসের চরণচিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে আনাচে কানাচে। এর আগেও সে বেশ কয়েকবার কুঠিতে এসেছে। কিন্তু ইতিহাস কখনও তার চোখের সামনে এভাবে ধরা দেয় নি। আসলে জ্যেঠুর কথা শুনে এখানে আসার আগে হোমওয়ার্ক করতে গিয়ে কুঠির ইতিহাসটা তার জানা হয়ে যায়। সেই ইতিহাসই এখন প্রতিভাত হয় তার চোখে। সে পাকা গাইডের মতো বলতে বলতে এগিয়ে চলে --- ওই দেখ , চিমনি। গুড় থেকে চিনি তৈরি হত। ওই দেখ রেশম ঘর। গোলাকৃতি ড্রয়িং রুম, গুদাম ঘর। আর ওই দেখ কুঠির মালিক জন চিপ আর তার স্ত্রীর সমাধি। চিপ এদেশকে ভালোবেসেছিলেন। এদেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন। মানুষের বিপদে আপদে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। তাই নানা বিপর্যয়েও এদেশ ছেড়ে যান নি। এদেশের মাটিতেই সস্ত্রীক  নিয়েছিলেন অন্তিম আশ্রয়।
সবাই অবাক হয়ে শঙ্খর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। বিশেষ করে চৈতী তো চোখ ফেরাতে পারে না।ওইভাবে এগিয়ে যেতে যেতে মালা একসময় সবার অগোচরে সৌমিকের হাত টেনে ধরে।সৌমিক তার মুখের দিকে বিষ্মিত হয়ে তাকায়। মালা ঠোঁটে আঙুল রেখে তাকে চুপ করতে বলে হাত ধরে গোলঘরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। শঙ্খ আর চৈতী টের পায় না। তারা ঝোঁপ জঙ্গল ইতিহাসের সন্ধানে এগিয়েই চলে। আর গোলঘরের ভিতরে ঢুকে হবু স্ত্রীর দিকে চেয়ে সৌমিক বলে , ব্যাপারটা কি হল বুঝলাম না ? 
মালা হবু স্বামীর নাকটা মুলে দিয়ে বলে , আরে বুদ্ধুরাম বোঝ না কেন এই নির্জনতায় প্রিয়জনকে কাছে পেতে খুব ইচ্ছা করে।তাই ওদের সেই সুযোগ করে দিতেই তোমায় আটকালাম। আমরাও কিছুটা সময় একান্ত করে পাব। কেন তোমার ভালো লাগছে না ? 
--- তা লাগছে না আবার ? বলেই মালাকে বুকে টেনে নেয় ধরে সৌমিক। মালা কপট রাগ দেখিয়ে বলে -- অ্যাই , একদম দুষ্টুমি করবে না। ভালো হবে না কিন্তু বলছি।
---- খারাপটা কি হবে শুনি ? আমি আমার বৌকে আদর সোহাগ করতেই পারি। তাতে কার কি বলার আছে ? 
---- এখনও তোমার বৌ হইনি কিন্তু ? 
---- কিন্তু আমি তো যেদিন ভালোবেসেছি সেদিন থেকেই তোমাকে বৌ বলে জানি।
মালাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সৌমিক। সেই আলিঙ্গনে পৃষ্ট হতে হতে মালা তার ঠোঁট সৌমিকের ঠোঁটের কাছে উঁচু করে তুলে ধরে। চুম্বন পিয়াসী সেই ঠোঁটে সৌমিক তার ঠোঁট নামিয়ে আনে। ওদিকে তখন চৈতী আর শঙ্খ কুঠির শেষপ্রান্তে পৌঁচ্ছে যায়। তারপর পিছন ফিরে দেখে কেউ কোথাও নেই। যতদুর দৃষ্টি চলে দেখা যায় শুধু ঘন জঙ্গল। সেই নির্জনতায় তারাও আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়। আদর সোহাগে কেটে যায় অনেকটা সময়।




                         ( ক্রমশ ) 







     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  






                                      ----০---



No comments:

Post a Comment