Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কীর্তি যস্য -- ২ ( অনন্ত মালাকার)



                                   


শোলাশিল্পে আন্তর্জাতিক খ্যাতি  অর্জন করেছেন অনন্ত মালাকার


                                                 




 
                  অর্ঘ্য ঘোষ





পরিবারে শোলাশিল্পের চল থাকলেও বাল্যকালে সেই শিল্পকর্মে মন ছিল না । সেই শোলাশিল্পই আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে অনন্ত মালাকারকে। দিয়েছে শিল্পগুরুর স্বীকৃতিও। ১৯৪২ সালের ২৯ জানুয়ারি অধুনা পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম থানার পালিটা গ্রামে তার জন্ম। বর্তমানে নানুরের কীর্ণাহারের পশ্চিমপট্টির বাসিন্দা হলেও  ওই গ্রামেই ছিল অনন্তবাবুর আদি বাড়ি। সেখানেই ছিল তাদের অভাবের সংসার। বাবা অশ্বিনী মালাকার ছিলেন শিল্পী মানুষ। শোলা , জরি এবং বাজি তৈরির কাজ করতেন। মা সরসীদেবীও শোলাশিল্পের পাশাপাশিমাটির পুতুল তৈরি করতেন। দিদি পুষ্পলতা এবং বড়দা এককড়ি মালাকারও শোলাশিল্পেরকাজ করতেন। কিন্তু বালক অনন্ত মালাকারের সেসব দিকে ঝোঁক ছিল না। তার ছিলআঁকা , আবৃত্তি এবং অভিনয়ের শখ। ভালো ছবি আঁকতেন। যাত্রা নাটকের দলে মহিলাচরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। কিন্তু সেসব ছিল বাবার না পছন্দের।ছেলেকে শোলাশিল্পের কাজে মন দিতে বলতেন। কিন্তু ছেলে তা কানে তুলতেন না। তাই বাবা বকাবকি করতেন। প্রশ্রয় মিলত দিদির কাছে।দিদিই বাবাকে বলতেন , ওকেবকাবকি কোর না। ওর যা মন চাই, ওকে তাই করতে দাও।



     
                             অগত্যা ছবি আঁকার জগতে সামিল করার জন্য একদিন বিশ্বভারতী কলাভবনে ভর্তি করতে নন্দলাল বসুর কাছে ছেলেকে নিয়ে যান বাবা। নন্দলালবাবু তার আঁকাছবি এবং কিছু মাটির মডেল দেখে প্রশংসা করেন। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবেসেদিন তার কলাভবনে ভর্তি হওয়া হয় নি। নন্দলালবাবু বলেছিলেন , ‘ওকে মাধ্যমিকপাশ করিয়ে আনুন। কারণ আর্টের বইগুলো অধিকাংশই ইংরাজী ভাষার। সেইজন্য কিছুটা ইংরাজী জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। সেই কথা শুনেই হতাশ হয়ে পড়েন বাবা-ছেলে। কারণ অর্থাভাবে নবম শ্রেণীর বেশি পড়া এগোয় নি অনন্তবাবুর। আর ছেলেকে পড়ানোও সম্ভব ছিল না অশ্বিনীবাবুর। সেই কথা শুনে রামকিঙ্কর বেইজ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তিনিইঅশ্বিনীবাবুকে বলেন , তুমি যখন ওকে পড়াতে পারবেই না বলছ , তখন বরং মাঝে মাঝে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। আমি মডেলিংএর দিকটা দেখিয়ে দেব। 



                            
                     সেই দিনের কথা আজও অনন্তবাবুর মনের মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে আছে। সেই থেকেই রামকিঙ্করের কাছে কাজ শেখা শুরু হয়। তিন বছর কাজ শেখার পর একদিন হঠাৎজীবিকা অর্জনের তাগিদে বাড়ি ছেড়ে পাড়ি জমান কলকাতায়। ঠাঁই হয় কুমোরটুলিতে।বাবার বকা খেয়ে যেটুকু  শোলাশিল্পের কাজ শিখেছিলেন সেই শিক্ষাটুকু সম্বল করেসেখানে শোলার অলংকার তৈরির কাজ শুরু করেন। সেখানে তার কাজ দেখে শোভাবাজারে নিজের স্টুডিওতে নিয়ে যান ভাস্কর রমেশচন্দ্র পাল। সেই স্টুডিওতে দুবছর একই কাজ করেন তিনি। তারপর স্বাধীনভাবে কালীঘাটে শুরু করেন। সেখানেই ভবানীপুরেরক্যামেলিয়া রেস্টুরেন্টে বন্ধুত্ব হয় উত্তমকুমারের ভাগ্নে অমল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। অমলবাবু তার শোলার কাজের কথা শুনে পূর্ণাংগ প্রতিমা গড়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন অনন্তবাবু। ভবানীপুরের সপ্তর্ষি ক্লাবের জন্য সম্পূর্ণ শোলার প্রতিমা তৈরির বায়না নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।
        


                                তার চ্যালেঞ্জের কথা শুনেই তো বকাবকি শুরু করে দেন বাবা। সংশয় প্রকাশ করে বলেন , পুরোপুরি শোলার তৈরি প্রতিমা আবার হয় নাকি ? বায়না নিয়ে এসেছো , এবার মুর্তি দিতে না পারলে কলকাতার ছেলেরা তোমাকে ম্যানহোলে ঢুকিয়ে দেবে। সেদিন দিদিই কেবল সাহস আর উৎসাহ যুগিয়েছিলেন। সেই উৎসাহেই দুমাসের মধ্যেই আট ফুট চালি বিশিষ্ট পাঁচ ফুটের সম্পূর্ণ শোলার সরস্বতী প্রতিমা করে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। সেই মুর্তি দেখতে তার বাড়িতে ভিড় উপচে পড়ে। হাসি ফোটে বাবার মুখে। মুর্তি দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন ক্লাব কর্তারা। সেই দিনটা যেন আজও অনন্তবাবুর চোখের সামনে ভাসে। প্রতিমা দেখেতে আসেন মহানায়ক উত্তমকুমার। তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই তিনি অনন্তবাবুর মাথায় হাত রেখে আর্শিবাদ করেন। মুর্তির ভূয়সী প্রশংসাও করেন।তিনিই ফোন করে আনন্দবাজার পত্রিকাকে জানান।



                         সেইদিন শুরু হয় যাত্রা। খবর পেয়ে শোলার প্রতিমা দেখতে আসেন পূর্বাঞ্চলীয় ডি,সি হ্যান্ডিক্র্যাপ্টস সুধীন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডাইরেক্টর প্রভাস সেন।তারা মুর্তিটিকে দিল্লী পাঠান। তারপর প্রভাসবাবুর নির্দেশে আড়াই ফুটের শোলার বাংলা আর্টের লক্ষ্মী প্রতিমা গড়ে ভারত সরকার প্রদত্ত সার্টিফিকেট অফ মেরিট এবং পরবর্তীকালে আড়াই ফুটের বাংলা আর্টের দুর্গা প্রতিমা গড়ে জাতীয় পুরষ্কার পান। সেই দিন আজও তার স্মৃতির সঞ্চয় হয়ে রয়েছেন। সেদিন রাস্ট্রপতি ভি,ভি,গিরি বিজ্ঞান ভবনে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন। আর সফরদজং বাংলোর ভোজ সভায় প্রথম খাবারের প্লেটটি আমার হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী।   


            
                        তারপর থেকেই উপাধি আর পুরষ্কারে তার ঝুলি ভর্তি হয়ে গিয়েছে। শুধু এদেশেই নয় , পুরস্কার পেয়েছেন রাশিয়া , আমেরিকা , কালিফোর্নিয়া প্রভৃতি জায়গাতেও।২০০৪ সালে ভারত সরকার তাকে শিল্পগুরু আখ্যা দিয়েছেন। এদেশের দিল্লি ন্যাশানাল মিউজিয়াম , ন্যাশনাল ক্র্যাপ্টস মিউজিয়াম, ছত্রপতি শিবাজী মিউজিয়াম ,মহারাষ্ট্রের এশিয়া প্লাটো পাঞ্চগনি , কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম , নেহেরু চিল্ডেন মিউজিয়াম , বিড়লা একাডেমী সহ বিভিন্ন জায়গায় তার শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। বিভিন্ন সময় তার শিল্পকর্ম পাড়ি দিয়েছে নিউইয়র্ক , নিউ জার্সি , টরেন্টো ওয়াশিংটন , জার্মানী , মস্কো ,মরিশাস সহ বিভিন্ন বিদেশী মিউজিয়াম কিম্বা প্রদর্শনীতে।



                           বর্তমানে প্রশিক্ষক হিসাবে যুক্ত রয়েছেন দিল্লীর সি,সি,আর,টি’তে।সেখানে ৪০০ জন স্কুল শিক্ষককে ভারতীয় সংস্কৃতি ক্র্যাফপ্ট বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। যুক্ত রয়েছেন তিনটি আই, আই , টি প্রতিষ্ঠানেও। তারা যখন যেখানে ডাকেন সম্মানীয় প্রশিক্ষক হিসাবে প্রশিক্ষণ দিতে যান। শোলাশিল্পের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা এবং সমাজসেবা নিয়েই এখন সময় কাটে তার। লিখেছেন তিন শতাধিক কবিতা , পঞ্চাশটি গল্প এবং প্রবন্ধ।রাজ্যের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে তার লেখা। প্রকাশিত হয়েছে তিনটি উপন্যাসও।দুই বাংলার শোলাশিল্প নিয়ে লিখছেন একটি বই।



                              
                                       কীর্ণাহারে অনন্তবাবুর আট সদস্যের সংসার। বড় ছেলে অরূপ বাবার মতোই শোলার কাজ করেন। ছোট ছেলে অনুপ প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। অনন্তবাবুর আক্ষেপ , বর্তমান প্রজন্ম শোলাশিল্পের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। একদিন হয়তো এই শিল্পের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একদিন অর্থাভাবে নিজের পড়া হয়নি। কিন্তু তার শিল্পকর্মের উপরেই অনেকে ডক্টরেট করেছেন।একদিন ইংরাজী না জানার জন্য তার কলাভবনে ভর্তি হওয়া হয় নি। কিন্তু তাকে নিয়েই ইংরাজীতে তথ্যচিত্র হয়েছে।



                  -----০-----



     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  







দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে -----







                   ----০---














No comments:

Post a Comment