Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কীর্তি যস্য -- ৩ ( পার্থপ্রদীপ )



 


     মানুষ গড়ে সেরার শিরোপা পেয়েছেন  কারিগর পার্থপ্রদীপ সিংহ 



                                                                      





                          অর্ঘ্য ঘোষ





দায়িত্বভার নিয়েই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বদলে দিয়েছিলেন স্কুলের খোলনলচে। তারই স্বীকৃতি স্বরূপ এক বছরের ব্যবধানেই শিক্ষারত্ন এবং জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন লাভপুরের কালিকাপুরডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পার্থপ্রদীপ সিংহ। পুরোপুরি আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামের ওই স্কুলটি জেলার আর পাঁচটি স্কুলের থেকে আলাদা ছিল না। বরং অন্য স্কুলের তুলনায় নানান সমস্যায় জর্জ্জরিত ছিল। না ছিল শিক্ষা সুলভ পরিবেশ , না ছিল শিক্ষানুরাগ। সেই স্কুলটিই এখন সবার নজরকেড়েছে। কি নেই ওই স্কুলে ?


                       গ্রামে ঢোকার রাস্তার একদিকে প্রাচীর ঘেরা দোতলা স্কুলবাড়ি । বিপরীতেও প্রাচীর ঘেরা মিড,ডে,মিল রান্না এবং খাওয়ার জায়গা , শৌচাগার , ফুলবাগান , খেলার জায়গা। সব যেন সাজানো ছবির মতো। স্কুলে ঢোকার মুখে সার দিয়ে সাজানো পড়ুয়াদের জুতোর সারি। প্রতিটি ক্লাসঘরে জলের ফিলটার। অফিসঘরে ছোট্ট লাইবেরী , আলমারিতে নাটকের পোশাক , মুখোশ সযত্নে রাখা। রয়েছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। শিক্ষামূলক তথ্যচিত্র প্রদর্শনের জন্য রয়েছে নিজস্ব প্রোজেক্টর। দোতলার হলঘরে ছাত্রছাত্রীদের আঁকা ছবির আর্ট গ্যালারি। ছাদে বৈদ্যুতিন ব্যবস্থায় ছাত্রছাত্রীদের গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান দেখানোর জন্য কৃত্রিম সৌরজগত। অন্যদিকে রয়েছে পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর , খাওয়ার জন্য প্রতিটি পড়ুয়ার থালা , বাটি,  গ্লাস। পড়ুয়াদের উচ্চতা অনুযায়ী তিনটি তিন উচ্চতার বেসিন। খাওয়ার আগে সবার হাতে দেওয়া হয় ‘হ্যান্ড-ওয়াস।’ বেসিনে লাইন ধরে হাত ধোয় পড়ুয়ারা। বেসিনের ব্যবহৃত জল পাইপের মাধ্যমে গিয়ে পড়ে লাগোয়া ফুলের বাগানে। সেখানে সারা বছরই ফুটে থাকে নানা মরসুমি ফুল। পাশেই ছেলেদের এবং মেয়েদের তিনটি করে শৌচাগার।খেলার জন্য স্লিপার , দোলনা , মানুষের ক্রমবিবর্তনের স্ট্যাচু , সংস্কৃতি মঞ্চ। স্কুলে পড়ুয়ার  গড় হাজিরা ৯০ শতাংশ।


                           স্কুলের এই পরিবেশের জন্য পঠনপাঠনের মানও উন্নত হচ্ছে । দুরের গ্রাম থেকেও ছেলেমেয়েরা ভর্তি হচ্ছে।  অথচ একসময় এমন ছিল সুদিন ছিলনা। গ্রামের  সবাই দিনমজুর। কাজে বেড়িয়ে যাওয়ার পর ছেলেমেয়েরা স্কুলে গেল কি না গেল তা দেখার কেউ নেই অধিকাংশ পরিবারে। পার্থবাবু স্কুলে যোগ দেওয়ার পর ছেলেমেয়েদের আর স্কুলে না গিয়ে উপায় থাকে না। তিনি নিজেই  বাড়িতে হাজির হন। তাই স্কুলমুখী হয়েছে গ্রামের ছেলেমেয়েরা। তাদের পড়ানোর জন্য গ্রামবাসীদের কাছে আদিবাসী ভাষাও শিখেছেন তিনি। ছেলেমেয়েরা তাই এখন আর স্কুল পালায় না। বরং বাবা-মা কোন কাজে বাড়িতে আটকে রাখার চেষ্টা করলে বাড়ি থেকে পালিয়ে স্কুলে হাজির হয়। কারণ স্কুলে এখন তাদের  শুধুমাত্র পড়াশোনার গন্ডীতে বেঁধে রাখা হয় না , খেলাধুলো , গল্প , খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি হরেক রকম বিনোদনের দরজা দুহাট করে খুলে দেওয়া হয়েছে।


  
                                শুধু পড়ুয়ারাই নয় , অভিভাবকেরাও সামিল হয়েছেন স্কুলের নানা কর্মসূচিতে। স্কুলের উন্নয়নে গ্রামবাসীদেরও সামিল করেছেন পার্থবাবু। আগে গ্রামে ৫/৬ টি সরস্বতী পুজো হত। এখন পার্থবাবুর উদ্যোগেই স্কুলে ধুমধাম করে একটাই পুজো হয়। তাতে অনেক টাকা সাশ্রয় হয়।সেই টাকায়  ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অভিভাবকেরাও নাটক সহ নানা আদিবাসী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সারা গ্রাম  মিলে স্কুলে পংক্তিভোজও হয়। উদ্বৃত্ত টাকা লাগানো হয়  স্কুলের উন্নয়নের কাজে। স্কুলের এই হেন উত্তোরণের কথা শুনে ২০১৬ সালে হাইদ্রাবাদের ২৫ সদস্যের এক শিক্ষা পরিদর্শক  প্রতিনিধিদলও ওই স্কুল পরিদর্শনে এসে ভূয়সী প্রশংসা করে যান। পার্থবাবুর প্রচেষ্টাতেই স্কুল সবার নজর কেড়েছে।



        
                ১৯৬৪ সালের ২১ জানুয়ারি পার্থবাবুর জন্ম। বর্তমানে লাভপুরের বিরামমন্দির পল্লীর বাসিন্দা হলেও স্থানীয়  ভালাস গ্রামে তার বাড়ি। বাবা প্রয়াত আনন্দদুলাল সিংহ ছিলেন লাভপুর শম্ভুনাথ কলেজের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মী। মা স্বর্ণময়ীদেবী গৃহবধু। বিরামমন্দির পল্লীতে স্ত্রী মিলিদেবী , ছেলে নীলাঞ্জন এবং মেয়ে পৃথাকে নিয়ে পার্থবাবুর ছোট্ট সংসার। অসুস্থতাজনিত কারণে মাধ্যমিকের বেশি পড়া এগোয় নি ছেলের।পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চাতেও সমান পারদর্শিনী পৃথা। শম্ভুনাথ কলেজের পদার্থ বিদ্যার স্নাত্মক পার্থবাবু ১৯৯৫ সালে প্রথম লাভপুরের মানপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। ২০০৪ সালে প্রধান শিক্ষক হন স্থানীয় দুবসা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ২০০৯ সালে কালিকাপুরডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন তিনি। তারপর থেকেই সেখান শুরু করেন মানুষ গড়ার কাজ। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে রাজ্য সরকারের কাছে থেকে পেয়েছেন শিক্ষারত্ন পুরস্কার। ২০১৭ সালে মিলেছে জাতীয় পুরস্কার। নজরুল মঞ্চে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় তার হাতে শিক্ষারত্ন পুরস্কার তুলে দেন। দিল্লির বিজ্ঞানভবনে জাতীয় পুরস্কার তুলে দেন উপরাষ্ট্রপতি ভেঙ্কাইয়া নাইডু। সেই দুটি দিনের কথা আজও তার মনের মনিকোঠায় অক্ষয় হয়ে রয়েছে। সেদিনের কথা ভাবলে আজও তার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।


           
                          দুটি পুরস্কার বাবদ পাওয়া টাকার সিংহভাগ পার্থবাবু স্কুলের ছাদে কৃত্রিম সৌরজগৎ নির্মাণ এবং মানুষের ক্রম বিবর্তণের স্ট্যাচু সংরক্ষণের কাজে ব্যয় করেছেন । শুধু শিক্ষারত্ন বা জাতীয় পুরস্কারই নয় , ২০১৮ সালে দিল্লির ইন্টারন্যাশানাল পাবলিশিং হাউস  অমিতাভ বচ্চন , শিবরাজ পাটিল , মীরাকুমার , মহেন্দ্র সিংহধোনির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের ১৪২ জন কৃতি মানুষের মধ্যে পার্থবাবুকেও বেস্ট সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। শুধু  শিক্ষাক্ষেত্রেই নয় , সাংস্কৃতিক জগতেও পার্থবাবুর অবাধ বিচরণ। এলাকায় নাট্যকর্মীও হিসাবেও তার পরিচিতি রয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত নাট্যদলের নাম দিশারী সাংস্কৃতিক চক্র। ওই নাট্যদলের একটি বিশেষত্ব রয়েছে। সূচনা লগ্ন থেকেই তারা শুধুমাত্র কথাসাহিত্যক তারাশঙ্কর  ববন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন কাহিনীর নাট্যরূপ দিয়ে পরিবেশন করে আসছেন। অভিনয় , নির্দেশনার পাশাপাশি ওইসব কাহিনীর নাট্যরূপ দেন পার্থবাবু। তার রচিত মৌলিক নাটকও রয়েছে। একই সঙ্গে মঞ্জরী নামে কচিকাঁচাদের নাচ , গান , আবৃত্তি, নাটক , অঙ্কন শিক্ষার প্রতিষ্ঠানও চালান।স্বভাবতই শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি  এলাকার সাংস্কৃতিক চর্চা বিকাশেও তার অবদান অনস্বীকার্য।


                           পার্থবাবু অবশ্য যাবতীয় স্বীকৃতির জন্য এলাকার মানুষজনের কাছে কৃতজ্ঞ। স্কুলের উন্নয়নে সবাই সামিল হয়েছিলেন বলেই কাজটা সহজ হয়েছে।তাই স্বীকৃতিটা ওই গ্রামের মানুষজনেরও সমান প্রাপ্য বলেই মনে করেন তিনি। সেইজন্য পুরস্কারের টাকার সিংহভাগই স্কুলের উন্নয়নে লাগিয়েছেন । তাই এলাকার মানুষজন থেকে শিক্ষা দফতরের কর্তারা তার  প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সরকার স্কুল গড়ে , তা রক্ষার দায়িত্ব  মানুষের। এলাকার মানুষকে সেই দায়িত্ব সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করে পার্থবাবু  দেখিয়ে দিয়েছেন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিজের ভাবতে পারলে কি হয় ? কৃতিত্বের নিরিখে সত্যিই তিনি কৃতি মানুষ। তার পদাঙ্ক অনুসরণ যোগ্য।



                         -----০-----




     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  







দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে -----







                   ----০---

No comments:

Post a Comment