বাবাকে রাগাতে গিয়ে সাহিত্য অনুরাগ জন্মায়
অনিতা মুখোপাধ্যায়ের
অনিতা মুখোপাধ্যায়ের
অর্ঘ্য ঘোষ
মেয়েবেলায় পড়াশোনা ফেলে সঙ্গীদের নিয়ে বাগানে বাগানে আম-জাম পেড়ে বেড়াতেন । কখনও বা পুকুরে ডুব সাঁতার কেটে চোখ লাল করে বাড়ি ফিরতেন। তাই নিয়ে বাবা-মায়ের কাছে বিস্তর বকা খেতেন। তবুও স্বভাবের পরিবর্তন হয় নি মেয়েটির। তাই বকুনি খাওয়াও ঘোচে নি। একদিন বাবার কাছে বকুনি খেয়ে খুব রাগ হয়ে যায় তার। সেইজন্য বাবাকে রাগাতে খাতায় লিখে ফেলেন ‘মোদের বাবার নামটি রাজা / সদাই দেয় সে সাজা / বাবা খুব ধর্মভীরু / তবু তার জোটে নি গুরু।’ সেই ছড়াটি অবশ্য সরাসরি বাবাকে দেখানোর সাহস হয়নি মেয়েটির। দেখিয়েছিলেন মাকে। মা মজা পেয়ে মেয়ের সাহিত্যকীর্তি বাবাকে পড়ে শুনিয়েছিলেন। বাবা মৃদু হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় লেখা সেই ছড়া আজও মনের মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে রয়েছে অনিতা মুখোপাধ্যায়ের।সেদিন বাবাকে রাগাতে লেখা সেই ছড়াই তাকে পরবর্তী কালে সাহিত্য অনুরাগী করে তোলে।
নানুরের পেঙ্গা গ্রামে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৬৫ সালের ৭ ডিসেম্বর অনিতাদেবীর জন্ম। বাবা রাজানন্দ গোস্বামী ছিলেন গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাও করতেন তিনি। মা বীনাপানি দেবী ছিলেন গৃহবধু। নয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট অনিতাদেবীর বাবাকে রাগানোর সেই ছড়া রচনার পর থেকেই গোপনে কলম চলতে থাকে। পরবর্তীকালে সাহিত্য রচনাতেই তিনি খুঁজে পান নিজস্ব জগত। বি,এ পাশ করার পর গ্রন্থাগারিক শোভনেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বছরের পাঁচেকের মাথায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় স্বামীর। তিন বছরের মেয়ে কেকাকে নিয়ে শোক বিহ্বল হয়ে পড়েন অনিতাদেবী।
মেয়েকে মানুষ করার পাশাপাশি কলম আঁকড়ে ধরেন। মহুয়া , চণ্ডীদাস , রাঙাখই , উন্মচন সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়। এ পর্যন্ত তার প্রাকশিত গল্প-উপন্যাসের সংখ্যা ১৮ টি।তার মধ্যে ' ভালোবাসার আড়ালে ' ' মাষ্টার মশাই ' , 'যান্ত্রিক ভালোবাসা ' , ' শ্রেয়ার সংসার ' অন্যতম।ছোটদের জন্যও কলম ধরেছেন তিনি। তাদের জন্য লিখেছেন ' বিড়ালের ভবিষ্যৎ ' , ' নীতি শিক্ষার গল্প ' , বিড়িখেকো ভুত ' , ' রকমারি স্বাদের হাসির গল্প '। স্বনামের পাশাপাশি ' অম্বালি ' ছদ্মনামেও বেশ কিছু বই লিখেছেন। তার লেখায় উঠে এসেছে মাটি - মানুষ আর গ্রামজীবনে কথা। একেবারে মানুষের মুখের ভাষা স্থান পেয়েছে তার রচনায়। তাই তার লেখা পাঠক এবং সাহিত্য মহলে বিশেষ সমাদর লাভ করেছে।
শুধু নিজে লিখেই ক্ষান্ত হন নি। অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করেছেন। বর্তমানে নানুরের সাকুলিপুরের বাসিন্দা অনিতাদেবী ২০০৯ সালে স্থানীয় চণ্ডীদাস নানুর স্মৃতি সাধারণ পাঠাগারে গ্রন্থাগারিক হিসাবে যোগ দেন। সাহিত্যচর্চার প্রসারে ওই গ্রন্থাগারে তিনি প্রতিমাসের প্রথম শনিবার সাহিত্যসভার আসর বসান। সেই আসরে বিভিন্ন সময়ে নবীন লেখকদের পাশাপাশি প্রথিতযশা সাহিত্যিকেরাও হাজির হয়েছেন। মুলত তারই উদ্যোগে ওই সাহিত্য সভায় পঠিত কবিতা , গল্প , প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত হয় ত্রৈমাসিক ফাইল পত্রিকা। ফাইল পত্রিকায় প্রকাশিত ওইসব নির্বাচিত রচনা নিয়ে প্রকাশিত হয় চন্ডীদাস নামে বাৎসরিক সাহিত্য পত্রিকা। তার জন্যই প্রবীণদের পাশাপাশি বহু নবীন সাহিত্যকর্মী আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন।
এহেন সাহিত্য কীর্তির জন্য অনিতাদেবীকে মহুয়া পত্রিকা গোষ্ঠী , নয়াপ্রজন্ম পত্রিকা গোষ্ঠী , চণ্ডীদাস হরিগুণানুকীর্তন কমিটি , নানুর থানা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছে। শুধু সাহিত্য কর্মই নয় , তার সুদক্ষ পরিচালনায় ২০১৫ সালে সংশ্লিষ্ট বোলপুর মহকুমায় পাঠক পরিষেবায় সেরার শিরোপা পেয়েছে চণ্ডীদাস স্মৃতি সাধারণ পাঠাগার। ২০১৭ সালে মডেল লাইব্রেরীরও স্বীকৃতি পেয়েছে ওই গ্রন্থাগার। তার সুদক্ষ পরিচালনায় ২০১৯ সালে পাঠক পরিষেবায় জেলা সেরা গ্রামীণ গ্রন্থাগারেরও স্বীকৃতি মিলেছে। সাহিত্যসেবার পাশাপাশি সমাজসেবাতেও তার সমান আগ্রহ। তার গোপন দানে বহু দুঃস্থ ছাত্র পড়ার সুযোগ পেয়েছে , চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন বহু মানুষ। তবুও বিন্দুমাত্র আত্মশ্লাঘা নেই। বরং অস্বস্তির ছাপ ফুটে ওঠে তার চোখে মুখে। কারণ দক্ষিণহস্তের দান বাম হস্তের কাছে গোপন রাখার শিক্ষাই যে বাবা-মায়ের কাছে পেয়েছেন তিনি।
-----০----






No comments:
Post a Comment