ডাক্তার অভিনেতা
অর্ঘ্য ঘোষ
সাহিত্যিকদের নিয়ে দক্ষিণ কলকাতায় একবার একটি নাটক করেছিলেন কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।সেই নাটকে প্রম্পটার ছিলেন তারাশঙ্করের স্নেহধন্য ফটিক। অভিনয় শেষে তারাশঙ্করবাবু সাজঘরে সকৌতুকে বলেছিলেন , ' ফটিক তোমার প্রম্পট ভালোই হয়েছে। আমরা যারা অভিনয় করেছি তারা শুনতে তো পেয়েছেই , দর্শকরাও ভালোভাবে শুনেছেন তোমার প্রম্পট'। গ্রামে ফিরে সেই গল্প পাঁচজনের কাছে করেছিলেন ফটিকবাবু। আজও নাটক যাত্রার আসরে সেই কথাটা মুখে মুখে ফেরে।
লাভপুরের বাবুপাড়ার বাসিন্দা ফটিকবাবুর জন্ম ১৯২৫ সালের ২০ জানুয়ারি। তার পোশাকি নাম বঙ্কিমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। এলাকায় তিনি ফটিকডাক্তার হিসাবেই সমধিক পরিচিত। বাবা নিত্যগোপালবাবু ছিলেন পুলিশকর্তা। মা রাধারানী গৃহবধু।ছয় ভাইবোনের ছোট বঙ্কিমবাবু লাভপুরের ফ্রি কুইনটন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে লাভপুর যাদবলাল হাইস্কুল থেকে এন্ট্রাস পাস করেন। তারপর সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে আই,এস,সি এবং পরবর্তীকালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশের পর লাভপুরে প্রাইভেট প্রাকটিস শুরু করেন। একসময় সরকারি হাসপাতালে চাকরিও পান। কিন্তু তারাশঙ্করবাবুর অনুরোধে সে চাকরি তার করা হয় নি।
তারাশঙ্করবাবু ছিলেন তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠজন। তার বড়মেয়ে গঙ্গাদেবীর সঙ্গে বঙ্কিমবাবুর বড়দা শান্তিশঙ্করের বিয়ে হয়। সেই সুত্রে উভয় পরিবারে যাতায়াত ছিল তাদের। বঙ্কিমবাবু মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন তারাশঙ্করবাবু অসুস্থ হয়ে পড়লে টালাপার্কের বাড়িতে তাকে ডেকে পাঠাতেন। লাভপুরে অসুস্থ হলেও ডাক পড়ত তার। তারাশঙ্করের রচনাতেও ডাক্তার হিসাবে বঙ্কিমবাবু এবং সুকুমার চন্দ্র ওরফে বিশুবাবুর উল্লেখ রয়েছে।
বঙ্কিমবাবুর বাইরে চাকরি করতে যাওয়ার কথা শুনে সেদিন তারাশঙ্করবাবু বলেছিলেন, ফটিক তোমরা যদি ডাক্তারি পাশ করে চাকরি করতে বাইরে চলে যাও তাহলে অসুখ-বিসুখ গ্রামের মানুষগুলোকে দেখবে কে ? সেই কথা অমান্য করে আর চাকরি করতে যাওয়া হয় নি বঙ্কিমবাবুর। গ্রামেই প্রাইভেট প্রাকটিসের পাশাপাশি নাট্যচর্চা চালিয়ে গিয়েছেন।সাংস্কৃতিক পরিবেশে মানুষ বঙ্কিমবাবুর ছেলেবেলা থেকেই নাটক তথা সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি অসীম অনুরাগ।
বাবা নিত্যগোপালবাবু যাত্রা নাটকে অভিনয় করতেন। ভালো কীর্তন গাইতেন। কলকাতা রেডিও স্টেশনেও গান করেছেন। দাদা শান্তিশঙ্করও অভিনয় করতেন। পরিবারে উচ্চাঙ্গ সংগীত চর্চার রেওয়াজ ছিল। খেলাধুলোর পরিবর্তে বালক ফটিককে টানত ওইসব সাংস্কৃতিক চর্চা। বাবা-দাদাদের অভিনয় দেখে বাড়িতে আপন খেয়ালে তা রপ্ত করার চেষ্টা করতেন সেদিনের সেই বালক।
অতুলশিব রঙ্গমঞ্চে সত্যনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত তারাশঙ্করের কালিন্দী নাটকে রাঙাবাবুর ভূমিকায় অভিনেতা হিসাবে তার প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। তারপর বিভিন্ন সময়ে ‘আনন্দমঠে’ ' ধীরানন্দ ' , ‘ দ্বিতীয় পানিপথে ’ সমরু , ‘নাজমা হোসেনে’ হোসেনের ভূমিকা সহ বিভিন্ন যাত্রা নাটকে তার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। ১৯৬৫ সালে অতুলশিব ক্লাব আয়জিত পশ্চিমবঙ্গ নাট্য প্রতিযোগিতায় আনন্দমঠ তৃতীয় স্থান অধিকার করে। ওই নাট্য প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসনে ছিলেন খোদ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। মঞ্চসজ্জায় ছিলেন চিত্র পরিচালক পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। পুরুষ চরিত্রের পাশাপাশি তারাশঙ্করের ‘ দুই পুরুষ ’ নাটকে স্ত্রী চরিত্র মমতা , ‘ সিরাজদৌল্লা ’ নাটকে লুৎফার চরিত্রেও অভিনয় করে সারা ফেলে দেন তিনি।
নাট্যচর্চার পাশাপাশি সাহিত্য এবং সংগীত চর্চাতেও তার সুনাম রয়েছে। ‘দিদিভাই’ , ‘বীরভূম বার্তা ’ , ‘আলোর ফুলকি ’ প্রভৃতি পত্রিকায় একসময় তার লেখা কবিতা , ছড়া , স্মৃতিকথা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা দিবসের দিন লাভপুরে প্রভাত ফেরিতে যারা গান গেয়েছিলেন বঙ্কিমবাবু তাদের অন্যতম। এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার ভূমিকা অপরিসীম। দীর্ঘদিন তিনি অতুলশিব ক্লাবের কর্মকর্তা হিসাবে বিভিন্ন ধরণের সংস্কৃতিচর্চা বিকাশের কাজ করেছেন। ধাত্রী
দেবতায় তিনিই প্রথম গুটি কয়েক সাহিত্য অনুরাগীকে নিয়ে তারাশঙ্করের জন্মদিন পালনের উদ্যোগ নেন। এহেন সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য বিভিন্ন সময় বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী , অতুলশিব ক্লাব , বীরভূম জেলা পরিষদ সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাকে সংবর্ধনা জানিয়েছে। তার দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে পার্থসখা মুখোপাধ্যায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ছোট ছেলে সুব্রতবাবু ডব্লু,বি,সি,এস অফিসার। মেয়ে স্বাতীদেবীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে দীর্ঘদিন আগে। ১৯৯৬ সালে স্ত্রী গীতাদেবীকে হারিয়েছেন। ১৯১২ সাল থেকে হারিয়ে ফেলেছেন স্মৃতি। কিন্তু এলাকার মানুষের স্মৃতিতে তার নাট্যনুরাগ অমলিন হয়ে রয়েছে।





No comments:
Post a Comment