Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কীর্তি যস্য -- ৬ ( অধীর)






                                                                          





   সমকালীনতার ছোঁওয়ায় লোটোগানের           জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন   অধীর মণ্ডল 



                                                      


                 অর্ঘ্য ঘোষ   




‘ বীরভূমের ওই সূচপুর/ নানুর থেকে নয়কো দুর / সেথায় যেতে আর ভালো লাগে না রে / ওরা খুঁচিয়ে এগারো মানুষ মেলো রে।’ কিম্বা ‘ অজয় আর ময়ূরাক্ষী বানে / গরীব –গুনো মলো ধনে প্রাণে। তারই মাঝে কেউ বগল বাজায় রে / বান-খরাতে কারও হয় মজাই রে।’ 
না , এ গান কোন বইয়ে পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে না কোন রেকর্ড কিম্বা সিডিতে। এই গান যার মুখে মুখে ফেরে তার নাম অধীর মণ্ডল। নিত্য নতুন বিনোদনের দাপটে যখন  একের পর এক বিপন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন লোকশিল্পের অস্তিত্ব। হারিয়ে যাচ্ছেন শিল্পীরা। তখন সমকালীনতার বার্তাবাহকের কাজ করে লোটোগানের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন তিনি। টিকিয়ে রেখেছেন লোটো গানের সঙ্গে জড়িত শিল্পীদেরও।  



                       শুধু তার গলাতেই নয় , ১৯৮৫ সালের বন্যার ক্ষতিপূরণে আর্থিক দুর্নীতি কিম্বা ২০০০ সালে সূচপুরে হাড়হিম করা গণহত্যা নিয়ে অধীর মন্ডলের লেখা ওইসব লোটোগান একসময় বীরভূম তথা রাজ্যের মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। ওইসব লোটোগানেই সমকালীন বিভিন্ন বিষয়কে জেনেছেন এলাকার মানুষজন। সেই ধারায় আজও লোটোগানের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন ওই শিল্পী। ইতিমধ্যেই লিখে ফেলেছেন শতাধিক গান। লিখেছেন পঞ্চাশটিরও বেশি হাস্যকৌতুক। বেশ কিছু পালাও।  


           
                        ১৯৬০ সালের ১ জানুয়ারি নানুরের দাসকলগ্রামের চাষি পরিবারে জন্ম অধীরবাবুর।বাবা  নারায়ণচন্দ্র মণ্ডল গ্রামেরই শিশির ঘোষের কৃষ্ণযাত্রার দলে অভিনয় করতেন। মা পুষ্পরাণী মণ্ডল ছিলেন গৃহবধু। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট অধীরবাবু গ্রামের প্রাইমারি স্কুল থেকে চতুর্থ শ্রেণী উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন গ্রামেরই হাইস্কুলে। কিন্তু অষ্টম শ্রেণীর বেশি তার পড়া এগোয় নি। বাবারই কৃষ্ণযাত্রার দলে নাম লেখাতে হয় তাকে।ওই দলেই মহিলা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমেই প্রথম পাদপ্রদীপের আলোর নীচে পা রাখেন বালক অধীর। সেইসময় বর্ধমান থেকে গ্রামে আসে একটি লোটোগানের দল। সেই গান শুনে আকৃষ্ট হন অধীরবাবুরা। তারা কৃষ্ণযাত্রার দলের মালিক শিশিরবাবুকে লোটোগানের দল খোলার আর্জি জানান। সেই মতো কৃষ্ণযাত্রার দলটি রূপান্তরিত হয় লোটো গানের দলে। মহিলা চরিত্রে অভিনয় দিয়ে লোটো গানের আসরেও পা রাখেন অধীর। 


                               পরে অবশ্য রামকৃষ্ণ অপেরা নামে  নিজেই দল খোলেন। জেলা তথা রাজ্যের গন্ডী ছাড়িয়ে বাংলাদেশেও প্রশংসা অর্জন করে তাদের দলের গান। তাদের গানে মুগ্ধ হয়ে বিভিন্ন সময় চুরুলিয়ার নজরুল অ্যাকাডেমি , পশ্চিমবঙ্গ নাট্য অ্যাকাডেমি , শান্তিনিকেতন পৌষমেলা কমিটি সহ বিভিন্ন সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠান তাকে  সংবর্ধনা দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সেখ হাসিনা , সঙ্গীতশিল্পী শান্তিদেব ঘোষ , রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ভক্তিভূষণ মণ্ডল , কলিমুদ্দিন শামস তার হাতে মানপত্র তুলে দিয়েছেন। শান্তিদেববাবুর জন্যই শান্তিনিকেতনের  পৌষমেলায় রামকৃষ্ণ অপেরার আসন পাকা হয়ে যায়। বর্ধমানের মাটিমেলা মঞ্চ , মধুসূদন মঞ্চ , রবীন্দ্রসদনে বহুবার সরকারি অনুষ্ঠানে গান করেছেন। কলকাতার একতারা মঞ্চে তার গান শুনে ভূয়সী প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গানের সুবাদেই বিশিষ্ট কীর্তনীয়া সুমন ভট্টাচার্য , যাত্রাশিল্পী ত্রিদিব ঘোষ , কবিয়াল তপন চট্টোপাধ্যায় , নন্দ মাঝি প্রমুখ মানুষজনের সান্নিধ্য লাভ করেছেন।



                                     বর্তমানে সব মিলিয়ে তার দলে শিল্পীর সংখ্যা আঠাশ জন । যার মধ্যে মহিলা রয়েছেন আট জন। তাদের অধিকাংশই ওই গানের মাধ্যমেই খুঁজে পেয়েছেন জীবন জীবিকা। ওইসব শিল্পীরদের অনেকেই  একদিন ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হয়ে সমাজের মূলস্রোত থেকে ছিটকে পড়েছিলেন। কোথাও কিছু না পেয়ে লোটোগানের দলে নাম লেখান। যে সমাজ তাদের কোন সুযোগ দেয়নি সেই সমাজের লোকেরাই নামে ' নষ্ট মেয়ে'র তকমা এঁটে দেয়। কিন্তু অধীরবাবুর  লোটোগানের দলে অভিনয় করে তারা সম্মানের সঙ্গে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার পথ খূুঁজে পেয়েছেন।  


                          শুধু ওইসব মহিলারাই নন , একসময় কলকাতার যাত্রাদলে অভিনয় করা কয়েকজন অভিনেতাও তার দলে নাম লিখিয়ে জীবিকা অর্জনের পথ খুঁজে পেয়েছেন। নিত্য নতুন বিনোদনের দাপটে অধিকাংশ লোকশিল্পের মতো লোটোগানও  বিপন্ন হয়ে পড়েছে। শিল্পীরা মজুর খাটছেন কিম্বা রিক্সা টানছেন। কিন্তু অধীরবাবুর গানের দল সমান জনপ্রিয়। এখনও গড়ে বছরে দুই শতাধিক পালা গানের বায়না হয়। তিনি মনে করেন ,মানুষ ঘরের কাছের সমকালীন বিষয়কে মঞ্চে দেখতে বেশি পছন্দ করেন। তাই নিজেই  সমকালীণ বিষয় নিয়ে লিখেছেন লিখে চলেছেন মৌলিক হাস্যকৌতুক , ' হাকিম নড়ে তবু হুকুম নড়ে না ' , ' নীল বিদ্রোহ ' এর মতো পালা সহ গান। অধীরবাবু মুলত কৌতুক অভিনেতা । তার পরিবেশিত নিত্যনতুন কৌতুক দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে দেয়। ঘটনা এমনও ঘটে দর্শকদের অনুরোধে একই মঞ্চে কোন গান বা কৌতুক একাধিক বার পরিবেশন করতে হয়। নিত্যনতুন বিনোদনের দাপটে মানুষ যখন ক্রমেই লোকায়ত শিল্পের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তখন সেই অবক্ষয়ের মাঝে এহেন ঘটনা আশার আলো জাগায়। 


                                          ----০---- 


                      



     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  







দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে -----







                   ----০---




No comments:

Post a Comment