‘ অভিনয় জানো তো ’ – পাত্রী দেখতে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন নাটক পাগল মহাদেব দত্ত
অর্ঘ্য ঘোষ
‘ গৃহকর্মে নিপুণা কিম্বা রন্ধন পটিয়সী ’ না হলেও চলবে। কিন্তু অভিনয়ে অনুরাগ অবশ্যই থাকতে হবে। নাহলে গৃহবধু হিসাবে লাভপুরের দত্তবাড়ির সিংহদরজা দিয়ে ঢোকার ছাড়পত্র মেলে না।অন্যান্যদের ক্ষেত্রে তো বটেই , নিজের পুত্রবধু নির্বাচন করতে গিয়েও অভিনয়কেই প্রাধান্য দেন মহাদেব দত্ত।
লাভপুর ফুল্লরাতলা পাড়ার বাসিন্দা মহাদেববাবুর জন্ম ১৯৪৪ সালের ২০ ডিসেম্বর। লাভপুর নির্মলশিব বুনিয়াদি বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে ভর্তি হন স্থানীয় যাদবলাল হাইস্কুলে। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের পর সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজে সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট হন। তারপর পিতৃবিয়োগের জন্য আর পড়া হয়নি তার। পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়। আসলে ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান মহাদেববাবুর বাবা শম্ভুনাথ দত্ত ছিলেন বড় ব্যবসায়ী। মা অন্নপুর্নাদেবী গৃহবধু। চার ভাইবোনের মধ্যে মহাদেববাবুই একমাত্র পুত্রসন্তান। সেই হিসাবে মূলত পৈত্রিক ব্যবসাতেই তার মনোনিবেশ করার কথা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার চেয়ে তাকে বেশি টানত নাটক।
শুধু নিজে নাটক করাই নয় , কোথাও নাটক যাত্রার খবর পেলেই সব কিছু ফেলে দেখতে ছুটতেন। তাই বকাও খেতেন খুব। কিন্তু কানে তুলতেন না।ছাত্রাবস্থাতেই প্রথম ফুল্লরা বয়েজ ক্লাবে ‘ ঘুর্ণি ’ নাটকে অভিনয় করেন। প্রথম পর্দাপনেই দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন। ওই নাটকে একজন চায়ের স্টলের মালিকের চরিত্রে তার অভিনয় আজও এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
তারপর বিভিন্ন সময় অতুলশিব ক্লাব , সপ্তর্ষি , নিবেদন নাট্যসমাজ , দিশারী , বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী , আমোদপুর সাহিত্য সংসদ সহ বিভিন্ন সংস্থায় শতাধিক যাত্রা নাটকে অভিনয় করেছেন। তার মধ্যে কালিন্দী , রঙ্গলাল , কঙ্কাবতীর ঘাট , মেবার পতন , মেঘমুক্তি , গণদেবতা , ভগবানবাবু , সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ , শোভাযাত্রা অন্যতম। সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ তার অভিনয় জীবনের মাইলস্টোন হিসাবে বিবেচিত হয়। ওই যাত্রাপালায় বিবেকানন্দের চরিত্রে মহাদেববাবু এবং একটি বিশেষ চরিত্রে বড় মেয়ে শর্মিষ্ঠার অভিনয় সবার নজর কাড়ে। জেলার গণ্ডী ছাড়িয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সংস্থার আমন্ত্রণে পালা করতে যেতে হয় মহাদেববাবুকে। সর্বত্রই উচ্চ প্রশংসা পায় তাদের বাপ-মেয়ের অভিনয়।
সেইসব কথা স্মৃতির সঞ্চয় হয়ে রয়েছে তার। অভিনয় শেষে অনেকেই সাজঘরে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে যেতেন। তাদের ভাব দেখে মনে হত তারা যেন বিবেকানন্দকেই প্রনাম করেছেন।কোথাও বা আতিথ্য গ্রহণের অনুরোধ আসত। সেই অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারতেন না।সব জায়গায় না হলে কোথাও কোথাও যেতেও হত। একজন শিল্পীর এর চেয়ে বড়ো পাওনা আর কিছু হতে পারে না বলে মনে করেন তিনি।
শুধু মঞ্চ নাটকই নয় , করেছেন বহু শ্রুতি নাটকও। তারাশঙ্কর সহ বিভিন্ন লেখকের রচিত বহু কাহিনীর নাট্যরূপ দিয়ে পরিবেশন করেছেন। বহুল প্রচলিত উত্তরণ এবং স্বামীজির শক্তিপুজো শ্রুতিনাটক নিয়ে সারা রাজ্য ঘুরেছেন। ওইসব নাটকে অভিনয় করেছেন ছোটমেয়ে স্বাতীও। শুধু মেয়েরাই নয় , দুই ছেলে- বৌমাকেও মঞ্চে নামিয়েছেন। তারশঙ্করের ধাত্রীদেবতা অবলম্বনে তার রচিত , নির্দেশিত এবং অভিনীত শিবনাথ নাটকে দুই ছেলে শান্তব্রত , শুভব্রত, দুই বৌমা অনন্যা এবং নম্রতা দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন। শুধু তাই নয় , তারশঙ্করের কাহিনী অবলম্বনে তার রচিত এবং নির্দেশিত হাঁসুলী বাঁকের উপকথা নাটকে কালোশশীর ভূমিকায় বড় বৌমা অন্যন্যাদেবীর বিপরীতে রোমান্টিক চরিত্র বনোয়ারির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি।
তার সঙ্গে নৃত্য নাট্য অভিনয় করেছেন নাতনি প্রত্যুষাও। তার কাছে গৃহকর্ম কিম্বা রান্নাবান্না নয় , অভিনয়ে অনুরাগটাই মুখ্য। ছেলের জন্য পাত্রী দেখতে গিয়ে সেই কথাটাই জিজ্ঞেস করেছিলেন।মেয়েদের পাশাপাশি দুই বৌমাকেও হাতে ধরে অভিনয় শিখিয়ে মঞ্চে নামিয়ে ছেড়েছেন। পুরো পরিবারকে মঞ্চে নামানোর মতো এমন নাটক পাগল মানুষ বড়ো একটা দেখা যায় না। তার এহেন নাট্য অনুরাগের কথা এলাকার মানুষের আলোচনার খোরাক হয়ে আছে। তারাশঙ্করও খুব স্নেহ করতেন তাকে। বাবার মৃত্যুর পর সহমর্মিতা প্রকাশ করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তাকে। সেই চিঠিতে তার বাবাকে ' সেলফ মেড ম্যান ' হিসাবে উল্লেখ করেছেন তারাশঙ্কর। মুল্যবান সম্পদের মতো সযত্নে সেই চিঠি সংরক্ষণ করে রেখেছেন তিনি।
মূলত তারই উদ্যোগে ভগ্নপ্রায় অতুলশিব মঞ্চ নতুন রূপে গড়ে উঠেছে। অভিনেতা মনোজ মিত্র নবনির্মিত সেই মঞ্চ উদ্বোধন করে গিয়েছেন। দীর্ঘদিন তারাশঙ্কর শতবর্ষ উদযাপন কমিটির যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। ১৯৯১ সালে গোমুখে বেড়াতে গিয়ে দুর্ঘটনায় স্ত্রী ভাস্বতীদেবীকে হারিয়েছেন।হারাতে বসেছেন স্মৃতিশক্তিও। কিন্তু হারান নি নাটকের নেশা। আজও বিভিন্ন কাহিনীর নাট্যরূপ দিয়ে চলেছেন। সেইসব নাটক মঞ্চস্থ করার স্বপ্ন দেখেন।






No comments:
Post a Comment