পাদপ্রদীদের আলোয় উজ্বল - উজ্বল মুখোপাধ্যায়
অর্ঘ্য ঘোষ
গ্রামগঞ্জে একসময় যাত্রা , নাটক , ম্যাজিক শোয়ের মতো বিনোদনের অন্যতম অঙ্গ ছিল পুতুলনাচ। মেলা-খেলা উপলক্ষ্যে তো বটেই , কোন উপলক্ষ্য ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময় গ্রামে গ্রামে পুতুলনাচের তাবু পড়ত। আট-থেকে আশি , সবাই ভিড় জমাতেন সেই পুতুল নাচের আসরে। ক্লাস সিক্সের ছেলেটিও মা-কাকীমাদের হাত ধরে সেই পুতুলনাচ দেখতে যেত। দেখতে দেখতে পুতুলনাচের প্রতি কেমন যেন একটা আর্কষণ বোধ করত। তাই নিছক পুতুলনাচ দেখে তার মন ভরত না। জানতে ইচ্ছা করত পুতুলনাচের কৃৎকৌশল। তাই স্কুল পালিয়ে পুতুলনাচের তাবুর পাশে ঘুর-ঘুর করত। ওইভাবেই সে জেনে যায় পুতুলনাচের অন্দরমহলে কথা। সেইমতো প্ল্যাস্টিক কিম্বা মাটির পুতুলের মাথায় সুতো বেঁধে বাড়ি জানলায় পুতুলনাচের আয়োজন করে সে। টিকিট হিসাবে দেশলাই কিম্বা সিগারেটের প্যাকেটের মার্কার বিনিময়ে ভাইবোন আর পাড়ার ছেলেমেয়েদেরজুটিয়ে পুতুলনাচ দেখাতে শুরু করে ছেলেটি।
সেই থেকেই তার মনের মধ্যে পুতুলনাচ একটা জায়গা করে নেয়। পরিণত বয়সে পৌঁচ্ছে তিনি আর সেই পুতুলনাচকে খুঁজে পেলেন না। তার মনে হলো হাজারো আধুনিক বিনোদনের ভীড়ে হারিয়ে গিয়েছে সেদিনের সেই পুতুলনাচ। মনের মধ্যে একটা কষ্ট অনুভব করলেন । তার মনে হল ভবিষৎ প্রজন্মের কাছে বিনোদনের ওই মাধ্যমটি হয়তো অজানাই থেকে যাবে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পুতুলনাচকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিলেন অভিনব প্রয়াস। নাটকের মাধ্যম অবলুপ্ত প্রায় সেই বিনোদন মাধ্যমটিকে তুলে ধরার জন্য চালু করলেন পুতুলনাটক।
সেদিনের সেই বালকটির নাম উজ্বল মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৮ সালের ১২ জানুয়ারি তার জন্ম। পেশায় স্কুল শিক্ষক উজ্বলবাবুর বাড়ি লাভপুরের রক্ষাকালীতলা পাড়ায়। বাবা প্রয়াত বঙ্কিমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন পেশায় ঠিকাদার। মা তপতীদেবী গৃহবধু। দুই ভাইয়ের বড় উজ্বলবাবু ছেলেবেলা থেকেই সংস্কৃতি মনস্ক। লাভপুর নির্মলশিব বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে স্থানীয় যাদবলাল হাইস্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। তারপর লাভপুর শম্ভুনাথ কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বীরভূমে নাট্যচর্চার ইতিহাসের উপর গবেষণা করে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতিও লাভ করেন।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ২০০৭ সালে উজ্বলবাবু গড়ে তোলেন বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী। ওই সংস্থার পরিচালনায় ২০০৭ সালেই লাভপুর সব পেয়েছির আসরে প্রথম মঞ্চস্থ হয় মনসা মঙ্গলের কাহিনী অবলম্বনে মৌলিক ভাবনার ভিন্ন ধারার পুতুলনাটক ' বেহুলা লখিন্দর।' পুতুলনাচের পুতুলের আঙ্গিকে পরিবেশিত ওই নাটক প্রথম থেকে দর্শক সমাজে সাড়া ফেলে দেয়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত তো বটেই , ওই নাটক অসম , কেরলা , মেঘালয় , বিহার , ঝাড়খণ্ডে একাধিকবার প্রদর্শিত হয়। ইতিমধ্যে নাটকটি চার শতাধিক পালা অভিনীত হয়েছে। আজও নাটকটি সমান জনপ্রিয়।
পরবর্তী কালে ‘ কৃষ্ণলীলা ’ নামে আরও একটি পুতুলনাটক প্রযোজনা করেন উজ্বলবাবু। সেটিও সমান জনপ্রিয় হয়। পুতুল নাটকের ওই জনপ্রিয়তা দেখে বীরভূম জেলা প্রশাসনও উজ্বলবাবুকে দিয়ে ‘ নির্মল বীরভূম ’ নামে একটি পুতুলনাটক তৈরি করান। বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনীর পরিচালনায় সেই নাটকটি জেলার বিভিন্ন স্থানে সাত শতাধিক বার প্রদর্শিত হয়েছে। পুতুলনাটক নিয়ে উজ্বলবাবুও রীতিমতো নস্টালজিক। ছোটবেলায় পুতুলনাচ দেখতে গিয়ে খুব ভালো লেগে গিয়েছিল। বড়ো হয়ে যখন দেখলেন নানা বিনোদনের ভীড়ে সেই পুতুলনাচটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। তখন কিছু একটা করার কথা ভাবেন। সেই ভাবনারই সফল রূপায়ণ আজ দর্শকদের মন জয় করছে।
শুধু পুতুলনাটকই নয় , মূলধারার নাটকও করেছেন তিনি। নাটকে নাট্যরূপ দেওয়া থেকে পরিচলনার পাশাপাশি অভিনেতা হিসাবেও দেখা গিয়েছে তাকে। ওইসব নাটকের মধ্যে ‘বেগলো বায়েন’ , ‘ নাগিনী কন্যার কাহিনী ’, ‘ অলৌকিক ’ , ‘ নজর ’ ‘ ধর্মমঙ্গল ’ এবং ‘ রসকলি ’ অন্যতম। বাউল , রাইবেশে , ঘোড়ানাচ , বহুরূপী , রণপা , ঢাক-ঢোল সহ ষাট জন শিল্পী সমন্বিত ধর্মমঙ্গল নাটক রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত সহ পুরী , রাউরকেল্লা , ভূপালে প্রশংসা অর্জন করেছে। ইতিমধ্যে নাটকটি তিরিশ বার প্রদর্শিত হয়েছে। তার পরিচালিত বিভিন্ন নাটক জেলা যুব উৎসবে ৬ বার শ্রেষ্ঠ প্রযোজনার স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৫ সালে রাজ্য যুব উৎসব আয়োজিত নাট্য প্রতিযোগিতায় তার পরিচালিত নাটক ‘ নজর ’ শ্রেষ্ঠ প্রযোজনার পুরস্কার পায়। ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের পুর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্র আয়োজিত দেশের সম্ভাবনাময় যুব নির্দেশকদের ‘ নবউদিত’ উৎসবে তার পরিচালিত ‘ ধর্মমঙ্গল ’ রাজ্যের একমাত্র নাটক হিসাবে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ লাভ করে। ২০১৮ সালে ধর্মমঙ্গল নাটকের সফল রূপাকার হিসাবে ধর্মমঙ্গল কাব্যের রচিয়তা ঘনারামের স্মৃতিতে প্রদত্ত ঘনারাম পুরস্কার পান তিনি। ওই বছর ভোপালে অনুষ্ঠিত মধ্যপ্রদেশ সরকার আয়োজিত আদি বিদ্রোহী নাট্য উৎসবে আমন্ত্রিত দেশের সাতটি নাটকের মধ্যে বাংলার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে একমাত্র ধর্মমঙ্গল। বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়, মনীশ মিত্র , আশিস চট্টোপাধ্যায়রা বিভিন্ন সময় উজ্বলবাবুর সুদক্ষ পরিচালনায় ভিন্ন ধারার নাটক প্রদর্শনের পাশাপাশি তার নাট্যদল যেন একটা সুশৃঙ্খল একান্নবর্তী পরিবার হয়ে উঠেছে বলে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। নাট্যশিল্পীরাও সে কথা স্বীকার করেন।
বর্তমানে ওই নাট্যদলে উজ্বলবাবুর ভাই কাজল , একমাত্র মেয়ে স্কুল ছাত্রী উষসী সহ পঁচিশ জন শিল্পী রয়েছেন। তাদের মধ্যে তেরো জনের অন্যতম জীবিকাই হয়ে উঠেছে নাটক। ওইসব শিল্পীদের মধ্যে রথীন্দ্রনাথ ভান্ডারী , তুফান চন্দ্র কোনার , অন্বেষা ঘোষ , রূপা সুতাররা ওই নাট্যদলে কাজ করে শুধু জীবিকাই নয় , নাটকে অন্যরকম জীবনের সন্ধান পেয়েছেন বলে মনে করেন। উজ্বলবাবু তাদের সেই জীবন পথের সন্ধান দিয়েছেন। শুধু নাটকই নয় , সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি এলাকার সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক কর্মকান্ডেও উজ্বলবাবুর অবদান অনস্বীকার্য। সাহিত্যচর্চা বিকাশের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে তারাশঙ্কর সাহিত্যসভা চালু করেন তিনি। ওইবছর থেকেই তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বাৎসরিক সাহিত্য পত্রিকা ' শরতদূত।' তাছাড়াও ' সোনার কাঠি ' এবং ' সংস্কৃতি ' নামে আরও দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। সেখানে প্রবীণদের পাশাপাশি নবীনদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন। নিজেও বিভিন্ন পত্রিকায় কবিতা গল্প লিখেছেন।
২০০৫ সাল থেকে আকাশবানী শান্তিনিকেতন কেন্দ্রের নিয়মিত ঘোষক হিসাবে কাজ করছেন। দুরদর্শনেও আলোচক এবং অভিনেতা হিসাবে অংশ নিয়েছেন। তার লেখা নাটক ‘মেলানপুরের ঘাট ’ আকাশবানী কলকাতা কেন্দ্রে সম্প্রাচারিত হয়েছে। তার প্রচেষ্টায় লাভপুরে তারাশঙ্কর বইমেলা , জাতীয় নাট্য উৎসব , কলকাতা থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারই উদ্যোগে তারাশঙ্করের কর্মভূমি ধাত্রীদেবতা সংরক্ষণ সহ সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সাংস্কৃতিক চর্চা বিকাশের লক্ষ্যে চালু করেছেন ‘ গুরুকুল ’ নামে সাংস্কৃতিক সংস্থা। সেখানে ছেলেমেয়েদের বিনা পারিশ্রমিকে শেখানো হয় নাচ , গান , আবৃতি , নাটক প্রভৃতি।
খেলাধুলোর ব্যাপারেও উৎসাহিত করতে তার সংস্থার পরিচালনায় তিরন্দাজি প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখান থেকেই প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে বেশ কিছু তিরন্দাজ জাতীয় স্তর সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তৈরি করেছেন মুক্তমঞ্চ সহ সংস্কৃতিচর্চার নিজস্ব ভবন। পাশাপাশি সামাজিক কাজকর্মেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী। ফ্যামেলি কাউস্নিলিং সেন্টারের মাধ্যমে বহু ভেঙে যাওয়া সম্পর্ককে জোড়া লাগিয়েছেন তারা। ওইসব কর্মকাণ্ডের মাঝেও গান্ধিজীর জীবনকাহিনী নিয়ে প্রযোজনা করেছেন 'গাধী - মহাত্মা - বাপু ' নামে একটি পূর্ণাঙ্গ নাটকও প্রযোজনা করেছেন।
শুরুতে চলার পথটা অবশ্য এত মসৃণ ছিল না। হাতে গোনা কিছু কচিকাঁচাকে নিয়ে সব পেয়েছির আসরের মাধ্যমে শুরু হয় পথ চলা। সেখানে ২০০৩ সালে বঙ্কিম মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় মঞ্চস্থ হয় নিত্যগোপাল মুখোপাধ্যায়ের লেখা নাটক ‘হালখাতা।’ সেই নাটক কোন রকমে উতরে গেলেও পরের বছর মনোজ মিত্রের ‘ টু-ইন-ওয়ান ’ নাটক মঞ্চস্থ করতে বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়তে হয় উজ্বলবাবুকে। সেই সমালোচনার জেরে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। নিজেকে অযোগ্য ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু পরের বছর সেই ধারনা বদলে দেন আমোদপুরের নাট্য ব্যক্তিত্ব অশোক দাস। তারই নির্দেশনায় স্থানীয় অতুলশিব মঞ্চে ‘ আলিবাবা ’ নাটক মঞ্চস্থ হয়। সেই নাটক দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করে। আধুনিক নাটক সম্পর্কে ধারণা গড়ে উঠে উজ্বলবাবুর। অশোকবাবুর পরামর্শে নিজের লেখা গল্প ‘ বেগলো বায়েন ’ নাট্যরূপ দিয়ে মঞ্চস্থ করেন। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয় নি তাকে। কিন্তু ভুলে যান নি সেই সব দিনের কথা। বহু চড়াই-উৎরায় পেরিয়ে আসতে হয়েছে ঠিকই কিন্তু এখন সব ভুলে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী একটি আশ্রমিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়তে চান তিনি।






No comments:
Post a Comment