বয়সকে তুড়ি মেরে মহড়ায় ছোটেন হরিপ্রসাদ
অর্ঘ্য ঘোষ
অতুলশিব মঞ্চে গত রাতেই মঞ্চস্থ হয়েছে তারাশংকরের লেখা নাটক ‘ কালিন্দী।’ তারাশংকর নিজে দেখেছেন সেই নাটক। পরদিন সকালে কাছারিবাড়িতে বসে সেই নাটক নিয়েই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন তারাশংকর। সেইসময় একটি তরুণকে ঘুরঘুর করতে দেখে তারাশংকর ডেকে ওঠেন , ‘ সুনীতি , ও সুনীতি।’ তরুণ ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে কোন মেয়েকে দেখতে না পেয়ে অবাক হয়ে তারাশংকরের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তার বিষ্ময়ের কারণ অনুধাবন করে তারাশংকর ফের বলে ওঠেন , ‘তোমাকেই ডাকছি। তুমিই তো আমার সুনীতি। ’ বলা বাহুল্য কালিন্দী নাটকে ওই তরুণই সুনীতির ভুমিকায় অভিনয় করেছিলেন। সেদিনের সেই তরুণের নাম হরিপ্রসাদ সরকার।
নাটক অন্ত প্রাণ হরিপ্রসাদবাবুর জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি।কিন্তু বয়সকে তুড়ি মেরে আজও নিয়মিত হাজির হন নাটকের মহড়ায়। সাজঘরে উঁকি দেন। কখনও বা উদাত্ত গলায় গেয়ে ওঠেন গানও। লাভপুর স্টেশন পাড়ার বাসিন্দা হরিপ্রসাদবাবু এলাকায় আপুবাবু হিসাবেই সমধিক পরিচিত। বাবা ভোলানাথবাবু ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের শুল্ক বিভাগের কর্মী। মা অশোকা দেবী গৃহবধু।ছয়
ভাইবোনের তৃতীয় হরিপ্রসাদবাবু স্থানীয় কুইনটন ফ্রি প্রাইমারি স্কুল থেকে ৬ টি জেলার মধ্যে প্রথম স্থান দখল করে গ্রেড ওয়ান ডিভিশন্যাল স্কলারশিপ সহ চতুর্থ শ্রেণী উত্তীর্ণ হয়ে লাভপুর যাদবলাল হাইস্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু সেইসময় ওইস্কুলের জন্য স্কলারশিপ চালু ছিল না। তার স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখে স্থানীয় হাতিয়া মধ্য ইংরাজী স্কুলের শিক্ষকরা এসে যাদবলাল শিক্ষকদের তাকে একবছরের জন্য তাদের স্কুলে পাঠানোর অনুরোধ জানান। তাদের অনুরোধ ক্রমে তাকে পাঠানো ওই স্কুলে।
হাতিয়া স্কুল থেকে জেলাবৃত্তি নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ফের যাদবলাল হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে ভর্তি হন। ওই স্কুল থেকেই মাধ্যমিক , মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুর কলেজ থেকে আই , এ এবং বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি,এ পাশ করেন।হাতিয়া স্কুলেই শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে যোগ দেন যাদবলাল হাইস্কুলে। সেখানে শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রাইভেটে এম,পাশ করেন। ওই স্কুল থেকেই অবসর নেন।
বাবা সভাসমিতি , নাটক সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতেন। মাঝেমধ্যে বাবার সঙ্গে ওইসব অনুষ্ঠানে যেতেন বালক হরিপ্রসাদও। সেই সুবাদেই সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি তার অনুরাগ জন্মায়। নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন প্রথম পাদপ্রদীপের আলোয় পর্দাপন করেন। সেইসময় যাদবলাল হাইস্কুলের পঞ্চাশবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে অতুলশিব মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় ‘দেবলাদেবী।’ ওই নাটকেই এক বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দেন। পরবর্তী কালে সাজাহান , টিপু সুলতান , পার্থসারথি , চিত্রাঙ্গদা , পৃথ্বিরাজ , পথের শেষে , চিরকুমার সভা, চকমকি , কালিন্দী , আনন্দমঠ সহ বিভিন্ন নাটক এবং যাত্রায় অভিনয় করেছেন।মূলত মহিলা চরিত্রেই অভিনয় করেছেন। ২০১৮ সালে ৮৩ বছর বয়সেও অতুলশিব মঞ্চের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী প্রযোজিত নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রাতকানা’ নাটকে সূত্রধর হিসাবে মঞ্চে নামেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি বহু নাটক নির্দেশনা এবং পরিচলনাও করেছেন। সাহিত্যচর্চাতেও তার সমান অনুরাগ। নিজে লেখালিখির পাশাপাশি দীর্ঘদিন অতুলশিব ক্লাব থেকে প্রকাশিত ‘ পূর্ণিমা ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। গানের গলাও ভালো। প্রথম স্বাধীনতা দিবসের প্রভাতফেরীতে গান গেয়েছিলেন। সেদিন পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়। হরিপ্রসাদবাবু বর্তমানে রামকৃষ্ণ পাঠচক্রের লাভপুর শাখার কর্ণধার।
সেখানে তিনি নিয়মিত ভক্তিমূলক গান পরিবেশন করেন। সেই গান শুনতে শ্রোতারা ভীড় জমান। এখন নিজে আর মঞ্চে নামেন না ঠিকই কিন্তু এলাকার দুই সাংস্কৃতিক সংস্থা বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী এবং দিশারী সাংস্কৃতিক চক্রের মহড়া এবং সাজঘরে নিয়মিত তার দেখা মেলে। তাদের পাশে থেকে নানারকম পরামর্শ দেন। সাহিত্য-সংস্কৃতির অবদানের জন্য বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী, দিশারী সাংস্কৃতিক চক্র , অতুলশিব ক্লাব , নয়াপ্রজন্ম পত্রিকা গোষ্ঠী তাকে বিভিন্ন সময় সম্মাননা জানিয়েছে। নাটকের টানেই হরিপ্রসাদবাবু সব কিছু উপেক্ষা করে ছুটে যান মহড়া কিম্বা সাজঘরে। নাটকের মধ্যেই যেন নিজেকে খুঁজে পান তিনি।
----০----




No comments:
Post a Comment