Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ৭৭




     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



         শুরু  হল  ধারাবাহিক উপন্যাস -- 











          কালের কারিগর
              


                      অর্ঘ্য ঘোষ


                  (  কিস্তি --- ৭৭ )




সেখানেই এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন মনোতোষ। সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি বলে বসেন , আমি ঠিক করেছি এই সরকারের অধীনে আর চাকরি করব না। কালই আমি চাকরি থেকে ইস্তফা দেব। তোমাদের মত কি ?
কথাটা শুনেই আঁতকে ওঠেন ছন্দা। বলে কি লোকটা ? মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি ? এই বাজারে এই রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত কেউ নেয় ? তাই স্বামীকে নিরস্ত করতে তিনি বলেন , তোমার কোন সিদ্ধান্তে কোনদিন আমি অমত করি নি। আজও করছি না। কিন্তু চাকরি থেকে ইস্তফা দিলে আমাদের চলবে কি করে ভেবে দেখেছ ? তাছাড়া তোমার একার ইস্তফায় সরকারের কি এসে যায় ?
---- দেখো , আর মোটে এগারো মাস চাকরি আছে আমার।তারপর তো পেনশনটুকু সম্বল করেই চলতে হবে আমাদের। সেটা না হয় এগারো মাস আগে থেকেই শুরু হল।স্বেচ্ছা অবসর নেওয়ার পর টাকাপয়সা যেটুকু হাতে পাব , সেটা ওদের  দুইভাই বোনের নামে জমা করে দেব। আর আমার ইস্তফায় সরকারের যে কিছুই এসে যাবে না সেটা আমি ভালোই জানি। কিন্তু আমার মন তো বুঝবে , আমি আমার মতো করে প্রতিবাদ করেছি।না হলে যে নিজেকে মানুষ মনে হচ্ছে না গো।
আর কোন কথা বলতে পারেন না ছন্দা।বলেও কোন লাভ হবে না তা ভালোই জানেন তিনি।বরাবরই এক কথার মানুষ মনোতোষ , যা সিদ্ধান্ত নেন তা থেকে কখনও সরে আসেন না।তাই ইস্তফা দেওয়া আটকানোর চেষ্টা ছেড়ে বলেন --- কিন্তু ইস্তফা দিয়ে কি করবে কিছু ঠিক করেছো ?  টিউশানি যে তুমি করবে না তা ভালই জানি। তাহলে এই বয়সে সময়টা কাটাবে কি করে ?
--- আমি একটা পরিকল্পনার কথা ভেবেছি। সেটা নিয়েই তো তোমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই।
---- বলো বলো , কি পরিকল্পনা বাবা ----- ছেলেমেয়েদের মুখ থেকে আগ্রহের আতিশয্য ঝড়ে পড়ে।
---- আমি ভেবেছি আমাদের বাড়িতেই বাচ্চাদের একটা স্কুল খুলব।সরকারি স্কুলগুলোতে ঘুষের বিনিময়ে যেসব শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে তাদের দ্বারা আর যাই হোক প্রকৃত মানুষ গড়া সম্ভব নয়।তাই আমি স্বেচ্ছাশ্রমে আশ্রমিক পরিবেশে প্রকৃত মানুষ গড়ার কাজ শুরু করার কথা ভেবেছি। আমরা যদি আমাদের বার্তাটা মানুষের কাছে ঠিকঠাক পৌঁচ্ছে দিতে পারি তাহলে তারা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা ছেড়ে ছেলেমেয়েদের আমাদের কাছেই নিয়ে আসবেন। এখন বলো তোমরা কে কে আমার সঙ্গে থাকতে চাও ?
বলে নিজের হাতটা বাড়িয়ে ধরেন মনোতোষ।
---- দারুণ হবে বাবা। আমরাও আছি তোমার সঙ্গে বলে সূর্য আর সুস্মিতা বাবার হাতে হাত রাখে। তা দেখে ছন্দা তিন জনের হাতের উপর হাত রেখে বলেন , আমিই বা একা পড়ে থাকি কেন ? তোমাদের কর্মযজ্ঞে আমিও আছি।
সবার চোখে মুখে তখন এক অনাবিল প্রশান্তি বিরাজ করে। আবার বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পায়। মনোতোষের কথায় উচ্ছাস ঝড়ে পড়ে।  তিনি বলেন , আমি জানতাম আমার প্রিয় মানুষগুলোকে আমি পাব এই কর্মযজ্ঞে। 
---- কিন্তু বাবা আমরা না হয় বেতন নেব না। কিন্তু একটা স্কুল চালাতে তো কিছু খরচ আছে। সেটা যোগাড় হবে কি ভাবে -- প্রশ্ন তোলে সূর্য।
--- সেটা একটা সমস্যা ঠিকই। তবে আমরা যদি কাজটা ভালোভাবে করতে পারি , যদি মানুষকে বোঝাতে পারি তাদের ছেলে মেয়েদের প্রকৃত মানুষ করাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য , তাহলে একদিন অনেকেই আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। আর কোথাও কোনকালে ভাল কাজ অর্থের জন্য আটকে থাকে নি।



                        ছেলেমেয়েদের পাশাপাশি স্বামীর ওই কথায় সহমত পোষণ করেন ছন্দাও। স্কুলের নামও ঠিক হয়ে যায়। ছন্দাই নাম প্রস্তাব করেন -- আনন্দ পাঠশালা।ছেলেমেয়েরা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে --- দারুন নামটা হয়েছে মা।
পরদিন থেকেই শুরু হয়ে যায় স্কুলের পরিকাঠামো তৈরির কাজ। ঠিক হয় আপতত বাড়িতে যে পাঁচটি কলমের ঝাঁকড়া আমগাছ রয়েছে তারই নীচে চ্যাটাই পেতে সুরু হবে ক্লাস। সেই মতো মহা উৎসাহে ছন্দা আর সুস্মিতা গাছেরতলাগুলো সাফ সুতরোর করার কাজ শুরু করে দেন।সাইনবোর্ড লেখাতে সূর্য ছোটে নলহাটি। আর ইস্তফাপত্র জমা দিতে স্কুলের পথে রওনা দেন মনোতোষ। ইস্তফাপত্রে তিনি যা লেখেন তার মর্মার্থ হলো -- কিছু টাকার জন্য নিছক চাকরি করা নয় , শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মানুষ গড়াই হল শিক্ষকের ব্রত।কিন্তু সামগ্রিক অবক্ষয় আজ শিক্ষা ব্যবস্থাটাকেই গ্রাস করে নিয়েছে। রাজনৈতিক দুবৃত্তায়ণ মানুষ গড়ার প্রকৃত কারিগরদের দূরে সরিয়ে রেখেছে।আমি মনে করি এই পরিবেশে শিক্ষকের ব্রত পালন করা সম্ভব নয়। তাই আমি শিক্ষকের পদ থেকে ইস্তফা দিলাম।
তার ইস্তফা পত্র দেখে বিস্মিত হয়ে যান প্রধান শিক্ষক সত্যনারায়ণ রুজ। মনোতোষকে বলেন , ছেলের মতো আপনারও কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি মাস্টারমশাই ? আর কয়েকটা মাস আছে অবসর নিতে। এই অবস্থায় এই রকম কথা লিখে কেউ ইস্তফা দেয় ? শেষে প্রাপ্য টাকা পয়সা আটকে গেলে করবেন কি আপনি ? বুড়ো বয়েসে চলবেই বা কি করে ?
---- মাথা এখন আমার ঠিকই আছে। এতো দিনই বরং ঠিক ছিল না। এই পৃথিবীর ক'জন মানুষই বা চাকরি করেন ?  তাদের যদি চলে যায় তাহলে আমাদেরও শাক-ভাত ঠিক জুটে যাবে। আর যদি না'ও জোটে তাহলেও মতাদর্শের সঙ্গে আপোষ করতে পারব না।
---- তবু একবার ভেবে দেখলে হত না ? 
---- ভাবাভাবির আর কিছু নেই। অনেক ভেবেই পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। শুধু আপনাদের ছেড়ে যেতে হচ্ছে বলে খারাপ লাগছে। আপনারা সবাই ভালো থাকুন।
বলেই  হাত জোড় করে অফিস ঘর থেকে বেড়িয়ে আসেন মনোতোষ। পিছনে পড়ে থাকে হাজারো স্মৃতি মাখা তার প্রিয় স্কুল।লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির পথে হাঁটা দেন তিনি।বাড়ির সামনেই পৌঁছোতেই দেখতে পান ততক্ষণে দরজার মাথার উপরে টাঙানো হয়ে গিয়েছে আনন্দ পাঠশালার সাইন বোর্ড। আর সেটা ঘিরেই তাদের বাড়ির সামনে জমে উঠেছে মানুষের ভীড়। মনোতোষ এগিয়ে গিয়ে তাদের কাছে তার পরিকল্পনার কথা খুলে বলেন। উপস্থিত মানুষজনের  মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ বলেন , দারুণ হবে মাস্টারমশাই। আমার মেয়েটাকে আপনার আনন্দ পাঠশালাতেই ভর্তি করাব। কেউ বলেন , সরকারি সাহার্য ছাড়া এই স্কুল চলবে কত দিন ? তাছাড়া চতুর্থ শ্রেণীর পর সেই তো সরকারি স্কুলেই দিতে হবে।
মনোতোষও সেই কথা উড়িয়ে দিতে পারেন না।তাই সবাইকে হাত জোড় করে বলেন , আপনারা পাশে থাকলে সব সম্ভব হবে।



                             সেই আবেদন রেখেই বাড়ির ভিতরে যান তিনি। ছেলেমেয়ে আর স্ত্রী'র সঙ্গে আনন্দ পাঠশালা নিয়ে আলোচনায় সারাদিন কেটে যায়।সন্ধ্যায় ডাক পিওন এসে একটা চিঠি দিয়ে যায় সূর্যর হাতে। শিক্ষা দফতর থেকে পাঠানো সেই চিঠিতে জানানো হয়েছে , পরদিন সকালেই আদালত নিযুক্ত বিচার বিভাগীয় কমিটির সদস্যরা গ্রামের হাইস্কুলে আসবেন। সেখানে ওই স্কুল থেকে যারা প্রাইমারী শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা দিয়েছিলেন তাদের সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে। 
বিষয়টি জানার পরই স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে মনোতোষের।বিচার বিভাগীয় কমিটি কতদুর কি করবে তা সময়ই বলতে পারবে , কিন্তু যে আলোড়ন পড়েছে সেটা কম কথা নয়। উত্তেজনায় মনোতোষরা কেউ সেদিন রাতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারেন নি। শিক্ষা দফতরের চিঠি পাওয়ার পর  ঘুমোতে পারে নি রজতদের মতো টাকা দিয়ে চাকরি কেনা বহু পরিবারের লোকজনও। শেষ পর্যন্ত কি পাওয়া চাকরিটাও হারাতে হবে নাকি ? মাঝখান থেকে শুধু টাকাটাই জলে  যাবে না তো ? ও ই প্রশ্নই তাদের  প্রায় পাগল করে তোলে। তাই তারা মনে মনে সূর্য আর তার বাবার মুন্ডুপাত করেন। পরদিন যথারীতি সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে সকাল সকাল স্কুলে হাজির হয় সূর্য। মনোতোষ আর সুস্মিতাও তার সঙ্গে যায়। স্কুল চত্বরে তখন মেলার মতো ভীড়। চাকরি পাওয়া এবং না পাওয়া প্রার্থীদের পরিবারের লোকেরা হাজির হয়েছেন , তাছাড়াও হাজির হয়েছেন রাজনৈতিক নেতা এবং কৌতুহলী মানুষজন। সেই ভীড়ের মাঝেই রজতের বাবা রাজীবের সঙ্গে শ্রাবন্তীকে দেখতে পায় সুস্মিতা। কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছোয় শ্রাবন্তীর বাবা সৌমেনও। তাদের সবার চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।চোখে চোখ পড়তেই সুস্মিতা দেখতে পায় আড়চোখে তাদের দিকেই চেয়ে আছে শ্রাবন্তী। সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।সেই সময় পর পর চারটে গাড়ি এসে পৌঁছোয় স্কুল চত্বরে।সেই সব গাড়ি থেকে দশ সদস্যের প্রতিনিধি দল সহ নামেন জেলা স্কুল বোর্ডের চেয়ারম্যান বাঞ্ছারাম দাসও। অনেকেই এখন তাকে বাঞ্ছা কল্পতরু বলে টিপ্পনী কাটেন।টাকা নিয়ে নাকি অকাতরে চাকরি বিলানোর জন্যই ওই নাম হয়েছে তার। এখানেও ভীড়ের মাঝে থেকে কেউ কেউ সেই ভাবেই টিপ্পনী ছুড়ে দেন --- ওরে বাঞ্ছা কল্পতরু এসেছে রে। গামছা পাত , গামছা পাত,  চাকরি পড়ল বলে।
ভীড়ের দিকে একবার কটমট করে চেয়ে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে স্কুলের ভিতরে ঢুকে যান বাঞ্ছারাম। তারা ভিতরে ঢুকতেই গাড়ি থেকে বস্তাবন্দী কাগজপত্র নামিয়ে  স্কুলের হলঘরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।তারপরই একে একে নাম ধরে ডেকে নেওয়া হয় এই স্কুল থেকে পরীক্ষা দেওয়া একশো জন প্রার্থীকে। ডেকে নেওয়া হয় স্কুলের শিক্ষকদেরও। 
সবাই হলঘরে পৌঁছোতেই প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র সুপ্রিয় ঘোষ তাদের উদ্দেশ্যে বলেন -- আপনাদের মধ্যে যারা চাকরি পেয়েছেন তারা একদিকে দাঁড়ান , বাকিরা অন্যদিকে।
দেখা যায় পঞ্চান্ন চাকরি পাওয়ার দলে রয়েছেন আর পঁয়তাল্লিশ জন চাকরি পান নি।দুইদিকে দু'দল ভাগ হয়ে যাওয়ার পর সুপ্রিয়বাবু তার সঙ্গীদের বলেন , প্লিজ আপনারা এবার দু'দলর শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেটগুলো যাচাই করে তালিকাভুক্ত করে ফেলুন। আর নিয়োগপত্র গুলো জমা করে নিন। 
হল ঘর তখন নিস্তব্ধ। ঘটনার গতি প্রকৃতি কোন দিকে যাচ্ছে কেউ তা আঁচ করতে পারেন না। তারই মধ্যে তালিকা তৈরি করে নিয়োগ পত্রগুলো সংগ্রহ করে নিয়েছেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। সেই তালিকা দেখে সুপ্রিয়বাবু বলেন , কি ব্যাপার বাঞ্ছারামবাবু যারা চাকরি পান নি দেখা যাচ্ছে তাদের মার্কসের ধারে পাশেই তো যেতে পারছেন না আপনার চাকরি পাওয়া প্রার্থীরা। এমন কি সূর্য নামের ছেলেটি এই সেণ্টারের সেরা ক্যান্ডিডেট হয়েও চাকরি পান নি কেন বলতে পারবেন ? 
---- স্যার মার্কসটাই তো সব নয়।পরীক্ষাটাই আসল।ওরা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পান নি বলেই চাকরি পান নি।
---- ঠিক বলেছেন , পরীক্ষাটাই  হলো আসল। আসুন বরং সেগুলোই খতিয়ে দেখা হোক।
তারপর বেছে বেছে প্রার্থীদের  উত্তর পত্রগুলো তাদের হাতে তুলে দেওয়ার পর সুপ্রিয়বাবু বলেন , কি বন্ধুরা আপনারা সবাই নিজ নিজ লেখা উত্তরপত্র পেয়েছেন তো ? সব আপনাদের নিজের হাতেই লেখা তো ? 
সবাই সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়তেই আত্মপ্রসাদের হাসি ফুটে ওঠে বাঞ্ছারামবাবুর মুখে। তিনি তো ভালো করেই জানেন ওসব ফাঁকফোকর তারা মেরেই রেখেছেন।কিন্তু প্রতিনিধি দলের পরবর্তী পদক্ষেপে তার মুখে ঘনিয়ে আসে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া।

                                                    ( ক্রমশ )


নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------

                                    ( ১ )
  

                                  
                               

                             ( ২) 





                                       

                       ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                      ( ৪ )

            



                          ( ৫ )

                                 ( খেলার বই )
         

                                                                                 


                 ----০----



No comments:

Post a Comment