Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

শহিদের মা - ৮ /

                                                 

                                    


                         শহিদের মা 


                                     অর্ঘ্য ঘোষ 


                                         ( ৮ ) 


সার সত্যটা অনুভব করে গণমঞ্চের উপর তলার নেতারাও। অন্ধ হলে যে প্রলয় বন্ধ থাকে না তা ভালোই টের পান তারা। সারা রাজ্যে বিরূপ সমালোচনার ঝড় ওঠে। সরব হয় গণমঞ্চের শরিক দলগুলিও। তারাও গণমঞ্চের দাদাগিরিতে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। এই সুযোগে তারা তুলোধনা করতে ছাড়ে না। সংবাদ মাধ্যমে লাগাতর প্রচারিত হতে থাকে গণহত্যার খবর। বুদ্ধিজীবীদের একাংশও ওই হত্যাকান্ডকে হাড়হিম করা ঘটনা বলে আখ্যা দেন। টনক নড়ে গণমঞ্চের। এতদিন বুদ্ধিজীবীরা তাদের বিরুদ্ধ মুখ খোলেন নি। ঘরে বাইরে সমালোচিত হয়ে ল্যাজেগোবরে অবস্থা হয় শাসকদলের। অপরাধের পাল্লা ভারি হলে যে আর তা ধামাচাপা দেওয়া যায় না সেটা এতদিনে হাড়ে হাড়ে টের পান তারা। তাই মুখরক্ষা করতে দলের রাজ্য সম্পাদক সুহাস অধিকারীকে বিবৃতি দিয়ে বলতে হয় , ' ঘটনা যাই হোক না কেন , ' এই গণহত্যা কিছুতেই বরদাস্ত করা যায় না। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াটা কোন মতেই কাম্য নয়। আমাদের দল ঘটনার তীব্র নিন্দা করছে। '

একই সুরে মুখ্যমন্ত্রী গৌতম ভট্টাচার্য্য বিবৃতি দেন , ' এই ঘটনা কিছুতেই বরদাস্ত করা হবে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। '

তারপর থেকেই পরিবেশ- পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। পুলিশ মহলে জোর তৎপড়তা শুরু হয়। সুরঞ্জন সেনগুপ্ত অবশ্য তাতে কোন আমল দেন না। তিনি তখন সেখবাজারের পার্টি অফিসে বসে কর্মী সমর্থকদের নিয়ে খোসগল্পে মেতে রয়েছেন। কর্মী সমর্থকরা কেউ কেউ সেদিনের খবরের কাগজগুলোতে চোখ বোলাচ্ছিলেন। সব কাগজেই সেদিন বড়ো বড়ো বেরিয়েছে উঁচপুর গণহত্যার খবর। কিছুটা রেখে ঢেকে হলেও গণমঞ্চের মুখপত্র দৈনিক ' আহ্বান ' পত্রিকাতেও বড়ো করেই বেরিয়েছে খবরটা। সেইসব কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে সুরঞ্জনবাবুর ডান হাত হিসাবে পরিচিত শান্তি মান্না বলে ওঠে , ' হ্যাগো দাদা , একি দেখছি গো ? বুর্জোয়া কাগজগুলোর কথা নাহয় বাদই দিচ্ছি , আমাদের কাগজেও যে রাজ্য সম্পাদক - মুখ্যমন্ত্রীরা সব কড়া কড়া কথা বলেছেন। উল্টো - পাল্টা কিছু হয়ে যাবে না তো দাদা ?' মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে সুরঞ্জন সেনগুপ্ত বলেন , ' ওসব বাদ দে তো। জনসমক্ষে দলের ভাবমূর্তি উজ্বল রাখতে উপর তলার নেতাদের ওই রকম কথা বলতে হয়। কিন্তু তারাও জানেন ক্ষমতায় থাকতে গেলে সব কিছুই করতে হয়। '

গুরুর কথা শুনে আশ্বস্ত হয় শান্তির মন। কথাটা তো আর মি থ্যা নয়। এত বড়ো হত্যাকান্ড না হলেও তাদের বিরুদ্ধে খুনখারাপির অভিযোগ তো এর আগে কম ওঠে নি। উপরতলার নেতারাও ওইরকম বিবৃতিও কম দেন নি। দিন কয়েক নেতাদের বিবৃতি চায়ের ঠেকে আলোচনার খোরাক হয়েছে মাত্র। পরে সব ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে। কেউ তাদের টিকিটিও ছুতে পারে নি।এবারে কিন্তু সব হিসাব উল্টে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজার সামনে এসে থামে তিনগাড়ি পুলিশ আর একটি বিশাল ভ্যান। দ্রুত পুলিশ কর্মীরা পার্টি অফিস ঘিরে ফেলে। কয়েকজন অফিসারকে নিয়ে পার্টি অফিসের ভিতরে ঢুকে আসেন ও,সি মিথিলেশ সরকার। ওসিকে দেখে সুরঞ্জনবাবু অভ্যর্থনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন , 'আরে আসুন আসুন বড়বাবু ,  সকাল বেলায় কি মনে করে ? ' তারপর শান্তির দিকে ফিরে বলেন , ' শান্তি বড়বাবুদের জন্য চায়ের ব্যবস্থা কর। '

শান্তি চা তৈরির তোড়জোড় শুরু করতেই বড়বাবু তাকে হাত তুলে তাকে নিরস্ত করে বলেন , ' সুরঞ্জনবাবু আজ আর আপনাদের এখানে চা খাওয়া সম্ভব হবে না। আপনারাই বরং আমাদের সঙ্গে থানায় চলুন , সেখানেই চা-টা খাওয়া হবে। ' ওসির কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে ওঠে সুরঞ্জনবাবুর। বিস্মিত হয়ে বলেন , ' মানে ? ' 

' মানেটা বলছি। তার আগে আমি যাদের নাম বলছি তাদের মধ্যে কে কে এখানে আছেন বলুন দেখি ? '

পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে ওসি পড়ে পড়ে একটা করে নাম বলতে থাকেন। দেখা যায় সেই তালিকা অনুযায়ী ৪০ জন রয়েছে সেখানে।সুরঞ্জনবাবু আর কৌতুহল চেপে রাখতে পারেন না। অধৈর্য হয়ে বলেই ফেলেন , 'কি শুরু করেছেন বলুন তো ? নাম ধরে ধরে মাথা গুনতি করছেন , ধরেটরে নিয়ে যাবেন নাকি মশাই ? '

' ঠিক ধরেছেন , উঁচপুর গণহত্যার অভিযোগে আপনাদের গ্রেফতার করা হোল। ' ওসির কথা শুনে নিজের কানকেও যেন বিশাস করতে পারেন না সুরঞ্জনবাবু। একি বলছেন ওসি ! সে ঠিক শুনেছে তো ! এতদিন থানায় কোন অভিযোগ দায়ের হলে  কোথায় কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা তার  সঙ্গে আলোচনা করেই নিয়েছেন ওসি। সেই ওসিই তাকে গ্রেফতার করার কথা বলছেন। তার মনে হয় , নিজের হয়তো বুঝতে ভুল হচ্ছে। এর আগেও তাদের নামে তো সব রকম অভিযোগ উঠেছে। চাপে পড়ে পুলিশ লোক দেখানো দু'চারজনকে ধরেও নিয়ে গিয়েছে। অনেক সময় তারাও পুলিশের মুখ রক্ষা করতে তাদের পোষা দু'চারজন দুস্কৃতিকে তুলে দিয়েছে। তারপর আবার ছাড়িয়েও নিয়ে এসেছে। এবারেও হয়তো তেমন চাপে পড়ে গ্রেফতার দেখানোর জন্য কয়েকজনকে নিতে এসেছেন। চাপ হওয়ারই তো। একটা - দুটো নয় , এ যে একেবারে এগারোটা মার্ডার। তার উপরে শালা সাংবাদিকগুলো লেগে রয়েছে পিছনে। সেই ভেবেই ওসিকে বলেন , ' ও বুঝতে পেরেছি। কিছু অ্যারেষ্ট দেখাতে হবে তো। চিন্তা করবেন না , সে হয়ে যাবে। ডালু - মালুর সাগরেদ গুষ্ঠি কয়েকদিন আগে জেল থেকে ফিরেছে। বিকালের দিকে তাদের কয়েকজনকে নাহয় সঙ্গে করে পৌঁছে দিয়ে আসব। '

' কিন্তু এবারে যে আর তা হবে না সুরঞ্জনবাবু। এবারে যে আপনাকেও আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।'


ওসির স্পর্ধা দেখে আশ্চর্য হয়ে যান সুরঞ্জনবাবু। কি ছুটা দুঃশ্চিন্তাও হয়। এক ঘর কর্মী সর্মথকের সামনে তাকেও ধরে নিয়ে গেলে প্রেস্টিজ বলে তো আর কিছু থাকবে না ? এরপর কর্মীদের মনোবলই কি  ঠিক থাকবে ? তাদের সামনেই পুলিশ নেতাকে ধরে নিয়ে গেলে সব তো ঘর ঢুকে যাবে। তাই কর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে বলে , ' কি বলছেন  বড়োবাবু ! সাতসকালে কি মসকরা করতে এলেন নাকি ?' 

' মসকরা নয় সুরঞ্জনবাবু , আপনাদের পার্টির সত্তর জনের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ দায়ের হয়েছে '।

' সে হোক , এ রকম অভিযোগ তো কম দায়ের হয় নি। দিন কয়েক ধামাচাপা দিয়ে রেখে দিন। তারপর দেখুন কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। ঠিক আছে , পরে না হয় থানায় গিয়ে  আপনার সঙ্গে আলোচনা করব। '

' দুঃখিত সুরঞ্জনবাবু , কিছু করার নেই। বোঝেনই তো আমরা হুকুমের চাকর। এতদিন আপনারা যা হুকুম করেছেন তা তামিল করছি। আজও সেই হুকুমই তামিল করতে হবে। চলুন গাড়িতে উঠুন। '

কথাটা শুনে নিজেকে বাঁচানোর মরীয়া চেষ্টায় সুরঞ্জনবাবু বলেন, ' দলের নেতারা জানলে আমাদের অ্যারেষ্ট করতে পারবেন ? '

' বেশ তো , আপাতত আপনারা থানায় চলুন। তারপর নাহয় আপনাদের উঁচুতলার নেতারা বললে স্বসম্মানে ফিরিয়ে দিয়ে যাব। ' 

কাউকে আর কিছু না বলে সুরঞ্জনবাবু সহ চল্লিশ জনকে পার্টি অফিস থেকে অ্যারেস্ট করে গাড়িতে তুলে থানা অভিমুখে রওনা দেয় পুলিশ।পুলিশের গাড়িতে আসতে আসতেই মুসড়ে পড়ে সুরঞ্জন সেনগুপ্ত। সে স্বপ্নেও ভাবে নি তার মতো নেতাকে তাদেরই পুলিশ এক হাট কর্মী সমর্থকের সামনে এভাবে তুলে নিয়ে আসবে। সংগঠন টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তার অবদানের কথা রাজ্য নেতাদের জানা না থাকলেও জেলা নেতাদের তো আর অজানা নেই। জেলার নেতারা নিশ্চয় সেই অবদানের কথা ভেবেই তার গ্রেফতারি আটকাবেন। সেই ভরসাতেই তার মনের মধ্যে যেন আশার ক্ষীণ একটি প্রদীপ শিখা জ্বলতে থাকে। কিন্তু থানায়  পৌঁছে তার সেই আশার প্রদীপ শিখাটি যেন দমকা হাওয়ায় নিভে যায়। থানায় ওসির ঘরেই দলের জেলা সম্পাদক প্রদীপ ব্যানার্জী আর জেলা সভাধিপতি তমোরেশ রায়কে দেখে বুকে বল পায় সে। অনুযোগের সুরে বলে , ' দেখুন তো দাদা , আমাদেরই পুলিশ একহাট লোকের সামনে আমাকে তুলে নিয়ে এল। এরপর আর কর্মীদের মনোবল থাকবে না দল ধরে রাখা সম্ভব হবে ? আপনারা এর একটা বিহিত করুন দাদা। নাহলে যে আমার মুখ লুকানোরও জায়গা থাকবে না। '

জেলা নেতারা কিন্তু কিছু মন্তব্য করেন না। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেন তারা। তা দেখে উদ্বেগ ঝড়ে পড়ে সুরঞ্জনেরবাবুর গলায় , ' কি হলো দাদা , চুপ করে আছেন কেন ? কিছু বলুন। '

বেশ কয়েক মুহুর্ত কেটে যায় উদ্বেগে। তারপর প্রদীপবাবু নিরাসক্ত গলায় বলেন , ' স্যরি সুরঞ্জন। আমাদের কিছু করার নেই।  রাজ্য নেতৃত্বের নির্দেশে তোমাদের গ্রেফতারের কথা বলতে আমদেরই এখানে আসতে হয়েছিল। ' 

' আপনারা আমাদের গ্রেফতার করার কথা বলতে এসেছিলেন! ' উদ্বেগ ছাপিয়ে এবার বিস্ময় ঝড়ে পড়ে সুরঞ্জনের গলায়।

' ওই যে বললাম আমাদের কিছু করার নেই , উপর তলার নেতাদের নির্দেশ পৌঁচ্ছে দিতে আসতে হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য যাই কিছু করা হোক না কেন , তা ট্যাক্টফুলি ম্যানেজ করতে হবে। ভাবমূর্তি উজ্বল রাখতে দলের মুখে কালি লাগলে দল তা মুছে ফেলতে দু'বার ভাববে না। ' 

' তাহলে কি আমি জেল খাটব ? '

' কিছু তো করার নেই। কেউই আইনের উর্দ্ধে নয়। তবে আইনী লড়াইয়ে জেলা কমিটি তোমাদের পাশে থাকার চেষ্টা করবে। '


        আর কোন কথা বলেন না জেলা নেতারা। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে যান। আর পুলিশ ধৃতদের একে একে নিয়ে গিয়ে লক আপে ঢোকায়। আশার প্রদীপটা নিভে যাওয়ায় চুপসে যান সুরঞ্জনবাবু। গণমঞ্চের জেলা নেতারা চলে যাওয়ার পরই বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে পুলিশ গ্রামে গ্রামে ধরপাকড় শুরু করে দেয়। কিন্তু সুরঞ্জনবাবুদের গ্রেফতার খবর পাওয়ার পরই অধিকাংশই গা ঢাকা দেয়। পুলিশ হাতে গোনা কয়েকজনকে নিয়ে ফেরে। দাবানলের মতো সুরঞ্জনবাবুদের গ্রেফতারির খবর ছড়িয়ে পড়ে। খবর পৌঁছোয় সংবাদ মাধ্যমের কাছেও। অন্যান্য সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌমেনকে নিয়ে দেবদত্ত থানায় পৌঁছোয়। ওসিকে সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করে , ' কি ব্যাপার বলুন দেখি ?  সুরঞ্জন সেনগুপ্তের মতো একজন জাঁদরেল নেতাকে গ্রেফতার করার মতো সাহস কি করে হলো তা ভেবে পাচ্ছি না। এ যে দেখি একেবারে উলোট পুরান। '

ওসি উপরে দিকে হাত তুলে বলেন , ' কি বলি বলুন তো ? সেই যে একটা কথা আছে না,  কর্তার ইচ্ছায় কর্ম , ধরতে পারেন অনেকটা তাই।সেইসময় কোর্টে নিয়ে যাওয়ার জন্য লকআপ থেকে সুরঞ্জনবাবুদের বের করে পুলিশ ভ্যানের দিকে নিয়ে আসা হয়। সাংবাদিক - চিত্রসাংবাদিকরা ছেঁকে ধরে তাদের। 

দেবদত্ত এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে , ' কি হলো সুরঞ্জনবাবু সেদিন তো বলেছিলেন ডাকাত বলে গ্রামের লোক ওদের পিটিয়ে মেরেছে। কিন্তু এখন তো দেখছি পুলিশ আপনাকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করেছে। কি বলবেন আপনি ?' দেবদত্তর কথা শুনে সুরঞ্জনবাবুর গায়ে যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়ে। পুলিশের ভ্যানে উঠতে উঠতে রীতিমতো শাসানির সুরে বলেন , ' সব শালা তোদের উল্টো পাল্টা খবরের জন্য হয়েছে। বেশিদিন তো আর জেলে থাকব না। ঘুরে আসি দাঁড়া , তারপর তোদের দেখছি। '


                                                   ( ক্রমশ ) 


No comments:

Post a Comment