Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মণিকোঠায় - ১৩ ( কামাখ্যা - কবি)


             মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        


                                    অর্ঘ্য ঘোষ



( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )




               কামাখ্যা ঠাকুরের কথা 



                  (  ২৫ )



এলাকার লোকের কাছে কামাখ্যা ঠাকুর হিসাবেই তার পরিচিতি ছিল। আসল নাম ছিল কামাখ্যা চ্যাটার্জী। ময়ূরেশ্বরের তিলডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা কামাখ্যা ঠাকুরের কিন্তু তাবলে পুরুতগিরি পেশা ছিল না। তিনি ছিলেন স্থানীয় ঢেকা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কম্পাউণ্ডার। তবে কেউ কোনদিন পুরোহিত না পেলে অনুরোধে ইতু , সত্যনারায়ণ , লক্ষ্মী পুজো করে দিতেন।

                                        তার বেশভুষা ,  চলন - বলন এতই সাধারণ ছিল যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কম্পাউণ্ডার তো দুরের কথা , সাধারণ সরকারি কর্মীও মনে হতো না তাকে।একেবারে ভোলেভালে টাইপের চেহেরা। পায়ে সব সময় হাওয়াই চটিও থাকত না। হাঁটুর নিচে থেকে মোটা ধুতির উপর থাকত হাফ হাতা গেঞ্জি। ঘাড়ে উপর ঝোলানো থাকত ফতুয়ার মতো জামা। জামা পড়তে তাকে কালেভদ্রে দেখা যেত।

                                                   তার জামা না পড়া নিয়ে এলাকায় নানা ঘটনার কথা  এখনও প্রচলিত  রয়েছে। ১৯৭৮ সালের বন্যার সময় পেটের রোগ দেখা দিয়েছে। রোগীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা  করাতে হাজির হচ্ছেন। কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একমাত্র টিউবওয়েলটি তখন বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। বার বার স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আর্কষণ করেও টিউবওয়েল মেরামতের কোন ব্যবস্থা হচ্ছে না। রোগী , তাদের পরিজন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শেষে তিতিবিরক্ত হয়ে ঘাড়ে জামাটি ফেলে সিউড়ির বাস ধরে সোঁজা সি,এম,ও,এইচের অফিস হাজির কামাখ্যাঠাকুর।

                                                 সে সময় সি,এম,ও,এইচ ছিলেন নাকি একজন ভদ্রমহিলা। জোড় হাত করে খোদ  সি, এম, ও,এইচ'এর সামনে দাড়িয়ে বলেন , মা তোমার দ্বারস্থ হলাম , এবার তুমি উদ্ধার করো।হকচকিয়ে যান সি,এম,ও,এইচ। চাষাভুষো টাইপের লোকটা তাকে মা সম্বোধন করছে , তুমি তুমি করে কথা বলেছে কেন ? ভেবে কোন কুল কিনারা পান না তিনি।তাই কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলেন , কে আপনি , কি চান ? জবাবে কামাখ্যা ঠাকুর বলেছিলেন , মা আমি তোমারই অধস্তন ,  ঢেকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কম্পাউণ্ডার। পরিচয় জানার পর বিস্ময় আর ধরে না সি,এম,ও,এইচের। কিন্তু সেটা গোপন করে বলেন, তা অফিসে গেঞ্জি পড়ে চলে এসেছেন কেন ? কামাখ্যা ঠাকুর ঘাড়ে হাত দিয়ে দেখেন তখনো ঘারের উপরেই পড়ে রয়েছে জামাটা। সঙ্গে সঙ্গে জিভ কেটে বলেন , বড়ো ভুল হয়ে গিয়েছে মা , কেমন ভাবে তোমাকে সমস্যার কথাটা বলব , সেই কথা ভাবতে ভাবতেই জামা পড়ার কথা ভুলে গিয়েছি।

  
                               তারপর বাইরে গিয়ে জামা পড়ে এসে সমস্যার কথা বলেন সি,এম,ও,এইচকে।বলা বাহুল্য পরদিনই টিউবওয়েল মেরামত হয়ে গিয়েছিল।আর সি,এম,ও,এইচের কাছে থেকে সেদিনের ওই ঘটনার কথা ডাক্তার , স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এসে পৌঁছেছিল এলাকায়।সব থেকে মজার ঘটনাটি ঘটে ছিল স্থানীয় বেলেড়া গ্রামে। একটি বাচ্চা ছেলে জ্বরে কাহিল হয়ে পড়েছিল বিছানায়।বাড়ির লোকেরা খবর পাঠিয়েছিলেন কামাখ্যা ঠাকুরের কাছে। বিকালের দিকে ঘাড়ে জামাটি ফেলে সেই বাড়ি পৌঁছোন তিনি। জামার পকেটেই থাকত তার  ইঞ্জেকশান দেওয়ার সিরিঞ্চ সহ টুকিটাকি ওষুধপত্র। ছেলেটিকে দেখার পর গৃহকর্ত্রীর উদ্দ্যেশ্যে বলেন , ইঞ্জেকশান দিতে হবে , একটু গরম জল করে দাও তো মা। যথাসময়ে গরম জল আসে। পকেট থেকে সিরিঞ্জ ,ওষুধপত্র বের করার জন্য ঘাড় থেকে জামাটা নামিয়েই তার চক্ষু চড়কগাছ। জামা কোথায় ? এ তো তার স্ত্রীর শায়া। পাশাপাশিই  ছিল , আনমনে সেটাকেই ঘাড়ে ফেলে চলে এসেছেন। আবার সায়া নিয়ে লোক ছোটে তার বাড়ি। জামা এসে পৌঁছোয়।কিন্তু ততক্ষণে জল ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। সেদিন ওই বাড়ির বধুটিকে আরও একবার জল গরম করতে হয়েছিল।


                                আলাভোলা গোছের হলেও আজকের ' আসি যাই , মাইনে পাই ' কর্মসংস্কৃতির বাজারে কিন্তু দৃষ্টান্ত হতে পারেন কামাখ্যা ঠাকুর। সে সময় আজকের মতো আলো , পাখা , ট্যাপ ঘুরিয়ে জলের সংস্থান ছিল না স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। তার বাড়িও ছিল কাছে। কিন্তু রোগীদের কথা ভেবে তিনি সস্ত্রীক  পড়ে থাকতেন  স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোয়ার্টারে। দিনের পর দিন ডাক্তারহীন স্বাস্থ্যকেন্দ্র সামলেছেন তিনি। আবার শয্যাশায়ী রোগীকে দেখতে ছুটেছেন বাড়িতে।কারও কাছে পয়সা - টাকা নেন নি। জমির বেগুনটা-মুলোটা , যে যা হাতে তুলে দিয়েছেন তাই নিয়েছেন। আমাকেও অনেকবার বাড়িতে এসে দেখে গিয়েছেন। বাবা  তাকে কাকা বলতেন। আমরা বলতাম দাদু। যাওয়ার সময় মা হয়তো গাছের চারটে পেঁপে দিয়েছেন , তখন উনি কুণ্ঠার সঙ্গে বলেছেন , প্রভাত ( আমার বাবার নাম ) চারটে কাঁচা কলা দিবি নে ? মাগুর মাছ জেলাই ( জলে সংগ্রহ করে রাখা ) করা আছে। তোর কাকীর জ্বর।গোলমরিচের ঝাল করে দিতাম। বলা বাহুল্য বাবা চারটের জায়গায় এক থড়ি কলা পাড়িয়ে দিতেন। আজ মনে মনে ভাবি সে কালের মানুষজনের চাহিদা কত অল্প ছিল। 


        আজ কামাখ্যাঠাকুর নেই। ডাক্তারহীন ঢেকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোয়ার্টারে আর কেউ থাকেন না । গবাদি পশুর খোঁয়াড়ে পরিণত হয়েছে গোটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র চত্বর। কিন্তু যে কোয়ার্টারে তিনি বাস করতেন সেটিকে এখনও এলাকার বাসিন্দারা কামাখ্যা ঠাকুরের কোয়ার্টারই বলে থাকেন।



                    -----০-----





                      কবিকাকুর কথা 



                     ( ২৬ )                                  



কবিকাকুর ভালো নাম ছিল জীতেন্দ্রনাথ ঘোষ। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের ষাটপলসা সংলগ্ন বড়ডিবুর গ্রামে। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন আমাদের লোকপাড়া গ্রামে। লোকপাড়াতেই ছিল তার মামা বিশিষ্ট চিকিৎসক দূর্গাচরণ ঘোষের বাড়ি। সেই সূত্রেই উনি আমার কাকা হতেন। মামার বাড়ির বৈঠকখানা ঘরে ছিল তার ওষুধের দোকান। খাওয়া দাওয়া করতেন মামার হেঁসেলে।আর থাকতেন ওষুধের দোকান ঘরের দোতলায়। 

                                     
                                  আমার সোনালি শৈশবের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কবিকাকু। সে সময় কবিকাকুকে আমার সিনেমার নায়ক মনে হোত।সব সময় ফিটফাট থাকতেন।টেবিল টেনিস খেলতেন। একটা শৌখিন সাইকেল ছিল। সেই সাইকেলের সামনে চাপিয়ে যেখানে যেতেন আমাকেও নিয়ে যেতেন। তার দোকানের পেনদানিতে থাকত বিভিন্ন রকম কলম , আর লাল - নীল রুল পেন্সিল।আমার খুব লোভ ছিল ওই পেন্সিলের উপরে। কবিকাকু আমাকে ওষুধের দোকানের প্যাড আর লাল নীল রুল পেন্সিল দিতেন। ছবি আঁকা শেখাতেন। আমার জন্য চকলেট কিনে লুকিয়ে রাখতেন।যখন খুব জ্বালাতাম , তখন একটা একটা করে দিয়ে আমাকে শান্ত করে রাখতেন।

                                                        সব থেকে ভালো লাগত বিকালবেলায়। আমাকে নিয়ে কবিকাকু ক্যানেলের দিকে বেড়াতে যেতেন। মাঝে মধ্যে সেখানে বেড়াতে আসতেন কৃষ্ণাপিসিও।কৃষ্ণাপিসি গ্রামেরই মেয়ে।আমার পিসিদের বন্ধু স্থানীয়া।তাই আমাকেও ভাইপোর মতোই দেখতেন। তাদের বাড়িতেও যাতায়াত ছিল আমার।  আমাকে মাঝে রেখে কবিকাকু আর কৃষ্ণাপিসি চুপিসারে কথা বলতেন। সব না বুঝলেও সেই বয়েসেই বুঝে গিয়েছিলাম কথাগুলো অন্যরকম কথা। তখন থেকে আমার মনেও অন্যরকম কথা বলার শিকড় গজিয়ে যায়।

                                
                                            তারপর হঠাৎ একদিন কবিকাকু আর কৃষ্ণাপিসি উধাও হয়ে যায়।খুব অভিমান হয়েছিল। আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে কি ক্ষতি হত ? কবিকাকুর খোঁজে প্রতিদিন তার দোকানের সামনে যেতাম। আর তালাবন্ধ দেখে ঠোঁট ফোলাতে ফোলাতে বাড়ি আসতাম। উধাও হওয়ার মতোই একদিন হঠাৎ আবার হাজির হন কবিকাকু। সঙ্গে কৃষ্ণাপিসিও। কৃষ্ণাপিসিকে তখন একেবারে অন্যরকম লাগছিল।মাথায় টকটকে সিঁদুর , হাতে শাখা। অভিমানে কয়েকদিন কাছেই যাই নি।কৃষ্ণাপিসিই মান ভাঙিয়ে কোলে করে নিয়ে গিয়েছিলেন।

                                            দোকানঘরের দোতলাতেই সংসার পেতেছিলেন কবিকাকু আর কৃষ্ণাপিসি। আমি হয়ে উঠেছিলাম তাদের মধ্যমনি। তখন তাদের সদ্য বিয়ে হয়েছে , তাও আমাকে নিয়ে কোন বিরক্তি বোধ হয়নি তাদের। বরং কৃষ্ণাপিসির কাছে খাওয়া দাওয়া করে দুপুরে ঘুমিয়েছি কতদিন।কৃষ্ণাপিসির রান্নাঘরটি সুন্দর করে সাজানো ছিল। আমার আজও মনে আছে অনেকগুলো কৌটা জোড়া দেওয়া একটা পাত্রে কৃষ্ণাপিসির বিভিন্ন রকম মশলা থাকত। সেই সময় অন্য কারও বাড়িতে আমি ওই ধরণের পাত্র দেখিনি।

   
                                     পরবর্তীকালে লোকপাড়ায় ওষুধের তুলে দিয়ে গ্রামে ফিরে যান কবিকাকুরা।ষাটপলশা হাটে বইয়ের দোকান করেন।কতবার সেই দোকান থেকে বই এনেছি। কবিকাকু জোর করে ধরে মিষ্টি খাইয়েছেন। কখনও পেন উপহার দিয়েছেন।আর আমার মনে পড়ে গিয়েছে সোনালি শৈশবের সেই দিনগুলির কথা। আজ কবিকাকু নেই ,  কিন্তু তার স্মৃতি আজও ভুলি নি।এখন আমি সেই ক্যানেলের দিকে বিকালে হাঁটতে যায়। মাঝে মধ্যে অনেক ছেলে মেয়েকে গল্প করতে দেখি। আর তখন এক লহমায় সামনে এসে দাঁড়ায় শৈশব। ভালো লাগা দুটি মুখ। এ জীবনে আমি তাদের ভুলব কেমন করে  ? 

                                                                                                                                                                                                                                            

               ( চলবে )

                



             নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 আগামী রবিবার  ১৯  নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হবে





                ধারাবাহিক উপন্যাস 



                       সালিশির রায় 

                                                                

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                  


খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ। 

               

                 ------০------ 

                    
                                            

1 comment:

  1. আজকের কবিকাকু আমার মন কেড়ে নিল। ধন্যবাদ।

    ReplyDelete