মনের মনিকোঠায় - ১
অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি ।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
সাহানির কথা
( ১ )
সত্তর কিম্বা আশির দশকে যারা বীরভুমের ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া হাইস্কুলে পড়েছেন বা পড়িয়েছেন তারা সাহানি নামটির সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত।প্রচলিত ওই নামটির আড়ালেই হারিয়ে গিয়েছে তার পোশাকি নাম।আসলে সাহানি ছিল তার পদবি।লোকপাড়া হাইস্কুলে তিনি নিজে হাতে তৈরি চানাচুর , ঝুড়ি আর বাদাম ভাজা বিক্রি করতে আসতেন।কিলোমিটার পাঁচেক দুরে ষাটপলশায় ছিল তার বাড়ি।কি বর্ষা , কি গ্রীষ্ম প্রতিদিন টিফিনের আগে কাঁধে তেলের টিনের তৈরি বাক্স নিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ঠিক হাজির হতেন।
মুখে পানের ছোপ।পড়নে খাটো ধুতি আর হাত কাটা ফতুয়া।গলায় ঝোলানো কাপড়ের তৈরি পয়সা রাখার থলে। হোস্টেলের সামনে চট বিছিয়ে পসরা খুলে বসতেন। ছিল লাল রঙের একটা খেরোর খাতা। যারা ধারে নিত তাদের নাম লিখে রাখতেন ওই খাতায়।তিন প্রজন্ম তার হাতে ভাজা চানাচুর-বাদাম খেয়েছেন এমন নজিরও রয়েছে। সেই মানুষটাকেই একদিন আর স্কুলে দেখতাম না।সেই সময়টা আজ আর মনে নেই। কিন্তু সাহানির কথা আজও ভুলি নি।
বৈদ্যনাথ বাবাজীর কথা
( ২ )
লোকমুখে তিনি বদি বা বদে বাবাজী নামে পরিচিত ছিলেন।আসল নাম ছিল বৈদ্যনাথ দাস।বীরভুমেরই ময়ূরেশ্বরের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে ছিল তার বাড়ি।বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর থাকতেন স্থানীয় নবগ্রাম-ভগবতীপুর মহামন্ত্র আশ্রমে। খঞ্জনি বাজিয়ে ভিক্ষা করতেন। উচ্চারণ খুব একটা স্পষ্ট ছিল না।কিন্তু তার রাম নামে ছিল এক অপূর্ব শ্রুতিমাধুর্য। তিনি ছিলেন যথার্থই বৈষ্ণব। নিছক লোক দেখানো কৌপিণ ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না তার বৈষ্ণব সত্ত্বা।তার মধ্যে কোনদিনই ছিল না সঞ্চয় প্রবনতা।
( ভক্তদের দাবি ধ্যানস্থ অবস্থায় এভাবেই মৃত্যুবরণ )
একটা বেলের মালা এবং কমন্ডলু নিয়ে ভিক্ষায় বেরোতেন।নিজের প্রয়োজন যতটুকু ঠিক ততটুকু ভিক্ষা করে ফিরতেন। মালায় নিতেন চাল , কমন্ডলুতে দুধ। দিনান্তে আশ্রমে ফিরে স্বপাকে আহার সারতেন।তারপর খেতেন দুধ। গাঁজা খেতেন বলে দুধটুকু নাকি তার দরকার হত। তাই নিয়ে আমার দাদুর সঙ্গে মাঝে মধ্যে বকাবকিও হত। আমার দাদু সুহৃদরঞ্জন ঘোষের ওই আশ্রমে যাতায়াত ছিল।
( অমিত মন্ডলের আঁকা ছবি )
আমিও দাদুর সঙ্গে মাঝে মধ্যে ওই আশ্রমে যেতাম। সেই সূত্রে বৈদ্যনাথ বাবাজীকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। বাবাজী দাদুকে ' সুরিতবাবু' বলে সম্বোধন করতেন।আমাকে বলতেন ' দাদুভাই'।কি মিষ্টি যে শোনাত সেই ডাক।আমি বলতাম 'বদিদাদু'। নেশায় বেসামাল হলে দাদুকে বলতে শুনেছি , বৈদ্যনাথ তুমি বৈষ্ণব মানুষ , তোমার নেশায় এত আশক্তি কেন ? বদিদাদু কোন প্রত্যুত্তর করতেন না।পরে আমাকে বলতেন , দাদুভাই তোমার দাদুকে একটু বকে দাও তো ভাই।খালি আমাকে বকাবকি করে।
সেই বদিদাদুও বাংলার ১৩৯৮ সালের ২৮ শে আশ্বিন আশ্রমেই ধ্যানস্থ অবস্থায় পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গিয়েছেন।আশ্রমেই তার সমাধি রয়েছে। ভক্তরা তৈরি করেছেন সমাধি মন্দির। প্রতিবছর আশ্রমেই তার প্রয়াণ দিবস পালন করেন ভক্তরা। আজও যেন চোখের সামনে রসকলি রঞ্জিত ছোটখাটো চেহারার সেই মানুষটিকে দেখতে পাই। কান পাতলেই যেন শুনতে পাই ---- দাদুভাই , তোমার দাদুকে একবার বকে দাও তো ভাই।


আপনার প্রয়াস সার্থক হোক। আর আমরা সমৃদ্ধ হতে থাকি।
ReplyDelete