ছোটলোক
অর্ঘ্য ঘোষ
বাবা ছিল মদন বায়েন , লোকে বলত ছোটলোক ।
আমিও জানতাম তাই , ছোটলোককে কি'ই বা বলা যায় ?
আমিও জানতাম তাই , ছোটলোককে কি'ই বা বলা যায় ?
ছোটবেলায়
মনিববাড়ির নতুন বৌ জিজ্ঞেস করেছিলেন, কাদের রে তুই?
আমি বলেছিলাম , জানে না যেন
, কেন ছোটলোকদের , ওতো সবাই জানে।
শুনে হাসিতে ফেটে
পড়েছিলেন নতুন বৌ।
বলেছিলেন , ভালোই
বলেছিস ,বাগদি নয় , ভল্লা নয় , একেবারে ছোটলোক ।
বাবুবাড়ির বৌ হয়ে সবার জানা কথাটাও জানে না ?
সেদিন নতুন বৌয়ের অজ্ঞতায় আমিও তাই হেসেছিলাম একচোট ।
বুঝিনি চার
অক্ষরের শব্দটি জনম দাগ হয়ে যাবে জীবনে।
শুনতে শুনতে মনে
হয়েছিল আমাদের পদবিটাই বুঝি ছোটলোক।
কিন্তু
দুর্গামন্দিরে ঢাকের শব্দ শুনলে ভুলে যেতাম আমি ছোটলোক।
বাবুবাড়ির
ছেলেদের মতো প্রসাদ নিতে হাত বাড়াতাম ।
দেখে বাবু বলতেন
, ছোটলোকের ছেলের আস্পর্ধা কম নয়তো , যা গিয়ে নীচে দাঁড়া।
সবার শেষে গিন্নিমা
আলগোছে উপর থেকে হাতের উপর ফেলে দিতেন প্রসাদ।
কিছু পড়ত হাতে ,
কিছু মাটিতে , সব নিমেষেই খেয়ে ফেলতাম।
দেখতাম বাবুবাড়ির
ছেলেদের প্লেট ভর্তি প্রসাদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে ।
মনে মনে ভাবতাম ,
ছেলেগুলো যেন কি ? খেতেও পারে না।
খুব লোভ হত , আমায়ও যদি দিত ওরকম প্লেটভর্তি প্রসাদ।
তারিয়ে তারিয়ে
খেতাম , দেখিয়ে দিতাম খাওয়া কাকে বলে।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে
থাকা প্রসাদ কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেতাম ।
মজা পেয়ে ওরাও
ছুড়ে ছুড়ে দিত ।
কুকুরের সঙ্গে
কাড়াকাড়ি করে কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেতাম ।
বাবুবাড়ির ছেলেরা
বলত , মা দেখ দেখ কেমন ধুলোবালি মাখা প্রসাদ খাচ্ছে ,
ওর কিছু হবে না ? অসুখ করবে না ?
গিন্নিমা বলতেন ,
ওরা ছোটলোক , ওদের সবকিছু হজম হয়ে যায় ।
সেদিনই জেনেছিলাম
ভগবান আমাদের হজমশক্তিটা বেশিই দিয়েছেন ।
আমাদের অনেককিছু হজম
হয়ে যায় ।
বেশি বেশি ভাত
হজম হয় , অপমানও হজম হয় ভালো।
আমাদের অবশ্য মান
অপমান বোধই নেই ?
জানি
না সেটা খায় না মাথায় মাখে ।
যার যখন ইচ্ছে হয়
লাথি মারে , তবু আমরা লেজ নাড়ি
কে জানে কবে কারা
আমাদের হাড়ে মজ্জায়
লেজ নাড়ার স্বভাবটা ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
আমরা শুধু লেজ
নেড়েই যায় , ঠাকুরদা - বাবা থেকে আমি ,
আমার বাচ্চা
ছেলেটাও এখন থেকেই কি সুন্দর লেজ নাড়া শিখে গিয়েছে।
বাবা ছিল ঢাকি ,
লোকে মদনা বায়েন ।
কাঁসি নিয়ে কতবার
বাবার সঙ্গে বাবুদের বাড়ি বাজাতে গিয়েছি ।
বাবা তখন সুন্দর
করে চুল আঁচড়ে দিত ।
দেখে বাবুরা
বলতেন , দেখ দেখ শালা ছোটলোকের টেরির বাহার দেখ ।
সেই শুনেই বাবা আমরা
চুলটা এলোমেলো করে দিত ।
দেখে বাবুরা
বলতেন , ছোটলোক কি আর সাধে বলে।
বুঝতাম না ছোটলোকেরাই
কেন এমন চোরের দায়ে ধরা পড়ে ?
সেবারে মনিববাড়ির মেজকর্তা ছোটবোনটার সঙ্গে কি না কি করেছিল।
লজ্জায় অপমানে বোনটা গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলে পড়েছিল , কিন্তু মরে নি।
লোকে বলেছিল , ছোটলোকের তো কই মাছের জান , ওরা সহজে মরে না।
কেবল বড়কর্তা বাড়ি বয়ে এসে বলেছিল , কথাটা পাঁচ কান করিস নি ,
তোর
মেয়েরই লোক খিটকেল হবে।
বাবা বলেছিল ছোটলোকের আবার খিটকেল কিসের গো কর্তা ?
সেই প্রথম দেখেছিলাম মনিববাবুর সামনে বাবার লেজ নড়ে নি ,
বরং থানা-পুলিশ করে বাবুদেরই নাড়িয়ে দিয়েছিল বাবা।
রেগে মেগে বাবুরা বলেছিলেন , ছোটলোক কি আর গায়ে লেখা থাকে ?
আমি মনে মনে বলেছিলাম , সত্যি বাবু তুমি ধন্য।
গায়ে তো লেখা নেই , তবু তুমি কেমন বুঝে যাও আমরা ছোটলোক , তোমরা অন্য ?


ছোটলোক - বারবার শোনা, কতবার শোনা! শুনতে শুনতে কানে আর ঠেকত না। একদিন সয়ে গেল সব। সেদিনের কথাগুলো আজ মনে হলে বড় নাড়া দেয়। বাবুদের ঘেন্না করতে শেখায়। তখনই নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। ইস এই বোধটা যদি না জন্মাতো তাহলে আর কষ্টটা পেতে হয় না!
ReplyDeleteধন্যবাদ
Delete